সাইবেরিয়ার সোনার ট্রেন

সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ বিশ্বের সবচে গভীর, সবচে প্রাচীন। আর এ হ্রদের গভীরেই হয়ত লুকিয়ে রয়েছে বিগত শতকের রোমাঞ্চকর এক রহস্যের উত্তর। রহস্যটিকে অনেকে রঙচঙে নাম দিয়েছে ‘ৎসারের হারানো স্বর্ণরাজি’, আবার আরেক নাম ‘কলচাকের সোনা’।

লেক বৈকালের তীর ঘেঁষে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের একাংশ, যার নাম সারকাম-বৈকাল লাইন।

বৈকালের তীরের ইরকুতস্ক শহরের মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, হ্রদের তলদেশে একটি সোনাভর্তি ট্রেনের কার রয়েছে। বৈকালের ধারঘেঁষা ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের একাংশ থেকে নাকি ছিঁটকে এটি পড়ে গেছিল ১৯২০ সালে। ২০১০এ একটি সাবমেরিন নাকি অনুসন্ধান চালিয়ে একটি বগি পায়, কিন্তু গভীর পানির নিচ থেকে সোনা কিংবা অন্য কোন বস্তু উদ্ধারের সক্ষমতা না থাকায় রহস্য রহস্যই থেকে গেছে।

এ পোস্টারে রাশিয়ার ম্যাপে বৈকাল হ্রদের অবস্থানের পাশাপাশি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

বিংশ শতকের শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভের আগে রুশ সাম্রাজ্যের স্বর্ণভান্ডার ছিল তৃতীয় বৃহত্তম। ব্রিটেন-ফ্রান্সের পরপরই তার স্থান। কিন্তু এই দেশ দুটির যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল, রাশিয়ার তা ছিল না। দাম্ভিক সম্রাটদের খায়েশে চলা দেশটিতে জনসাধারণের এক বিশাল অংশ ছিল ভূমিদাস। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে সংস্কারায়নের ফলে শিল্পের অগ্রগতি হয়। কিন্তু তার সাথে যে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনগুলো আসে, তাকে সামাল দেবার যোগ্যতা পুরনো ঘরানার শাসনপদ্ধতিতে সম্ভব ছিল না।

তার ওপর একের পর এক সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়ার এলাকাবিস্তার চলতে থাকে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি তুরস্ক-ইরান থেকে খাবলা মেরে বিশাল রাজত্বের মালিক হন ৎসারেরা। তারপর চীন-মাঞ্চুরিয়া-সাইবেরিয়ার দিকেও নজর পড়ে তাদের। সেদিকে পা বাড়াতে গিয়ে বাঁধা আসে নতুন এক শক্তিশালী দেশের কাছে থেকে। ১৯০৫ সালে রুশদের যুদ্ধে হারিয়ে বাকি বিশ্বকে তাঁক লাগিয়ে দিয়ে সুপার পাওয়ার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে আধুনিক জাপান।

একই বছরে রাশিয়াতে রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। ৎসারের রক্ষীবাহিনী রাজধানী পিয়েত্রোগ্রাদে প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা চালালে সারাদেশে আগুন জ্বলে ওঠে। ‘স্বৈরাচারী’ ৎসার নিকোলাস নির্বাচন, সংসদ ও সংবিধান প্রনয়ণের দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হন।

এভাবে দেখতে দেখতে চলে আসে ১৯১৪ সাল। সুপার পাওয়ারগুলি যে সেকেলে ব্যালান্স অব পাওয়ারের মাধ্যমে বিশ্বে তুলনামূলক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজিয়ে রেখেছিল, তার একিলিস হীলে আঘাত আসে। সার্বিয়ান এক জাতীয়তাবাদীর গুলিতে অস্ট্রিয়া-হাঙেরির যুবরাজ সপত্নীক নিহত হলে সারা ইউরোপের দেশগুলি দু’দলে ভাগ হয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ শুরু করে।

বলা বাহুল্য, রাশিয়ার সম্রাট যুদ্ধজয় নিয়ে আশাবাদী হলেও ভেতরে ভেতরে তাঁর শেষ সময় ঘনিয়ে আসছিল। জার্মান আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে কয়েকটি যুদ্ধে হার মেনে দেশের পশ্চিম ভাগের বিশাল এলাকা থেকে সরে আসতে হয় রুশ বাহিনীকে। পুরো সৈন্যদলের মধ্যে শুরু হয়ে যায় অরাজকতা, পলায়নপ্রবৃত্তি। পালিয়ে যাওয়া সৈন্যরা জড়ো হয় বড় শহরগুলিতে। হাত মেলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সাথে। সে দলগুলিও একেকটি একেক রকম। কেউ শাসনতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, কেউ সংসদীয় গণতন্ত্রে। কিন্তু বামপন্থী সোশাল-রেভলুশনারী (এসআর) পার্টির — লেনিনের বলশেভিক নয় — যে পরিমাণ সমর্থন ছিল তেমনটা আর কারো ছিল না।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে যুদ্ধচলাকালীন সময়েই বিপ্লবের মুখে ৎসার নিকোলাস পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রের শাসনভার প্রথমে আসে প্রিন্স ল্ভভের হাতে, তারপর এসআর পার্টির নেতা আলেকজান্ডার কেরেনস্কির কাছে। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করার কোন চিন্তাভাবনা এ সরকারের ছিল না। বড় শহরগুলির অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যাগুলির দিকে নজর দেবার মত সক্ষমতাও ছিল না। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সমাজতান্ত্রিক কট্টরপন্থী বলশেভিক পার্টি ও অন্যান্যরা। জার্মান সরকারও আগুনে কেরোসিন ঢালার জন্যে সময়মত এক গোপন ট্রেনে করে লেনিনকে সেন্ট পিটার্সবার্গে পাচার করে দেয়। ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় আরেকটি বিপ্লব — মতান্তরে কু’য়ের।

সোনার কাহিনীর শুরু বলা যেতে পারে এখানে। আসন্ন অস্থিতিশীলতার আঁচ পেয়ে নতুন রুশ সরকার প্রায় পাঁচশ টন ডবল-ঈগলছাঁপমারা সোনার বার ট্রেনে করে পূর্বে উরাল পর্বতের নিকটবর্তী কাজান শহরে পাঠিয়ে দেয়। অক্টোবর বিপ্লবের পর লেনিনের সহকর্মী ত্রতস্কি গঠন করেন লালবাহিনী। হাতে গোনা যে কটি শহর তখন বলশেভিকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেসব থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ‘শত্রু’ শ্বেতবাহিনীকে উৎখাত করা ছিল তাদের কাজ। আর যার হাতে ৎসারের সোনা পড়বে শেষ পর্যন্ত, এই নিরন্তর গৃহযুদ্ধে তাদেরই জয় অবশ্যম্ভাবী।

ঘর সামলানোর যুদ্ধে মনোনিবেশের জন্যে বলশেভিকরা জার্মানির সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯১৭তে। পশ্চিম রাশিয়ার বিশাল এক এলাকা ছেড়ে দেয় তারা। ৎসারের পক্ষে লড়া স্বেচ্ছাসেবক চেক ও পোলিশ সৈন্যরা পড়ে যায় মহাবিপদে। তাদের ইচ্ছে ছিল চলমান যুদ্ধে অংশ নেবার জন্যে পূর্ব ফ্রন্ট থেকে ফ্রান্সের পশ্চিম ফ্রন্টে যাবার।

চেক সেনাদল বিশাল ট্রেনবহর নিয়ে পাঁচ হাজার মাইল পূর্বে ভ্লাদিভস্তকের দিকে যাত্রা শুরু করে। এদের রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা আগের একটা লেখায় বলেছি। কাজান শহরে লালসেনারা ঘেরাও বসালে তাদেরকে হারাতে শ্বেতদের সাহায্য করে চেকরা। ঘেরাওয়ের ফাঁক গলে সোনার ট্রেন গায়েব হয়ে যায় আরো পূর্বে ইরকুতস্ক শহরে। কাজানে এসে ত্রতস্কি পান শূন্য খাজাঞ্চিখানা।

যারা রাশিয়া সম্পর্কে কিছুটাও জানেন তারা হয়ত ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলওয়ের কথা শুনে থাকবেন। পশ্চিমে পেত্রোগ্রাদ থেকে শুরু করে পূর্বে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত ব্যাপ্ত ৫,৭০০ মাইল দীর্ঘ এই রেললাইন বিশাল দেশটির নাড়ি বললে ভুল হবে না। সাইবেরিয়ার খনিজ সম্পদ আর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির ওপর মাতবরি ফলাতে হলে এ রেললাইনের নিয়ন্ত্রণ থাকা অত্যাবশ্যক। মজার ব্যাপার হলো, রুশ গৃহযুদ্ধের অধিকাংশ সময় শ্বেত-লোহিত কোন রুশের হাতেই এ রেলপথের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ছিল আটকেপড়া চেক স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যদলের হাতে। তারা স্বদেশের স্বাধীনতার আশায় অস্ট্রিয়া-হাঙেরির বিরুদ্ধে রুশদের পক্ষে যুদ্ধে শরিক হয়।

এই রেলবিচ্ছিন্নতার সুযোগে সাইবেরিয়ার ওমস্কে বলশেভিকবিরোধীরা কিছুটা স্থিতিশীল পাল্টা সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়। প্রথমদিকে এ সরকারে বামপন্থী এসআর যেমন ছিল, তেমন ছিল ৎসারের প্রচ্ছন্ন সমর্থক গোষ্ঠী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৮তে কুয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাদখল করেন ৎসারের নৌবাহিনীর এডমিরাল আলিয়েকসান্দর কলচাক।

রুশদের হয়ে উত্তরমেরু অভিযানে অংশ নিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন ৪৫ বছরবয়েসী এই নৌ অফিসার। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আহত ও বন্দী হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জার্মান নৌবাহিনীকে রুখতে বাল্টিক সাগরে সামুদ্রিক মাইন স্থাপন অভিযানের সফলতাও ছিল তাঁর কৃতিত্ব। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় কৃষ্ণসাগরের তুর্কী অভিযান থেকে অব্যাহতি পান। পিয়েত্রোগ্রাদে গিয়ে কেরেনস্কিকে নৌসেনাদের নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি অবহিত করেন। তাঁর সুপারিশ ছিল, সশস্ত্র বাহিনীতে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি পুর্নবহাল করার। কেরেন্সকি সে উপদেশ শুধু যে অগ্রাহ্য করেন তা নয়, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ভয়ে কলচাককে যুক্তরাজ্যে একটি অ্যাসাইনমেন্টে পাঠিয়ে দেন।

অক্টোবর বিপ্লব যখন শুরু হয়, তখন কলচাক যুক্তরাষ্ট্র হয়ে জাপানে। সেখান থেকে ভ্লাদিভস্তক হয়ে সোজা সাইবেরিয়া চলে যান তিনি। বলশেভিকবিরোধী বাহিনীগুলির একটির নিয়ন্ত্রণ নেন। সাইবেরিয়ায় কলচাকের পাশাপাশি ফিনল্যান্ড-এস্তোনিয়াতে ইউদেনিচ, ইউক্রেনে দেনিকিন-ভ্রাঙেল প্রমুখ ছিলেন শ্বেতবাহিনীর নেতৃত্বে। এদের পরস্পরের মধ্যে পারতপক্ষে যোগাযোগ ও সামঞ্জস্য না থাকায় ত্রতস্কির লালবাহিনী ক্রমে একে একে এদেরকে হারাতে সক্ষম হয়।

দক্ষিণ রাশিয়ার ইউক্রেনে দেনিকিনের অধীনস্থ শ্বেত বাহিনীর ব্যবহৃত ডাকটিকেট, ১৯১৯।
রাশিয়ায় আটকে পড়া চেক সৈন্যরা সুসংগঠিত ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রিত সাইবেরিয়ান রেলপথে একটি ছোটখাট রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। সেখানে চালু ছিল এ ডাকটিকেট (১৯১৯)।
দক্ষিণ রাশিয়ার ইউক্রেনে দেনিকিনের অধীনস্থ শ্বেত বাহিনীর ব্যবহৃত ডাকটিকেট, ১৯১৯।
উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার বাল্টিক উপকূল, ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়াতে জেনারেল ইউদেনিচের নেতৃত্বাধীন শ্বেতবাহিনি এ ডাকটিকেট ব্যবহার করে, ১৯১৯।
কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবাহিনী ছিল ৎসারের অনুগত। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডমিরাল ভ্রাঙেল। তাদের ব্যবহৃত ডাকটিকেট, ১৯২১।

১৯১৮তে ওমস্কে প্রভিশনাল অল-রাশিয়ান গভার্নমেন্টের শাসনভার দখল করেন কলচাক। এর মাসদুয়েক আগে ৎসার নিকোলাস সপরিবারে বলশেভিকদের হাতে নিহত হন। তাই বলশেভিকবিরোধী সমগ্র রাশিয়ার ‘সুপ্রীম লীডার’ হিসাবে নিজেকে ঘোষণা করতে কোন সমস্যা হয়নি কলচাকের।

ভাইস-অ্যাডমিরাল আলিয়েকসান্দর ভাসিলিয়েভিচ কলচাক, ১৯১৬।

একটা কথা আছে, অ্যাবসলুট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসলুটলি। পরবর্তীতে কম্যুনিস্টদের জন্যে কথাটি যতটা সত্য, কলচাকের জন্যেও ততটা। ক্ষমতা দখল করলেও সফল রাজনীতিবিদের যে দূরদর্শিতা ও সমঝোতার গুণ দরকার, তা দেশপ্রেমী কলচাকের ছিল না। প্রথমেই বামপন্থী শরিকদল এসআর সদস্যদের সরকার থেকে পদচ্যুত করেন। এসআর পার্টির একটি ব্যর্থ পাল্টা কুয়ের পর দলটির পাঁচশ সদস্যকে হত্যা করে কলচাকের অধীনস্থ কসাক সেনাদল।

যে চেক লেজিয়ন কলচাকের কাছে সোনার ট্রেন এনে দিয়েছিল, তারাও কলচাকের স্বেচ্ছাচারে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিম ফ্রন্টের যুদ্ধও ১৯১৯এ শেষ। নতুন রাষ্ট্র চেকোস্লোভাকিয়ার ততদিনে গোড়াপত্তন হয়েছে। রুশদের রক্তাক্ত অন্তর্ঘাতে অংশ নেবার পরিবর্তে স্বদেশপ্রত্যাবর্তন হয়ে দাঁড়িয়েছে চেকদের মূল লক্ষ্য।

কলচাকের তাঁড়িয়ে দেয়া এসআর পার্টিও ততদিনে লালবাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে। ত্রতস্কির সৈন্যরা সমানে ধেঁয়ে আসছে সাইবেরিয়ার আরো অভ্যন্তরে। এসআর পার্টির সাথে চেকরা ১৯২০এ গোপনে রফা করে যে পূর্বে নির্বিঘ্ন যাত্রা ও রেলরসদের বিনিময়ে কলচাক, তাঁর প্রধানমন্ত্রী আর সোনার ট্রেনবহর তুলে দেয়া হবে তাদের হাতে। কলচাক চেকদের ফাঁদে পা দিলেন। এসআর পার্টি তাঁকে কদিন বন্দী করে রাখে। তারপর বলশেভিকরা ইরকুতস্কের নিয়ন্ত্রণ নিলে কলচাক আর প্রধানমন্ত্রী পেলিয়ায়েভকে জনতার শত্রু আখ্যা দিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ড দেয়।

ইরকুতস্ক শহরে অ্যাডমিরাল কলচাকের স্মৃতিসৌধ।

ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র-জাপান ও অন্যান্য সকল সুপারপাওয়ারের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কলচাকের সাইবেরীয় সরকারের এমন পতন হয়। যুক্তরাজ্যের চার্চিল তাঁর সরকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিলেন, পারেননি প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের কারণে। কেরেনস্কি ততদিনে উইলসনের রুশবিষয়ক উপদেষ্টা। তাঁর প্ররোচনায় উইলসন ভেবেছিলেন কলচাক ৎসারপন্থী ও স্বৈরাচারী। মতবিরোধীদের নির্বিচারে হত্যা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাবিধানের বিরোধিতা, আর কলচাকের নাম নিয়ে অপমানসূচক কিছু বলা যাবে না — এধরনের আইনের কারণেও সরাসরি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় কলচাকের সরকার।

কলচাক পদত্যাগের আগে ইউক্রেনের শ্বেতরুশবাহিনীপ্রধান দেনিকিনকে সুপ্রীম লীডার ঘোষণা করে যান। সাইবেরীয় শ্বেতবাহিনী ইরকুতস্ক থেকে বিশাল এক লম্বা যাত্রা শুরু করে ভ্লাদিভস্তকের দিকে। সে ছিল এক বিচিত্র কাফেলা। চেক সৈন্যরা ছিল তার রক্ষক। রুশ সাম্রাজ্যের বহু অভিজাত যারা সময়মত টের পেয়েছিল বলশেভিক মানেই বিপদ, তারাও তাদের অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে এসকল সৈন্যদের ঘুষ দিয়ে তাদের সহযাত্রী। এই গ্রেট সাইবেরিয়ান আইস মার্চ প্রথমে ইরকুতস্ক থেকে চিতা, তারপর চিতা থেকে মাঞ্চুরিয়ার পোর্ট আর্থার আর কামচাতকা উপদ্বীপের ভ্লাদিভস্তক গিয়ে পৌঁছে ১৯২১ সাল নাগাদ। তারপর সেখান থেকে জাহাজ নিয়ে কেউ জাপান, কেউ আমেরিকা হয়ে ইউরোপে পৌঁছে। পথিমধ্যে ক্ষুধায়, ঠান্ডায়, ক্লান্তিতে, রোগজরায় প্রাণ হারায় অগণিত সৈন্য। এদের মধ্যে ছিলেন দলনেতা জেনারেল কাপেলও।

চিত্রশিল্পীর কল্পনায় জেনারেল কাপেলের নেতৃত্বে গ্রেট সাইবেরিয়ান আইস মার্চ, ১৯১৯।

সেই সোনাগুলির কি হল? চেকরা সে ট্রেনগুলোর সবই কি বলশেভিকদের হাতে তুলে দিয়েছিল? নাকি চালাকি করে দু’তিনটে জুড়ে নিয়েছিল নিজেদের পূবমুখী কাফেলার সাথে? লোককাহিনী তাই বলে। সেই ট্রেনবহরের একটিই নাকি দুর্ঘটনাক্রমে ছিঁটকে পড়ে গেছিল বৈকাল হ্রদের মধ্যে। বাপ-দাদাদের মুখে অন্তত তাই শুনে এসেছে ইরকুতস্কবাসী। আবার আরেক আঞ্চলিক গল্প অনুযায়ী, কলচাকই নাকি ধরা পড়ার আগে কয়েকটি ট্রেনের বগি উত্তরের পাহাড়ের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রাখার নির্দেশ দেন। আর তারপর সেসব সৈন্যদের সেখানেই গুলি করে মারে তাঁর বিশ্বস্ত অফিসাররা।

সাইবেরিয়ার কলচাক সরকারের স্বেচ্ছাসেবক শ্বেতরক্ষী বাহিনী, ১৯১৯।

আধুনিক যুগে এধরনের গালগল্প এখনো চলে সাইবেরিয়াতে। শাসক-শাসনব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সত্যটা কখনোই বেরোয় না এদেশে। যা বেরোয়, তা কেবল প্রপাগান্ডা। জনগণও জানে সে কথা। তাই লোকমুখে যা চলে, তাই সত্য এখানে। তাই বৈকালের মাইলগভীর পানিতে, কিংবা ঘন সাইবেরিয়ান পাইন-সীডার-বার্চের জঙ্গলে এখনো মানুষ খুঁজে ফেরে ৎসারের হারানো স্বর্ণরাজি। খুঁজতে গিয়ে হারিয়েও যায় অনেকে। ধনভান্ডারের গল্পে এসে তখন যুক্ত হয় দুর্ভাগা অ্যাডমিরাল কলচাকের প্রেতাত্মার অভিশাপ।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!