যুক্তির যুগ এবং ইবনে রুশদের উত্তরাধিকার

 

দ্য এইজ অফ রীজন — মার্কিন-ইংরেজ দার্শনিক টমাস পেইনের একটি বইয়ের নাম। হিন্দুপুরাণে যেমন বর্তমান যুগকে বলে কলিযুগ, সে রকম পেইন অষ্টাদশ শতকের শেষে হাঁটে হাঁড়ি ভেঙ্গে বলে দিলেন বর্তমান হল গিয়ে যুক্তির যুগ। তাঁর বইটি সেসময় রক্ষণশীল খ্রীষ্টানরা ভালভাবে না নিলেও এ আসলে গোপন কোন কিছু ছিল না যে, নতুন একটা যুগে মানুষ ইতিমধ্যেই পদার্পণ করেছে, আর তাদের জীবন পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। গ্যালভানির জৈববিদ্যুৎ আর স্টেভেনসনের বাষ্পইঞ্জিন আবিষ্কারের পরপর পশ্চিম ইউরোপ তখন শিল্পবিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত। যুক্তিবাদী চিন্তাধারাকে পিছু টেনে আটকে রাখার শক্তিগুলি আগের যুগে যেধরনের অত্যাচার করেছিল, তার কারণে তাদের ওপর মানুষের ভক্তি উঠে গিয়েছিল।

উন্নতির এ পর্যায়ে পৌঁছুতে কিন্তু অনেক চরাই-উৎরাই পেরোতে হয়েছে পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের। পেইনের আগে এসেছিলেন রনেসঁস যুগের দাভিঞ্চি, গ্যালিলেও, নিউটন, দেকার্ত। তাঁদের সবাই যে ভাগ্যবান ছিলেন তা নয়, টাইকো ব্রাহে আর জোর্দানো ব্রুনোকে অগ্নিআহুতি দিতে হয়েছিল। এঁরা কেউই নাস্তিক ছিলেন না। ব্রুনো বিশ্বাস করতেন, যদি পুরো বিশ্ব শুধু একটা পৃথিবী নিয়ে হয়, তাহলে তার স্রষ্টা কল্পনার তুলনায় অতিক্ষুদ্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, খোদা আর তাঁর সৃষ্টির মাহাত্ম্য তাদের অসীমতায়। বলা বাহুল্য, ক্যাথলিক চার্চ যা বাইবেলে পায় তার সাথে এসবের মিল নেই, অতএব ‘চড়াও ওকে শূলে!’

ইউরোপীয় সভ্যতার ‘আধুনিক’ হয়ে ওঠার পিছনে অন্যান্য অনেক সভ্যতার অবদান আছে। যেমন চীনাদের আবিষ্কার করা কাগজ-বারুদ তৈরির আর মুদ্রণের প্রক্রিয়াকে তারা শৈল্পিক রূপ দেয়। কিন্তু চীনাদের এসব উদ্ভাবন ছিল চাহিদাভিত্তিক আর হাজার বছরের ভুল করে করে শেখা প্রযুক্তির ফল। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ট্রায়াল-এন্ড-এরর প্রক্রিয়া। এর থেকে দক্ষ হল, যুক্তিবাদের ওপর স্থাপিত বৈজ্ঞানিক পন্থা, অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা কেন ঘটে, তার পিছনে কি কি কারণ আছে, সেগুলি কি নিয়মে চলে, আর এই উপপাদ্যগুলি প্রমাণের জন্যে কি ধরনের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দরকার। আর এসবের উত্তর জানার ফলে আমরা পেতে পারি নতুন কোন প্রযুক্তি।

এই যুক্তিবাদী পদ্ধতি ইউরোপীয় মনীষীরা পেয়েছিলেন আরব মুসলিম ও ইহুদী বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে। আরবদের থেকে তারা জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা — এসব সংক্রান্ত অনেক তথ্য পেয়েছিলেন। কিন্তু সবচে’ বড় যে ধারণাটা আরবদের হাত ঘুরে ইউরোপীয়রা ফিরে পেয়েছিল, তা হল তাদেরই প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিকদের যুক্তিবাদী চিন্তাধারা। অ্যারিস্টোটল, প্লেটো — এঁদের কোন লেখাই তখন ল্যাটিন বা গ্রীকে তারা পড়েনি, পড়েছিল আরবীতে। আর আরব মনীষীদের যারা এগুলিকে পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন ইসলামী স্বর্ণযুগের ধারক-বাহক। এদের মধ্যে ইবনে সিনা উল্লেখযোগ্য, তার পরেই ইবনে রুশদ। আর ইহুদী ধর্মাবলম্বী মুসা বিন মাইমুন, যার কারণে ইহুদী সমাজেও একটা দার্শনিক গতিশীলতা এসেছিল।

এদের মধ্যে ইবনে রুশদের লেখার মধ্য দিয়েই ইউরোপীয় আদি মনীষীরা যুক্তিবাদ শেখেন, আর তাঁকে এখনো বলা হয় সেক্যুলারিজমের জনক (সেক্যুলারিজমের অর্থ বাংলায় করে ধর্মনিরপেক্ষতা, এটা খুবই সংকীর্ণ অসম্পূর্ণ অনুবাদ)। তিনি ছিলেন আন্দালুসিয়ার রাজসভার কাজী আর মালিকী মতবাদের বিশেষজ্ঞ। তাঁর যুক্তিবাদের উদাহরণ দিই। মোমবাতি আলো দেয় কেন? এর উত্তরে তিনি ও তাঁর শিষ্যরা বলবেন যে, মোমে আছে দাহ্য পদার্থ, অগ্নির সংস্পর্শে আসলে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় আর তার থেকে উত্তাপ হয়, সে কারণে আলো। এ ঘটে খোদার করে দেয়া প্রাকৃতিক নিয়মেই, খোদাকে প্রতিটা মোমবাতি জ্বলার জন্য আলাদা করে আদেশ করতে হয় না, মোমবাতি জ্বলে ওঠো। আর এভাবে ক্রিয়াকারণ জানার মাধ্যমেই আমরা খোদাকে ভালভাবে জানতে পারি, আর তাঁর তৈরি করে দেয়া প্রাকৃতিক নিয়মাবলীকে ব্যবহার করতে পারি নিজেদের জীবনটাকে একটু সহজ করার জন্য। এই সামান্য ব্যাপারটাই হলো যুক্তিবাদ।

ইবনে রুশদের বিপরীতে সেসময় ছিল সনাতনী সুন্নী গোষ্ঠী আশারী, তাদের নেতার নাম সবাই একটু আধটু শুনেছেন — হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী। তিনি ইবনে রুশদের চিন্তাভাবনাকে সম্মান করতেন, কিন্তু ছিলেন সুফী অদৃষ্টবাদের প্রবক্তা। তিনি ইবনে সিনার যুক্তিবাদ খন্ডন করে একটি বই লিখেন। তাঁর হিসাবে মোমবাতি জ্বলে কারণ খোদা অপরিসীম শক্তিমান এবং এ জগতের কোন ঘটনা নেই তাঁর নির্দেশব্যতীত সংঘটিত হওয়ার। প্রতিটি মোমবাতিকে তিনিই ব্যক্তিগতভাবে আদেশ করেন প্রজ্জ্বলিত হওয়ার, তাতে সে জ্বলে। আর যদি তিনি আদেশ করেন কোনটিকে না জ্বলার, তাহলে শতবার আগুন দেয়ার পরও সে জ্বলবে না, আর তা হবে তাঁর একটি মুজিজা বা অলৌকিকতা।

আমরা আজ মসজিদে গাজ্জালীর নাম শুনি, কিন্তু ইবনে সিনা বা ইবনে রুশদের নয়। তাঁরাও তো প্রখ্যাত ফকীহ বা মুজাদ্দেদ (যার অর্থ কিন্তু সংস্কারক) ছিলেন। কেন শুনি না? কারণ, কার্যকারণ বুঝে বুঝে যদি খোদাকে জানতে-বুঝতে হয়, তাহলে তা অনেক কঠিন কাজ, আর প্রাকৃতিক নিয়মের বেড়ায় স্রষ্টা হয়ে যান দূরের কেউ। সাধারণ মানুষ এতকিছু বোঝে না, কষ্টও করতে চায় না। তারা ভাবতে পছন্দ করে স্রষ্টা অনেক নিকটে, আর সকলের অদৃষ্টলিখন করে দেয়া আছে, সে গন্ডি পেরোনো মানুষের অসাধ্য।

আজ মসজিদে ইবনে রুশদের বই শিক্ষা দেয়া হলে আমরা শিখতাম, মানুষকে খোদা ভাল-মন্দ যাচাইয়ের ক্ষমতা-স্বাধীনতা দুটোই দিয়েছেন, দিয়েছেন প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার বুদ্ধি। একটি বড় গন্ডির মধ্যে মানুষ তার স্বাধীনতা খাটাতে পারে, তার কল্পনাপ্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারে। যুক্তি দিয়ে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিসে তার লাভ।

আজ কি কেউ মসজিদে ইবন রুশদদের চিন্তাধারা শেখাচ্ছেন? জানতে পারলে আমায় বলবেন!

(লেখাটি শেষ করার পর জানতে পারি ইবনে রুশদের গতকাল ১৪ই এপ্রিল ছিল ৮৯২তম জন্মবার্ষিকী!)

শুভ নববর্ষ ১৪২৫

শুভ বাংলা নববর্ষ!

পহেলা বৈশাখ যারা মনে করেন ‘হিন্দুয়ানি অপসংস্কৃতি’, আশা করি তাদের জন্যে এই পোস্টটি কিছুটা শিক্ষামূলক হবে।

অনেকে বলেন রাজা শশাংকের সময়ে, সপ্তম শতকে, নাকি বঙ্গাব্দের যাত্রা শুরু। তা হতে পারে, কিন্তু সনাতনী হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রের সাথে সে সময়কার সব ভারতীয় রাজত্বের হিসাবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, সম্ভবত আলাদা করে বঙ্গাব্দ ব্যাপারটা ছিল না। এই অব্দের প্রচলনের মূল তাই অনেকে ধরেন আমাদের দেশের হিন্দু রাজ-রাজড়াদের ইতিহাসে প্রথিত।

কিন্তু সেটা প্রমাণ করা কষ্টসাপেক্ষ, আর রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট।

যেটুকু আমরা প্রমাণসহ বলতে পারি, সেটা হলো সম্রাট আকবরের সময় যখন দেখা গেল আরবী চান্দ্র হিজরী সন ধরে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল প্রজাদের কর আদায় করা কঠিন (কারণ তাতে ঋতু ওলটপালট হয়ে যায়), তখন সম্রাটের নির্দেশে পুরনো মাসগুলি রেখেই সৌর সন তৈরি করা হয়। তাতে কৃষকদের সুবিধা হয় সময়মত কর দিতে, আর বাংলা সেসময় ভারতের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল ছিল।

অনেকে বলেন মঙ্গল শোভাযাত্রা এসব হিন্দু ঐতিহ্য। পুরোপুরি সত্য নয়, এর সাথে জড়িত বাংলার নবাব মুর্শিদকুলী খানের সময় প্রচলন করা রাজপুন্যাহের পহেলা বৈশাখের ‘করপ্রদানযাত্রা’। সকল প্রজারা তাদের যা যা বাৎসরিক কর দেয়ার মত আছে, তাই নিয়ে রাজা বা রাজকীয় প্রতিনিধির কাছে যেত, এরই জাতিস্মৃতি আমি মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে দেখতে পাই। এখনো চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলে এরকম রাজপুন্যাহ উৎসব হয়।

রাজপ্রতিনিধিরাও এসময় প্রজাদের আদর করে দু’বেলা আপ্যায়ন করতেন। এই আপ্যায়নের ঐতিহ্যটা মুর্শিদকুলী খান করতেন ইসলামী বা আরবী ঐতিহ্যের অতিথিপরায়ণতার খাতিরেই। এর জাতিস্মৃতি আমাদের রমনার বটমূল আর পান্তা-ইলিশ খাওয়ার মাঝে।

হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অনেকে ধর্মীয়ভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন, কিন্তু সেটা পরে এসেছে, কারণ যারা বণিক, তারা নতুন হালখাতা খুলতেন লক্ষ্মী-গণেশের আশীর্বাদ নিয়ে। অর্থাৎ নতুন বছরটা আগে এসেছে, পরে তার ধর্মীয় যোগাযোগ।

যারা চৈত্রসংক্রান্তির সাথে পহেলা বৈশাখকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেন, তাদের জন্যে বলি যে এটা চৈত্রের শেষ দিনে পালন করা হলেও, এর সাথে স্প্রিঙ ইকুইনক্স বলে বহু প্রাচীনকাল থেকে পালিত আরেক পরব জড়িত। সেটার আসল তারিখ মার্চের ২০ হলেও সেটা কিভাবে চৈত্রের শেষে চলে আসল সে এক ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়।

আরো বলি যে এখনকার ইরান, যেটা কিনা ইসলামী গণপ্রজাতন্ত্র, তাদের নববর্ষ বা নওরোজ পালন হয় ঠিকঠাক মার্চের ২০ তারিখ। অর্থাৎ খাস চৈত্রসংক্রান্তিতে। এ তাদের প্রাক-ইসলামী ঐতিহ্য, কিন্তু কেউ সেটার ‘বিধর্মী’ শিকড় ঘাঁটাতে যায় না।

আপনার নববর্ষ আনন্দময় আর প্রাচুর্যপূর্ণ হোক!

বিটকয়েন ও ডিজিটাল কারেন্সি – ৫ (শেষ)

আমি চতুর্থ পর্বে ব্যাখ্যা করেছি কেন আমি বিটকয়েনের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান, আবার প্রথম পর্বে বলেছি আমার কিছু টাকা এসবে আছে। এটা পরস্পরবিরোধী নয়। ইনভেস্টমেন্টে সব সময় অপরচুনিটি কস্ট বলে একটা জিনিস চিন্তা করতে হয়। লাখে একটা লটারি লাগলেও সেটা কারো না কারো লাগে। ধরুন লটারিই কিনেছি, ভবিষ্যতে দশগুণ হলে মনে মনে আক্ষেপ থাকবে না যে অপরচুনিটিটা নিইনি। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সবসময় মনে রাখবেন সাফল্যের মূলমন্ত্র ডাইভার্সিফিকেশন, পরস্পরবিরোধী জিনিসে টাকা রাখলে সব মিলিয়ে লাভই হবে, যদি না অর্থনৈতিক মন্দার সময় হয়।

যারা টেকি টাইপের মানুষ, নতুন টেকনোলজি দেখলে উত্তেজিত হয়ে যান, তা হোন। কিন্তু দশপা পিছনে গিয়ে ভাল করে পুরো চিত্রটা একবার দেখবেন। সব টেকনোলজি সময়মত আসে না আর সবকিছুই ভাল বাজার পায় না। আইপ্যাডের পূর্বসুরী একটা প্রোটোটাইপ বোধহয় মটোরোলা আশির দশকে বানিয়েছিল, কিন্তু তখন মার্কেট রিসার্চে তার লাভজনকতা কেউ দেখেনি। ফাইন্যান্সিয়াল ইনডিকেটরগুলি সম্পর্কে ভাল করে জানবেন, কাজে দিবে। টেকিদের জন্য এসব বোঝা কঠিন নয়।

বিটকয়েনজাতীয় মুদ্রাকে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চীনের মত ব্যান করবে না, এটা আমি লিখে দিতে পারি। কিন্তু তারা স্পেক্যুলেশন আর মানি লন্ডারিংয়ের যথাযোগ্য প্রতিষেধক না পেলে তাকে সরকারি নিয়মনীতি ছাড়াই যেভাবে পারে আটকাবে। যেমন অনেক ক্রেডিট কার্ড কম্পানি বলেছে তারা কয়েন কেনার ট্রানজ্যাকশন অনুমোদন করবে না। ফেডারেল সরকার না করলেও অনেক স্টেট সরকার তাদের নাগরিকদের জালিয়াতি থেকে রক্ষার জন্য নতুন আইনকানুন প্রণয়ন করছে। গুগল-ফেসবুক-টুইটারও বলেছে তারা কয়েনওয়ালাদের অ্যাড তাদের সাইটে দেখাবে না। অথচ এদের মাধ্যমেই কয়েনওয়ালারা তাদের অধিকাংশ ক্রেতা খুঁজে পায়।

মানি লন্ডারিং সবচে’ বড় ভয়ের কারণ, যেহেতু বিটকয়েনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীরা বিদেশে তাদের তহবিল যেমন সংগ্রহ করতে পারে, তেমন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের লুক্কায়িত সদস্যদেরও টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করতে পারে। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিটকয়েনের ভবিষ্যত অন্ধকার। এদেশের মানুষ ব্যক্তিস্বাধীনতা ভালবাসলেও এখনকার যুগে নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তার ওপর আবার রাশিয়া বিটকয়েনের মাধ্যমে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় সাহায্য করেছে, সেরকমটা খবর বেরুলেও আমি অবাক হব না। শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, কর্পোরেট এস্পিওনাজের উদ্দেশ্যে হ্যাককরা ইমেল বা ডকুমেন্টও ডার্ক ওয়েবে কিনতে পাওয়া দৈনন্দিন ব্যাপার।

এসব নানাকারণে বিটকয়েনে মানুষ ধীরে ধীরে আস্থা হারাবে এবং আগামী অর্থনৈতিক মন্দার সময় পুরোপুরি নেই হয়ে যাবে, এরকমটা আমার ধারণা। এর আগেও ডিজিটাল টোকেনের ব্যবসাকারী বেশ কিছু কম্পানি ডটকম বাবল বাস্টের সময়ে পটল তুলেছিল। সে মন্দাটা কবে হবে তা বলতে পারি না। কোন বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদও বলতে পারবেন না। কিন্তু তারপরেও হডলাররা একে ধরে বসে থাকবে ভবিষ্যত লাভের আশায়! (আবার বলছি, আমার ধারণা ভুল হয়ে এর দশগুণ মূল্যবৃদ্ধি হলেই আমার লাভ!)

বিটকয়েন বিলুপ্ত হলেও দুটো জিনিস থাকবে। এক, ব্লকচেইন টেকনোলজি, আর দুই, একটা সত্যিকারের বৈশ্বিক মুদ্রার সম্ভাবনা। ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক আছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের সেরা ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেরা গবেষণা করে বের করছে কিভাবে একে তাদের বর্তমান ব্যবস্থার সাথে একীভূত করে মক্কেলদের লেনদেনকে ত্বরান্বিত করা যায়। তারা এসব ব্যাপারে সরাসরি কাজ করছে আইবিএমের মত নামী টেক কম্পানিগুলির সাথে। এরা ওপেন সোর্সওয়ালাদের মত অ্যামেচার নয়। আমার ধারণা এদের নতুন প্রযুক্তিরই বিস্তার হবে তাড়াতাড়ি আর সাধারণ মানুষ বিটকয়েনের অনেক সুবিধা এদের মাধ্যমে পাবে, অধিকাংশ ক্ষতিকর দিকগুলি বাদ দিয়ে। সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামধারী বেনামী প্রোগ্রামারদের থেকে এসব নামঠিকানাধারী বড় কম্পানিকেই আমি আপাতত বিশ্বাস করি একটু বেশি। আর বিশ্বাস ভাঙ্গলে জাকারবার্গের মত সোজা ওয়াশিংটনে বুড়োবুড়ি সিনেটরদের আখড়ায় হাজিরা! (ওয়েলস-ফারগোও গুগলিয়ে দেখুন।)

ব্যাংকিং ছাড়াও অন্যান্য অনেক খাতে ব্লকচেইনের ব্যবহার বাড়বে। যেমন মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলি রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য নিরাপদভাবে রাখতে এবং শেয়ার করতে পারবে রোগী আর তার অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে। স্টক ব্রোকার আর ইনশুরেন্স কম্পানিরাও এর থেকে লাভবান হতে পারে। বাড়ির মর্টগেজ আর অন্যান্য ধারের কাজও আগের থেকে দ্রুত সম্ভব হতে পারে। এগুলি সবই ধীরে ধীরে চলে আসতে দেখবেন। কিন্তু সাধারণ এনক্রিপশন টেকনোলজির সাথে ব্লকচেইনকে মেলাবেন না। ইন্টারনেটে নানা রকম কম্পানি আছে যারা নামে ‘ব্লকচেইন’ শব্দটা লাগিয়ে ইনভেস্টরদের ধোঁকা দিচ্ছে। দুটো টেকনোলজির তফাতও ভাল করে বুঝবেন। এনক্রিপশন কোন নতুন কিছু নয়।

শেষপর্যন্ত বলি, সীমানাবিহীন, সমান-সুযোগের একটা মুক্ত বিশ্ব অনেক মানুষের আকাঙ্ক্ষা। হয়ত সেরকম সীমানাবিহীন একটা মুদ্রাব্যবস্থা তার আগে এসে পৃথিবীর মানুষকে তার জন্যে প্রস্তুত করবে। বিটকয়েন দিয়ে তার কিছুটা আস্বাদন যখন মানুষ করতে পেরেছে, তখন এ ব্যাপারটা নিয়ে অনেকেই আরো গভীর চিন্তা করবে, এখনকার ক্রিপটোকারেন্সিগুলির সমস্যাগুলি সমাধান করার চেষ্টা করবে। হয়ত ক্রিপটোকারেন্সি ২.০ আমাদেরকে সেই ইউটোপিয়ার দিকে একঘর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আজ না হলেও হয়ত বছর কুড়ি পরে। বিটকয়েনের দশগুণ দরবৃদ্ধি নয়, আমি সেই ইউটোপিয়ান আশাতেই থাকলাম!

সকল পর্বের লিংকঃ

বিটকয়েন ও ডিজিটাল কারেন্সি – ৪

বিটকয়েনের দেখাদেখি এখন প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মত ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে চালু হয়েছে। তার মধ্যে বিটকয়েনের পরেই বাজারমূল্যের হিসাবে উপরে আছে রিপল, ইথারিয়াম, বিটকয়েন ক্যাশ, কারডানো আর লাইটকয়েন। এদের সম্পূর্ণ বাজারদর বলা হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি ডলারের উপরে! মনে রাখবেন, মানুষ এগুলোকে টাকা দিয়ে কিনছে বলেই এদের দাম আছে, নাহলে তারা ব্লকচেইনে উল্লেখিত একটা সংখ্যামাত্র! সবগুলি যে একইরকম তাও নয়, প্রত্যেকটির বিশেষ বিশেষ গুণাগুণ আছে, যেমন ইথারিয়ামকে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আসল টাকার প্লেসহোল্ডার হিসাবে ব্যবহার করছে, তার কিছু সুবিধার কারণে। কিন্তু বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ ক্রিপটোকারেন্সিই ‘প্লেইন ভ্যানিলা’ ওপেন সোর্সের উপর তৈরি, আর যে কেউই নতুন একটা বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বহুল প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে সেটা কিনতে আগ্রহী করে তুলতে পারে, আর সে সুযোগে বিশাল অংকের টাকা অনবহিত ক্রেতার কাছ থেকে সরিয়ে নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য একারণে নতুন নীতি এসেছে এক্সচেঞ্জগুলির জবাবদিহিতার জন্যে। অপরদিকে চীনে এক্সচেঞ্জ এবং মাইনিং এখন নিষিদ্ধ।

এসব নানা নিয়মনীতির ভয়ে এখন ক্রিপটোকারেন্সিগুলি একটু দামে কম। যদি আপনি বিনিয়োগের চিন্তা করে থাকেন, তাহলে এখন ভাল সময়। কিন্তু আমি সে উপদেশ দেব না। ফটকাবাজি বা স্পেক্যুলেশনের কারণে বিটকয়েন আর অন্যান্য কারেন্সির দাম অনেক উঠা-নামা করে, আর সেটা করে সকলে একসাথেই কোরিলেটেড-ভাবে, অর্থাৎ সত্যিকারের ডাইভার্সিফিকেশনের অভাব। ওয়ালস্ট্রীটের বড় বড় ফার্মও এ ব্যবসায় নেমেছে। তাদের পকেট অনেক গভীর, আর কম্প্যুটার অ্যালগরিদমের সহায়তায় হাই ফ্রিকুয়েন্সি ট্রেডিং করে তারা এদের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মাঝখান থেকে পকেট কাটা পড়বে আপনার-আমার মত চুনোপুঁটির। অনেকে বলছে সীমিত সাপ্লাইয়ের কারণে এগুলোর দাম এমনিতেই স্বর্ণের মত ঊর্ধ্বমুখী হবে। আমার প্রশ্ন, সোনার গয়নাও তো মানুষ হাতে-গলায় পড়ে পার্টিতে যেতে পারে, বিটকয়েনের ব্যবহারটা কি, সার্টিফিকেট বানিয়ে বাঁধিয়ে রাখবেন? (খেয়াল করুন, ব্লকচেইন টেকনোলজির গুষ্টি উদ্ধার করছি না! ৫ম পর্ব দ্রষ্টব্য।) স্টক মার্কেটের কম্পানিগুলির তো লাভ না থাকলেও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে, আছে ভবিষ্যত লাভের সম্ভাবনা, টেসলার কথাই ধরুন – বিপুল ক্ষতিতে বহুদিন থাকার পরে এখন লাভ করা শুরু করেছে। সেসব ছেড়ে কেন বিটকয়েনে জুয়া খেলা?

কম্প্যুটার প্রোগ্রামারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেও আমি বলবো যে পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক আর ওপেন সোর্স মডেলে টাকাপয়সা লেনদেন করার সমস্যা আছে। ওপেন সোর্স সফটওয়্যারে বাগ থাকে অনেক, সেগুলি ঠিকঠাক করে আর কোড মেইনটেইন করে ভলান্টিয়াররা। যদি সেসব দুর্বলতার কারণে কারো কোটি টাকা মার যায়, তাহলে তাকে টাকা ফেরত দিবে কে? ব্যাংকের টাকা মার গেলেও তো বীমার কারণে সেটা ফেরত পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যাংকগোষ্ঠীর দরকার অবশ্যই আছে, কারণ তাদের জবাবদিহিতা করতে হয়! জনগণের অর্থলেনদেনব্যবস্থা যদি বিটকয়েন হয়, তাহলে তার এদিক-সেদিক হবার জবাবদিহিতা করবে কে? তার ওপর, আপনার প্রাইভেট কী গোপন থাকলেও আপনার কম্প্যুটার হ্যাক করে যে কেউ সেটা বেহাত করে নিয়ে টাকাপয়সা সরিয়ে নিবে না, তার কি নিশ্চয়তা? এভাবে তো ইতিমধ্যেই কয়েকটা এক্সচেঞ্জে হ্যাকাররা আক্রমণ করে পয়সা গায়েব করে ফেলেছে।

আপনি যদি ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারক-বাহক হন আর সে কারণে বিটকয়েন ব্যবহার করেন, তাহলে নগদ ব্যবহার করতে সমস্যা কোথায়? এটিএম থেকে টাকা তুলে আপনি গাঁজা-হেরোইন-পর্ন যা খুশি কিনুন, দেখতে আসছে কে? আর আপনি যদি রকেট লঞ্চার একখান কিনতে চান, তাহলে তো অবশ্যই সেটা সরকারের নাক গলানোর মত বিষয়! আর বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন করে যে পার পাওয়া সম্ভব নয়, এফবিআই কর্তৃক উলব্রিখ্টের পরিচয় উদ্ঘাটন তার বড় প্রমাণ। তাছাড়া, যত দিন যাবে, বিটকয়েন মাইনিংয়ের পুরস্কার তত কমবে, অর্থাৎ লাভজনকভাবে মাইনিং করতে পারবে কেবল সেসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান যারা একসাথে অনেকগুলি কম্প্যুটার নিয়ে সর্বাধিক দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। তারাই তখন হবে বিটকয়েন নেটওয়ার্কের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক আর চাইলে ব্লকচেইনের হিসাবে গরমিল করতে পারবে। অর্থাৎ ‘ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান’, সেই সেন্ট্রাল ব্যাংকের মনোপোলি আর ডলার-ইউরোর কারবার (অথবা তার থেকেও খারাপ)!

আর অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেও বিটকয়েনজাতীয় মুদ্রার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। একটা বিশাল অর্থনীতির মুদ্রা হিসাবে বিটকয়েন কতটুকু সফল হতে পারে? খুব একটা নয়! প্রথমত, সাপ্লাই সীমিত থাকার অর্থ এই কারেন্সি ডিফ্লেশনারি। অথচ, আধুনিক সব কারেন্সি উচিত কারণে ইনফ্লেশনারি, প্রথম পর্বে বলেছি। যত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়বে, তত সম্পদের সাথে সাথে কয়েনের সংখ্যা না বাড়লে প্রতিটা বিটকয়েনের ক্রয়ক্ষমতা হবে অত্যধিক। তখন মানুষ সেটা লেপের নিচে পোরা শুরু করবে, সেটা এখনই হচ্ছে, যাকে কয়েনপ্রেমীরা বলে HODLing। তো, যে লেনদেনের কাজের জন্য বিটকয়েনের উদ্ভব, সে কাজ না করে যদি তা হয়ে যায় সংগ্রহবস্তু, তাহলে কারেন্সি হলো কিভাবে?

দ্বিতীয়ত, আস্থা! যেকোন মুদ্রার বেলায় এটা সবচে’ জরুরী। কিন্তু বিটকয়েন নিয়ে মানুষ এক্সচেঞ্জে কেনাবেচায় এতই পাগল যে আজ বিটকয়েনের দাম ১৭,০০০ ডলার তো কাল ৭,০০০। কিভাবে এ মুদ্রা ক্রয়ক্ষমতার আধার হয়? লোকে বলছে মানুষ যত একে লেনদেনে ব্যবহার করবে তত তার মূল্য স্থিতিশীল হবে। মানুষ কি আসলেই বিটকয়েন লেনদেনে ব্যবহার করছে, নাকি লেপের নিচে ভরছে?

তৃতীয়ত, যেকোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোন না কোন সময় ধ্বস নামে, নানাকারণেই। সবসময় যে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দোষ দেয়া যায়, তা না। তখন যদি মুদ্রার সাপ্লাই বাড়িয়ে-কমিয়ে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা না করা হয়, তাহলে অর্থনীতি পাগলা ঘোড়ার মত একদিকে ছুটবে। ইঞ্জিনিয়ার হলে আপনি ফীডব্যাক ব্যাপারটা বুঝবেন। ফীডব্যাকের অবশ্যই দরকার আছে, মুক্তবাজারের সরকার-কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু আপৎকালেই হস্তক্ষেপ করে বলে সবসময় আমাদের অবস্থা জিম্বাবুয়ে-ভেনেজুয়েলার মত দাঁড়ায় না। সে হিসাবে আমি বলবো ২০০৮এ ফেডারেল রিজার্ভ আর ইসিবির নামী অর্থনীতিবিদরা ডলার-ইউরো প্রিন্ট করে বিশ্বের অর্থনীতিকে রক্ষাই করেছেন, এখন স্থিতিশীলতার পরে সে ডলারগুলো (বা সমকক্ষ বন্ড) আবার বাজার থেকে তুলে নিয়ে ‘ধ্বংস’ করে ফেলা হচ্ছে। বিটকয়েনের ব্যবস্থায় তো কম্প্যুটার অ্যালগরিদম বানায় নতুন পয়সা। সে তো নিয়মে বাঁধা, সে কীভাবে বুঝবে কখন কি ফীডব্যাক দেয়া দরকার?

সকল পর্বের লিংকঃ

বিটকয়েন ও ডিজিটাল কারেন্সি – ৩

বিটকয়েন আজ এতটা জনপ্রিয় নাও হতে পারত, শুধু সীমাবদ্ধ থাকতে পারত ছোট কয়েকটা অনলাইন কম্যুনিটির মধ্যে, আর তারা হয়ত কয়েকশ’ বিটকয়েন নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেনামি মনোপোলি খেলায় এখনও ব্যস্ত থাকতো।

বিটকয়েনের জনপ্রিয়তাবৃদ্ধির পিছনে ডীপ বা ডার্ক ওয়েব বলে একটা জিনিসের বেশ বড় ভূমিকা আছে। ইন্টারনেটের একটা বিশাল অংশ আছে, যেগুলি কখনো গুগল সার্চ করে পাবেন না। পাবলিক ওয়েবসাইটের ডট কমজাতীয় ডোমেইন নেইম থাকলে তার রেজিস্ট্রেশনের তথ্য আইক্যান বলে একটা সংগঠনের সাইটে পাওয়া যায়, তার সাথে ডোমেইন ওনারের নাম-ঠিকানাও। ডীপ ওয়েব এসবের ধার ধারে না। তাদের সাইটগুলি রেজিস্টার্ড না, কিন্তু চাইলে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে পারে। আপনিও চাইলে নিজের কম্প্যুটারকে সার্ভার বানিয়ে ফেলতে পারেন, তখন আপনার সাইটটাকে আইপি অ্যাড্রেস দিয়ে ব্রাউজারে দেখা সম্ভব, তার জন্য ডট কম জাতীয় নামের কোন দরকার নেই। আইপি অ্যাড্রেস দিয়ে এটাও বোঝা সম্ভব আপনার সার্ভারের অবস্থান কোথায়। এধরনের অনেক সাইট নিয়েই ডীপ ওয়েব তৈরি।

এদের কিছু আবার নাম-পরিচয় গোপনের চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত। তাদেরকে আলাদা করে বলে ডার্ক ওয়েব। এদের দেখার জন্য টর বলে বিশেষ একটা ওয়েব ব্রাউজার লাগে। এই ব্রাউজার এনক্রিপশন আর বিশেষ ধরনের রাউটিং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে যে সাইটটা দেখছে তার এবং সাইটটার মালিকেরও পরিচয় ঢাকতে সাহায্য করে। সেরকম সিল্ক রোড ছিল ডার্ক ওয়েবের ইবের মতই একটা ই-কমার্স সাইট। এর প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট উলব্রিখ্ট ছিলেন লিবার্টারিয়ান মতাদর্শের অনুসারী, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্যে সরকার বা বড় কম্পানিগুলির অতিরিক্ত নাক গলানো তার পছন্দ ছিল না। কোন অসদুদ্দেশ্যসাধনের থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আদর্শই ছিল বেনামী এই সার্ভিস চালু করার মূল কারণ।

কিন্তু সিল্করোড চালু হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অপরাধজগতের লোকজন বুঝে ফেলল একে তাদের কাজে লাগানো সম্ভব। তারা সিল্করোডে অবৈধ মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র, পর্নোগ্রাফি, এসব বিক্রি করা শুরু করল। আর যারা তাদের কাছ থেকে এসব কিনত, তারা দাম দিত বিটকয়েনের মাধ্যমে, কারণ ক্রেডিটকার্ড ব্যবহার করলে নাম-পরিচয় ফাঁস! সিল্করোডের সফলতা দেখে আরো অন্যান্য ডার্ক সাইটও একইভাবে বিটকয়েন ব্যবহার শুরু করল। সেসবে হেন কোন বস্তু বা কাজ নেই, যার মূল্য বিটকয়েন দিয়ে পরিশোধ করা হয়নি — চুরি করা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, হ্যাককরা ইমেইল, ভুয়া পরিচয়পত্র, এমনকি পেশাদার খুনী আর হ্যাকাররাও তাদের ‘সার্ভিস’ এসব সাইটে ‘বিক্রি’ করেছে! আইসিসের মত সন্ত্রাসবাদী দল আর উত্তর কোরিয়ার মত একঘরেকরা দেশও এসব সাইট আর বিটকয়েনের মাধ্যমে তাদের তহবিল সংগ্রহ আর অস্ত্রশস্ত্র বেচাকেনা করেছে। এমনকি জুলিয়ান আসাঞ্জও উইকিলিকসে যারা বেনামে তথ্য পাঠাতে আগ্রহী, তাদেরকে বিটকয়েন দিয়ে পরিশোধ করেছেন। ২০১৩তে ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক শ্যুমারের অনুরোধে এফবিআই সিল্করোডের তদন্ত শুরু করে, উলব্রিখ্টের পরিচয় বের করে তাকে গ্রেফতার করে, আর সিল্করোড বন্ধ করে দেয়। ইতিমধ্যেই সিল্করোড প্রায় ১ কোটি বিটকয়েনের লেনদেনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে ফেলেছে।

বিটকয়েনে দাম পেলেই তো হবে না, তাকে অন্য সত্যিকারের কারেন্সিতে রূপান্তরেরও প্রয়োজন দেখা দিল। তার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ব্যবসার মত ঝাঁকে ঝাঁকে গজিয়ে উঠল বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ। সেসবে অপরাধজগতের সাথে যুক্ত লোকজনই শুরুতে বিটকয়েন কিনে কিনে তার দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে ডলার-ইউরো খরচ করে বিটকয়েন কিনতে। তাতেই তাদের লাভ, কারণ এতে তারা তাদের ‘কাল্পনিক’ মুদ্রার ভান্ডার খালি করে পেতে পারে ডলার-ইউরোর মত সত্যিকারের মুদ্রা। এসব এক্সচেঞ্জের বেশিরভাগ বহুদিন সরকারি নিয়মনীতির অভাবে যথেচ্ছভাবে ফী সংগ্রহ করে চুটিয়ে ব্যবসা করে গেছে। এফবিআই যখন শেষপর্যন্ত এদের দিকে নজর দিয়েছে, তখন মানি লন্ডারিং বা হুন্ডিব্যবসার অভিযোগে অনেককে জেলে পুরেছে। কিন্তু ততদিনে বিটকয়েন ইন্টারনেটের গলি-ঘুঁপচি থেকে এসে ঢুকে পড়েছে মূলসরণীতে। বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, কফিশপ, এরা দাম পরিশোধের মাধ্যম হিসাবে বিটকয়েন গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছে।

কাহিনীর এই পর্যায়ে এসেই হয়ত আমি-আপনি প্রথম শুনেছি বিটকয়েনের নাম।

সকল পর্বের লিংকঃ

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!