রাশিয়া আর পুতিন নানা কারণে আজকাল হেডলাইন নিউজ। রুশ ইতিহাস-সাহিত্য-সংক্রান্ত বইপত্র পড়ে আর ডকুমেন্টারি দেখে যেটা বুঝি, সেটা হল রুশ জনগণের একটা সামগ্রিক কালচারাল ম্যাসোকিস্ট সাবকনশাস সেন্টিমেন্ট আছে, যেটা তাদেরকে শ্বেত-লোহিত সকল প্রকার ৎসারদের দাসত্বশৃংখল মেনে নিতে প্রবৃত্ত করে (শ্বেত=রোমানভ সম্রাট, লোহিত=কমিউনিস্ট ডিক্টেটর)। রুশবিপ্লব সত্যিকারের অর্থে জনবিপ্লব ছিল না, ছিল মূলত পাওয়ার ভ্যাকুয়ামের সুযোগ নেয়া ক্যু!
আমার মনে হয়, সাধারণ রুশরা একটু সাদাসিধা টাইপ। তাদের দুর্ভাগ্য তাদের ঘাড়ে কেবল চতুর-ধূর্ত ডিক্টেটররাই চাপে। অথবা খারাপ সময়ে খারাপের এত চরম সীমায় তারা পৌঁছায়, যেখানে তাদের মনে হয় বিশৃংখলার চেয়ে অত্যাচারী শক্ত হাতও ভাল।
নিচের গানটার সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলার এমন একটা সময়ে, যখন সমাজতন্ত্র আর সাম্যবাদ আমাকে টানত। মার্ক্স-এঙ্গেলসের দুর্বোধ্য পুস্তক পড়ে তখন ধনতন্ত্র খারাপ, এই সরল কথাটাই খালি বুঝতাম। পরে অর্থনীতি-সমাজবিজ্ঞান-ইতিহাসের আরো সুবোধ্য বই-পুস্তক পড়ে বুঝেছি যে, সেই দুর্বোধ্যতার উদ্দেশ্য অনেকাংশে মার্ক্সের মেডিয়োক্রিটিকে ঢাকা। যেমনটা ছাইপাঁশ টেকনিক্যাল পেপারের জার্গন!
কাতিউশা নামের এই গানটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে লেখা-গাওয়া, এখনো পপুলার। দেশাত্মবোধক এ গণসঙ্গীতের সুর বিপ্লবী ধাঁচের মনে হলেও, এতে বিপ্লবের ব-ও নেই, সুরটাও ফোক্। এতে কাব্যিক ভাষায় বর্ণিত হয়েছে সুদূর যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত প্রেমিকের জন্যে কাতিউশা নামের এক তরুণীর ভালবাসার স্বীকারোক্তি।
বিশ্বযুদ্ধের আগের রুশ দেশাত্মবোধক গানগুলি বিপ্লবী হোয়াইটওয়াশে সয়লাব থাকলেও, যু্দ্ধের সময় স্তালিনগোষ্ঠীকে নিজেদের চামড়া বাঁচাতে জনগণের চেতনানিয়ন্ত্রণে কিছুটা ছাড় দিতে হয়েছিল — আমার মনে হয় এ গানটা তার একটা নমুনা, তাই এখনো জনপ্রিয়। যুদ্ধপূর্বযুগে স্তালিনের বিভিন্ন জোর করে চাপিয়ে দেয়া নিয়মের ফলে দুর্ভিক্ষে-লেবার ক্যাম্পে দু’কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তিরিশের দশকের ইউক্রেনে সোভিয়েত সরকারের তৈরি দুর্ভিক্ষের দিনগুলিকে হলোকস্টের মত বলে হলোদোমোর (যে কারণে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা নাৎসিদের হাতে হাত মিলিয়ে রাজাকারি করেছিল)।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন নাৎসি আগ্রাসনের ফলেও বিপুল প্রাণহানি-ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, তার অনেকটা তাদের পোড়ামাটি স্ট্র্যাটেজির কারণে। সোভিয়েত সাধারণ জনগণও প্রাণ বাঁচাতে আর প্রতিশোধ নিতে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ইউরোপীয় যুদ্ধের ম্যানু্য়ালের প্রথম নিয়মটা ভেঙ্গে হিটলার নাপোলেওনের মত ভালমত ফেঁসে গেছিলেন — নিয়মটা হলো, নেভার এভার মার্চ অন মস্কো! অপরদিকে, জার্মানি দখলের সময় প্রতিশোধপরায়ণ রুশ সেনারাও সমানে সাধারণ জার্মানদের ওপর হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ চালায়।
গানের সাথে যে ভিডিওটা জোড়া লাগানো, সেটা একটা সোভিয়েত প্রোপাগান্ডা ফিল্ম থেকে নেয়া। শুরুর ফ্রেমের তিন সেনার মাঝখানের জন সম্ভবত ফিল্ড মার্শাল ঝ়ুকভ — টি-৩৪ ট্যাংক আর ‘কাতিউশা’ নামেরই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল ব্যবহার করে জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের অন্যতম মহানায়ক। স্তালিনের বিরুদ্ধমতে অন্য কেউ কথা বলার সাহস না পেলেও ঝ়ুকভ বলতেন। জার্মানিবিজয়ের সময় রুশ সৈন্যদের প্রতি তিনি বলেছিলেন, নাৎসিবাদকে ঘৃণা করো, কিন্তু জার্মান জনতাকে নয়। পশ্চিমা সেনানায়ক মন্টগোমারি-আইজেনহাওয়ারের সাথেও তাঁর বহুদিন বন্ধুত্ব ছিল। যুদ্ধের পরে স্তালিন নিজের গদি অটুট রাখার জন্যে ঝ়ুকভকে সুদূর উরালে পাঠিয়ে দেন, যাতে রাজনীতিতে অংশ নিতে না পারেন। কমিউনিজমের পতনের পরে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির মানুষ লেনিন-স্তালিনের মূর্তি ভূপাতিত করলেও ঝ়ুকভকে সরায়নি।
ভিডিওটিতে আরো দেখবেন যে ফ্যাক্টরিতে বাচ্চারা-মেয়েরা কাজ করছে। সোভিয়েতসহ পশ্চিমা দেশগুলিতে ছেলেরা সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার ফলে মেয়েদের ঘরকন্নাসহ চাকরিবাকরিও করতে হয়েছে। পশ্চিমাদেশে নারীস্বাধীনতা আন্দোলন এ সময়েই হালে পানি পাওয়া শুরু করে। রুশদেশে ততটা নয়।
ভিডিওর শেষে কাতিউশা নামের রকেট লঞ্চার থেকে রকেট উৎক্ষেপণের দৃশ্য শব্দসহ দেখানো হয়েছে। আর্টিলারি হিসেবে এই অস্ত্র ছিল খুবই কার্যকর, কারণ খুব দ্রুত অনেকগুলি রকেট ছুঁড়ে শত্রুর মনে ত্রাস সৃষ্টি করতো এটা। যদিও এদের টিপসই নির্ভুল ছিল না।
গানটা গেয়েছে আলেক্সান্দ্রভ রেড আর্মি কয়ের বলে একটা দল। ১৯২৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনামলে দলটির যাত্রা শুরু, মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক মুখপাত্র হিসাবে কাজ করা। পূর্ব জার্মানিতে যুদ্ধের পরে একটা পীস কনসার্ট করেও বেশ জনপ্রিয় হয়। ৯০এর দশকে কমিউনিজমের পতনের পরেও টিকে ছিল। ২০১৬র ২৫শে ডিসেম্বরে সিরিয়ায় একটা ক্রিসমাস পারফরম্যান্স করে ফেরার পথে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিমান দুর্ঘটনায় দলটির ৬৪জন সদস্য প্রাণ হারায়।
(এখানে গানটির কথা ও মানে।)

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০১৮


