প্রাচীন বিশ্বের বাণিজ্য

সুইডেনে আবিষ্কৃত আব্বাসী খেলাফতের দিরহাম।

ছবির রৌপ্যমুদ্রাগুলি আব্বাসী খেলাফতের দিরহাম। মুদ্রার পিঠে খলীফার নামের পাশাপাশি আল্লাহ-রাসুলের নামে কালেমা লেখা। এ মুদ্রা খুব একটা দুর্লভ নয়। তবে এগুলি যে জায়গায় আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটাই পিলে-চমকানো ব্যাপার! উৎপত্তিস্থল বাগদাদ কিংবা দামেস্ক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাইল উত্তরে, একাধিক পর্বত-সাগর-নদী পেরিয়ে সুইডেনের স্টকহোমের কাছে এক সমাধিঢিবির মধ্যে পাওয়া গেছে এগুলি।

ভাইকিং ‘নৌকাসমাধিতে’ কুফী হরফে আল্লাহ-আলীর নাম এম্ব্রয়ডার করা সিল্কের কাপড়ও নাকি পেয়েছেন বলছেন সুইডিশ গবেষকরা। আরেক জায়গায় একটা আংটিও পাওয়া গেছে যার গায়ে নাকি ‘আল্লাহর জন্যে’ আরবীতে খোদাই করা।

ভাইকিং আর আব্বাসী খেলাফতের মধ্যে দশম/একাদশ শতকে একটা যোগসূত্র যে থেকে থাকতে পারে, এটা অনেকের কল্পনাতীত। দুটি কালচারের মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূরত্ব। অবশ্য প্রত্নতত্ত্ববিদরা এরকম উদাহরণ প্রায়শই পান। এর যৌক্তিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

সুইডেনের ভাইকিং সমাধিতে আবিষ্কৃত রেশমের কাপড়ে এম্ব্রয়ডার করে আল্লাহ ও আলী লেখা।
সুইডেনের ভাইকিং সমাধিতে আবিষ্কৃত আংটিতে লিল্লাহ লেখা।

এরকম আরো ভূরি ভূরি উদাহরণ দিতে পারি। বঙ্গোপসাগরের তীরে পন্ডিচেরির কাছে তামিলনাড়ুর আরিকামেডুতে গ্রীক-রোমান ধাঁচের একটি বসতি আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে পাওয়া গেছে রোমান অ্যাম্ফোরা — ওয়াইন সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের জন্যে বড় বড় মাটির বোতল। আরো পাওয়া গেছে রোমান-গ্রীক ও ভারতীয় ডিজাইনে ছাঁপমারা মাটির পাত্র। আর সম্রাট অগাস্টাসের মুখাবয়বখচিত স্বর্ণমুদ্রা।

জাপানের সমাধিস্তূপে পাওয়া নীলরঙের কাঁচের থালা নিয়েও জাপানী রসায়নবিদরা অনেক গবেষণা করেছেন। কারণ এরকম নিদর্শন জাপানে আর পাওয়া যায়নি। তাদের রিসার্চ থেকে বেরিয়েছে যে, রোমান সাম্রাজ্যে এ ধরনের থালা ব্যবহৃত হত, আর সেসবে অ্যান্টিমোনির মত বিশেষ ধাতু যে যে পরিমাণ পাওয়া গেছে, তা একই অনুপাতে রয়েছে থালাটিতে। অর্থাৎ রোমের বিলাসদ্রব্য কিভাবে যেন এসে পড়েছে ছয় হাজার মাইল দূরে জাপানে।

তামিলনাড়ুর আরিকামেডুর কাছে পুদুক্কোটাইয়ে আবিষ্কৃত রোমান সম্রাট অগাস্টাসের মুদ্রা।
জাপানের সামাধিস্তূপে আবিষ্কৃত রোমান কাঁচের থালি।

এতক্ষণ যেসব উদাহরণ দিলাম, তা বড়জোর এক হাজার থেকে দু’হাজার বছর আগের। এদের থেকেও পুরনো উদাহরণ হলো, প্রাচীন মিশরের তিন হাজার বছরের পুরনো মামির চুলে সিল্কের সুতোর আবিষ্কার। সে সময়ে একমাত্র চীনাদেরই আয়ত্ত ছিল সিল্ক তৈরির চাবিকাঠি। তার মানে দাঁড়াল, ছয় হাজার মাইল অর্থাৎ পৃথিবীর পরিধির প্রায় একচতুর্থাংশ পাড়ি দিয়ে এসে মিশরীয় অভিজাতদের শোভাবর্ধন করেছে রেশমী সুতো।

আজকের দুনিয়ার কথা‌ই ভাবুন। বাংলাদেশে বসে ‘আই লাভ এনওয়াই’ টিশার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আপনি। শার্টের আমদানি হয়ত মার্কিন মুল্লুক থেকে। আবার মার্কিন মুল্লুকের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে বানানো শার্টটা খুব সম্ভব বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্পেরই প্রস্তুত। কোথাকার মাল কোথায় এসে পড়ল, অথচ আমরা আজ অবাক হই না।

চীনা সমাধিসৌধে আবিষ্কৃত রোমান পাত্র।

আজ থেকে তিন চার হাজার বছর আগেও একই কাহিনী ঘটেছে। আজকের পরিসরে না হলেও সেপরিমাণটা তুলনামূলকভাবে বড়ই। পরিমাণটারও উত্থানপতন হয়েছে।

আর বিভিন্ন সভ্যতার যে কর্মকান্ড এ ম্যাজিকটা যুগযুগান্তরে ঘটিয়েছে, তার নাম ট্রেড — বাণিজ্য। সোনা-রূপার তৈরি মুদ্রা কিংবা বুলিয়ন আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই মানবজাতি একে অন্যের সাথে বাণিজ্যের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আসছে। টাকার ব্যবহার না থাকলেও বার্টার বা বিনিময়ের মাধ্যমে বাণিজ্য চলেছে। আর সওদা আদানপ্রদানের পাশাপাশি চলেছে ধর্মীয়, দার্শনিক, প্রযুক্তিগত, ভাষা-সাংস্কৃতিক মতবিনিময়।

প্রাচীন মানুষ কৃষিকাজ শিখে থিতু হতে হতে শুরু হয় নগরসভ্যতার। সমষ্টিগত শ্রমের দক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসে মানুষের। কিন্তু বহু আদি নগরসভ্যতায় একটা সমস্যা খুঁজে পান প্রত্নতত্ত্ববিদরা। যদিও খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে বড় জনসংখ্যার ভরনপোষণ সম্ভব, তাতে খাদ্যের বৈচিত্র কমে যায়। সুষম পুষ্টির অভাবে আদি নগরবাসীরা ছিল শিকারী-সংগ্রহকারী যাযাবরদের থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল। ফলে ‌অনেক আদি নগর বহির্শত্রুর আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়।

কিন্তু দক্ষতা বাড়ানোর জন্যে যে কাজটা তারা সাধন করেছে তা হলো শ্রমের বিশেষায়িতকরণ। আদি নগরেই দেখা যায় একেকটি পাড়ার পেশা একেক রকম। কেউ কৃষক, কেউ কুম্ভকার, কেউ সূত্রধর। নগরের মধ্যেই আঞ্চলিক বাণিজ্যের যাত্রা শুরু। তারপরে খাদ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য কাঁচামালের বৈচিত্র্যের জন্যে স্থানীয় আর সব জনবসতির সাথে আদানপ্রদান শুরু।

নব্যপ্রস্তরযুগের পরবর্তী ক্যালকোলিথিক যুগে, অর্থাৎ ব্রোঞ্জের আবিষ্কারের প্রাক্কালে বিশেষায়িত শ্রমের আবির্ভাবের সাথে সাথে বৈশ্বিক না হলেও আঞ্চলিক বাণিজ্যের শুরু। সেটা কমপক্ষে সাত/আট বাজার বছর আগের কথা। তারপর চার হাজার খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়াতে গরুর মত ভারবাহী পশুকে পোষ মানানোর ফলে লং ডিসট্যান্স ট্রেডিংয়ের রাস্তা খুলে যায়।

মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয়দের সাথে ময়েঞ্জোদারো-হরপ্পার যোগাযোগটা বৈদেশিক বাণিজ্যের সবচে প্রাচীন উদাহরণ। স্থল ও নৌপথে ভারতের মশলাপাতি ও সেমিপ্রেশাস রত্নরাজি এসে পৌঁছত উরের মত ইরাকের বড় শহরগুলিতে। হরপ্পান সভ্যতার টেরাকোটা সীল আর আবক্ষ মুর্তির মধ্যেও মেসোপটেমিয়ার সাংস্কৃতিক প্রভাব হুবহু দৃশ্যমান। এ বাণিজ্য তুঙ্গে ওঠে আড়াই হাজার খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। আর প্রাক-আর্য হরপ্পান নগরগুলির পতনের পর এ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ময়েঞ্জোদারোর এই মূর্তিটি কোন রাজার নয়, সম্ভবত অলিগার্কের। শিল্পে মেসোপটেমিয়ার সাংস্কৃতিক প্রভাব সুস্পষ্ট।
ঊর শহরে আবিষ্কৃত কার্নেলিয়ান পাথরের নেকলেস। শিল্প দেখে মনে হয় সিন্ধু সভ্যতার থেকে আমদানি।

এরপর মিশরে পোষ মানে ভারবাহী গাধা, সে তিন হাজার খ্রীষ্টপূর্বে। তার পাশাপাশি নীলনদের নৌপথে চলে উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্য। কৃষিজমির দখল আর আঞ্চলিক নৌবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের খাতিরেই সম্ভবত মিশরে আবির্ভাব ঘটে প্রথম সাম্রাজ্য কিংবা কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার। শাসকদের কাজ হলো প্রজাদের কৃষিজমির ভাগবন্টন আর আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাবিধান আর যাত্রাপথের রক্ষণাবেক্ষণ। এসবের ব্যয়নির্বাহের জন্যে কর ধার্য হত। অর্থ দিয়ে না হলেও খাদ্যশস্য আর বাণিজ্যের ফেরির ভাগ দিয়ে সে কর পরিশোধিত হত। অর্থাৎ যেখানে মিষ্টির সুবাস, মাছির উৎপাত সেখানেই। তার মানে এই নয় যে, ইতিহাসে বাণিজ্যই সবসময় রাজা-সম্রাটদের জন্ম দিয়েছে।

ঊটও পোষ মানে তিন হাজার খ্রীষ্টপূর্বাব্দের আশপাশ দিয়ে। দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন-ওমানের স্থলপথ, হর্ন অফ আফ্রিকার সোমালিয়া, লোহিত সাগরের নৌপথ ইত্যাদির যোগসাজশে প্রাচীন ভারতের সাথে যুক্ত হয় মিশর। ১২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ‘ব্রোঞ্জ এইজ কলাপ্সের’ আগ দিয়ে মিশরে সিডার কাঠ আমদানি হত লেবানন থেকে, সাইপ্রাস থেকে তামা-ব্রোঞ্জ, দক্ষিণ আরব থেকে সুগন্ধি, নুবিয়া থেকে সোনা, প্রভৃতি।

হিট্টাইট আর মিশরীরা ছিল সেযুগের সুপারপাওয়ার, আর সভ্য বিশ্বের হেন শহর নেই যাদের সাথে যোগাযোগ ছিল এ দু’য়ের। সিরিয়ার মিত্তানি মিত্রদের সাথে পত্রযোগাযোগের পান্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলি পড়লে মনে হবে সে যুগের কূটনীতি এ যুগের থেকে এমন ভিন্ন কিছু ছিল না। সে সব পত্রে বিলাসদ্রব্যের বিনিময়ে কেউ চাইছে মিশরীদের প্রতিরক্ষা। কেউ পাঠাচ্ছে বিশাল উপঢৌকন, এ আশায় যে ভবিষ্যতে তার প্রতিদান পাওয়া যাবে। বিভিন্ন আদানপ্রদানের রশিদ এগুলি। পাওয়া গেছে মিশরের তেল-আল-আমারনাতে।

১৪২০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মিশরী বাণিজ্যজাহাজ।
চতুর্থ খ্রীষ্টপূর্ব শতকের ফীনিশীয় জাহাজ।

এরপর এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়ে, যাকে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ নাম দিয়েছেন ‘ব্রোঞ্জ এইজ কলাপ্স’। ‘সীপিপল’ নামক অজানা জাতির আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যের সভ্য শহরগুলির একে একে পতন ঘটে। কমে আসে কূটনৈতিক যোগাযোগ। ভেঙে পড়ে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা আর বড় সাম্রাজ্যগুলি। অর্থাৎ মাছিরা ঝেঁটিয়ে বিদায়। তাই বলে মিষ্টি আদানপ্রদান থেমে থাকেনি। এই অরাজকতার মধ্যেই উত্থান ঘটে নতুন এক বণিকজাতির, যাদের নাম ফীনিশিয়ান। এরা নতুন ধরনের দ্রুত জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে দিকে দিকে। দূরদূরান্তে স্থাপন করে বাণিজ্য কলোনি। বড় সাম্রাজ্যের জন্ম না দিলেও তাদের একটা বড় লেগ্যাসি আমরা এখনো বহন করে চলেছি, যার নাম অ্যালফাবেট।

পৃথিবীর অপর প্রান্ত চীনে অরাজকতার যুগশেষে দ্বিতীয় খ্রীষ্টপূর্ব শতকে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাট শিহুয়াংদি। তার রাজদূত মরুভূমি-পর্বত পেরিয়ে মধ্য এশিয়ায় আসে যুদ্ধে কাজে লাগানোর মত দ্রুত ঘোড়ার খোঁজে। সে বাণিজ্য সম্পর্ক থেকেই শুরু হয় সিল্করোডের পূর্বভাগের।

ফারগানার ঘোড়া, এই ‘স্বর্গের’ ঘোড়ার জন্যেই চীনারা মধ্য এশিয়ার সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপন করে, যার থেকে সিল্করোডের শুরু।
প্রাচীন রোমের অভিজাতদের কাছে চীনা রেশমের কাপড়ের বেশ কদর ছিল।
চীনের সমাধিসৌধে আবিষ্কৃত বিজ্যান্টিন স্বর্ণমুদ্রায় সম্রাট কন্সট্যান্সের মুখাবয়ব।

আর রোমান সাম্রাজ্যও দ্বিতীয় খ্রীষ্টীয় শতকে ইরান ও মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে যুক্ত হয় চীনের বাণিজ্যপথের সাথে। ইউরোপ থেকে যেত সোনা আর চীন থেকে রেশম। আর আজকের ট্রেড ওয়ারের শুরুও এই সময়ে। রোমান অভিজাতরা চীনা রেশমের জন্যে রাজ্যের স্বর্ণভান্ডার প্রায় নিঃশেষ করে ফেলে। সম্রাট টাইবেরিয়াস বাধ্য হয়ে সিল্কের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। চীনও রেশমের গোপন প্রস্তুতপ্রণালী আগলে রেখেছিল, যাতে রোম সাম্রাজ্যের কারিগররা প্রতিযোগিতায় আবির্ভূত না হয়।

রোমানদের আগেই সম্ভবত গ্রীকরা বাণিজ্য কলোনি স্থাপন করেছিল ভারতের আরিকামেডুতে। পেরিপ্লাস অফ দ্য এরিথ্রেয়ান সী নামের গ্রীক পান্ডুলিপিতে এ বন্দরের উল্লেখ আছে। গ্রীকদের পরে রোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে এই বাণিজ্যবসতি। বহু দেশীবিদেশী বণিকদের স্থায়ী-অস্থায়ী নিবাস ছিল এই ভারতীয় শহরটি। আনুমানিক সময়কাল দ্বিতীয় খ্রীষ্টপূর্ব শতক থেকে সপ্তম খ্রীষ্টীয় শতক।

রোম, আর পরে বিজ্যান্টিন, সাম্রাজ্যের সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ যুক্ত ছিল। একে বলে ইনসেন্স রাউট। ইয়েমেনের স্থানীয় গাছের বাকল থেকে তৈরি হত দুটি সুগন্ধি, এগুলি দিয়ে এখনো আতর তৈরি হয়। এদের নাম ফ্রাংকিনসেন্স ও মাঢ়। রোমান দেবালয়ে পূজোর কাজে এদের ব্যবহার ছিল।

ইয়েমেন থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের তীরের জেদ্দা, তারপর জর্দানের পেত্রা হয়ে মধ্যোপসাগরীয় বন্দরে এসে জাহাজে উঠত এই মালামাল। যীশুখ্রীষ্টের জন্মলগ্নে এগুলিই উপহার নিয়ে এসেছিলেন তিন মেজাই। তৃতীয় খ্রীষ্টপূর্ব শতক থেকে দ্বিতীয় খ্রীষ্টীয় শতকের মধ্যে এই ইনসেন্স রাউট উপকূলীয় আরব শহরগুলিকে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিল।

ইনসেন্স রাউটের অন্যতম স্থলবন্দর জর্দানের পেত্রা।

ইসলামী ঐতিহ্যে যদিও বলা হয় নবীজীর বাণিজ্যে হাতেখড়ি এই পথের মক্কা-সিরিয়া অংশে, তাতে একটা সমস্যা রয়েছে। গথদের হাতে ততদিনে রোমের পতন হয়েছে, আর বিজ্যান্টিনরা ঘোরতর খ্রীষ্টান। এসব সুগন্ধির বড় বাজার তখন আর নেই ইউরোপে।

রোমের পতনপরবর্তী সময় বিজ্যান্টিনরা চীনের সাথে সিল্করোডের মাধ্যমে বাণিজ্য করতে থাকে। চীনা সমাধিতে বিজ্যান্টিন মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। রাজনৈতিক শত্রু ইরানিদের পাশ কাটিয়ে মধ্য এশীয় সগডিয়ানদের মাধ্যমে সরাসরি সিল্কের বাজার পায় তারা। ভারত থেকেও মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধধর্ম পাচার হয়ে গেছে চীনে একই সময়ে। মধ্য এশিয়ার রাজ্যগুলি প্রকৃতার্থেই ছিল মানুষের মিলনমেলা।

ভাইকিংরা এ চিত্রে এসে যুক্ত হয় এরকম সময়েই। নবম/দশম খ্রীষ্টীয় শতকে সুইডিশ ভাইকিংরা ভলগা নদীর তীর ধরে লুটতরাজ করতে করতে অনেক দক্ষিণে ইউক্রেনের নভগরোদ আর কিয়েভ শহরে এসে পড়ে। সেখানকার স্লাভ জাতির মানুষ এই ‘রুস’দেরকে রাজা মানা শুরু করে। গোড়াপত্তন হয় প্রাচীন রাশিয়ার। এই ভাইকিংয়ের দল আরো দক্ষিণে কৃষ্ণসাগরের তীরে এসে টক্কর খায় বিজ্যান্টিনদের সাথে।

ততদিনে লুটতরাজ ছেড়ে ভাইকিংরা নতুন পেশা ধরেছে, বাণিজ্য আর ভাড়াটে সৈন্যগিরি। মার্সেনারি হিসাবে বিজ্যান্টিন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়া পড়ত তাদের। সে সুবাদে একটু বাণিজ্যও করে নিত। এভাবেই সম্ভবত আব্বাসী খেলাফতের সাথে তাদের যোগাযোগ। আর আব্বাসীদের চকচকে রূপার ধাতব মুদ্রার প্রতি তাদের ছিল বিশেষ টান। আরব পরিব্রাজক ইবনে ফাদলানও উত্তরের দেশে ভ্রমণ করে এসে ভাইকিংদের নৌকা-শেষকৃত্যের একটা বিবরণী লিখে গেছেন আরবীতে।

এ হলো মোটামুটি সভ্য দেশগুলির থেকে পাওয়া বাণিজ্যের লিখিত বিবরণী। নিরক্ষর অনেক দেশও যে বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রাচীনকাল থেকে যুক্ত ছিল তার প্রমাণও প্রত্নতত্ত্ববিদরা পেয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ওয়েলসের চার হাজার বছরের পুরনো তামার খনি থেকে মধ্যোপসাগরীয় সভ্য দেশগুলোতে রপ্তানী। কর্নওয়ালের টিনের খনিও সেরকম তিন হাজার বছরের পুরনো। এ দুয়ের তামা আর টিন মিলে সভ্য দেশগুলিতে তৈরি হত ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র।

বাল্টিক উপকূল থেকে দক্ষিণে রোম-গ্রীস পর্যন্ত বিস্তৃত অ্যাম্বার রোড তিন হাজার বছরের পুরনো। মধ্যোপসাগর ছাড়িয়ে মিশরের তুতানখামুনের মামির গয়নাতেও জায়গা করে নিয়েছিল বাল্টিকের অ্যাম্বার। সেটা সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। ভাইকিং-আরব বাণিজ্যের যেমন লিখিত বিবরণ নেই, ইউরোপের অধিকাংশ এলাকা তখন নিরক্ষর থাকার কারণে অ্যাম্বার রোডেরও তেমন কোন বিবরণী পাওয়া যায়না।

ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষও ছিল নিরক্ষর। কিন্তু তাতে বাণিজ্য থেমে থাকেনি। মূলত নৌপথে তারা চীন থেকে জেড পাথরের আমদানি-রপ্তানি করে গেছে। কমপক্ষে তিন হাজার বছর আগে এই সওদাগরির শুরু।

মিশরের ফারাও তুতানখামুনের ব্রেস্টপ্লেটের নিচের অংশের চারটি অ্যাম্বার পাথর এসেছে সুদূর বাল্টিক উপসাগর থেকে।
ফিলিপাইনের জেড পাথরে তৈরি লিংলিং-ও গয়না রপ্তানি হত পুরো দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে।

আর সাব-সাহারান আফ্রিকার থেকে রোমান সাম্রাজ্য আর আরব খেলাফতে গেছে সোনা, লবণ, আর কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস।

পরবর্তী যুগে আরো বহু ট্রেড রুট বিশ্বের মানুষকে সংযুক্ত করেছে। পূর্ব আফ্রিকার জিরাফ বাঙ্গালার সুলতানের উপঢৌকন হিসাবে গিয়ে পৌঁছেছে চীনা সম্রাটের দরবারে। পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি হ্যান্ডিক্রাফট শোভা বাড়িয়েছে পর্তুগীজ ডাইনিং টেবিলের। ইন্দোনেশিয়ার মশলা সোনার দরে বিক্রি হয়েছে হল্যান্ড-ইংল্যান্ডের বন্দরে। আমেরিকার আনারস, আলু, কোকো, রাবার, টমেটো, তামাক পাল্টে দিয়েছে বাকি বিশ্বকে।

পঞ্চদশ শতকে চীনা সম্রাটের জন্যে বাংলার সুলতান সাইফউদ্দিন উপঢৌকন পাঠান এই জিরাফ। বহন করে নিয়ে যায় খোজা সেনাপতি জংহোর জাহাজবহর। সাইফউদ্দিন জিরাফটি পান কেনিয়ার মালিন্দির রাজার কাছ থেকে, বাণিজ্যসূত্রে। চীনে জিরাফটি ব্যাপক সাড়া ফেলে, কারণ কাল্পনিক প্রাণী জিলিনের সাথে এর মিল। ফলে সম্রাটের শাসনক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়।

শুধু যে বস্তু আর জ্ঞানের আদানপ্রদান হয়েছে তা নয়, মানুষের কাফেলা একেকসময় একেকমুখী হয়েছে। কখনো পরদেশেই রয়ে গেছে বিদেশী বণিক। হরপ্পান সভ্যতার একটি পরিবারের সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে ইরানে। ধরা যেতে পারে যে এরা ছিল সভ্যতার প্রথম ইমিগ্রান্ট। বিদেশ-বিভুঁইয়ে নিজেদের ছোট একটি কলোনি হয়ত তৈরি করেছিল তারা, যেমনটা করেছিল ফীনিশীয় (কার্থেজ), রোমান (মধ্য এশিয়া), গ্রীক (স্পেন), পারসিক (ইয়েমেন), চীনা (ইন্দোনেশিয়া), আরব (আফ্রিকা), আর রেনেসাঁস পরবর্তী যুগের অন্যান্য ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী। এদের যাতায়াত কখনো ছিল বাধাহীন নিরাপদ, কারণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে কোন না কোন বড় সাম্রাজ্য (প্যাক্স রোমানা — ইউরোপীয় বাণিজ্য, প্যাক্স মোঙ্গোলিকা — সিল্ক রোড, অধুনা প্যাক্স আমেরিকানা — বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠার ক্রেডিট এদেরই‌ প্রাপ্য)। আবার কখনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অভাবে তা ছিল বিপৎসংকুল।

কিন্তু এটা মানতেই হবে, যতই বাধাবিপত্তি থাকুক, মানুষ একে অন্যের সাথে যোগাযোগ যখন একবার শুরু করেছে, তারপর আর থেমে থাকেনি। জোয়ার-ভাঁটা এসেছে সে বাণিজ্যে, কিন্তু নদীর প্রবাহের মত নতুন ধ্যানধারণা, ধর্মচিন্তা, শব্দভান্ডার এসে যুক্ত হয়েছে একেক সভ্যতায়।

লেখার শেষে এসে মনে হলো রবিঠাকুরের ‘তাসের দেশ’ গীতিনাট্য। সে কাহিনীতে রাজপুত্র আর সদাগর এসে হাজির নতুন দেশে। রাজপুত্র যেখানে দিনবদলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে, সেখানে সদাগর কিন্তু তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী। প্রচলিত নিয়মের সুবিধাভোগী সফল বণিকসমাজ। তাই তারা সাধারণত শান্তিকামীও।

অবাধ ও ন্যায্য বাণিজ্য আসলে বিশ্বশান্তির একটা বড় অনুঘটক। মধ্যপন্থায় ধীর কিন্তু স্থির সামাজিক পরিবর্তন যদি কোন প্রক্রিয়া আনতে পারে, তো সেই বাণিজ্য। সহিংস বিপ্লব তার পন্থা নয়। আলোকিত বিপ্লব যুগে যুগে যারা করে গেছেন, তাদের মূলে বণিকরাই ছিলেন চালিকাশক্তি। রেনেসাঁস শিল্পের পৃষ্ঠপোষকরা যেমন ছিলেন মেদিচির মত বণিক-ব্যাংকার পরিবার, তেমন মার্ক্যান্টাইল যুগের কলোনিয়াল এক্সপ্লয়টেশন থেকে হোমনেশনগুলির মধ্যবিত্ত শ্রেণী আরও সমৃদ্ধশালী ও বহির্মুখী হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের দর্শন থেকে এসেছে এজ অফ এনলাইটেনমেন্ট। তারপর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্র, বিজ্ঞানপ্রযুক্তি ইত্যাদি।

বাণিজ্যের হাত ধরে ঔপনিবেশিকতা-সাম্রাজ্যবাদের শুরু বলবেন অনেকে। কিন্তু সব দিক বিচার করে, সব ইতিহাস, লংটার্ম ইমপ্যাক্ট দেখে, আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, ট্রেড ইজ নট এ জিরো-সাম গেম, ট্রেড ইজ এ পজিটিভ সাম গেম। সবার জন্যে মুক্তবাণিজ্যে আখেরে উইন-উইন।

কামার ও শয়তান – ২

(প্রথম পর্বের পর)

প্রস্তরযুগের মানুষের বিবর্তনের কথা বলেছি এর আগে। সেসাথে আগুনের আবিষ্কারের ফলাফল। আগুনের পরপরই সম্ভবত ধাতুকার্যের কাকতালীয় আবিষ্কার।

প্রস্তরযুগ আর তাম্রযুগের মাঝের যুগটাকে বলে ক্যালকোলিথিক। এসময় তামা মেশানো পাথর বা আকরিক দিয়ে অস্ত্র আর যন্ত্রপাতি বানানো হত। হয়ত এরকম কোন আকরিক পাথর আগুনের কুন্ডলীতে ফেলার পর সেটা গলে পরিশুদ্ধ ধাতু হয়ে বেরোয়। ক্যাম্পফায়ারের তাপমাত্রা খুব বেশি নয়, হয়ত কোন বিশেষ ধরনের চুলোর মধ্যে অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে এই আকস্মিক আবিষ্কারটি হয়।

আবিষ্কারটি প্রথম যারা করেছিল, তারা ওয়াকিবহাল ছিল এর তাৎপর্য সম্পর্কে। ধাতু পাথরের থেকে কয়েক গুণ বেশি শক্ত আর গলিত অবস্থায় বিভিন্ন আকার দেয়া যে যায় তাকে, তারা সেটা বুঝতে পেরেছিল। সে কারণে যে খনি থেকে তামার আকরিক পেয়েছে, সেখানে তারা ফিরে গেছে আরো সংগ্রহের জন্যে। তারপর আরো গবেষণা করে জ্ঞানটাকে মোটামুটি পাকাপোক্ত করেছে।

আর এরা জ্ঞানটা গোপন রেখেছে অন্যান্যদের কাছ থেকে। ইন ফ্যাক্ট, এই প্রাচীন কামারদের কাছে এটা বিজ্ঞান নয়, প্রকৃত অর্থেই জাদুবিদ্যা ছিল। কারণ কখনো কখনো ঠিক তাপমাত্রায় চুল্লী গরম রাখতে না পারলে পুরো কাজটা যেত ভেস্তে। তাই মন্ত্রপাঠ আর দেবপূর্বপুরুষদের পূজোর দরকার হয়ে পড়ত বৈকি। আবার কখনো পশু কিংবা নরবলিরও!

এই যে তামা কিংবা তামার সাথে টিন মিশিয়ে আরো শক্ত ব্রোঞ্জ তৈরির প্রণালী, এর আবিষ্কার কমপক্ষে আট হাজার বছর আগে। ওয়েলসের ক্লানদুদনোতে ৪,০০০ বছরের পুরনো বিশাল এক তামার খনি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখান থেকে উত্তোলিত তামা পুরো মধ্যোপসাগরে রপ্তানি হত। অর্থাৎ ইতিমধ্যে ধাতুর খনন কুটিরশিল্প থেকে বৃহদশিল্পে পরিণত হয়েছে। এরকম আরেকটা জায়গা বর্তমান সাইপ্রাস, যার নামের মধ্যেই রয়েছে ‘কপার’ (গ্রীকে ক্যুপ্রোস, তুর্কীতে কিবরিস)। প্রাচীন মিশর-তুরস্ক-গ্রীসের ব্রোঞ্জশিল্পের তামার আদি উৎস এই সাইপ্রাস।

ওয়েলসের ক্লানদুদনোর গ্রেট ওর্ম কপার মাইনস। ৪,০০০ বছর আগে এখানে খনিতে কাজ শুরু হয়। ম্যালাকাইট নামের আকরিক উত্তোলনের পন্থা ছিল পশুর হাড় আর পাথরের হাতুড়ি দিয়ে খনির দেয়াতে ক্রমাগত ঘা মারা।
সাইপ্রাসের স্কুরিওতিসার তামার খনি বিশ্বের প্রাচীনতম। ৪,০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে এখনও পর্যন্ত এখানে তামা উত্তোলন চলছে।

ব্রোঞ্জের আবিষ্কারের পরে কর্মকারদের সৃজনশীলতা তুঙ্গে ওঠে। খোদার ওপর খোদকারি করে নানা জন্তু-জানোয়ার, মানুষ, বস্তু, এমনকি দেবদেবীর নিখুঁত মূর্তি পর্যন্ত তারা বানিয়ে ফেলতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে এ বিদ্যা জাদুটোনার থেকে কম কিছু ছিল না। শিকারী কিংবা কৃষকের কাছে খনির গভীর অন্ধকারে ঢুকে পাথর খোঁড়া ছিল রহস্যময় একটা ব্যাপার। সে ‘পাথর’ যে চুল্লীতে ঢুকে নতুন সৃষ্টি হয়ে বেরিয়ে আসছে, এটাও অলৌকিক শক্তির লক্ষণ। শয়তান বা অশুভ আত্মাকে যদি কেউ নাকানি-চুবানি দিতে পারে, তো সে এই ধূর্ত কামারই। ‘কর্মকার’ মানেও আসলে ‘স্রষ্টা’।

ব্রোঞ্জ আমলের কামারদের অবশ্য অনেক পেশাগত ঝুঁকি ছিল। তামা-টিনের খনিতে মিশ্রিত থাকে বিষাক্ত আর্সেনিক ও সীসা। এ বিষের সংস্পর্শে এসে শারীরিক ও মানসিক বৈকল্য দেখা দিত তাদের। এ কারণেই হেফেস্টাস ল্যাংচা, পাগলা, বেঁটে। হয়ত আয়রিশ লোককথায় ডয়ার্ভস কিংবা বামনদের সাথে খনি ও ধাতুবিদ্যার রহস্য জড়িত এ কারণেই।

১৫৫০-১৫০০ খ্রীষ্টপূর্বে সোনার তৈরি মাস্ক অফ আগামেমনন। ট্রয়ের আবিষ্কর্তা হাইনরিষ শ্লীমান মাইসেনির ধ্বংসাবশেষে এটি খুঁজে পান। তিনি ভেবেছিলেন ইলিয়াডের আগামেমননের সমাধি খুঁজে পেয়েছেন। ব্রোঞ্জ যুগের অসাধারণ ধাতবশিল্পের প্রমাণ এটি।

ব্রোঞ্জের পর লৌহযুগের শুরু হয় প্রায় ২,২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। এ ছিল আরেক অসম্ভব ব্যাপার। সাধারণ ক্যাম্পফায়ারে ৪০০ ডিগ্রিরই বেশি তাপমাত্রা ওঠে না, আর লোহার গলনাংক ১,৪০০-১,৫০০ ডিগ্রি। অর্থাৎ লোহা গলানোর জন্যে দরকার হয়ে পড়ে বিশেষ ধরনের চুল্লি। তাছাড়া কাঠকয়লারও দরকার পড়ে আকরিককে পরিশুদ্ধ করার জন্যে। কখনো কখনো পশুর হাড়গোড়ও চুল্লিতে ফেলত কামাররা, এতে অর্গানিক কার্বন মিশে লোহাকে আরেকটু মজবুত করত। স্টীলের রহস্য ঠিক তাই। সাধারণ মানুষ অবশ্য এর উসিলায় ‌গুজব রটাত যে কামাররা চুল্লীতে নরবলি দেয়। সত্যমিথ্যা বলা মুশকিল।

ইতিহাসের সবচে পুরনো লোহার তৈরি অস্ত্র পাওয়া গেছে তুরস্কের প্রাক-হিট্টাইট হাট্টিয়ান কালচারে। এ অসম্ভব না যে, এদের উত্তরপূর্বের পন্টিক স্তেপের আদি ইন্দোইউরোপীয়রাই লোহা বিশুদ্ধকরণ প্রণালী প্রথম আবিষ্কার করে। মিশরে অবশ্য এর থেকেও পুরনো লোহার তৈরি ছুরি আবিষ্কৃত হয়েছে, তুতানখামুনের সমাধিতে। কিন্তু সেটা পৃথিবীর লোহা নয়, উল্কার লোহা! অর্থাৎ তার বিশুদ্ধিকরণের তেমন কোন প্রয়োজন ছিল না। মোটামুটি একটা উচ্চ তাপমাত্রায় নিয়ে পিটলেই হলো।

১৪০০ খ্রীষ্টপূর্বে ডেনমার্কে ব্রোঞ্জের তৈরি এই সূর্যরথ। সূর্যদেবতাকে প্রতি ভোরে ঘোড়ায় টানা এ রথ টেনে তোলে। ঋগ্বেদসহ সকল ইন্দো-ইউরোপীয় মিথে প্রায় একই মোটিফের ছড়াছড়ি।
৩৭০০-৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বে ককেশাসে মাইকপ কালচারের মানুষ ব্রোঞ্জ দিয়ে এই ষাঁড়টি বানায়। পন্টিক স্তেপের ইন্দোইউরোপীয়দের সরাসরি দক্ষিণের পড়শী ছিল এরা। দু জাতের মধ্যে প্রযুক্তি আদানপ্রদান হওয়ারই কথা।
২৩০০-২০০০ খ্রীষ্টপূর্বের আনাতোলিয়ার হাট্টিয়ান কালচারের মানুষ ব্রোঞ্জে তৈরি করেছে এই জোড়া ষাঁড়।
১৭০০-৫০০ খ্রীষ্টপূর্বে ডেনমার্কে তৈরি হয়েছিল ব্রোঞ্জের এই শিরোস্ত্রাণ।

লৌহযুগের আগমনের সাথে সাথে অস্ত্রশস্ত্র বানানোতে একটা বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। ভাল কামাররা তরবারি তৈরির প্রক্রিয়াকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এসব ‘অলৌকিক’ তরবারিকে নাম দিলে তার জাদুশক্তি আরো কয়েকগুণ বাড়ত। সেই থেকে আর্থারের এক্সক্যালিবার, রোলাঁর দ্যুরন্দাল, শার্লমেনের জোয়াইওজ, সিগুর্দের গ্রাম, বেওউল্ফের হ্রুনটিং, আলীর জুলফিকার, ইত্যাদি।

এদের সাথে যোগ করতে পারি বর্তমান যুগের ‘রূপকথা’ লর্ড অফ দ্য রিংসের দুটো ধাতব জিনিস। ওয়ান রিং — যার মধ্যে রয়েছে সারা বিশ্বের ক্ষমতালাভের শক্তি। আর নারসিল, যে তরবারি দিয়ে সাউরনের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ইসিলদুর। ভেঙে যাওয়া নারসিলের ধাতু গলিয়ে তৈরি হয় নতুন তরবারি আন্দুরিল। আর ধাতুবিদ্যায় শ্রেষ্ঠ গিমলির জাত ডয়ার্ফরা। তাদের আবাস পাহাড়ের গভীরের খনিশহরে।

তুতানখামুনের সমাধিতে পাওয়া মিটিওরিক আয়রনের তৈরি ছুরি, ১৩২৩ খ্রীষ্টপূর্ব, ব্রোঞ্জ যুগ চলছে তখনও।
শার্লমেনের তরবারি লা জোয়াইয়োজ। লেজেন্ডারি এই তরবারি নাকি আরো আদি রাজা রোলাঁর দ্যুরন্দালের ধাতু গলিয়ে তৈরি। ফরাসী রাজাদের রাজ্যাভিষেকে দ্বাদশ শতক থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে।
লর্ড অফ দ্য রিংসে ভেঙে যাওয়া তরবারি নারসিলের ধাতু গলিয়ে তৈরি এল্ফরা আরাগর্নের জন্যে তৈরি করে নতুন আরেক তরবারি আন্দুরিল।

যাক গে, রূপকথা থেকে বহু দূরে সরে এসেছি। কামার ও শয়তান রূপকথাটির একটা মোরাল বা নীতিকথা অবশ্য আছে। ফাউস্টের মত বিদ্বান ব্যক্তিরা, যারা কিনা কামারের উন্নত সংস্করণ, তারা নিজেদের আত্মা বিকিয়েছেন জাগতিক অলৌকিক ক্ষমতার বিনিময়ে। তারা বৈশ্বিক জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়েছেন ঐশ্বরিক জ্ঞানের ওপরে।

কামারদের চরিত্রটাও অনেকটা সেরকম। খোদার ওপর খোদকারির ব্যাপারটা বলেছি। তাছাড়াও সোনা-রূপা ইত্যাদি ধাতুর জাগতিক মূল্যটাই খালি বুঝতে পারে কামার। এখানেই তার ট্র্যাজেডি। ধূর্ত শয়তানকে ঠকিয়ে ইহলোক সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে পরলোকে স্বর্গ-নরক কোথাও ঠাঁই হয় না জ্যাক ও’ল্যান্টার্নের। এ কারণেই প্রাচীন গল্পটা পরবর্তীকালের খ্রীষ্টান ধর্মের লেজেন্ডে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

আজকে অবশ্য আমরা এত কিছু গবেষণা করে বের করতে পারছি কামারের মতই প্রযুক্তির ম্যাজিক খাঁটিয়ে। তেহরানি তার গবেষণায় যে খান পঞ্চাশেক ভাষার আড়াইশ’ রূপকথার প্রব্যাবিলিস্টিক অ্যানালিসিস করেছেন, তা সম্ভব হয়েছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের বদৌলতে। ঊনবিংশ শতকের গ্রিমভ্রাতৃদ্বয় জার্মানিতে, আর বিংশ শতকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশে বছরের পর বছর গবেষণা করে যে সব ইন্দোইউরোপীয় রূপকথার কাহিনী একে অন্যের সাথে যুক্ত করেছেন, সে কাজটা কম্পিউটারের বদৌলতে এখন কয়েক সপ্তাহের না হলেও মাস দুয়েকের ব্যাপার। তাই বলতে পারি, জয় হোক কামারের হাতুড়ি-নেহাই-হাঁপর-চিমটের। আর প্রোগ্রামারের মাউস-কীবোর্ড-মনিটরের।

কামার ও শয়তান – ১

“… শয়তান ভেবেছিল, এতে কামারের স্ত্রী খুব খুশি হয়ে তার সাহায্য করবে। কিন্তু কামারের স্ত্রী তার কিছু না করে, ‘বটে রে হতভাগা, তোর এত বড় আস্পর্ধা! আমার স্বামীর গায়ে হাত তুলছিস!’ বলে, সেই ঝাটা দিয়ে শয়তানের নাকে মুখে এমনি সপাংসপ মারতে লাগল যে বেচারার দমই ফেলা দায় । সে তাতে বেজায় থতমত খেয়ে একটা চেয়ারের উপর বসে পড়ল— সেই চেয়ার, যাতে একবার বসলে আর বিনা হুকুমে ওঠবার জো নেই।

“কামার দেখল যে, শয়তান এবারে বেশ ভালমতই ধরা পড়েছে, হাজার টানাটানিতেও উঠতে পারছে না। তখন সে তার চিমটেখানি আগুনে তাতিয়ে নিয়ে তা দিয়ে আচ্ছা করে তার নাকটা টিপে ধরল। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে হেইয়ো’ বলে সেই চিমটে ধরে টানতেই নাকটা রাবারের মত লম্বা হতে লাগল। … “

প্যারা দুটি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘তিনটি বর’ নামে গল্প থেকে নেয়া। ছোটবেলায় তার সংকলিত দেশ-বিদেশের উপকথা নিয়ে একটা বই পড়েছিলাম। তাতে ছিল। শয়তানের মত ধূর্ত বদ চরিত্রকেও যে ঢিঁট করা সম্ভব, সে গল্প পড়ে বেদম মজা পেয়েছিলাম।

এই গল্পটা নাকি কমপক্ষে ছয় হাজার বছরের পুরনো!

২০১৬ সালে গবেষক জামশেদ তেহরানি ও গ্রাসা দি সিলভা ফাইলোজেনেটিক অর্থাৎ ভাষাগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিবর্তনের ভিত্তিতে রিসার্চ করে এ তথ্যটা আমাদের দিয়েছেন। তাদের বিচারে ইন্দোইউরোপীয় ভাষার জন্মের আদিকালে এ গল্পটি মুখে-মুখে প্রচলিত ছিল। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়া আর রাশিয়া থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ড অব্দি এটি নানা রূপে উপস্থাপিত হয়েছে শ্রোতাদের কাছে। সে সময়ে বই দূরের কথা, লিখনপদ্ধতিরও আবিষ্কার হয়নি। কথক কিংবা বার্ড বলে একটি পেশা ছিল যাদের কাজ কেচ্ছা শুনিয়ে বেড়ানো।

ঊনবিংশ শতকের ইলাস্ট্রেশনে সেন্ট ডানস্ট্যান শয়তানের নাকটা চিমটে দিয়ে ধরে দিলেন এক টান, হেইয়ো…

গল্পটার সারবস্তু হলো শয়তান, মৃত্যু, জ্বীন কিংবা কোন অপদেবতার কাছ থেকে নিজের আত্মার বিনিময়ে কামার অলৌকিক ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়। তারপর সে ক্ষমতাটাকে কাজে লাগিয়েই কূটকৌশল করে চুক্তি থেকে মুক্তি ছিনিয়ে নেয়।

উপেন্দ্রকিশোরের গল্পটিতে অবশ্য কামার তিনটি বর পায় এক বৃদ্ধ মানুষের ছদ্মবেশধারী দেবতাকে সাহায্য করে। আর মৃত্যুর পর স্বর্গ-নরক কোথাও কামারের স্থান হয় না। শয়তান নরকের আগুন থেকে কাঠকয়লা ছুঁড়ে তাকে দূর করে দেয়। সেই জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে জলায় জলায় সে ঘুরে বেড়ায়, আর তার আলো দেখা যায়। তাইই নাকি আলেয়া — জ্যাক ও’ল্যান্টার্ন। হ্যালোয়িনের জ্যাক ও’ল্যান্টার্নের উৎপত্তি এই রূপকথা থেকেই। ইংরেজী কাহিনীতে কামারের নাম জ্যাক। আবার অন্য কোন কাহিনীতে সে সেন্ট ডানস্ট্যান। ফ্রান্সে সেন্ট ডানস্ট্যান হয়ে গেছে স্যাঁত-এলোয়া।

হ্যালোয়িনের জ্যাক ও’ল্যান্টারনের উৎস স্মিথ অ্যান্ড দ্য ডেভিল নামে সুপ্রাচীন এক উপকথায়।

রাশিয়াতে কাহিনীটা একটু পরিবর্তিত। সেখানে কামারের সহকারী শয়তান, যে কিনা তাকে বিপদে ফেলে। গ্রীকদেরও প্রায় একইরকম গল্প আছে। চেক ভারশনে উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের মত স্টুলে শয়তানকে আটকে রাখে কামার। এর্রেমেন্তারি বলে একটা বাস্ক ভাষার ছবি দেখেছিলাম ক’দিন আগে নেটফ্লিক্সে, তার কাহিনীতেও শয়তানকে চালাকি করে নিজের কারখানায় নেহাইয়ের সাথে আটকে রেখে দিয়েছিল শ্মশ্রুমন্ডিত পাগলা কামার। আয়রিশ ভার্শনে কামারকে বর দেয় ফেইরি কুইন।

বাস্ক লোককাহিনীভিত্তিক মুভি এর্রেমেন্তারিতে শয়তানকে খাঁচায় পুরে রেখে দিয়েছে কামার।

প্রায় একই রকম গল্প জার্মানিতে প্রচলিত ছিল বিদ্বান ডক্টর ফাউস্টের নামে। শয়তানের কাছে নিজের জীবন বন্ধক রেখে নানান অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে বেড়াত মধ্যযুগীয় এ চরিত্র। পরে ক্রিস্টোফার মার্লো আর গ্যেটে ফাউস্টকে নিয়ে মেলোড্রামাটিক ক্লাসিকাল কাহিনী ফেঁদে বসেছেন। আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকায় এসেও কাহিনীটির বিবর্তন শেষ হয়নি। আপালাচিয়ান পর্বতমালার মানুষ জনি দ্য ফিডলার নামে চেনে এই ধূর্ত কামারকে।

গ্রীক কামার দেবতা হেফেস্টাস তার কর্মশালায়, ক্লাসিকাল শিল্পীর কল্পনাতে।

কামারের ধূর্ততা আর কূটকৌশলের একটা তাৎপর্য যে আছে সেটা আরেকটু ব্যাখ্যা করতে চাই। শুধু যে লোককথায় আছে কামার তা নয়। বিভিন্ন প্রাচীন দেবদেবীর কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে কামার দেবতার পেশাভিত্তিক যে স্থান, সেটা আর কারো নেই। উদাহরণ, গ্রীক দেবতা হেফেস্টাস, আফ্রোদিতির স্বামী। মুখভর্তি দাঁড়ি, লেংচা, কুৎসিত। অথচ ধাতু নিয়ে সে অসাধারণ সব জিনিস বানিয়ে ফেলে। জিউসের বজ্র থেকে শুরু করে হার্মিসের শিরোস্ত্রাণ, একিলিসের বর্ম — এগুলি তারই বানানো। একটা রথও সে বানিয়ে ফেলে যা কিনা নিজ থেকেই সচল। অর্থাৎ হেফেস্টাস গ্রীক দেবতাদের টেক-গীক! ও হ্যাঁ, নিজের মা হেরাকেও চেয়ারে সেঁটে রাখার কৃতিত্ব তারই। এখানে শয়তানের জায়গা নিয়েছেন মাতৃজননী স্বয়ং।

গ্রীকদের হেফেস্টাসের মত রোমানদের ভাল্কান। দু’জনেরই কর্মশালা আগ্নেয়গিরির মধ্যে। যখন তারা কাজ শুরু করে সেখানে, তখন মাউন্ট এটনা থেকে অগ্ন্যুৎপাত হয়।

নর্স-জার্মানিক জাতিগোষ্ঠীদের কামার দেবতার নাম ওয়েল্যান্ড কিংবা ভলুন্ড। আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখা পোয়েটিক এডাতে তার গল্প রয়েছে। কেল্টিকদের গভন্যু। ফিনিশ ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় নয়, তারপরও তাদের জাতীয় কাহিনী কালেভালাতে ইলমারিনেন নামে এক কামার চরিত্র রয়েছে। জাদুর ধাতব জিনিসপাতি বা সাম্পো তৈরি করে সে — তামার জ্যান্ত ঘোড়া পর্যন্ত।

ফিনিশ-সোভিয়েত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘সাম্পো’তে কালেভালা কাহিনীর কামার ইলমারিনেন একটা ধাতব স্লেজ বানাচ্ছে।

ইরানী উপকথায় কাভে আহাঙ্গারানও কামার। অত্যাচারী রাজা জাহাকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পারসিকদের মুক্ত করে সে। ককেশাসের ওসেটিয়াতেও রয়েছে কামারদেবতার উপকথা। আর বৈদিক যুগের ভারতের ত্বস্তৃ, পরবর্তীতে বিশ্বকর্মা নামে ব্রহ্মায় মিলিয়ে যান। জাপানেও রয়েছে আদি কামার আমাকুনি।

কেন্টাকির লেক্সিংটনে পুরনো বাড়ির চৌকাঠে হর্স শু ঝুলছে। এ কুসংস্কার আমেরিকায় এসেছে আইরিশদের সাথে।

শুধু এশিয়া আর ইউরোপ নয়, পশ্চিম আফ্রিকাতেও কামারদের আলাদা মর্যাদা। অনেকের ধারণা তারা জাদুকর। কোন কোন কালচারে কামার আর মেডিসিনম্যান একই ব্যক্তি। লোহা আর আগুনের কম্বিনেশন দিয়ে ভূত তাড়ানোর ব্যাপারটাও মনে হয় কামার-ওঝাদের ঊর্বর মস্তিষ্কের ফল! হর্সশুও তাই অমঙ্গলনাশক। নাইজেরিয়ার দেবতা ওগুন কামারদেরই পৃষ্ঠপোষক।

অর্থাৎ, ইন জেনারেল, কামার পেশাটা ম্যাজিকের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, শুধু ইন্দোইউরোপীয় সংস্কৃতিতেই নয়। কেন ও কিভাবে, এটাই জানতে চাই! হাজার হোক, টেকনলজিস্ট আর ইনজিনিয়াররা এ যুগের কামার, শুধু সেকালের সম্মানটা আর নাই!

(দ্বিতীয় খন্ডে সমাপ্য)

পেপার ট্রেইল

“জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও” — ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি এটা নাকি নবীজী বলেছেন। সত্যি কথা হলো, এটি একটি দা’য়ীফ (দুর্বল) হাদীস, সম্ভবত বানোয়াট। ইসলাম ও আরবের আদি ইতিহাসে চীনের সাথে তেমন কোন প্রত্যক্ষ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল না।

অবশ্য ইসলামের শুরুতে আরব দিগ্বিজয়ের ঝান্ডা পশ্চিমে ইউরোপ আর পূর্বে ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হতে বেশি সময় লাগেনি। নবীজীর প্রয়াণের বিশ বছরের মধ্যে দুই বড় পড়শী বিজ্যান্টিন সাম্রাজ্যের পূর্বভাগের একটা বড় অংশ আর সাসানীদের পুরো রাজ্য আরবদের করায়ত্ত হয়। এর মধ্যে ইরানের উত্তরপূর্বের খোরাসান (বর্তমান আফগান-ইরানের উত্তর সীমান্তে) মধ্য এশিয়ার প্রবেশপথ। এ এলাকার উত্তরের দুর্গম গিরিপথের মধ্যে দিয়েই প্রাচীন পরিব্রাজকরা চীনে যেতেন।

অর্থাৎ চীন ও আরব এ দুইয়ের মোলাকাত ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার।

চীনের তাং সাম্রাজ্যের মানচিত্র

এসময় চীনে তাং রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তী অন্যান্য রাজবংশের মত অন্তর্মুখী এরা ছিল না। বিশাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সমান অংশগ্রহণ ছিল রাজকার্য পরিচালনায়। এরকম কসমোপলিটান রাজ্যে পূর্বের কোরিয়ান, উত্তরের মোঙ্গোল, পশ্চিমের তুর্কী জাতিগোষ্ঠীগুলিকে যথাযোগ্য স্থান দেয়া হত। অবশ্যই যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা চীনের সম্রাট ‘স্বর্গপুত্রকে’ উপঢৌকন পাঠানো বন্ধ করত।

মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে সিল্করোডের বাণিজ্যপথ এসময় ভারতকে চীনের সাথে যুক্ত করে। মধ্য এশিয়া ছিল প্রাচ্য-প্রতীচ্যের এক মিলনস্থল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের উত্তরসূরী গ্রেকো-ব্যাক্ট্রিয়ান রাজারা যেমন ছিল আফগানে, সেরকম ফারগানা-তাশখন্দ-বুখারা-কাশগর-সমরখন্দ এসব শহরেও সগডিয়ানভাষী ইরানীশাসিত নগররাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। এরা ছিল বংশপরম্পরায় বণিক। আর নেস্টরিয়ান খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, মানিকিয়ান, ইহুদী, জোরোয়াস্ট্রিয়ান ইত্যাকার নানা ধর্মবিশ্বাসের অনুসারীদের আবাস ছিল এ রাজ্যগুলিতে।

সিল্ক রোডের ভারতীয়, পারসিক, চীনা অংশ

ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম চীনে প্রথম যায় এ পথেই। সম্ভবত অতীশ দীপংকরও এই রাস্তার পূর্বভাগ যেটা পাকিস্তানের গিলগিটের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেদিক দিয়ে তিব্বতে গেছেন। চীন থেকেও হিউয়েন সাং এ পথেই ভারত ও বাংলায় এসেছিলেন সংস্কৃত বৌদ্ধ পান্ডুলিপি সংগ্রহ করতে। তার সে অভিযানের গল্প পরবর্তীতে চীনা পুরাকাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যার ইংরেজী নাম ‘এ জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট’। আর তার অন্যতম প্রধান চরিত্র বানররাজা সুন উখোং। ছোটবেলায় আমরা এই কাহিনীর চীনা ছবিবই পড়েছি।

সিল্ক রোডের অন্যতম স্থলবন্দর চীনের দুনহুয়াংএর গুহায় আবিষ্কৃত হয়েছে দেয়ালচিত্র। এখানে ভারতীয় প্রভাবে আঁকা বৌদ্ধ জাতকের কাহিনী চিত্রিত।
বানর রাজা সুন উখোং, সম্ভবত চরিত্রটি ভারতের হনুমানজির অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট

তাং সাম্রাজ্যের শত্রু অবশ্য কম ছিল না। ইরানীরা যেমন তুরানের যাযাবরদের একরোখা বর্বর বলে তুলে ধরেছে শাহনামার মত মহাকাব্যে, তেমন চীনারাও এদেরকে ‘পশ্চিমের ডাকাত’ নামে ডাকত। বিভিন্ন ট্রাইবের তুর্কীভাষী এসকল জনপদ আবার নিজেদের মধ্যেও লড়ত। চীনাদের সাথে মিত্র হিসাবেও যোগ দিত, কখনো হত শত্রু। এসকল যাযাবরদের ঠান্ডা রাখার জন্যে তাদের সাথে তাং সম্রাটরা নানা কূটনৈতিক চুক্তি সাক্ষর করে। সে অনুযায়ী একে অন্যের পরিবারের সাথে বিবাহসূত্রে তারা আবদ্ধ হয়।

নতুন একটি সাম্রাজ্য অবশ্য চীনের দক্ষিণপশ্চিমে এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। সেটি তিব্বত। এরাও মূলত যাযাবর। আর সপ্তম শতক থেকে শুরু করে এরা চীনাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। তারিম বেসিন পুরোপুরি তিব্বতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াতে চীনাদের পশ্চিমে যাবার রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়াতে তাং বাণিজ্যপ্রভাব ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সবচে বড় প্রতিবন্ধক ছিল তিব্বত সাম্রাজ্য।

আরব সেনাদল এসময় মধ্য এশিয়ার মারি-সমরখন্দ জয় করে বেশি পূর্বে আর অগ্রসর হয়নি। এরপরে মধ্য এশিয়ার বিশাল স্তেপভূমি আর গোবি-তাকলামাকান মরুভূমি। জনশূন্য বিশাল এলাকার মাঝে একটি-দুটি মরূদ্যান শহর। কেন্দ্রীয় কোন শাসনব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে করারোপের মত যথেষ্ট জনসংখ্যা নেই। বিশাল সাম্রাজ্যও নেই জয় করার মত। তখন ইউরোপের সাথে সিল্ক রোড বাণিজ্যও তেমন বেশি নয়। সব মিলিয়ে উমায়্যা খলীফাদের তেমন কোন অর্থনৈতিক ইনসেন্টিভ ছিল না মধ্য এশিয়ার আরো অভ্যন্তরে ঢোকার।

সিল্ক রোডের পশ্চিম চীন প্রান্তের তুরপান শহরের প্রাচীন ভবন। তাকলা মাকান মরুভূমি পেরিয়ে চীনা তুর্কীস্তান কিংবা শিনজিয়াংএ এসে এই মরুদ্যান শহরে পৌঁছত সওদাগরি কাফেলা।

চীনাদের অবশ্য এ অঞ্চলের প্রতি প্রাচীনতা থেকে আগ্রহ ছিল। প্রথম চীনা সম্রাট শিহুয়াংতি মধ্য এশিয়াতে এক রাজপ্রতিনিধি পাঠান ‘রক্তঘর্ম’ অশ্ব খুঁজে নিয়ে আসার জন্যে। যুদ্ধে নাকি ভীষণ দ্রুততা দিত এ ঘোড়া। আরো নানা ভারতীয় বিলাসদ্রব্য পাওয়া যেত এখানকার বাজারে।

পূর্ব-পশ্চিমের মিলনস্থলের এ রাষ্ট্রগুলো তাই কখনো স্বাধীন, কখনো চীনা প্রটেক্টরেট, এভাবে চলছিল। নবাগত প্রতিবেশী উমাইয়্যা খিলাফতকে এরা চীনের বিরুদ্ধে ব্যালান্সিং অ্যাক্টের জন্যে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে ৭১৫তে একবার আর ৭১৭তে আরেকবার উমাইয়্যা সেনাদল তাংদের মিত্র তুর্কী জাত তুর্গেশদের মুখোমুখি হয়।

৭৪৭এ উমাইয়্যাদের পতন ঘটে আব্বাসী অভ্যুত্থানের মুখে। ক্ষমতার কেন্দ্র সিরিয়া থেকে পরিবর্তিত হয়ে আসে ইরাক-ইরানে। সাসানী সাম্রাজ্যেরই একরকম পুনরুত্থান ঘটে পারসিক প্রভাব বাড়ার সাথে। বাগদাদের আব্বাসী খলীফাদের দৃষ্টি হয় প্রাচ্যমুখী। আর নতুন ‘সাম্যবাদী’ খেলাফত প্রতিষ্ঠার সাথে বেশ একটা জিহাদী জোশও চলে আসে আরব-অনারব দু’জাতের মুসলিমদের মধ্যে।

আব্বাসী খেলাফতের মানচিত্র

৭৫১তে মধ্য এশিয়ার দুই রাজ্য ফারগানা আর শাশ (তাশখন্দ) একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। শাশের বিরুদ্ধে তাং সাম্রাজ্যের সাহায্য প্রার্থনা করে ফারগানা। কোরিয়ান তাং জেনারেল গাও শাশে আক্রমণ চালিয়ে সেখানকার অধিকর্তাকে হত্যা করেন। শাশের রাজপুত্র পালিয়ে গিয়ে আব্বাসী বিপ্লবের অন্যতম নেতা মারি-সমরখন্দের গভর্নর আবু মুসলিমের দরবারে গিয়ে হাজির হন। এভাবে আব্বাসীদের সাথে তাং সাম্রাজ্যের সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

আব্বাসী খেলাফতের সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হয় বৌদ্ধ তিব্বত সাম্রাজ্য। অমুসলিম তুর্কী যাযাবর তুর্গেশরাও সাহায্যের হাত বাড়ায়। সব মিলিয়ে প্রায় লাখখানেক সৈন্য নিয়ে বর্তমান কাজাকস্তানের তালাস নদীর উপত্যকায় সমবেত হয় আব্বাসী সেনাদল। চীনাদের সেনাশক্তিও কম ছিল না। অবশ্য এ সব সংখ্যার অনেক কমবেশি হতে পারে।

তিব্বতী সাম্রাজ্য, ৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ
বর্তমান কাজাখস্তানে অবস্থিত তালাস নদী

তিনদিনব্যাপী ভীষণ যুদ্ধ হয় দুই দলের মধ্যে। যুদ্ধের শেষভাগে তাংদের মিত্র কারলুক তুর্কী যাযাবররা দলত্যাগ করে শত্রুদের সাথে যোগ দেয়। তাতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় চীনা সেনাশক্তি। সেনাপতি গাও পশ্চিম থেকে জান নিয়ে পালিয়ে ফেরেন মূল তাং ভূমিতে। প্রতিশোধ নেবার জন্যে নতুন সেনাদল গড়ে তুলতে না তুলতেই ৭৫৫তে খোঁজ আসে যে বেজিংয়ের দিকে এক বিশাল বিদ্রোহীদল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে তাং সেনাপতি আন লুশান। নিজেকে তিনি ইয়ান নামে নতুন এক বংশের সম্রাট দাবি করে বসেছেন। আব্বাসীদের কথা ভুলে সেনাপতি গাওকে উল্টোদিকে রওনা দিতে হয় তাং সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য।

আন লুশান বিদ্রোহে পরবর্তী আট বছর বিপর্যস্ত হয় সমগ্র উত্তর চীন। পশ্চিমে সাম্রাজ্যপ্রসারের স্বপ্ন আপাতত শিকেয় তুলে রাখতে হয় তাংদের।

তালাসের যুদ্ধ, ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দ

অপরদিকে আবু মুসলিমের জিহাদী জোশেও ব্রেক কষে দেন নতুন আব্বাসী খলীফা আল-মনসুর। আবু মুসলিমের জনপ্রিয়তা আর বিশেষত শিয়া মতাদর্শীদের অন্ধ সমর্থনের কারণে শত্রুতা বেড়ে চলে খলীফার সাথে। ষড়যন্ত্র করে ‘জিন্দিক’ বা ধর্মপরিত্যাগকারী সাব্যস্ত করে আবু মুসলিমকে হত্যা করেন আল-মনসুর। এরপর আব্বাসীরাও মধ্য এশিয়ায় নতুন সামরিক অভিযান পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

অর্থাৎ দুই সাম্রাজ্যই মোটামুটি একটা স্থিতিশীলতায় আসে। শ’দুয়েক বছর ধরে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের একটা সীমানা দাঁড়া হয়ে যায় এ অঞ্চলে। এ সীমানা অবশ্য দ্বাদশ শতাব্দীতে পদদলিত করে চেঙ্গিস খান আর তার মোঙ্গোল হোর্ড।

তালাসের যুদ্ধ নিয়ে আজকালকার মানুষ খুব বেশি কিছু জানে না। চীনারা এর কিছু বিবরণ লিখে গেছে। তাতে নিজেদের পরাজয়ের সাফাই গেয়েছে। আর আরব ইতিহাসবিদরাও দুয়েক জায়গায় এর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু খুব বেশি গুরুত্ব দেননি।

কিন্তু এ যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এরপর মধ্য এশিয়ার পশ্চিমভাগ সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে, যদিও এরা ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করে আরো শ’খানেক বছর পর। চীনা বাণিজ্য যায় কমে।

মধ্য এশিয়া হয়ে ভারত থেকে চীনে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের যে সাপ্লাই লাইন সেটা কেটে যায়। অবশ্য এসময় ভারতে নতুন করে হিন্দু ধর্মের প্রভাব বাড়ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের জন্যে চীনা-জাপানী-কোরিয়ানদের তাই খুঁজে নিতে হয় স্বকীয়তা। এর ফলে শুরু হয় শাওলিন, চান, জেন, প্রভৃতি স্থানীয় জাতের বৌদ্ধধর্ম। তাদের শিল্পসংস্কৃতিও ভারতীয় প্রভাব থেকে স্বাধীন হতে থাকে।

চীনা ‘চান’ বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম নিদর্শন ‘হাস্যরত বুদ্ধ’। আসলে ইনি লোককাহিনীতে বর্ণিত এক চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু। ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মে এরকম কিছু নেই। অর্থাৎ চীনা বৌদ্ধ ধর্ম হয়ে গেছে স্বতন্ত্র।

এ হল তালাস যুদ্ধের কালচারাল ইমপ্যাক্ট। এর থেকেও বড় যে ইমপ্যাক্ট তা টেকনোলজিকাল। সেটা হলো কাগজ তৈরির প্রযুক্তি। নবম শতকের আগে শুধুমাত্র চীনারা জানত কিভাবে তুঁত গাছের বাকল থেকে মালবেরি পেপার প্রস্তুত করা যায়। এ ছিল তাংদের রাষ্ট্রীয় টপ সিক্রেট জ্ঞান। সিল্ক রোডের কোন বণিকের সাধ্য ছিল না কাগজ তৈরির কারখানায় ঢোকার। চীনের বাইরে বাকি বিশ্বের লেখাপড়া চলত ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরায় (শার্ড) আঁকিবুঁকি করে, নয়ত পশুর চামড়ার পার্চমেন্টে লিখে। এসবই ছিল খুব কঠিন প্রক্রিয়া।

চীনের ফাং মাতানে আবিষ্কৃত প্রাচীনতম কাগজের নিদর্শন, আনুমানিক দ্বিতীয় খৃষ্টপূর্বাব্দ।

তালাস যুদ্ধে আব্বাসীরা হাজার কয়েক তাং সৈন্য ও প্রযুক্তিবিদদের যুদ্ধবন্দী করে। এদের মধ্যে ছিল কাগজওয়ালারাও। প্রথমে সমরখন্দে এদের নিয়ে যাওয়া হয়। কাগজ বানানোর কৌশল তাদের কাছ থেকে শিখে নেয় স্থানীয় শিল্পীরা। এর বছর পঞ্চাশেক পরেই বাগদাদে কাগজ তৈরির কারখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

কাগজের প্রযুক্তিলাভের ফলে আব্বাসী খেলাফতে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিস্তারে বিশাল একটা বিপ্লব আসে। শুধু কুরআন-হাদীস নয়, দর্শন-বিজ্ঞানেরও চর্চা সহজলভ্য করে দেয় কাগজ। এ জোয়ারে সওয়ার হয়ে আসে নবম-দশম শতকের ইসলামী স্বর্ণযুগ। কাগজে যেভাবে কালিকলমে লেখার প্রক্রিয়া, ক্যালিগ্রাফি একমাত্র সে মিডিয়ামেই সম্ভব। চীনাদের ক্যালিগ্রাফি সর্বজনবিদিত। সম্ভবত একইভাবে আরবী ক্যালিগ্রাফিরও যাত্রা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্য আর পশ্চিমা বিশ্বের প্রথম লাইব্রেরিগুলিও প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাসী খেলাফতে।

১১৮০তে পূর্ব ইরানে কাগজে তৈরি কুরআনের ক্যালিগ্রাফিক ফোলিও (নিউ ইয়র্কের মেট মিউজিয়াম)
ডানে একাদশ শতকের চীনা সং রাজবংশের সময়কালীন কাগজে আঁকা ক্যালিগ্রাফি (তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম)

একাদশ-দ্বাদশ শতকের মধ্যে কাগজ পৌঁছে যায় স্পেনের উমায়্যা খেলাফতে। সেখানে পড়তে আসা ইউরোপীয়রাও পায় কাগজ তৈরির প্রযুক্তি। তারপর পঞ্চদশ শতকে গুটেনবের্গ, বাঁধানো বই, রেনেসাঁস, এজ অফ রিজন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই ‘পেপার ট্রেইল’ ধরে সামনে হাঁটলে আমরা এরকম বৈপ্লবিক অনেক কিছুই পাই। আজকে কাগজ নষ্ট করতে আমাদের বাঁধে না। অথচ ছোটবেলায় শিখেছি কাগজ অমূল্য একটা জিনিস। আসলেই তাই! প্রমিথিউসের আগুন চুরির মত কাগজের রহস্যটাকেও ভেদ করে কেড়ে নিয়ে আসতে হয়েছিল বাকি বিশ্বের জন্যে। যদি না এরকমটা হত, তালাসের যুদ্ধ না হত, আর যুদ্ধে আব্বাসীরা না জিতত, তাহলে হয়ত কাগজের জন্যে ইউরোপকে অপেক্ষা করে বসে থাকতে হত আরো একশ’ বছর। সেই অল্টারনেট হিস্টরি কল্পনার কাজটা আপনাদের হাতে সমর্পণ করে আজকের মত শেষ করলাম।

সুফী জিকির

তিনারিওয়েন বলে মালির একটা ব্যান্ড আমার বেশ পছন্দ। ২০১০এ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এরা গান করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মিউজিকাল ট্রাডিশনেই অধিকাংশ মার্কিন জনরের উৎপত্তি।

তিনারিওয়েনের সদস্যরা অবশ্য কালো নয়, তারা বেরবের বা তুয়ারেগ নামক একটি মিশ্র জাতের। ইউরোপীয় বা মেডিটেরানিয়ান জনগোষ্ঠীতে প্রাচীন বেরবের জিন রয়েছে। অর্থাৎ প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপকে জনধ্যুষিত করেছিল এদের পূর্বপুরুষদের একটি অংশ।

আলহাসান আগ তুহামি বলে তিনারিওয়েনের এক গায়ক অদ্ভূত এক চরিত্র। নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে লম্ফজম্প দিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। কখনো মনে হয়, সেই করতে করতে ঘোরের মধ্যে চলে গেছে আলহাসান।

ভদ্রলোকের সাথে ঠিক এক বছর আগে একটা কনসার্টে মোলাকাত হয়, ফরাসীতে কিছু বাতচিতও চলে। এথনিক মিউজিকে আগ্রহ থাকাতে এধরনের কনসার্টের সুযোগ মিললে হাতছাড়া করি না।

আলহাসান আর তার সঙ্গীরা কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান মালিতে স্বজাতির স্বাধীনতার জন্যে প্রথমে অস্ত্র ধরেছিল, পরে গীটার। ছোটবেলা কেটেছে রেফ্যুজি ক্যাম্পগুলিতে। চাদ নামের একটি দেশে গন্ডগোল পাকাতেও লিবিয়ার গাদ্দাফি এদেরকে ব্যবহার করে।

মালির কৃষ্ণাঙ্গদের মত তুয়ারেগরাও মুসলিম। কিন্তু আরবদের সাথে তাদের ভাষা-কালচার মেলে বেশি। আরব দিগ্বিজয়ের যুগে তুয়ারেগরা ‘মাওয়ালি’ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সামরিক অভিযানে উমাইয়্যা খেলাফতকে সহায়তা করে। তাদের একজন তারেক ইবনে জিয়াদ, স্পেন অভিযানের সফল সেনানায়ক। অবশ্য উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ জনগণ তখনও মুসলিম হয়নি। সেটি হয়েছে অনেক পরে। আমাদের দেশের মতই সুফী সাধকদের সংস্পর্শে এসে।

আলহাসান যে গানের তালে তালে তিড়িংবিড়িং লাফ দিয়ে ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে, এটাও আসলে তাদের সুফী ঘরানার একটা ব্যাপার। রুমির ‌অনুসারী তুর্কী-ইরানী মাওলানা সেক্ট যেমন সেমা নৃত্য করে ঈশ্বরের নিকটবর্তী হবার প্রচেষ্টায়, সেরকম উত্তর আফ্রিকার সুফীরাও গানবাজনার তালে তালে শরীর দোলানোর মাধ্যমে ‘ফানা’ বা সেল্ফ-অ্যানাইহিলেশনের একটা অনুভূতির জগতে চলে যায়।

তিনারিওয়েনের আলহাসানের তিড়িংবিড়িং

 

মরক্কোর গানাওয়া সুফী সেক্টটির সদস্যদেরও ফেজ-মারাকেশ-এসাউইয়া শহরের রাস্তাঘাটে কারাকেব নামের করতাল আর সিন্তির বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সম্মোহনী ট্র্যান্স মিউজিক করতে দেখা যায়। বাদ্যের সাথে তারা মাথাটিকে এমনভাবে দোলায় যাতে ফেজটুপির টিকলিটি সমানে ঘুরতে থাকে। বলা বাহুল্য, এরও লক্ষ্য ট্র্যান্স বা মন্ত্রাচ্ছন্ন অবস্থায় পৌঁছনো, যেটাকে রুমির মত কবিরা বলেছেন খোদাপ্রেমের মদে মাতাল হওয়া।

মরক্কোর গানাওয়া সুফী মিউজিক

সুফী তরিকাগুলির এধরনের রিচুয়ালের ধর্মীয় ভিত্তি জিকর বা খোদাকে স্মরণ করা। মূলধারাতে জিকির ফরজ নয়, কিন্তু আমাদের দেশের মুসলিম কেউ যদি কখনো জিকিরে অংশ না নিয়ে থাকে তাহলে অবাক হবো। এ প্রক্রিয়ায় আলো-আঁধারিতে একদল মানুষ জোরে জোরে আল্লাহর বিভিন্ন নাম পাঠ করতে থাকে। কখনো নবীজীর প্রশংসাসূচক দরূদ। কখনো সাধু-সন্ত-সাহাবীদের নাম। পুরো ব্যাপারটিতে একটা আধ্যাত্মিক অনুভূতি আসে, যেটা মনপ্রাণকে হাল্কা করে দেয়। মূলধারায় অবশ্যই নামাজ-রোজার গুরুত্ব জিকিরের থেকে ‌অনেক বেশি।

কিন্তু সুফীদের মধ্যে জিকিরের গুরুত্ব পঞ্চস্তম্ভের সমপরিমাণ। ভারতীয় উপমহাদেশের বাউল-কাওয়ালী-ধামাল এগুলির কথা না হয় না বললাম। সাবসাহারান আফ্রিকার নাইজেরিয়া, সুদান, সোমালিয়া — এসব দেশগুলিতেও তিড়িংবিড়িংকরা সুফী দলের দেখা মেলে। মিশরে রয়েছে মাওলানাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত তান্নুর। সিরিয়া আর আরবের অন্যান্য স্থানে সেমার পাশাপাশি চলে হাধরা। সেখানে কালিমা-দরূদ-জিকিরের সঙ্গত হয় দারবুকা-ড্রাম, কখনো নে নামক তুর্কী বাঁশি। মাথায় পাগড়ি আঁটা শ্মশ্রুমন্ডিত সুফীরা তার তালে তালে শরীর সামনে পিছে করে।

তুরস্কের সেমা

নাইজেরিয়ার কানোর তিড়িংবিড়িং জিকির

সিরিয়ার নকশবন্দী হাধরা

 

সিরিয়ার আলেভী সেমা আরেক অদ্ভূত জিনিস। শিয়া মিস্টিক এ গ্রুপটা সেদেশে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এদের ছেলে ও মেয়েরা একসাথে সেমা নৃত্যে অংশ নেয়। জিকির চলে আলী ও অন্যান্য শিয়া সন্তদের নামে। কুর্দীসমাজেও একইরকম মহিলা-পুরুষ মিশ্রিত সেমা করে থাকে। ইরাকের কুর্দী নারী যোদ্ধাদের ছবি খবরে প্রায় আসে। এদের জেন্ডার রোল বহু হাজার বছর ধরে সমানুপাতিক।

সিরিয়া-তুরস্কের আলেভী সেমা

ককেশাসের রুশ প্রজাতন্ত্র চেচনিয়া ও ইঙ্গুশেতিয়ার মানুষও মূলত সুফী মুসলিম। এদের জিকির আতা’য়ী দেখলে মূলধারার মুসলিমরা মূর্ছা যাবে। কলেমা পড়তে পড়তে দু’স্তরে গোল হয়ে দাঁড়ানো মানুষগুলি ড্রামের তালে বানরের মত দু’পায়ে লাফায়, আর হাতে তালি দেয়। মাঝে দলনেতার ইঙ্গিত অনুযায়ী চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। সে ঘোরার দ্রুততা কখনো বাড়ে, কখনো কমে। কারো কিন্তু ছন্দপতন নেই, পুরো দলটি যেন হয়ে গেছে একটিমাত্র দেহ। চেচেন মহিলারাও ভিতরঘরে বসে আলাদা জিকির করে।

চেচনিয়ার জিকির আতা’য়ী

সুফীদের ছোঁয়া কিন্তু পূর্বে বাংলাদেশে এসে শেষ হয়নি। ইন্দোনেশিয়া ও চীনে কখনো কোন মুসলিম সৈনিক পদার্পণ করেনি। সেসকল স্থানে ইসলাম গেছে সুফী মতবিশ্বাসের ওপর ভর করে। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে এরাও জিকিরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়।

ইন্দোনেশিয়ার সুফী দরূদ-জিকির

চীনের সুফী জিকির

 

বিশ্বের অন্যান্য অনেক ধর্মেও আধ্যাত্মিকতাবাদ রয়েছে। খ্রীষ্টানধর্মের উৎপত্তিই গ্নস্টিক আর ডায়োনাইসিয়ান মিস্টিসিজমের মধ্যে। ইহুদীদের রয়েছে কাবালা। তিব্বতী তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে মন্ত্রপাঠ আর ভূত তাড়ানোর নাচের মধ্যে একই বিষয়। বর্তমানকালের খ্রীষ্টান ইভানজেলিস্ট অনেক গ্রুপকেও দেখা যায় নাচগান করতে করতে একটা একস্ট্যাটিক স্টেটের মধ্যে চলে যায়। তাতে নাকি ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। সত্যমিথ্যা বলা মুশকিল।

যাই হোক, অন্য ধর্মের আধ্যাত্মিকতাবাদে সুফী জিকিরের কোন সমান্তরাল খুঁজে পেলাম না। একমাত্র যেটার সাথে মিলল তা হলো নামিবিয়া-বতসওয়ানার বুশম্যান বা খয়সান জনগোষ্ঠীর হিলিং সেরেমনি। এরা বহু প্রাচীন এক জাত। ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে আসার আগে এরা হাজার বছর ধরে প্রস্তর যুগেই আটকে ছিল। এদের ধর্মবিশ্বাস অ্যানিমিস্ট, অর্থাৎ প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু-প্রাণীর স্পিরিট আর পূর্বপুরুষদের আত্মার শক্তিতে এরা বিশ্বাসী। ট্রাইবের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ভূত তাড়ানোর হিলিং সেরেমনি হয়। সেখানে এরা লাইন ধরে মাটিতে পদাঘাত করতে করতে মন্ত্রপাঠ করে। তাদের নেতৃত্ব দেয় মেডিসিনম্যান বা শামান। মন্ত্রপাঠ করতে করতে একসময় ঘোরের মধ্যে চলে যায় শামান। তার মুখ থেকে তখন অবোধ্য সব কথা বের হতে থাকে। সারারাত এরকম অনুষ্ঠানের পরদিন অসুস্থ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে বলে সে সুস্থ হয়ে গেছে।

নামিবিয়ার খয়সান হীলিং সেরেমনি

‌একইরকম ব্যাপার আলাস্কা-আমেরিকার নেটিভদের কালচারে রয়েছে। উদ্দেশ্য একই, হীলিং।

এটা অবাক করার মত ব্যাপার নয়। মানুষ দলগতভাবে হাজার হাজার বছর ধরে এ ধরনের রিচুয়াল করে আসছে। গ্রুপ সাজেশনের মত একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার এর মধ্যে আছে। মুসলিম জিকির নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, জিকিররত মানুষদের হৃদস্পন্দন একে অপরের সাথে সিনক্রনাইজড হয়ে যায়। এক সাথে উত্থানপতন হয়। পুরো এক্সপেরিয়েন্সটা থেকে একটা পরিপূর্ণতা নিয়ে ফেরে অংশগ্রহণকারীরা। অর্থাৎ এর থেরাপিউটিক একটা ভ্যালু রয়েছে। এটাকেই হয়ত রুমির মত সুফীরা বলেছেন ডিভাইন ইনটক্সিকেশন।

সুফীদের এসব নাচগানবাদ্য অবশ্য মূলধারার অনেকের যেমন পছন্দ নয়, তেমন প্রগতিশীলদেরও নয়। বিশের দশকে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক আইন করে সুফী অনেক দরগা বন্ধ করে দেন। কারণ তারা নাকি পশ্চাদমুখী। শুধু পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্যে বেঁচে থাকে সেমা সেরেমনি। বর্তমানকালের সৌদী-সালাফীদেরও এসব অপছন্দ। সে ধারাটির পয়সা ঢালার কারণে যেসব দেশে সুফী ইসলাম ছিল মূলধারা, তারা এখন কোনঠাঁষা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত সত্য। তবে কুরআন-হাদীসে এ ভাবে জিকির করার কোন ইনস্ট্রাকশন আসলেই নেই।

যেভাবে এসকল রীতি রিজিওনাল ইসলামে এসেছে, তাকে বলে সিনক্রেটিজম। ধর্মপ্রচারকরা দেশে দেশে গিয়ে একটা কমন থীম বের করে সেটার ইসলামীকরণ করেছেন। তাতে স্থানীয়দের আদি ধর্মবিশ্বাস থেকে ইসলামে প্রবেশের পথ পরিষ্কার হয়ে গেছিল। সাধারণ মানুষ গভীর ধর্মতত্ত্ব বোঝে না, কিন্তু জিকির বা হিলিং সেরেমনির সোশাল-পারসোনাল বেনেফিটগুলি ঠিকই বোঝে। যদি সুফী ধর্মপ্রচারকরা বতসওয়ানাতে পৌঁছতেন, তাহলে খয়সান জনগোষ্ঠী গা-টা ঢেকেঢুকে খোদারসুলের নামেই জিকির করত।

অর্থাৎ মুসলিম লোকাল সংস্কৃতিগুলির ওপরের স্তরটাকে ঘষে তুলে ফেললে যেটা দেখি, সেটা অনেক প্রাচীন একটা সাবস্ট্রেট। আর পূর্ব থেকে পশ্চিমে সে সাবস্ট্রেট একই। প্রস্তরযুগের মানুষ যে অ্যানিমিস্ট শামানিজমে বিশ্বাস করত, সেটাই এই সাবস্ট্রেট। মানুষ হিসাবে আমাদের ফিজিকাল-সাইকলজিকাল ক্যারেক্টারের খুব একটা রূপান্তর হয়নি। সেই পরিচয়ে নাচগানবাদ্য এন্টারটেইনমেন্ট নয়, বরং প্রকৃতি আর আত্মাদের বশে আনার প্রচেষ্টার ম্যাজিক।

লাস্কো গুহার শিকারের চিত্র সেই একই ম্যাজিক। গুহাচিত্র অবশ্য গুহাতেই রয়ে গেছে, কিন্তু এসকল জিকির-হিলিং সেরেমনি গুহা থেকে আমাদের সাথেই বেরিয়ে এসেছে। আর এখনো বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে আমাদের ধর্ম-সংস্কৃতিতে।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!