লাল মৃত্যু ও অন্যান্য

Featured Video Play Icon

দশ-বারো বছর বয়েসে মফস্বলে নানাবাড়ি গিয়েছিলাম বেড়াতে। প্রায় প্রতি শীতের ছুটিতেই যাওয়া হত, কিন্তু সেবার বিদেশ থেকে খালা, খালাত বোনরাও এসেছিল। আশপাশে সর্বসাকুল্যে যে একটামাত্র ভাল বইয়ের দোকান ছিল সে সময়, ছোট মামা আমাদেরকে সেটায় নিয়ে গেছিলেন।

দুর্লভ বিদেশী অতিথি হওয়ার সুবাদে বোনের ভাগ্যে জুটলো রঙচঙে চীনা বা রুশ প্রিন্টের সুন্দর একটা বই। আমারও মনে ধরেছিল সেটা। কিন্তু শেষমেষ মিললো বাংলা একাডেমীর সাদামাটা ‘লাল মৃত্যু’ নামে হায়াৎ মামুদের অনুবাদকৃত একটা ছোটগল্পের সংকলন।

প্রথমে মনটা একটু দমে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর যখন বইটা পড়ে শেষ করে উঠলাম আর ঘোর কাটলো, মনে হলো সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরলাম! রনবীর ইলাস্ট্রেশনগুলো তো দারুণ ছিলই, অনুবাদও বলিহারি। ছোটগল্পগুলির সেলেকশনও সেরকম। অস্কার ওয়াইল্ডের হ্যাপি প্রিন্স, সেলফ়িশ জায়ান্ট, নাইটিংগেল অ্যান্ড দ্য রোজ়। আনেরসেনের লিটল ম্যাচগার্ল, আগলি ডাকলিং, দ্য এঞ্জেলহ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। অসাধারণ এই বইটা তালি-তাপ্পি নিয়ে বহুদিন আমার সংগ্রহে ছিল। বন্ধুরা-ভাইয়েরা-বোনেরা পড়েছে। তারপর কিভাবে হারিয়ে গেছে আমি প্রবাসী হবার পড়। আবার খুঁজে পেলে কিনতে চাই।

বইটা ছোটবেলাতে আমার মননশীলতার উপর একটা গভীর দাগ কেটেছিল। পরে ওয়াইল্ডআনেরসেনের গল্পগুলি ইংরেজী মূল আর অনুবাদেও পড়েছি। তরুণ বয়েসে সেও ছিল আরেক মাত্রার অনুভূতি।

যে গল্পটার কথা এখনো বলিনি সেটা হলো বইয়ের শীর্ষনামেরটা — লাল মৃত্যু — এডগার অ্যালান পো’র মাস্ক অফ় দ্য রেড ডেথ়। যতবার পড়তাম গল্পটা, গা ছমছম করে উঠত! ইংরেজী মূলটাও কম যায় না।

মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্লেগের সময় প্রিন্স প্রস্পেরো নামে এক রাজকুমার তাঁর বন্ধুবান্ধব, পরিবার, আর সমশ্রেণীর অভিজাতদের নিয়ে বহু বছরের রসদসমেত চলে গেলেন দূরের এক দুর্গে। সে দুর্গে অতন্দ্র প্রহরা, কাকপক্ষীরও সাধ্য নেই সেখানে প্লেগের জীবাণু নিয়ে ঢোকে। বহির্বিশ্বের মৃত্যুর বাস্তবতাকে ভুলতে আর দৈনন্দিন জীবনের একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্যে প্রস্পেরো একটা পার্টি দিলেন। যেনতেন পার্টি নয়, দুর্গবাসী অতিথিরা সেখানে আসবেন ছদ্মবেশে, রহস্যাবৃত হয়ে — যাকে ইংরেজীতে বলে মাস্কারেড

সে দুর্গে সাতটা বিশেষ ঘরকে সাজানো হলো, একেকটার রঙ একেক রকম। শেষটা লাল জানালা আর কালো দেয়ালের বিমর্ষ এক ঘর, কেউ পারতপক্ষে সেথায় ঢোকে না। শেষ বিকেলের আলো লাল কাঁচের জানালা দিয়ে কালো দেয়ালে পড়লে লাল-কালো মিলে এক ত্রাসের আবহ তৈরি হয়। আর সেখানে একটা বড় গ্রান্ডফাদার ক্লক। সেটা যখন গুরুগম্ভীর ঢংঢং শব্দ করে সময় জানান দেয়, কারো মুখে টুঁ শব্দটা হয় না। ঢংঢং শেষ হয়ে গেলে আবার সবাই যেমনকার তেমন।

পার্টির রাতে খুব হুল্লোড়। মদ-রুটি, আয়েশী খাবারের ছড়াছড়ি, গানবাজনা-জেস্টিং চলছে সমানে। দু্র্গপ্রাচীরের বাইরে সাধারণ প্রজারা রোগাক্রান্ত, মৃত্যুপথযাত্রী, প্রিয়জনের বিয়োগবেদনায় শোকাতুর। এরকম বৈপরীত্যের মধ্যে পার্টি যখন তুঙ্গে, তখন এক অদ্ভূত অতিথির আগমন ঘটলো।

নবাগতের মুখে মৃতের মুখোশ, আপাদমস্তক আবৃত কাফনের মত লাল কাপড়ে। অতিথিদের ভীড় সরে আপনি তাকে জায়গা করে দিল, আর সেই রহস্যময় মূর্তি হেঁটে হেঁটে — নাকি ভেসে ভেসে — এক ঘর থেকে আরেক ঘরে এগিয়ে যেতে থাকলো। রাজকুমারের বন্ধুরা একটু ঘাবড়ে গেলেন আর প্রস্পেরো গেলেন রেগে। কার এত বড় স্পর্ধা যে তাঁর ফূর্তির রাতে তামাশা করতে এরকম পোশাকে পার্টিতে আসে!

প্রস্পেরো তেড়ে গেলেন বেয়াদবের পরিচয় বের করতে। খোলা তলোয়ার হাতে দৌড়তে দৌড়তে অবশেষে তাকে ধরলেন শেষ কালো ঘরটাতে। মধ্যরাতের ঘন্টা বাজা তখনও শেষ হয়নি। নবাগতকে ছোঁয়ামাত্রই ভয়ে-বিভীষিকায় সাদা হয়ে প্রস্পেরোর আত্মা দেহত্যাগ করলো!

প্রস্পেরোকে রক্ষা করতে তাঁর পারিষদবর্গ ছুটে এলেন, আক্রমণ করলেন রক্তিম আগন্তুককে। তার আলখেল্লা ধরে টান দিতেই তাঁরা দেখলেন প্রহেলিকা — পোশাকের নিচে নেই কেউ! তারপর একে একে সকলে রক্তিম ত্বক নিয়ে প্লেগের আক্রমণে ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। দুর্গের প্রাচীরের ভেতরে চলল লাল মৃত্যুর রাজত্ব!

এই গল্পটা ছোটদের জন্যে একটু শিক্ষামূলকও। মৃত্যুর করাল গ্রাস কাউকে ছাড়ে না। অহংকারী মানুষ কোন না কোনভাবে যদি ভাবে তারা মৃত্যুর ঊর্ধ্বে, তখনই তাদের গ্রান্ডফাদার ক্লকে ঢংঢং করে বারোটা বেজে ওঠে।

আমার হিসাবে, এডগার অ্যালান পো খুবই আন্ডাররেটেড একজন লেখক। তিনি কিন্তু একাধারে ডিটেক্টিভ় নভ়েল, সাই-ফাই আর গথিক ম্যাকাবার শৈলীর লিখনের জনক। তাঁর লেখা দ্য গোল্ড বাগও আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চকর ছোট গল্প। তাতে এনক্রিপশনের ব্যাপারে যেসব আইডিয়া দেয়া হয়েছে, সেগুলি পরে মার্কিন এক সেনাপ্রধানকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল সিগনালিং কোর তৈরিতে। তার ওপর আছেন মার্ডারস ইন দ্য র‌্যু মর্গের খ্যাতিমান ফরাসী ডিটেক্টিভ় দ্যুপ্যাঁ! এগুলি এইচ জি ওয়েলস আর আর্থার কোনান ডয়েলের জন্যেও প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ছিল।

কিন্তু পো মূলত পরিচিত তাঁর গথিকশৈলীর ছোটগল্পের জন্যে। সেগুলিতে তিনি মানুষের সবচে’ নীচ স্বভাবের মনোবৃত্তিগুলি তুলে ধরেছেন খুবই সাবলীলভাবে, কোনটা শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন নিয়ে, আবার কোনটা তার সাথে ডার্ক হিউমার মিলিয়ে একটু কৌতুকপ্রদ। সবগুলিই ফিরে ফিরে মৃত্যু বিষয়টাকে টেনে নিয়ে এসেছে। আর প্রতিটা ভিলেইনই মানবিক — তাদের প্রতি যতটা না ঘৃণা জাগে, তার থেকে বেশি হয় করুণা।

কাস্ক অফ় আমন্টিলাডোতে রয়েছে প্রতিশোধপরায়ণ বন্ধু কর্তৃক এক দুর্ভাগার খুনের কাহিনী। মন্ত্রেসর তার বন্ধু ফরতুনাতোকে দেয়াল তুলে এক ছোট কামরার মধ্যে জীবন্ত কবর দিয়ে দেয় এ কাহিনীতে। ফ়ল অফ় দ্য হাউজ় অফ় আশারেও মানসিক রোগগ্রস্ত এক ভাই তার বোনকে সেরকম জীবন্ত সমাধিতে বন্ধ করে ফেলে।

পিট অ্যান্ড দ্য পেন্ডুলাম গল্পে বলা হয়েছে স্প্যানিশ ইনকুইজ়িশনের সময়ে ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক সংস্কারপন্থীদের নিপীড়নের লোমহর্ষক বৃত্তান্ত। টেল-টেইল হার্টে রয়েছে ঠান্ডা মাথায় এক রগচটা বৃদ্ধকে খুন করে তার দেহাবশেষকে টুকরো টুকরো করে বাড়ির মেঝের নিচে গুম করে ফেলার কাহিনী — যার শেষ খুনীর পাপবোধের ফলস্বরূপ তার মনস্তত্ত্বে মেঝের ফ্লোরবোর্ডের নিচ থেকে আসা বুড়োর চলমান হৃদপিন্ডের ধকধক আওয়াজ। আর কেউ শুনতে না পেলেও সে আওয়াজ তাকে পাগল করে ফেলে। আর পুলিশের সামনে সে মেঝে খুঁড়ে বের করে ফেলে নিজের কীর্তিকলাপের প্রমাণ!

অ্যালান পো মৃত্যু নিয়ে অবসেসড ছিলেন তার কারণ বোধহয় কয়েকটা। ১৮০৯এ বস্টনে তাঁর জন্ম। এক বছর বয়েসে বাবা পরিবারকে পরিত্যাগ করেন, মা মারা যান দু’বছর বয়েসে। জন অ্যালান নামে ধনাঢ্য এক ভদ্রলোকের পরিবারে পালকপুত্র হিসাবে বড় হন, ভারজিনিয়ার রিচমন্ডে — সেখানে এডগার অ্যালান পো মিউজ়িয়াম দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

ছাত্রাবস্থায় পড়াশোনায় বেশি মন টেকেনি, লেখালেখি আর জুয়াখেলায় ঝোঁক ছিল পো’এর। সে নিয়ে পরে পালকপিতার সাথে মনোমালীন্য আর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। কিছুদিন সেনাবাহিনীতেও কর্মরত ছিলেন পো। পালকমাতার অসুখের কথা গোপন রাখা হয়েছিল পো’র কাছ থেকে। তাঁর মৃত্যুর কথা জানতে পেরে পো রিচমন্ডে ফেরেন, কিন্তু সমাধির একদিন পর। জন অ্যালান এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করলে সে নিয়েও ঝগড়া হয়। দু’বছর পর বড় ভাইয়েরও অকালমৃত্যু দেখতে হয় পো’কে।

১৮৩৫এ ২৬ বছর বয়েসী পো বিয়ে করেন তুতো-বোন ১৩ বছরের ভারজিনিয়াকে। তাঁকে যে ভালবাসতেন প্রাণ দিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৮৪২এ ভারজিনিয়ার যখন যক্ষ্মা ধরা পড়ল, পো তখন বুঝে নিলেন যা বোঝার। বিষণ্ণতা আর নিয়তিবাদ তাঁর লেখায় ছাপ ফেলা শুরু করলো। ১৮৪৭এ মারা গেলেন ভারজিনিয়া। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর দু’বছর আগেই ভবিষ্যতদ্রষ্টা  পো লেখেন তাঁর সবচে’ কালজয়ী কবিতা দ্য রেভ়েন

সে কাব্যে বিমর্ষ এক পন্ডিত বইয়ের মাঝে ডুবে আছেন, প্রিয়তমা লেনোরকে হারানোর বেদনা ভুলে যাওয়ার প্রয়াসে। এমন সময় এক বিশাল দাঁড়কাকের আবির্ভাব ঘরের দরজার চৌকাঠের ওপরে। সে যখন ডেকে ওঠে, পন্ডিতপ্রবর ভাবেন কাক বলছে সে নামটি যেটা তিনি ভুলতে চান — লেনোর। কাককে অনুনয় করতে সে আবার ডেকে ওঠে — লেনোর নয়, সে আসলে বলছে নেভ়ারমোর! প্রেয়সীর দেখা তুমি আর কখনো পাবে না! যতবার বিদ্বান চান সে কথা ভুলতে, ততবার রেভ়েন ডেকে ওঠে — নেভ়ারমোর! এ এক উদ্ভ্রান্ত দ্বন্দ্ব! একদিকে বিরহবেদনা নিরসণের মানবিক প্রয়াস, আর অন্যদিকে প্রেমিকার স্মৃতির প্রতি অকপট বিশ্বস্ততা! (নিচের গানটা রেভ়েন কাব্য অবলম্বনে পো’এর প্রতি প্রগ রক গ্রুপ অ্যালান পারসনস প্রজেক্টের ট্রিবিউট।)

দ্য রেভ়েন লিখে পো মজুরি পেয়েছিলেন মোটে নয় ডলার। তাঁর ‘লেনোর’ ভারজিনিয়ার অকালমৃত্যুর দু’বছর পরে হতদরিদ্র-ক্ষতহৃদয়-ভগ্নশরীর ৪০ বছর বয়েসী এডগার অ্যালান পোও ১৮৪৯এর অক্টোবরের এক স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা রাতে দেহত্যাগ করেন বাল্টিমোরের রাস্তায় — অনেকটা তাঁর গথিক গল্পগুলির মত রহস্যজনকভাবেই!

এই ফ়লের কোন এক গা ছমছমে সন্ধ্যায় পো’এর একটা রোমহর্ষক ছোটগল্প পড়ে ফেলুন! হ্যাপি হ্যালোউইন!

প্রেতাত্মার রাত্রি

Featured Video Play Icon

হ্যালোউইন সমাগত প্রায়। অক্টোবর শেষের এই উৎসব আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশে নানা নামে পালিত হয়। এদেশের বাচ্চারা ভূত-প্রেত-দত্যি-দানোর সাজ পড়ে পাড়ার বাড়ি বাড়ি যায় ভয় দেখাতে। ট্রিক অর ট্রীট বলে টফি-চকলেট আদায় করে নেয়।

এই উৎসব মার্কিনদেশে এসেছে ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড থেকে। এখন সেক্যুলার অনুষ্ঠান হিসাবে পালিত হলেও, খ্রীষ্টধর্মের ঐতিহ্যের অংশ এটা। হ্যালোউইন মানে হ্যালোড ইভ়নিং বা পবিত্র রাত্রি, যে রাত সকল সন্তের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার জন্যে উৎসর্গীকৃত। কিন্তু এর শিকড় প্রাক-খ্রীষ্টান কেল্টিক ড্রুইড ঐতিহ্যে, যার ‌বৈশিষ্ট্য পূর্বপুরুষ আর প্রকৃতিদেবীর আরাধনা। বর্তমান যুগে সে ঐতিহ্যের বাহক আইরিশরা হ্যালোউইনকে সাওয়িন নাইট বা পবিত্ররাত্রি হিসাবে পালন করে — শুধু সেটা তাদের ক্যাথলিক ধর্মে এসে নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।

হ্যালোউইন আসলে একটা হারভেস্ট ফেস্টিভাল বা নবান্ন পরব। ফসল কাটা শেষে পড়শীদের মধ্যে মিষ্টি-খাবার আদান-প্রদানের উৎসব। সে থেকে পাম্পকিন প্যাচের হোৎকা কুমড়ো আর খড়ের গাঁদা। আবার বছরের একই সময়ে শীতের প্রাক্কালে ঊর্বরতা বিদায় নেয়, আর প্রকৃতিমাতার ঘুম অথবা ‘মৃত্যুর’ প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

হ্যালোউইনের সাথে সেজন্যে মৃত্যুরও একটা যোগাযোগ আছে। ভূতপ্রেত সাজার ব্যাখ্যাও সেটা, যদিও এরকম সাজসজ্জা তুলনামূলকভাবে নতুন প্রচলন। অনতিপ্রাচীনকালে এসময় পরলোকগত পূর্বপুরুষদের স্মরণ-সম্মান করা হত। প্রাক-কলাম্বাস যুগের ঐতিহ্য ধরে মেক্সিকোতে হ্যালোউইনের সময়েই পালন করা হয় দিয়া দে লস মুয়ের্তোসকোকো নামের ডিজ়নি ছবির কাহিনী এ নিয়েই।

যারা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের বাসিন্দা তাদেরকে বোঝানো একটু কঠিন উত্তরের দেশগুলিতে এসময় কি ধরনের ঋতুপরিবর্তন হয়। আবহাওয়া হঠাৎ করে ঠান্ডা হয়ে যায়, পর্ণমোচী বৃক্ষ সবুজ পাতা ঝেড়ে ফেলে ধূসর হাতের মত শাখাপ্রশাখা নিয়ে ভূত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা শীতল স্যাঁতসেঁতে বাতাস সেসব উদোম ডালপালার ভেতর দিয়ে শোঁ-শোঁ শব্দ করে বয়ে যায়। দিন ছোট হয়ে আসে আর অনেক জায়গায় ঝাঁপ দিয়ে পাঁচটার সময় থমথমে অন্ধকার হয়ে যায়। গায়ে কাঁটা দেয়ার মত ব্যাপারস্যাপার!

সাজপোশাকের পাশাপাশি হন্টেড হাউজ় বা পোড়োবাড়িগুলোর ব্যবসাও এসময় তুঙ্গে ওঠে। সাবার্বের বাড়িগুলিকেও পোড়োবাড়ি সাজানোর হিড়িক পড়ে যায়। পাম্পকিন প্যাচ আর থিম পার্কগুলিতে স্পেশাল ভয়ের রাইডগুলি ছোট-বড় ফ্যান্কেনস্টাইন আর ড্রাকুলার ভীড়ে ভর্তি হয়ে যায়।

কানাডিয়ান শিল্পী লরীনা ম্যাককেনিটের ‘অল সোলস নাইট’ নামের এই গানটা বিভিন্ন সংস্কৃতির হ্যালোউইন কিংবা একই ধরনের উৎসবের মূল প্রাচীন ভাবাবেগটা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে। বোনফায়ারের চারদিকে নেচে চলেছে ছায়ার দল, এরা ইউরোপীয় ভূত। আর মোমবাতি-কাগজের লন্ঠনের কাঁপা-কাঁপা আলোতে জাপানীদের পিতৃপুরুষ-স্মরণের ওবোন উৎসব। অক্টোবরের পরিবর্তে অবশ্য অগাস্টে পালিত হয় ওবোন।

মৃত্যু ব্যাপারটা আমাদের সংস্কৃতিতে একরকম টাবু। আমরা সে ব্যাপারে আলোচনা করতে ভয় পাই, বিমর্ষ হয়ে পড়ি। গুরুগম্ভীর টপিক সেটা। সেটা অমূলক নয়। যদিও ইসলামধর্মে মৃত্যুকে খোদার নিকট ফিরে যাওয়া হিসাবে ধরা হয়, অর্থাৎ আসলে টাবু কোন বিষয় এটা নয়। আমার মতে, হ্যালোউইন বা অল সোলস নাইটের মত উৎসব পালনের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্কৃতিতে মৃত্যুকে নরমালাইজ় করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরলোকগত পিতৃপুরুষদের সম্মান করে তাঁদের জীবদ্দশার আনন্দের স্মৃতি আর সাফল্যগুলো স্মরণ করা এবং সেসবের জন্যে কৃতজ্ঞ হয়ে স্রষ্টার কাছে তাঁদের জন্যে প্রার্থনা করা — মৃত্যুর বিষণ্ণতাকে লাঘব করার জন্যে এ এক অনন্য উৎসব।

স্টারি নাইট – ২

Featured Video Play Icon

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ়ের জন্ম নেদারল্যান্ডের এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে, ১৮৫৩ সালে। বাবা ডাচ রিফর্মড চার্চের পাদ্রী ছিলেন। ভিনসেন্টের ছোটবেলা কেটেছে কড়া ধর্মীয় অনুশাসনে। খুব একটা আনন্দময় ছিল না সেটা।

আর্ট ডীলার ফার্মের চাকরিতে আর্থিক সফলতা পেলেও বেশিদিন সেখানে মন টেকেনি ভিনসেন্টের। সেটা প্রথম প্রেমে বিফলতার কারণে, নাকি সৃজনশীলতার অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ দেখে, তা গবেষণার ব্যাপার! নতুন ঝোঁক এল ধর্মকর্মে।

বাবা-মা-খালুর পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন ভ্যান গঘ়। কিন্তু তাতে না দমে প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারীর চাকরী নিয়ে পাড়ি জমান বেলজিয়ামের দরিদ্র বোরিনাঝ় এলাকায়। সেখানে কয়লাখনির মজুরদের হাঁড়ভাঙ্গা কষ্টের জীবন দেখে ভিনসেন্টের মনটা আকুল হয়ে পড়ে। কিন্তু চাকরিচ্যুত হতে বেশি সময় লাগল না। চার্চের বরাদ্দ করা আরামদায়ক বাসা এক গৃহহীনকে ছেড়ে দিয়ে নিজে থাকা শুরু করলেন কুঁড়েঘরে। চার্চের হর্তাকর্তাদের হিসাবে এ ছিল মিশনারী পদমর্যাদার অবমাননা!

তারপরও ভ্যানগঘ় থেকে যান গরিব মানুষদের মাঝখানে। তাদের দৈনন্দিন পরিশ্রমের চিত্র আঁকার জন্যে পেন্সিল-চারকোল হাতে তুলে নেন। অনুপ্রেরণা আর সাহায্য আসে স্বচ্ছল আর্ট ডীলার ছোটভাই থিওর কাছ থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দু’চোখে দেখতে না পারলেও থিওর উপদেশে ব্রাসেলসের আর্ট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলেন।

ধর্ম থেকে ভিনসেন্টের মন শেষ পর্যন্ত উঠে গেল যাজক খালুর মেয়ে কর্নেলিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে। সাত বছরের বড় সদ্যবিধবা কর্নেলিয়ার পিছনে এর পরেও অনেকদিন লেগে ছিলেন ভ্যান গঘ়। পরিবারের কারো মনে আর কোন সন্দেহ রইলো না যে ভিনসেন্ট ‘বদ্ধ উন্মাদ’। এ ঘটনার পরে ভ্যান গঘ় পতিতালয়ে যাতায়াত শুরু করেন! অবশ্য শিল্পবিপ্লবের যুগের ইউরোপে নানা যৌক্তিক সামাজিক কারণে এধরনের ব্যাপারস্যাপার হরহামেশা চলত।

চিত্রকলার প্রশিক্ষণ চলতে থাকলো, এবার হেগ শহরে তুতো-বোনজামাই আন্তন মভ়ের কাছে। কিন্তু সে সম্পর্কেও চিড় ধরলো ভিনসেন্টের ছন্নছাড়া জীবনযাত্রার কারণে। বাবার নতুন কর্মস্থল ন্যুনেন গ্রামে চলে আসলেন ভ্যান গঘ়। এখানে দুটো ঘটনা মোটা দাগ কাটে ভিনসেন্টের মনে। মার্গো বলে এক পড়শীকন্যার প্রেমনিবেদনে সাড়া দিলেন তিনি। কিন্তু বিয়েতে বাদ সাধলো দু’পক্ষ। মার্গো বিষ খেয়ে মরতে বসেছিলেন, ভ্যান গঘ় সময়মত তাঁকে হাসপাতালে নেয়াতে প্রাণরক্ষা হল তাঁর। এ ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে ভিনসেন্টের বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। ভিনসেন্ট মনে মনে তাঁর মৃত্যুর জন্যে নিজেকে দায়ী করতেন কিনা, তা অবশ্য জানা যায়নি।

ন্যুনেনে থাকার সময়ে গ্রামের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভ্যান গঘ় প্রায় দু’শো তৈলচিত্র আঁকেন, যার একটা এখনকার সুপরিচিত ‘দ্য পটেটো ঈটারস’। থিও চেষ্টা করেন সেসব বিক্রি করতে। কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু আর নিষ্প্রাণ কাঠখোট্টা রঙের কম্বিনেশন ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। থিও ভাইকে উপদেশ দিলেন উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার বাড়াতে।

একটা অপ্রীতিকর ঘটনায় দোষী সন্দেহ করে ন্যুনেনবাসীরা গ্রামছাড়া করে ভ্যান গঘ়কে। বন্দর শহর আন্টওয়ের্প হয় তাঁর পরবর্তী গন্তব্য। জাহাজীদের কাছ থেকে কেনা কিছু জাপানী উডকাট ভিনসেন্টের ভীষণ মনে ধরে। সেসবের কপি এঁকে রঙের কম্বিনশনের প্র্যাকটিসটা আরো জুঁতসই হয় তাঁর। একই সাথে আন্টওয়ের্পের ফাইন আর্ট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন, পাশও করেন। কিন্তু শিক্ষকদের সাথে অঙ্কনশৈলী নিয়ে বচসা বেঁধে যায়। তারপর সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে ফ্রান্সের পার়িতে থিওর কাছে চলে যান তিনি।

পার়ি ছিল ভ্যান গঘ়ের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। সারা বিশ্বের আর্ট ক্যাপিটাল সেসময় নিউ ইয়র্ক নয়, ছিল পার়ি। থিওর সুবাদে ফের়নঁ কর়মোনের আর্টস্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। আর সে সুযোগে পরবর্তীকালের খ্যাতিমান অনেক চিত্রশিল্পীর সাথে পরিচয়-বন্ধুত্ব হয় তাঁর। এঁদের মধ্যে ছিলেন এমিল বেরনার্, অঁর়ি দ্য তুলুজ়-লোত্রেক, কামিয়্যি পিসার়ো, ঝ়র্ঝ় স্যর়া, পোল সিনিয়াক, আর, হয়ত দুর্ভাগ্যক্রমে, পোল গোগ্যাঁ। ইম্প্রেশনিস্ট আর্টের পাশাপাশি স্যরা়র বিশেষত্ব পোয়াঁতিয়িস্মে হাতে-খড়ি হয় ভ্যান গঘ়ের।

পার়ির পার্টি লাইফে ভিনসেন্টের হাঁপ ধরতে বেশিদিন লাগলো না। ভাইয়ের সাথেও লেগে যাচ্ছিল প্রায়! ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের ‌অজুহাতে ভ্যান গঘ় এবার পাড়ি জমালেন দক্ষিণ ফ্রান্সের ছোট্ট আর্ল শহরে। ভাবলেন, বন্ধু চিত্রশিল্পীদের নিয়ে সেখানকার নির্জনতায় একটা আর্ট কলোনি চালু করবেন। ভূমধ্যসাগরীয় আরামদায়ক আবহাওয়া আর নয়নাভিরাম সিনারিও তাঁর আঁকাআঁকির রঙের জেল্লা খুলে দিল। দুই বছরের কম সময়ে দু’শরও বেশি ছবি আঁকলেন। স্টারি নাইট নিয়ে হাত পাকানোও এসময়ে। র়োন নদীতীর আর কাফে টেরাসের ওপর তারকাখচিত আকাশ নিয়ে দু’টো স্টারি নাইট এসময়েই আঁকা।

সব ভালই চলছিল। আর্লের অধিকাংশ বাসিন্দা বিদেশী লালচুলো ভিনসেন্টকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলেও দু’একটা বন্ধু ঠিকই জুটেছিল তাঁর, যার একজন পোস্টম্যান রুল্যাঁর ছবি এঁকে দিয়েছিলেন তিনি।

সমস্যার শুরু হলো যখন থিওর অনুরোধে পোল গোগ্যাঁ এসে হাজির হলেন ভ্যান গঘ়ের তথাকথিত আর্ট কলোনির দ্বিতীয় সদস্য হিসাবে। প্রথম কয়েকদিন ভালই কাটল, দু’জনে মিলে ঘুরে ঘুরে বেশ কিছু ছবি আঁকলেন। কিন্তু গোগ্যাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল ভ্যান গঘ়ের পুরোপুরি বিপরীত। দাম্ভিক তো ছিলেনই, পার়ির আরামদায়ক বিলাসী জীবন ফেলে আর্লে এসে ভিনসেন্টের সাথে গরীবী হালে জীবনযাপনও তাঁর মনঃপূত হলো না। ভিনসেন্টকে তাচ্ছিল্য করতেও তাঁর বাঁধলো না। ভিনসেন্টও সহজ পাত্র নন। গোগ্যাঁকে শুরুতে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখলেও শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করতে পারলেন না অতিরিক্ত সংবেদনশীল ভ্যান গঘ়। ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ভ্যান গঘ়ের মানসিক অবস্থারও অবনতি হওয়া শুরু করলো।

১৮৮৮র বড়দিনের দু’দিন আগে এক ঝড়ো রাত। ভিনসেন্ট আর পোলের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। ভিনসেন্ট ছুরি বের করে পোলকে শাসানো শুরু করলেন। পোল ভিনসেন্টের মুখের ওপর হয়ত বলে ফেললেন যে তিনি আর্লে আর এক দন্ডও থাকবেন না। এই জিনিসটারই ভয় করছিলেন যে ভ্যান গঘ়! যে গোগ্যাঁ তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন। তাঁর অন্যান্য সব ব্যর্থতার মত আর্ট কলোনির স্বপ্নটারও অকাল সমাধি হবে। হয়ত মনে মনে ভিনসেন্ট একাকীত্বেরই ভয়ে ছিলেন। তাঁর একমাত্র চাওয়া ছিল ভ্রাতৃতুল্য কোন চিত্রকর তাঁকে সঙ্গ দেবে, অনুপ্রেরণা দেবে, আর তাঁর আঁকা ছবি দেখে বুঝবে তাঁর মনের ভাষা।

এরপর ঠিক কি হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস কারো জানা নেই।কাটা বাম কানটা কাগজে মুড়ে ভ্যান গঘ় দিয়ে এসেছিলেন শহরের পতিতালয়ে এক মেয়ের হাতে। নতুন গবেষণায় বেরিয়েছে সে মেয়ে রেচেল দুশ্চরিত্রা ছিল না, ছিল কর্মচারী মাত্র। ভ্যান গঘ়ের সাথে বন্ধুত্ব ছিল তার। (বাজারে প্রচলিত আছে এক প্রস্টিটিউটকে প্রেম নিবেদন করে ছ্যাঁকা খেয়ে ভ্যান গঘ় কানকাটা হন, সেটা খুব সম্ভব সত্য নয়!)

এ ঘটনার পরে আর পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি ভ্যান গঘ়। থিও তাঁকে যথাসম্ভব সাহায্য করেন। কাছের সাঁরেমি শহরে এক পাগলা গারদে ভর্তি হন ভিনসেন্ট। নামে অ্যাসাইলাম হলেও জেলখানার থেকে খুব একটা তফাৎ ছিল না সেটার। চলাফেরার না হলেও আঁকাআঁকির স্বাধীনতা সৌভাগ্যক্রমে তাঁকে দেয়া হয়েছিল। এ সময়েই আধ ঘোরে আধ জাগরণে শেষ স্টারি নাইটটা আঁকেন তিনি। বিষণ্ণতা আর হ্যালুসিনেশনে ভুগতে ভুগতে আরো বেশ কিছু বিখ্যাত ছবি এসময়ে আঁকেন ভিনসেন্ট।

একটু সুস্থ বোধ করা শুরু করলে সাঁরেমি ছেড়ে চলে যান ওভ়ের়-স্যুর়-ওয়াজ় শহরে। পোল গাশে বলে এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের নাম শুনেছিলেন পিসারোর কাছ থেকে। সে ভদ্রলোক অনেক নামীদামী শিল্পীদের আপ্যায়ন করতেন, আর চিকিৎসা দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে তাঁদের সাহায্য করতেন। এখানে এসে ভ্যান গঘ় প্রায় সত্তরটা ছবি আঁকেন। ‘থ্যাচড কটেজেস বাই আ হিল’ বলে এখানে আঁকা অসমাপ্ত একটা কাজ — তিন গোয়েন্দার পুরনো শত্রু গল্পের কটেজ পেইন্টিংয়ের সাথে এর সন্দেহাতীত মিল।

প্রথম প্রথম ভাল বোধ করলেও মনে এতকালের যত ক্ষত নিয়ে এসেছিলেন ভ্যান গঘ়, ডাক্তার গাশের কাছে তার কোন প্রতিষেধক আসলে ছিল না। মলমের ক্ষণস্থায়ী প্রভাব কেটে যেতে ভ্যান গঘ় সম্ভবত আবার বিষণ্ণতা, একাকীত্বের ছোবলে দুর্বল হতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত ১৮৯০এর ২৭শে জুলাই রিভলবার দিয়ে নিজের হৃদয় বরাবর গুলি চালিয়ে দেন। বুলেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও রক্তক্ষরণের ফলে ধীরে ধীরে মৃত্যুশয্যায় ঢলে পড়েন ভিনসেন্ট। হয়ত স্টারি নাইটের সাইপ্রেস বেয়ে তাঁর আত্মা পৌঁছে যায় স্বর্গপিতার কাছে, শেষ শান্তির নীড়ে!

ভাই থিওও এরপর বেশিদিন বাঁচেননি! ভিনসেন্টের মৃত্যুর ছয় মাস পর ৩৩ বছর বয়সে তাঁরও ডাক চলে আসে। হয়ত তিনি ভিনসেন্টের নন, ভিনসেন্টই তাঁর খুঁটি ছিলেন। যত্ন করে বড়ভাইয়ের যে চিঠিপত্র রেখে দিয়েছিলেন থিও, তার থেকেই আমরা আজ ভিনসেন্টের ব্যক্তিগত জীবন আর মানসিক অবস্থার অনেক বিস্তারিত খুঁটিনাটি জানতে পারি।

ভিনসেন্ট কি রোগে ভুগেছিলেন সে নিয়ে আজও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। অনেক রকম থিওরি আছে, যার শুরু হ্য়ত বাইপোলার ডিজ়অর্ডার দিয়ে, আর শেষ টেম্পোরাল লোব এপিলেপ্সি দিয়ে। ডন ম্যাকলীনের গানের মত আমার ভাবতে ইচ্ছে করে ভ্যান গঘ় আসলে অসুস্থ ছিলেন না। তাঁর মানসপটে পৃথিবী ও মানুষ ছিল অন্যরকম, অনেকটা তাঁর ছবির প্যালেটের মত। তাঁর সাথে অনেকেরই খাপ খায়নি, ঝগড়া বেঁধেছে। কিন্তু খেটে খাওয়া দুর্ভাগা মানুষের পাশে দাঁড়াতে তো তাঁর কখনো বাঁধেনি। তাঁর প্রথাবিরোধী স্বভাব আর বিদেশী পরিচয়কে অনেক স্বদেশী, ফরাসী সন্দেহের চোখে দেখেছে। তারপরও তো নানা শহরে-গ্রামে তাঁর হাতে গোনা হলেও বন্ধু জুটেছে। ভ্যান গঘ়ের কোন মানসিক বিকৃতি ছিল না, তাঁর মন ছিল পরিষ্কার। সেখানে মানুষের আচার, ধর্ম, ধন, সামাজিক অবস্থান তাদের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। গরিমা-লালসা-ছলনার স্থান নেই সেখানে। সেখানে ঈশ্বর পথহারা দুর্ভাগাদের নিশ্চিত শেষ আশ্রয়! শিল্পের অনুপ্রেরণা সেখানে খ্যাতি কিংবা অর্থ নয়, বরং অনন্যোপায়ের মর্মপ্রকাশের একমাত্র উপায়! আর সেই নিষ্কলুষ চিত্তেই পরিপূর্ণরূপে অনুভব করা সম্ভব নীল-হলদে স্টারি নাইটের মাহাত্ম্য!

স্টারি নাইট – ১

ছোটবেলায় সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা সিরিজের বই গোগ্রাসে গিলতাম। প্রথম পড়েছিলাম কাকাতুয়া রহস্য। পরের দিকে পুরনো শত্রু। হয়ত সমবয়সী কারো কারো মনে পড়বে দু’টোরই কাহিনী মূল্যবান চিত্রকর্ম নিয়ে।

পুরনো শত্রুতে একই কটেজের কুড়িটি পারসপেক্টিভ থেকে আঁকা ছবি দিয়ে রহস্যের শুরু। আর রহস্যাবৃত যে চিত্রকরের বেগুনী পাহাড় আর নীল ঘোড়ার অদ্ভূত মাস্টারপীস দিয়ে কাহিনীর শেষ, তার অনুপ্রেরণা ভ্যান গঘ় ছাড়া আর কেউ নন! (ডাচ ভাষায় নামের উচ্চারণটা কিন্তু যথেষ্ট কঠিন — ফান ঘ়ুফ়!)

ভ্যান গঘ়ও সিরিজ়ে ছবি আঁকতেন। এদের মধ্যে সবচে’ পরিচিত হলো বিভিন্নভাবে আঁকা ফ্লাওয়ারভাজ়ে সাজানো সূর্যমুখীর সিরিজ়টা। তিন গোয়েন্দা কাহিনীর কল্পিত আর্টিস্ট ফ্রাঁসোয়া ফরতুনারের মত তাঁরও কয়েকটি চিত্রকর্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমার আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। ভ্যান গঘ়ও শারীরিক আর মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা।

কিন্তু স্টারি নাইট নামে গানটায় ডন ম্যাকলীন ভ্যান গঘ়ের বিভিন্ন চিত্রকর্মের বর্ণনা দেয়ার সাথে সাথে তাঁর মননশীলতাকে খুবই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। গানের কথায় বুঝবেন যে এই প্রতিভাবান শিল্পী মানসিক রোগী মোটেও ছিলেন না! অনেক সংবেদনশীল ছিলেন ঠিকই, কিন্তু কপালের ফেরে একাধিক প্রিয়জনের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। ভাই থিও আর বোন উইল বাদে পরিবারের আর সবাই তাঁকে পাগল ঠাউরাতো। ভ্রাতৃতুল্য চিত্রকর ও চিত্ররসিকদের কাছেও যে সম্মান-স্বীকৃতি আশা করেছিলেন, জীবদ্দশায় তা পাননি। নিজের কাছে তিনি ছিলেন ব্যর্থতার চূড়ান্ত। তারপরও তাঁর রংতুলি এঁকে গেছে সমানে, কারণ এই একটা জিনিসেই তিনি পারতেন নিজের মনের অবস্থা সুক্ষ্ণভাবে তুলে ধরতে।

ভ্যান গঘ় যে ধারার শিল্পী ছিলেন তাকে বলে পোস্ট-ইমপ্রেশনিজ়ম। তাঁর আগের প্রজন্মের ইমপ্রেশনিস্টরা ছিলেন প্রকৃতি ও মানুষের দক্ষ পর্যবেক্ষক। সুচিকন তুলির সাহায্যে তেলরঙে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন যেকোন দৃশ্যকে। তাদের মনোযোগ ছিল নিখুঁত প্রতিলিপি তৈরিতে। এর সবচে’ বড় উদাহরণ ক্লোদ মোনের ওয়াটার লিলিজ় সিরিজ়, নিউ ইয়র্কের মিউজ়িয়াম অফ মডার্ন আর্টে (মোমা) দেখেছি তার কয়েকটা।

পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টরা ছিলেন সনাতন ইমপ্রেশিনজ়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুরোভাগে। তাঁরা বললেন, নিখুঁত প্রতিলিপি দেখতে ভাল, কিন্তু মানুষের মন আর আবেগকে সমুচিত নাড়া দেয় না। শিল্পীর মানসপটে একটা দৃশ্য কী অনুভূতি জাগ্রত করেছিল তা আঁকতে হলে চাই রং আর কাঠামোর পরিবর্তন। তাঁরা মোটা তুলি ধরলেন, বাঁছাই করলেন এমনসব রংয়ের কম্বিনেশন, যেগুলি সনাতনরা দেখে সংয়ের পোশাক বলে গালি দিবেন। কিন্তু তাঁদের সাহসী রংতুলিতে যেসব ছবি ফুঁটে উঠলো, সময় লাগলেও রসিকরা বোঝা শুরু করলেন সেগুলির মর্যাদা। ততদিনে ভ্যান গঘ় মনের বোঝা সইতে না পেরে ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছেন।

পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট আর্টের একটা সুন্দর উদাহরণ ভ্যান গঘ়ের স্টারি নাইট বলে সাঁ-রেমি শহরের রাতের দৃশ্যের ছবি। মোমাতে এটি সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এর একটা প্রতিলিপিও পোস্টার আকারে ঝুলছে আমার ঘরে। এতে যে দৃশ্য ভ্যান গঘ় এঁকেছেন, সেটা কিন্তু তাঁর পাগলা গারদের জানালা থেকে দেখা। ১৮৮৮এর কানকাটার ঘটনার পরের বছর ১৮ই জুন তিনি এটি আঁকা শেষ করেন। (ঘটনাচক্রে তার ঠিক ৯০ বছর পরে আমার জন্ম!)

স্টারি নাইটের দৃশ্যটি পার্থিব নয়। কোন তারাজ্বলা রাতে এরকম প্রুশিয়ান ব্লু আকাশে ইন্ডিয়ান ইয়েলো রঙের তারা, সেগুলি আবার বিশাল আকারের — এসব দেখতে পাবেন না। তার মাঝখানে আবার একটা ঘূর্ণাবর্তের ছবি।

কিন্তু চোখটা বন্ধ করে ভাবুন আপনি দক্ষিণ ফ্রান্সে। যদি সেথায় না গিয়ে থাকেন, ভাবুন আপনি উত্তরবঙ্গের কোন মফস্বল শহরে, যেখানে ঢাকার কংক্রীট-জঙ্গল নেই। তারাভরা পরিষ্কার আকাশ। ফ্রান্সের গ্রীষ্মকাল, হয়ত আমাদের শরৎ বা হেমন্ত। আরামদায়ক আবহাওয়া, ঝিরঝিরে বাতাস। মনটাকে ছেড়ে দিন। আপনার কল্পনার জগতে যে অনুভূতিটা আসবে, স্টারি নাইট ঠিক সেটাই তুলে ধরেছে। ঘূর্ণাবর্তটা হতে পারে দক্ষিণ ফ্রান্সের ঝড়ো মিস্ত্রাল বায়ুর চিত্ররূপ, আবার হতে পারে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি। আপনি ভেবে নিতে পারেন অকাল কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ। কোনটা যে কি বস্তু সেটা জরুরী নয়, আপনার মনে যে অনুভবটা আসছে ছবিটি দেখার পরে, সেটাকে যথোপযুক্ত প্রাণ দেয়াটাই ভ্যান গঘ়ের অভিপ্রায়!

এর মধ্যেও চিত্রশিল্পের বেসিক নিয়মগুলি মেনেছেন ভ্যান গঘ়। সাইপ্রেস বৃক্ষের ঊর্ধ্বমুখী অবয়বকে ব্যালেন্স করেছেন ছোট্ট আর্ল শহরের ভূসমান্তরাল বিস্তৃতি দিয়ে। শহরের চার্চের চূড়াটাও বাস্তবের আর্লের থেকে আলাদা, সেটার শৈলী ভ্যান গঘ়ের কৈশোরের বাসস্থান নেদারল্যান্ডের ধাঁচে। অর্থাৎ চিত্রকর নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত।

কিছুটা আধ্যাত্মিক সিম্বোলিজ়মও আছে। সাইপ্রেসকে মেডিটেরেনিয়ান কালচারে ধরা হয় পরকালের প্রতীক হিসাবে। আর হলুদ রং হলো জীবনের প্রতীক। সাইপ্রেস গাছকে বাহন বানিয়ে ভ্যান গঘ় যেন যেতে চাইছেন স্বর্গালয়ে। তাঁকে বুঝবার, তাঁর আত্মাকে শান্তি দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র স্বর্গপিতারই আছে।

হলুদ আর প্রুশিয়ান ব্লুর কম্বিনেশনটা কিন্তু অনেক প্রাচীন। প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন শিল্পকর্মে লাপিস-লাজ়ুলি নামের নীলরত্ন আর হলদে সোনার বিস্তর ব্যবহার হত। ফারাও তুতানখামেনের মমিমুখোশ তার সবচে বিখ্যাত উদাহরণ। মধ্যযুগে যীশুখ্রীষ্টের বাইজ়্যান্টাইন চিত্রেও এধরনের কালার কম্বিনেশন রয়েছে।

জীবদ্দশায় কেন বিখ্যাত হননি ভ্যান গঘ়? তার মূল কারণ, চিত্রকর্ম আঁকার লক্ষ্য তাঁর কাছে অর্থ উপার্জন কিংবা খ্যাতির প্রলোভন ছিল না। তিনি আঁকতেন কারণ তাঁর কাছে সেটাই ছিল তাঁর মনের অনুভূতি যোগাযোগের উপযোগ্য মাধ্যম। তাঁর টেকনিক-কম্পোজ়িশন কাউকে খুশি করার জন্যে নয়, নিজের আত্মতুষ্টির জন্যে। সেকারণেই বোধহয় এখন তাঁর চিত্রকর্ম সমসাময়িক পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টদের তুলনায় অনেক বেশি দরে নিলামে বিক্রি হয়।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!