রূপকথার শহর জাফা

Featured Video Play Icon

এক বছর আগের সূর্যাস্তের স্মৃতি — ইজরাইলের তেল আবিব শহরের নিকটস্থ পুরনো জাফা শহরতলীতে। পর্যটকদের জন্যে পাথরে তৈরি পুরনো সব ঘরবাড়ি, দুই তিন তলা সিঁড়ি বেয়ে চলে যাওয়া অলিগলি সব অক্ষত রাখা হয়েছে।

সারি বেঁধে তিন চারটে কামান সমুদ্রের দিকে মুখ করে রাখা। অটোমান তু্র্কী আমলের সিটাডেলের প্রতিরক্ষাব্যূহের অংশ। ১৭৯৯ সালে স্বয়ং নাপোলেওনের জাহাজবহর সে প্রতিরক্ষাভেদ করে জাফা শহরে সফল আক্রমণ চালায়।

ঊনবিংশ শতকে স্থানীয় ও নবাগত অভিবাসী ইহুদীরা যখন অনতিদূরে তেলআবিব শহরের গোড়াপত্তন করছে, তখন জাফা নগরী কমপক্ষে ৩৭০০ বছরের পুরনো। ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী জাফার বন্দর থেকেই ইউনুস নবী — বাইবেলের জোনাহ — সাগরপাড়ি দিতে গিয়ে বৃহৎকায় মাছের পেটস্থ হন।

মিশরের নিউ কিংডম আমলেও জাফা ছিল কৌশলগত একটি অবস্থান। সেসময়ের জাফাকে ঘিরে একটি ঘটনাই হয়তবা রূপকথার পাতায় স্থান করে নিয়েছে। আরব্যরজনীর আলিবাবা চল্লিশ চোরের গল্পটি। খ্রীষ্টের জন্মের ১২০০ বছর আগে ফারাও তৃতীয় তুথমোসের শক্তিমান সেনাপতি জেহুতি ইজরাইল-কানানের স্বাধীন নগররাজ্যগুলোর ওপর সাম্রাজ্য কায়েম করেন। তখনো ইহুদী রাজ্য ইজরাইল-জুদার গোড়াপত্তন হয়নি। মিশরীদের তদকালীন শত্রু ছিল উত্তরে তুরস্কের হিট্টাইটরা। ইজরাইল-প্যালেস্টাইনের নগররাজ্যগুলি দুই সাম্রাজ্যের মাঝে এক রকম চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যায়।

জাফা দখলের জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন জেহুতি। নগরপতিকে নিজের ক্যাম্পে দাওয়াত করে নিয়ে এসে আটকে ফেলেন। তারপর দু’শ সৈন্যকে গমের বস্তার মত সাজিয়ে গাধার পিঠে চাপিয়ে দুর্গের দরজায় পাঠানো হয়। ঘোষণা করা হয়, রাজ্যপালের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন জেহুতি। আর নগরবাসীদের উপঢৌকন পাঠানো হয়েছে গাধায় করে। উল্লসিত জনগণ দরজা খুলে গাধার কাফেলাকে বরণ করে নেয়ার পর রূপকথার চিচিঙ ফাঁক!

এ গল্প রয়েছে মিশরে প্রাপ্ত বিখ্যাত হ্যারিস প্যাপিরাস ৫০০তে, যেটি এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। প্রাক-আধুনিক যুগেই এই প্যাপিরাসসহ অনেক বস্তু মিশরীয় কোন না কোন রাখাল খুঁজে পেয়ে বিক্রি করে দেয় ইউরোপীয় ধনাঢ্য সংগ্রহকারীর কাছে।

বর্তমান জাফায় রয়েছে অটোমান যুগের বহু নিদর্শন। কিছুই ধ্বংস করা হয়নি। একটা ক্লক টাওয়ার। লাইটহাউজ, জেলখানা — সেটি এখন ফাইভস্টার হোটেল। তিনটা মসজিদঃ মাহমুদিয়া মসজিদ, আল বাহর মসজিদ, আজামি মসজিদ। সবগুলি সাগরতীরে প্রাইম প্রপার্টিতে। আরো আছে সেন্ট পিটার্স ক্যাথলিক চার্চ, সেন্ট অ্যান্টনিস ম্যারোনাইট চার্চসহ অগণিত ছোটবড় গীর্জা-ক্যাথেড্রাল। এগুলিতে উপাসনা করে মূলত আরব ফিলিস্তিনীরাই। বিশেষত লেবাননী আরবরা ম্যারনাইট তরিকার খ্রীষ্টান। এতগুলি চার্চ থাকার কারণ, যীশু খ্রীষ্টের অন্যতম শিষ্য সেন্ট পিটার নাকি এখানে মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করার মাজেজা ঘটিয়েছিলেন।

রূপকথা আর মাজেজার শেষ এখানেই নয়। বন্দর থেকে সামান্য দূরে সাগরের বুকে জেগে থাকা একটা বড় পাথরের নাম অ্যান্ড্রমেডা রক। গ্রীক মিথে জাফার রাজা সিফিয়াস, তার কন্যা অ্যান্ড্রমিডা — যার নামে একটা গ্যালাক্সির নাম। আর তার বউ ক্যাসিওপিয়া — যার নামে একটি তারকামন্ডলের নাম। সিফিয়াস গর্ব করত এ দুজন নাকি জলকন্যাদের থেকেও রূপবতী। জলকন্যারা তাদের বাপ দেবতা পসাইডনের কাছে বিচার দিলে পসাইডন বিশাল এক সমুদ্রদানব পাঠিয়ে জাফাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হন। তখন অনন্যোপায় সিফিয়াস শহরবাসীদের সাথে ষড় করে ঠিক করেন পসাইডনের কাছে বলি দিতে হবে অ্যান্ড্রমিডাকে। তারপর এই পাথরেই শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয় অ্যান্ড্রমিডাকে। তাকে দানবের হাত থেকে বাঁচায় পার্সিয়াস — গ্রীক মিথের অন্যতম হিরো।

রূপকথার এ নগরে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে এসব খেলে গেল মাথার ভেতরে। রোমহর্ষক ব্যাপার! আধুনিক কালে ফিরিয়ে আনল মোটে চৌদ্দশ বছরের পুরনো আযানের ধ্বনি। মাগরিবের পরে দেখা গেল বহু আরব মুসলিম নরনারী — অনেকে আবায়া পরে — সাগরতীরে হাওয়া খাচ্ছে, সেলফি তুলছে। এসইউভির নাম্বারপ্লেট ওয়েস্ট ব্যাংকের। কে বলবে মোটে এক ঘন্টার রাস্তার ওপারে পবিত্র ভূমি নিয়ে এরা এবং এদের প্রতিবেশীরা বাস করছে অনিশ্চয়তার অন্য এক জগতে?

রোজাভা

ইরাকী কুর্দিস্তান যেমন মার্কিন কোয়ালিশনের যুদ্ধের কারণে উপকৃত হয়েছে, তেমনি আরেকটি দেশের কুর্দীরাও সেখানকার গৃহযুদ্ধ থেকে লাভবান হয়েছে। সে দেশটি সিরিয়া। সেখানে মার্কিনরা তেমন কোন বড় মাপের হস্তক্ষেপ করেনি। তারপরও কুর্দীরা নিজেদের একটা স্বায়ত্ত্বশাসিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে।

সিরিয়ায় কুর্দী জনসংখ্যা খুব বেশি নয়। অধিকাংশ বিংশ শতকের শুরুতে তুরস্কের কুর্দীনিধন অভিযান থেকে পালিয়ে আসা অভিবাসী। সিরিয়ার উত্তরের স্বল্প জনঘনত্বের পাহাড়ী এলাকাগুলিতে বসবাসের অনুমতি তারা পায় ফরাসী ম্যান্ডেট সরকারের কাছ থেকে। স্বাধীনতার পরিবর্তে ফরাসীদের অধীনে স্বায়ত্ত্বশাসনের আকাংক্ষা ছিল তাদের বেশি, আলাউয়ীদের মতই। কারণ সিরিয়ার স্বাধীনতা মানে সংখ্যাগুরু আরবদের লাথি-গুঁতো খাওয়া!

সিরিয়া স্বায়ত্ত্বশাসিত কুর্দী অঞ্চল রোজাভার পতাকা ও প্রতীক
কুর্দী নারী মিলিশিয়া ওয়াই,পি,জের পতাকা হাতে কুর্দী মহিলা
২০১৯ সালে সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণের চিত্র

সিরিয়ায় কুর্দী ভাষা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি নেই। ১৯৬২ সালে বাথিস্ট ক্যুএর পর দেশটির কুর্দী জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দেড় লাখ মানুষকে নাগরিকতাবঞ্চিত করা হয়। কারণ তারা নাকি তুরস্ক থেকে আগত “বিদেশী।” ফরাসী ঔপনিবেশিক প্রশাসনের দেয়া বৈধ কাগজ ছিল অগ্রহণযোগ্য। এর ফলে বহু রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়। শিক্ষা, রাজনীতি, সম্পত্তির মালিকানা, পাসপোর্টের আবেদন — ইত্যাদি সব কিছুই জটিল হয়ে যায় তাদের জন্যে। তাদের “পতিত জমি” বেহাত করে সুন্নী আরব ও অ্যাসিরীয় খ্রীষ্টানরা।

তুরস্কের সীমানা থেকেও কুর্দীদের উচ্ছেদ করে সেখানে একটি “আরব বেল্ট” তৈরির চেষ্টা করে বাথিস্ট সরকার। অজুহাত যে সীমান্তে শত্রুভাবাপন্ন “বিদেশী” থাকাটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ভাল নয়। বহু স্থানের নাম কুর্দী থেকে আরবী করা হয়। জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করা হয় সাধারণ কৃষকদেরকে। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে নিষেধাজ্ঞা আসে নবজাতকের কুর্দী নামকরণের ওপর। জনসমক্ষে কুর্দী ভাষা ব্যবহার আর প্রাইভেট স্কুল পরিচালনাও হয় নিষিদ্ধ।

২০১২ সালে সিরিয়ার কামিশলি শহরে কুর্দী সমাবেশ

আশির দশকেও সিরিয়ায় কুর্দী বই, ক্যাসেট ইত্যাদি প্রকাশ ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিয়ের অনুষ্ঠানে কুর্দী ঐতিহ্যবাহী পোশাকপরিধান বা গান গাওয়া ছিল নিষেধ। ১৯৮৬ সালে কুর্দী নববর্ষ নওরোজের জনসমাবেশে এমন নিষেধাজ্ঞা না মানার কারণে সিরীয় পুলিশ গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করে।

ইরাক যুদ্ধ শুরুর পরপরই ২০০৪ সালে কামিশলি শহরে কুর্দী ও আরবদের মধ্যে বুশ বনাম সাদ্দামকে সমর্থন নিয়ে দাঙ্গা বেঁধে যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে আবারও রক্ত দিয়ে অসম মূল্য দিতে হয় কুর্দী সাধারণ মানুষকে। ২০১১ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে কুর্দী নেতাদের শুরুতেই গুপ্তহত্যার মাধ্যমে নিকেশ করে আসাদবাহিনী। কিন্তু দেশের অন্যত্র আরো ভয়াবহ বিদ্রোহ ঠেকাতে কুর্দী অঞ্চল থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়ে আসতে হ্য় বাশার আসাদকে।

সেই শূন্যতার সুযোগেই উত্তর সিরিয়ার বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় কুর্দী ন্যাশনাল কাউন্সিল। আমুদা-কামিশলি-আফরিন-কোবানি প্রভৃতি শহরে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্থাপিত হয় তাদের নব্যপ্রতিষ্ঠিত সামরিক বাহিনী ওয়াই,পি,জি’র সহায়তায়। এই ডি ফ্যাক্টো স্বায়ত্ত্বশাসিত কুর্দী অঞ্চলের নাম “রোজাভা।”

নিজের লেজিটিমেসি ধরে রাখার জন্যেই হয়ত বাশার আসাদ রোজাভায় শক্ত হাতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেনি। ২০১১ সাল থেকে কুর্দীদের পাসর্পোট ও নাগরকিত্বের সনদও দিতে শুরু করে তার সরকার। অন্যান্য শত্রুর থেকে কুর্দীরা তার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাই রোজাভার বেশ কিছু শহরে আসাদ সরকারের সাথে সহাবস্থান করতে সংকোচ করছে না কুর্দী প্রশাসন।

২০১৪ সালে আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুর্দী স্নাইপার, কোবানি
বিধ্বস্ত কোবানি শহরে ওয়াই পিজি ও ওয়াই পিজে মিলিশিয়া
কোবানি শহরে আইসিসের আক্রমণ চলাকালে সীমান্তের অপর পাশে তুরস্কে আশ্রয় নেয় কোবানির অধিকাংশ সাধারণ কুর্দী জনগণ

২০১৪ সালে কোবানি শহরের কুর্দী অবস্থানের চারদিকে অবরোধ বসায় আইসিস। শহরটির স্বল্পসংখ্যক ওয়াই,পি,জি সদস্য রিইনফোর্সমেন্ট না আসা পর্যন্ত তাদের অবস্থান ধরে রাখে। রক্ষা করে শহরটির সিভিলিয়ানদের। শেষ পর্যন্ত কুর্দী পাল্টা আক্রমণে আইসিস পিছু হটতে বাধ্য হয়। তাদের ধাওয়া দিয়ে রাক্কা পর্যন্ত দখল করে নেয় ওয়াই,পি,জি। এ কাজে তাদের সাথে শরিক ছিল ওয়াই,পি,জে নামে নারীযোদ্ধাদের মিলিশিয়াও। পুরো সিরিয়াতে যদি কোন প্রশিক্ষিত ডিসিপ্লিনড ফোর্স থেকে থাকে তো সে এই ওয়াই,পি,জি, এটা মার্কিন ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের মন্তব্য। এয়ারস্ট্রাইকের মাধ্যমে কোবানির অবরোধ ভাঙতে তাদের সহায়তা করে মার্কিন বিমানবাহিনী।

আইসিসের পতনের পর সিরিয়ার আরো বিশাল এলাকা আসে রোজাভার নিয়ন্ত্রণে। শুধু কুর্দী নয়, আরব, অ্যাসিরীয়, ইয়াজিদী প্রভৃতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা করতে হয় তাদের। রোজাভার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় অটোনমাস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ নর্থ এন্ড ঈস্ট সিরিয়া (আনেস)।

বহুজাতিক এই স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চলে লিবার্টারিয়ান সোশালিজম হচ্ছে আদর্শ। প্রতিটা শহরের স্থানীয় মানুষ স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে। আনেস কাগজেকলমে কুর্দী জাতীয়তাবাদ সমর্থন করে না, আর সিরিয়ার মাঝেই ফেডারেল সিস্টেমে স্বায়ত্ত্বশাসন চায়। অর্থাৎ ইরাকি কুর্দিস্তানের মত। ইরাকী কুর্দীদের মত এরা রক্ষণশীল না হলেও দজলা নদের ওপারের বন্ধুদের থেকে রসদ সরবরাহ তারা পায়।

ইতালির বোলোনা শহরে কোবানিতে কুর্দী বাহিনীর সমর্থনে গ্রাফিটি
২০১৪ সালে কোবানিতে আইসিস আক্রমণের বিরুদ্ধে তুরস্কের সেনাবাহিনী কোন হস্তক্ষেপ না করায় তুরস্কের দিয়ারবাকির শহরে কুর্দীরা সহিংস বিক্ষোভ করে

ইরাকের মত সিরিয়াতে আরেকটি স্বায়ত্ত্বশাসিত কুর্দিস্তান হয়ে যার বাড়া ভাতে ছাঁই ঢেলেছে সে হল তুরস্ক। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্বয়ং মার্কিনদের দোষারোপ করেন “ভুল ফরেন পলিসির” জন্য। এটা যতটা না ইরাক যুদ্ধের সাথে জড়িত, তার থেকে বেশি তুরস্কের কুর্দী সমস্যাটিকে বাড়িয়ে দেবার জন্য। ওদিকে সিরিয়ার কুর্দীরা আইসিস বা আসাদকে যতটা শত্রু ভাবে, তার থেকে অনেক বেশি ভাবে তুরস্ক ও “সুলতান” এরদোয়ানকে। কারণ ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত একাধিক তুর্কী সামরিক অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে অগণিত সাধারণ সিরিয়ান কুর্দী।

গত পোস্টে বলেছি ইরাকের বাথিস্ট সরকার কি পরিমাণ অত্যাচার কুর্দীদের ওপর করেছে। আরেকটি যে দেশে দশকের পর দশক এমন অত্যাচার চলেছে সেটি তুরস্ক। ১৯২৩ সালে ওসমানী খেলাফতের সমাপ্তি হয়। সে জায়গায় কামাল আতাতুর্ক যে আদর্শের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক তুরস্কের গোড়াপত্তন করেন সেটা তুর্কী জাতীয়তাবাদ। তাতে তুর্কী ব্যতীত অন্য জাতিসত্তার পরিচয়ের স্থান ছিল না। আগে অন্তত যে মুসলিম পরিচয়ের কারণে “খলীফা” তার কুর্দী প্রজাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম ছিলেন, সেটি রাতারাতি বিলুপ্ত হল। যে মিল্লি সিস্টেমের মাধ্যমে বিভিন্ন উপজাতি ও ধর্মের মানুষকে নিজেদের সমাজে নিজেদের অনুশাসন অনুযায়ী চলার স্বাধীনতা দেয়া ছিল, তার জায়গা নিল কেন্দ্রীয় সরকারের আরোপিত সেক্যুলার সিস্টেম।

কামালিস্ট তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন শেখ সাঈদ নামে এই সুফী নেতা, ফাঁসিতে ঝোলানোর আগের চিত্র
বিংশ শতকের শুরুর ভাগে স্বঘোষিত তিনটা কুর্দীপ্রধান রিপাবলিকের অবস্থান
দেরসিম গণহত্যার অভিযানের সময়ে কুর্দী শিশুদের “উদ্ধার” করেছে তুর্কী সেনাদল, পরে এদের অনেকে নিহত হয়, অনেকে তুর্কী বোর্ডিং স্কুলে গিয়ে কুর্দী পরিচয় হারিয়ে ফেলে, ১৯৩৭

কামাল আতাতুর্কের প্রগতিশীল কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে একের পর এক মাদ্রাসা, সুফী দরগা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কুর্দী সংবাদপত্র প্রভৃতি বন্ধ হতে শুরু করে। তার প্রতিক্রিয়ায় ১৯২৫এ সুফী ঘরানার একটি কুর্দী বিদ্রোহ হয়। সেটিকে কঠোর হাতে দমন করে তুর্কী বাহিনী। স্বল্প কয়েকটি উপজাতির বাইরে অবশ্য এ আন্দোলনের নেতার গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। যুদ্ধবিমান ও মেশিন গানের সাহায্যে তার মধ্যযুগীয় সৈন্যদের কচুকাটা করে তুর্কীরা। বিদ্রোহের পতনের পর হাজারে হাজারে কুর্দীদের বিচারের প্রহসনে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

১৯২৭ সালে আরো বিশাল আকারে বিদ্রোহের সূচনা করেন আরেক নেতা ইহসান নুরী, তার সমর্থনে ছিল খয়বুন নামে কুর্দী জাতীয়তাবাদী একটি দল। আগের ধর্মীয়-উপজাতীয় মোটিভটাকে ধর্ম ও জাতিনিরপেক্ষ রূপ দেয়ায় তাদের সমর্থন আরো জোরালো হয়। “রিপাবলিক অফ আরারাত” নামে একটি স্বঘোষিত কুর্দী দেশ তৈরি হয় দক্ষিণপূর্ব তুরস্কে। আগেরবারের থেকে বেশি প্রখরতায় এদের ওপর বিমানহামলা চালানো হয়। মোস্তাফা কামালের মেয়ে সাবিহা গুকচেন স্বয়ং ফাইটার থেকে বোমানিক্ষেপ করে এসকল “দস্যুর” ওপর। ১৯৩০ সালে এ বিদ্রোহের সমাপ্তি হয়।

রিপাবলিক অফ আরারাতের ওপর বোমাবর্ষণের আগে বৈমানিক দলসহ সাবিহা গুকচেন, ১৯৩০
তুরস্কের কুর্দীনিধন নীতির বিরুদ্ধে জওহরলাল নেহরুর বক্তব্য

এরপর ১৯৩৭এ দেরসিম (বর্তমান তুঞ্জেলি) প্রদেশের সীমান্তবাসী কুর্দীদের সিরিয়ার মত “তুর্কীকরণের” প্রচেষ্টা চলে। সেসব স্থানে কুর্দীদের সরিয়ে কসোভার আলবেনিয়ান ও বসনিয়ানদেরকে পুনর্বাসন করা হয়। কুর্দী শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে তাদের তুর্কী নাম দিয়ে তুর্কী শিখিয়ে কুর্দী পরিচয় বিলোপের চেষ্টা চলে। সেখানে যে পরিমাণ হত্যাযজ্ঞ চলে, তা আর্মেনি গণহত্যাকেও হার মানায়। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আর্মেনী গণহত্যা স্বীকার না করলেও ২০১১ সালে দেরসিম গণহত্যার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।

ষাটের দশক পর্যন্ত দক্ষিণপূর্ব তুরস্ক ছিল বিদেশীদের জন্য অফ লিমিট। কারণ সে অঞ্চলে সামরিক শাসন জারি ছিল। দমবন্ধকরা একটা পরিস্থিতি। ত্রিশের দশক থেকেই কুর্দী নামকরণ, ভাষা, উপকথা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। ডিকশনারি থেকেও কুর্দ-কুর্দিশ-কুর্দিস্তান শব্দগুলি এক্সপাঞ্জ! তুর্কী নেতারা কুর্দীদের সম্বোধন করত “মাউন্টেন টার্ক” অর্থাৎ পাহাড়ী তুর্কী নামে। সোজা কথায়, কুর্দী বলে কোন কিছু নেই, ছিল না — থাকবে না।

অধুনা তুরস্কে কুর্দী প্রদেশগুলির মাথাপিছু জিডিপি সবচে কম
দক্ষিণপূর্ব তুরস্কের একটি গ্রামে পিকেকে ও তুর্কী বাহিনীর সংঘর্ষে বিধ্বস্ত সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

এ ধরনের পরিস্থিতিতে নেটো সদস্য তুরস্কের মধ্যে গন্ডগোল পাকানোর মালমশলা হিসাবে কুর্দী জননেতৃত্ব সোভিয়েতের জন্য রেডি হয়ে বসে ছিল। সত্তরের দশকে তুরস্কে অতিবাম অতিডান দুই দলের মধ্যে ভয়াবহ রকমের সড়কযুদ্ধ চলত। এ পটভূমিতে আব্দুল্লাহ ওজালান নামে অর্ধ-কুর্দী এক ইউনিভার্সিটি ড্রপআউট শুরু করেন তার কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে দলটি। প্রথম প্রথম তাদের লক্ষ্য ছিল কুর্দীদের সমাধিকারের জন্য লড়াই। পরে সেটা হয়ে যায় সমাজতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠা। বলা বাহুল্য, তার বামপন্থী রাজনীতি সকল কুর্দীকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়।

তবে ১৯৮০র তুর্কী সামরিক অভ্যুত্থানের পর পিকেকে’র সুযোগ আসে আবেদন বৃদ্ধির। সামরিক জান্তার ধরপাকড় থেকে বাঁচতে কুর্দী তো বটেই বহু তুর্কী লেখক-সাহিত্যিক-গায়কও ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমায়। এ শূন্যস্থানে পিকেকে সামরিক বাহিনীর ওপর চোরাগোপ্তা সন্ত্রাসী হামলা করে নিজেদের নেতৃত্বের একটা স্থান তৈরি করে নেয়। এমন না যে তারা ধোয়া তুলসী পাতা, কুর্দী বহু ল্যান্ডওনার আর উপজাতীয় নেতারাও তাদের জিঘাংসার শিকার হয়। পিকেকের চোখে এরা ছিল রাজাকার, শ্রেণীশত্রু।

পিকেকে নেতা আবদুল্লাহ ওজালানকে গ্রেপ্তার করে তুরস্কে নিয়ে যাবার সময়, ১৯৯৯
পিকেকের আক্রমণে নিহত তুর্কী সৈন্যের কফিনের সামনে তার বাবা, ২০১৭
২০২২এ ইস্তাম্বুলে বোমাহামলার বদলা নিতে তুর্কী বিমানবাহিনী সিরিয়ার কুর্দী এলাকায় হামলা চালালে শিশুসহ একাধিক সাধারণ কুর্দী নিহত হয়

১৯৮৪ সালে পিকেকের শুরু করা ইনসার্জেন্সিতে এ পর্যন্ত পয়ত্রিশ হাজারের মত তুর্কী মানুষ মারা গেছে যাদের সিংহভাগ কুর্দী সাধারণ নাগরিক। বহু সন্ত্রাসবাদী হামলা চলেছে তুরস্ক-ইস্তাম্বুলের ট্রেন-বাস টার্মিনাল, এয়ারপোর্ট, বাজার, ট্যুরিস্ট স্পটে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধ ছিল পিকেকে বনাম তুরস্কের বিবাদের পটভূমি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তাই তখন থেকেই পিকেকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে স্বীকৃত। আয়রন কার্টেন ধ্বসে পড়তে শুরু করলে তুরস্ক ধীরে ধীরে কুর্দী ভাষা-সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে শুরু করে। রাষ্ট্রপতি তুরগুত ওজালের সাথে একটা শান্তি আলোচনা শুরু হলেও তার অকালমৃত্যুতে আবার ছক উল্টে যায়।

১৯৯৯ সালে মোসাদ স্টাইলে কেনিয়া থেকে আব্দু্ল্লাহ ওজালানকে ধরে নিয়ে আসে তুর্কী গোয়েন্দাবাহিনী এম,আই,টি। তখন প্রথম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পিকেকে। তারপরও থেমে থেমে এখনো সংঘাত চলছে। পিকেকে পালিয়ে ইরাকী কুর্দিস্তানের দুর্গম কান্দিল পর্বতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে প্রায়শই ইরাকী কুর্দিস্তানের সরকার পিকেকে উচ্ছেদে তুর্কীদের সহায়তা করে।

পিকেকে তুরস্কের কুর্দী সংগ্রামের হেডলাইন কেড়ে নিলেও আসলে বহু ঘরানার রাজনীতি প্রচলিত আছে সেখানের কুর্দীদের মাঝে। তবে ১৯৯০ পর্যন্ত কুর্দী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সেখানে ছিল নিষিদ্ধ। প্রায়ই কোন না কোন কুর্দীপ্রধান দলকে বিচ্ছিন্নতাবাদের দায়ে তুরস্কের সুপ্রীম কোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জনপ্রিয় নেতা সালাউদ্দিন দেমিরতাশ সেই অভিযোগে দশ বছর ধরে জেলে। আরেক সংসদসদস্য লেলা জানা শপথ গ্রহণের শেষে তুর্কী-কুর্দী ভ্রাতৃত্বের আকাংক্ষা প্রকাশ করেন। ফলঃ দশ বছরের জেল।

২০১৭ সালে আঙ্কারায় সন্ত্রাসী বোমাহামলা
সিরিয়ার রোজাভার সমাবেশগুলিতে ওজালানের মুখচ্ছবি অংকিত ব্যানার ও পতাকা শোভা পায়
উত্তর সিরিয়ায় পরিচালিত তুর্কী গ্রাউন্ড অপারেশন, ২০১৯

তাই ২০০৪ সালে প্রথম কুর্দী টি,আর,টি টিভি চ্যানেল যাত্রা শুরু করলেও তাতে প্রচারিত ইরানী দল রাস্তাকের সঙ্গীতের কথায় “কুর্দিস্তান” শব্দটি প্রতিস্থাপন করতে হয় “হাউরামান” প্রদেশের নাম দিয়ে। মোটে সে বছরই নবজাতকদের কুর্দী নামকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়।

আয়রনিক ব্যাপার হল, ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হবার পর এরদোয়ানই এমন উদারপন্থা অবলম্বন শুরু করেন। মার্কেট রিফর্মের পাশাপাশি কুর্দী-তুর্কী সম্পর্ক নর্মালাইজেশনের একটা চেষ্টা চলে। সেসব ওলট পালট হয়ে যায় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে। অতীতে সিরিয়ার সরকার পিকেকে দলটিকে নানা সময় আশ্রয় দিয়েছে। রোজাভার কুর্দীরাও ওজালানের অনুসারী বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত। গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়া থেকে আগত অভিবাসীদের সাথে স্বাধীনতাকামী সন্ত্রাসবাদীরাও তুরস্কে ঢুকে পড়েছে। অন্তত এমনটাই এরদোয়ানের দাবি।

তুরস্কে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিরিশটির মত সন্ত্রাসী বোমা হামলায় মারা গেছে সাড়ে পাঁচশর বেশি মানুষ। আক্রমণের দাবিদারদের মধ্যে ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসবাদী আছে যেমন, তেমন বিভিন্ন ক্ষুদ্র অপরিচিত কুর্দী জাতীয়তাবাদী দলও আছে। তবে তুরস্কের সরকার প্রায়ই ঢালাওভাবে পিকেকে’কে এসবে মূল হোতা হিসাবে দাবি করে। আর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সিরিয়ার ওয়াই,পি,জি নাকি পিকেকেরই একটা শাখা, এটা তাদের দাবি।

এ কিছুটা সত্য। ওয়াই,পি,জির সমাবেশের ব্যানারে-পোস্টারে ওজালানের ছবি শোভা পায়। এ সকল কারণে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিস উৎপাটন অভিযান সফল হবার পরপর সিরিয়ান কুর্দিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্যদের আংশিক প্রত্যাহার করে নেয়। তবে এখনো একটা ভাল মার্কিন উপস্থিতি সেখানে রয়েছে।

উত্তর সিরিয়ায় তুর্কী দখলদারিত্বের চিত্র
ইস্তাম্বুলের ইস্তিকলাল সড়কে বোমা বিস্ফোরণের ঠিক আগ মুহূর্তের দৃশ্য সিক্যুরিটি ক্যামেরায় ধারণকৃত

মার্কিনরা সরে আসার পরপরই তুর্কীরা তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে সিরিয়ার উত্তরাংশ দখল করে রেখেছে। কুর্দী সন্ত্রাসবাদী দল যাতে তুরস্কে ঢুকতে না পারে সে কারণে বর্ডারের দশ-পনেরো কিলোমিটারে তারা সেফ জোন বানাচ্ছে। হয়তবা ভবিষ্যতে সিরিয়ান রেফ্যুজিদের সেখানে ফেরত পাঠাবে। আবার এক দফা কুর্দীদের সম্পত্তি বেদখল হবে।

এসব কারণে সিরিয়ার রোজাভার জনমানসে আইসিস নয়, বরং তুর্কীবিদ্বেষ। সীমানার অপর পারে তুর্কী কুর্দীরাও অসন্তুষ্ট। এদের সকলের ধারণা কুর্দীবিরোধী অভিযানে তুর্কী সেনাবাহিনীর সাথে আইসিস শরীক রয়েছে। ২০১৪ সালে কোবানি অবরোধের সময় যুক্তরাষ্ট্রই তাদের সাহায্য করে, আইসিসবিরোধী জজবা তুলেও এরদোয়ান কোন সাহায্য করেনি।

এই রোববার বোঝা যাবে এরদোয়ানের ভবিষ্যৎ কি, আর রোজাভার অধিকৃত এলাকার ভবিষ্যতও। তার বিরুদ্ধে যে প্রার্থী জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন তার নাম কামাল ক্রিচদারোউলু। একাধিক কুর্দী রাজনৈতিক দলও তাকে সমর্থন দিচ্ছে।

এরদোয়ানের বিরুদ্ধে মে ২০২৩এ নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ কামাল ক্লিচদারোউলু
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কুর্দী ডায়াস্পোরার চিত্র
সুইডেনে তুরস্কের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করছে কুর্দী জনতা, ২০১৯

এরদোয়ান যে সুইডেন-ফিনল্যান্ডের নেটো সদস্যপদ ঝুলিয়ে রেখেছেন, তার মূলেও এ কুর্দী সংঘাত। কুর্দীদের একটা বড় জনসংখ্যা ইউরোপে অভিবাসী। এরা সেসব দেশ থেকে অর্থ সাহায্য পাঠায় ইরাক-সিরিয়া-তুরস্ক-ইরানের কুর্দীদের। অনেক বিরোধী মতের কুর্দী নেতারাও রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে রয়েছে সেসব দেশে। সুইডেনে-ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয়প্রদানের অভিযোগের মূল সেটাই। ওদিকে তুরস্কের বহু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ, বিশেষ করে বিচারব্যবস্থার। সে কারণে তুরস্কের কোর্ট কাউকে “সন্ত্রাসবাদী” তকমা দিলেও সুইডেন-ফিনল্যান্ডের মত দেশ সাথে সাথে সেটা বিশ্বাস করবে না।

এই একই কারণে তুরস্ক সহজে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হতে পারবে না। প্রথম পোস্টে আমি বলেছিলাম কেন কিভাবে মাইনরিটি রাইটস এর ব্যাপারটা ইউরোপীয় রাষ্ট্রসংজ্ঞার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে। তার মূলে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তস্নাত ইতিহাস। ইইউএর সদস্যপদ লাভের জন্য একটি দেশকে অবশ্যই স্বদেশের জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। ঐ লেঠা না চুকিয়ে ইইউতে ঢুকলে আবারও সে পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা। তাই যতদিন না কুর্দী প্রশ্নের একটা যথাযথ উত্তর তুরস্ক বের করতে না পারছে ততদিন ইউরোপীয় দেশ তারা নয়।

আর এ প্রসঙ্গে আমার মত যারা পশ্চিমা দেশে আরামে শান্তিতে বসবাস করছেন, তাদেরও মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমরা কিন্তু ঐ মাইনরিটি রাইটসের সংজ্ঞাটির সুবিধাভোগী হয়েই উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি পাচ্ছি! যদি ভাবেন স্বদেশে বাঙালী বা মুসলমানরাই হবে সব ক্ষমতার মালিক, কিংবা ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নস্টালজিয়াই সকল সমস্যার উত্তর, তো সেটা হবে চরম হিপোক্রেসি!

ইউরোপ-আমেরিকা উন্নতি করেছে শুধু টেকনোলজির বদৌলতে নয়, তারা স্বদেশের মানুষকে, আই মীন আপামর সকল মানুষকে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধিকার দেয়। স্বদেশের অর্থনৈতিক-সামরিক সকল প্রকার নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য সে ডাইভার্সিটিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যতদিন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এটা সঠিকভাবে স্বীকৃত না হবে, ততদিন জনগোষ্ঠীর একটা বড় পটেনশিয়াল থেকে বঞ্চিত হবে দেশ ও জাতি। সোভিয়েতের পতন হয়েছে, কিন্তু এখানে এখনও একটা বিশাল মানসিক ডিভাইড রয়ে গেছে ঈস্ট আর ওয়েস্টের মধ্যে। এই আয়রন কার্টেনের পতন না ঘটলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি কোথাও নেই।

আদি ইসলামী মুদ্রা – ৩

আদি ইসলামী মুদ্রা নিয়ে সিরিজের তৃতীয় লেখা এটি। প্রথম পর্বে ছিল উমাইয়া খেলাফতের পতন ও আব্বাসিয়াদের উত্থানের ইতিহাস। দ্বিতীয় পর্বে ছিল আরব-বিজ্যান্টিন মুদ্রার কথা, যেগুলিতে ক্রুশ, মানব অবয়ব ও অন্যান্য অনৈসলামিক প্রতীকের পাশাপাশি আরবীতে বিসমিল্লাহ ইত্যাদি লেখা।

আজকের পাঁচটি রৌপ্যমুদ্রা বা দিরহাম আর একটি তাম্রমুদ্রা বা ফালস সাসানী রাজবংশ থেকে শুরু করে উমাইয়া খলীফাদের গভর্নরদের আমলের — ইরাক ও ‌অন্যান্য প্রদেশের। সাসানীদের সাম্রাজ্যের দ্রুত অধঃপতনের পেছনের কাহিনীর পাশাপাশি লিখছি নতুন আরব প্রশাসনিক নীতির সংক্ষিপ্ত বিবরণী।

ছয়টি মুদ্রা দেখা যাচ্ছে ছবিতে। আপাতদৃষ্টিতে সবগুলি দেখতে প্রায় একই। কিন্তু এরা আলাদা আলাদা সময়ের। প্রথম দুটি সাসানী সাম্রাজ্যে আর শেষের চারটি উমাইয়া খেলাফতের পূর্বাংশের প্রাক্তন সাসানী প্রদেশগুলিতে প্রচলিত ছিল।

১। সাসানী শাহেনশাহ দ্বিতীয় খসরুর দিরহাম, ৬২০ খ্রিষ্টাব্দ
২। সাসানী শাহেনশাহ তৃতীয় ইয়াজদেগার্দের দিরহাম, ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ

সাসানী মুদ্রাগুলো যথাক্রমে শাহেনশাহ দ্বিতীয় খসরু (মুদ্রার তারিখ ৬২০ খ্রীষ্টাব্দ) আর তার পৌত্র তৃতীয় ইয়াজদেগার্দের (৬৫০ খ্রীষ্টাব্দ)। দুটোতেই তাদের প্রোফাইল অংকিত। মাথার ওপর ‘ফারাভাহার’ — পাখাওয়ালা সূর্য — জোরোয়াস্ত্রিয়ান মঙ্গল দেবতা আহুরা মাজদা অথবা শাহেনশাহের গার্ডিয়ান এঞ্জেল ফেরেশতার প্রতীক। চার ধারে চাঁদতারা — ঊর্বরতা ও জ্ঞানের দেবী অনাহিতার (ভারতের সরস্বতী) প্রতীক। সম্রাটের শ্মশ্রুমন্ডিত মুখাবয়বের সামনে পিছনে পাহলভী হরফে তার নাম-পদবী লেখা। অপরপিঠে দুই গদাধারী রক্ষকের মাঝে জোরোয়াস্ত্রিয়ান ধর্মমতের পবিত্র অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত মশালের বেদী। সাথে পাহলভী হরফে টাঁকশালের নামের আদ্যাক্ষর।

৩। ইরাকের মুসলিম গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে আমিরানের দিরহাম, ৬৬৩/৬৬৮ সাল
৪। ইরাকের মুসলিম গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবি সুফিয়ানের দিরহাম, ৬৬৮/৬৬৯ সাল

তৃতীয় ও চতুর্থ মুদ্রার ডিজাইন আগেরগুলোর মতই। কিন্তু একটু ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখবেন, সম্রাটের ছবির ফ্রেমের ঠিক বাইরে আরবী কুফী হরফে বিসমিল্লাহ লেখা। চতুর্থটিতে বিসমিল্লাহ রাব্বী। সম্রাটের মুখচ্ছবির আশপাশ দিয়ে লেখা নাম আর সাসানী সম্রাটের নয়, আরব গভর্নরদের! প্রথমটায় পাহলভী হরফে লেখা ‘প্দুল ‘জিজ ঈ প্দুল ঈ মীল’ন’ — আব্দুল আজিজ ই আব্দুল্লাহ ই আমিরান (৬৬৩/৬৬৪)। দ্বিতীয়টিতে জিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান (৬৬৮/৬৬৯)।

দু’জনেই বেশ পরাক্রমশালী উমাইয়া গভর্নর। আব্দুল্লাহ ইবনে আমির তৃতীয় খলীফা উসমানের সময় থেকে মুয়াবিয়ার আমল পর্যন্ত সে আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তুতো ভাই উসমানের গুপ্তহত্যার পর শুরু হওয়া প্রথম গৃহযুদ্ধের সময় (৬৫৬-৬৬১) হযরত আয়েশা, তালহা ও জুবায়েরের আলীবিরোধী দলকে বসরাতে আশ্রয় দেন তিনিই। আর জিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান ছিলেন আলীর মনোনীত গভর্নর, তার হত্যার পর শুরু হওয়া দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে শুরুতে আলীপন্থীদের সমর্থন দিলেও মুয়াবিয়া তাকে সৎভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে দলে টেনে নেন।

৫। দ্বিতীয় খসরুর দিরহামের চার ধার কেটে তাকে খেলাফতের মাপে নিয়ে আসা হয়েছে
৬। ইরাকের মুসলিম গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের তামার ‘পাশিজ’ বা ‘ফালস’, ৬৯৪/৬৯৫ সাল

আর শেষ দুটি মুদ্রার প্রথমটির চারধার থেকে বাড়তি ধাতু কেটে ফেলা হয়েছে। যদি তা না করা হত, আলাদা করে আরব মুদ্রা হিসাবে বোঝা সম্ভব ছিল না। চারধার কাটার কারণ তার ওজনটাকে নতুন আরব খেলাফতের দিরহামের ওজনের স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে আসা। আর শেষ মুদ্রাটি তামার ‘ফালস’ (৬৯৪/৬৯৫)। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ নামে আরেক শক্তিশালী ইরাকী গভর্নরের। তিনি ছিলেন উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খুবই বিশ্বাসযোগ্য এক সেনাপতি। মুদ্রার এক পিঠে সাসানী সম্রাটের প্রতিকৃতি, অপর পিঠে একটি ঘোড়ার ছবি!

পারস্য সাম্রাজ্যে আরব সেনাভিযানের প্রাক্কালে সেখানকার রাজনৈতিক অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। মুদ্রায় দেখানো দ্বিতীয় খসরুকে সিংহাসনে বসার সাথে সাথে বাহরাম চোবিন নামে এক সেনাপতির বিদ্রোহ সামাল দিতে হয়। বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে জাতশত্রু বিজ্যান্টিনদের সাহায্যের জন্যে হাত পাতেন তিনি। সিংহাসন পুনরুদ্ধারে সফলতার পর বিজ্যান্টিনদের হাতে মেসোপটেমিয়ার কয়েকটি সমৃদ্ধ শহর ছেড়ে দেন খসরু।

দ্বিতীয় খসরুর সময় সাসানী সাম্রাজ্যের বিস্তার, আনুমানিক ৬১০ সাল

বিজ্যান্টিনদের সাথে শান্তির সুযোগ নিয়ে নিজের গদি পাকাপোক্ত করতে মনোনিবেশ করেন খসরু। যে দুই চাচা তাকে রাজক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছিল, তাদেরকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা করেন খসরু। তার ফলে এতদিনের যে সাসানী-আর্শাকী রাজবংশের একতার ওপর ইরানী সাম্রাজ্য দাঁড়িয়েছিল, তাতে চিঁড় ধরতে শুরু করে। অভিজাতবংশীয় সেনানায়ক ও জমিদাররা (দেহগান) দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

একই সময়ে নিজের হাতে রাজ্যের সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ইরাকের পাপেট রাষ্ট্র আল-হিরার আরব লাখমীবংশীয় রাজা আল-নুমানকে বন্দী করে হত্যা করেন খসরু। এই রাষ্ট্রের যাযাবর ও অর্ধযাযাবররা এতদিন শত্রু বিজ্যান্টিনদের বিরুদ্ধে সৈন্য-সামন্ত ও সামরিক বাফার এলাকার নিয়ন্ত্রণ যুগিয়ে এসেছে সাসানীদের। এভাবে বিজ্যান্টিন ও মরু এলাকার আরব ট্রাইবগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাব্যূহ রাতারাতি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

খসরুর ভাগ্য পাল্টে যেতে শুরু করে ৬০২ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ। তার মিত্র বিজ্যান্টিন সম্রাট মরিস নিজ সেনাপতি ফোকাসের হাতে খুন হন। ফোকাস নিজেকে সম্রাট দাবি করলে মরিসের পুত্রকে সিংহাসনে আসীন করার ‘ন্যায়সঙ্গত’ লক্ষ্য নিয়ে খসরু বিজ্যান্টিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। প্রথম প্রথম খুব দ্রুততার সাথে আগের হারানো শহরগুলি পুনরুদ্ধার করে ফেলেন। ঈজিয়ান সাগরে নৌযুদ্ধেও সফলতা পায় সাসানীরা, মিশরও তাদের দখলে আসে। বিজ্যান্টিন সম্রাটের প্রাসাদে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। ফোকাসকে সরিয়ে সম্রাট হন হেরাক্লিয়াস আর খসরুকে শান্তির প্রস্তাব পাঠান। খসরু তাতে কান না দিয়ে উল্টো মরিসের পুত্র থিওডসিয়াসকে সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেবার দাবি করেন। তার সেনাপতি শহরবরাজ/সরফরাজ দামেস্ক ও জেরুজালেম দখল করে যীশুখ্রীষ্টের ট্রু ক্রস লুট করে নিয়ে যান।

৬২৬এ হেরাক্লিয়াস সাসানীদের কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ ভেঙে দিতে সক্ষম হন। এ সময় থেকে যুদ্ধের মোড় বিপরীত দিকে ঘুরে যায়। পূর্ব ফ্রন্টে তুর্কী ও হেফথালাইটদের সাথে মিত্রতাস্থাপনের পর দ্রুত সিরিয়া-মেসোপটেমিয়ায় বেশ কিছু যুদ্ধে বিজয় পান হেরাক্লিয়াস। এরপর একেবারে সাসানী রাজধানী ক্টেসিফোনে এসে হাজির হয় বিজ্যান্টিন সেনাদল। এবার খসরুর সময় এল অতীতের সব অত্যাচারের মাসুল দেবার। তার বিরোধী পাহলভী বনেদী পরিবারগুলো বিদ্রোহ শুরু করে। এদের মধ্যে ছিলেন শাহনামাখ্যাত রুস্তম ও তার পরিবার। তারা খসরুর কারাবন্দী পুত্র শেরোয়েকে মুক্ত করে তাকে শাহেনশাহ ঘোষণা করে। শেরোয়ে রাজকীয় নাম নেন কাভদ। বিজ্যান্টিনদের হারানো রাজ্যগুলি ফিরিয়ে দেন, পাশাপাশি উত্তর ইরাক তাদের কাছে ছেড়ে দেন। বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে শান্তি পুনর্প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার তাড়নায় নিজ পিতাকে তো হত্যা করেনই, স্বপরিবারের আপন ভাই, সৎ ভাই সকলকে নিকেশ করে নিজের আসন পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেন। ফলে সাসানী পরিবার প্রায় নির্বংশ হয়ে যায়, রাজা হবার যোগ্য কোন বংশধর আর থাকে না।

কাভদকেও অচিরেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়। তাকে সরানোর পর চার বছরে দশবার সম্রাট পরিবর্তন হয়। শেষমেশ শাহেনশাহ হন খসরুর এক নাতি তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ। ৬৩২ সালে রাজাভিষেকের সময় তার বয়স ছিল মোটে আট বছর। তিনিই ছিলেন ইসলামী বিজয়াভিযানের সময় সাসানী সম্রাট। তার রাজত্বের শুরুতে পুরো সাম্রাজ্যের ওপর তার তেমন কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না। অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত তার দেশ। নানা প্রদেশে প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করছে বিভিন্ন গভর্নররা। ধীরে ধীরে যুদ্ধ ও চুক্তির মাধ্যমে আবার সাসানী সাম্রাজ্যকে একীভূত করতে হয় তাকে। কিন্তু ততদিনে আরবদের উত্থান শুরু হয়ে গেছে। ৬৫১ সালে পলায়নরত অবস্থায় এক মিলার তাকে চিনে ফেলে, তাকে হত্যা করে মুসলিম সেনাদল নয়, বরং বিরোধীবংশীয় এক সামন্ত।

এ হলো সাসানীদের সমসাময়িক অবস্থা। আরব মুসলিমদের মাঝে এ সময়ে কি ঘটছিল তা বুঝতে হলে শুরু করতে হবে ইরাক ও তার ডেমোগ্রাফি দিয়ে।

এ সময়ের এক হাজার বছর আগের আকিমেনিদ আমল থেকেই ইরাক বা মেসোপটেমিয়া ইরানী গোত্র ও রাজবংশগুলির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু অতীতে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে ছিল অ্যাসিরীয়-ব্যাবিলোনীয় সাম্রাজ্যের জন্মভূমি। এদের মহান রাজা নেবুকাদনেজার বা বখত-নসর ইন্দোআর্য পারসিক ছিলেন না, ছিলেন আরব ও হিব্রুদের মতই সেমিটিক গোত্রীয়। পারসিকরা যখন অতীতে ছিল স্তেপের শিকারী ও মেষপালক গোত্র, তখন ব্যাবিলোনিয়ার সাম্রাজ্য ছিল নাগরিক সভ্যতার পুরোধা। কৃষিকাজ ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করে এরা ছিল পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি।

অর্থাৎ ইরানী বনেদী বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও ইরাকের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ তখনো সেমিটিক আরামাইক ভাষায় কথা বলত, ঠিক যেমনটা ছিল বিজ্যান্টিন সিরিয়ার সিরিয়াকভাষীরা। এদের ভাষার সাথে ফারসীর মিল নেই, মিল আছে আরবী ও হিব্রুর।

এসকল আরামায়িকভাষী মানুষের বসবাস ছিল ইরাকের বড় শহরগুলিতে। তাদের পাশাপাশি ছিল ফারসীভাষী সরকারী কর্মচারী ও সৈনিক। শ্রেণী ও গোত্রভিত্তিক বিভাজন ছিল সেসব শহরে। জোরোয়াস্ত্রিয়ান ফায়ার টেম্পল ছিল পারসিকদের শক্তির প্রতীক। কিন্তু অধিকাংশ জনগণের ধর্ম ছিল নেস্টরিয়ান ক্রিশ্চিয়ানিটি। পাশাপাশি কিছু ইহুদী ছিল যারা ড্যানিয়েল-এজেকিয়েলের সময় থেকে ইরাকের বাসিন্দা।

আর দুই নদীর উপত্যকার ঠিক পশ্চিমে যেখানে ঊর্বরভূমির সাথে মরুভূমির মিলন ঘটেছে, সেখানে আবাস ছিল বহু অর্ধ-যাযাবর মেষপালক আরব গোত্রের। এদের অধিপতি ছিল বনু লাখম বলে একটি বড় গোত্র, ঠিক যেমন সিরিয়াতে বনু ঘাসান ছিল বিজ্যান্টিনদের মনোনীত আরব নেতৃত্বস্থানীয় গোত্র। ভিনদেশী সাসানীদের হয়ে আরব গোত্রগুলো থেকে করসংগ্রহের দায়িত্ব ছিল লাখমীদের। এছাড়াও দক্ষিণে পারস্যোপসাগরের তীরবর্তী খুজেস্তান থেকে শুরু করে উত্তরের জাগ্রোস পর্বত পর্যন্ত আরো নানা আরব গোত্রের বসবাস ছিল, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাইবান, তাগলীব, তানুখ প্রমুখ। এদের অধিকাংশ ছিল নেস্টরিয়ান খ্রীষ্টান। ইরাকের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ছিল জরথুস্ত্রবাদ থেকে বিবর্তিত নিষিদ্ধঘোষিত মাজদাকী-মানিকেয়ান, আর আধ্যাত্মিক ভক্তিবাদী মান্দিয়ানরা।

আরব গোত্রদের কাছে হযরত মুহাম্মদ(সা)এর ইসলাম প্রচারের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল তাদেরকে একতাবদ্ধ করা। তার জীবদ্দশায় কুরাইশশাসিত মক্কা ও মুসলিমশাসিত মদীনার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফসল হিসাবে আরবের বেদুঈন ও শহরবাসী ট্রাইবগুলোর কনসলিডেশনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে। মক্কাবিজয়ের পরও একই প্রক্রিয়া আরো বড় মাপে চলতে থাকে, আর তার বিস্তার হয় দক্ষিণে ইয়েমেন-ওমান, উত্তরে আল-ইয়ামামা, আর পূর্বে বাহরাইন পর্যন্ত। হযরত মুহাম্মদ(সা)এর মৃত্যুর পর আবু বকরের খলীফা হবার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল তিনি সকল আরব ট্রাইবের পুংক্ষানুপুংক্ষ বংশপরিচয় জানতেন, অর্থাৎ তাদের সাথে কূটনীতিতে সফলতার চাবিকাঠি ছিল তার হাতে। তাই রিদ্দা নামক বিদ্রোহগুলিকে যুদ্ধ ও চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে তার দু’বছরের বেশি সময় লাগেনি।

আবু বকরের শাসনামলেই ইয়ামামার ‘ভন্ডনবী’ মুসায়লামাকে পরাজিত করতে সেনাদল পাঠানো হয়। সে সংগ্রাম চলাকালীন অবস্থাতেই ইরাকে অভিযান চালান মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ। তিনি দক্ষিণ ইরাকের বনু শাইবান গোত্রের নেতাকে তার সাথে হাত মেলানোর প্রস্তাব দেন। ততদিনে বনু শাইবান নিজেরাই মরুভূমি থেকে আক্রমণ চালিয়ে দজলা-ফোরাতের পশ্চিম তীরে মোটামুটি একটা স্বাধীন রাজ্য বানিয়ে ফেলেছে। সাসানীরা হয় তখনো সামরিক দুর্বলতার শিকার, নয়ত শাইবানদের ছোটখাট আক্রমণে গা না করে বড় কোন সমস্যা নিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত।

খালিদ বিন ওয়ালিদ ৬৩৩/৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দে ইরাকের স্থানীয় বেদুঈন আরবদের সাহায্য নিয়ে মরুসংলগ্ন এলাকা আর বসরার কাছে আল-উবুল্লা আর কুফার নিকটবর্তী আলহিরার মত আরবঅধ্যুষিত শহরগুলিকে ইসলামী রাজত্বের আওতায় আনেন। এ সময়ে সাসানী সেনাবাহিনীর কোন প্রতিরোধ তাদের বিরুদ্ধে আসেনি। খালিদ সিরিয়া বিজয়ের যুদ্ধে অংশ নিতে ইরাক ত্যাগ করে বিশাল মরুযাত্রা করেন আর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যান শাইবানদের গোত্রপতি আল-মুসান্নার হাতে।

ইসলামী নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা ‌অবশ্য আসে স্থানীয় আরব গোত্রগুলোর থেকে। এদের অনেকে লাখমীদের জায়গায় অধিষ্ঠিত ছিল। নতুন পাওয়া ক্ষমতা ছাড়তে তারা ছিল নারাজ। এদের বিরুদ্ধে আল-মুসান্না ইসলামী খেলাফতের নামে দু’একটা সফল অভিযান চালালেও শীঘ্রই সরাসরি সাসানী বিরোধিতার সম্মুখীন হন। আল-জিসরের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হন তিনি।

এর প্রতিক্রিয়ায় দ্বিতীয় খলীফা উমার স্বল্পকিছু রিইনফোর্সমেন্ট পাঠান বাজিলা গোত্রের জারীর ইবনে আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে। তাদের সাথে পরে যোগ দেন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের বড় সৈন্যদল। ৬৩৬ খ্রীষ্টাব্দে এরা সকলে মিলে ঘাঁটি গাড়ে আলহিরার নিকটবর্তী আল-ক্বাদিসিয়ার প্রাঙ্গনে। সেখানে পারসিক সেনাবাহিনীর সাথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সংখ্যায় অপ্রতুলতা সত্ত্বেও আরবরা কয়েকদিনের প্রচেষ্টায় যুদ্ধে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। এখানেই নাকি রুস্তমের সাথে মোলাকাত হয় আরবদের, আর রুস্তম তাদের চরম অপমান করেন।

ক্বাদিসিয়ার যুদ্ধে সাসানীরা হারার পর তাদের তেমন কোন প্রতিরক্ষা আর অবশিষ্ট থাকে না। তারা পিছু হটে আশ্রয় নেয় মাদাইন শহরে তাদের রাজধানীতে, তারপর সেখান থেকে পালিয়ে চলে যায় জাগ্রোস পর্বতের পাদদেশে। সেখানে ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে জালুলার যুদ্ধে আরেকবার শোচনীয় পরাজয় ঘটে সাসানীদের। ইয়াজদেগার্দ তার নিকটস্থদের নিয়ে আরো পূর্বে খোরাসান ও সগডিয়ার দিকে পালিয়ে যান, আর সুযোগ খুঁজতে থাকেন তার হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের। সে উদ্দেশ্যে চীনাদেরও সাহায্য প্রার্থনা করেন তিনি। কিন্তু তার সেই সংগ্রাম ৬৫১ পর্যন্ত বিভিন্ন মাপে চললেও শেষ পর্যন্ত সাসানী সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা বিফল হয়। তার পুত্র চীনের সম্রাটের দরবারে আশ্রয় নেন নির্বাসিত রাজা হিসাবে। আর কখনোই ইরানে ফিরে যেতে পারেনি সাসানীদের বংশধররা।

পারসিক সেনাদলের সংখ্যাধিক্য আর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও আরবদের যুদ্ধে বিজয়ের কারণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কারো ধারণা পারসিকদের হস্তীবাহিনীকে আরব তীরন্দাজরা দূর থেকে ধরাশায়ী করে ফেলে। আবার তাদের সাংগঠনিক একতার কারণও দেন অনেকে। তাদের বিপরীতে সাসানী বাহিনী ছিল বহু জাতি-গোত্রে বিভক্ত আর তারা মোটে জটিল গৃহবিবাদ কাটিয়ে উঠেছে। আর ইরানী সেনাদলের স্বাভাবিক আকারের তুলনায় তারা ছিল স্বল্প। আরবরা যে সংখ্যায় দুর্বল ছিল আর তাদের তীরন্দাজ, পদাতিক আর ঊষ্ট্রারোহী ছাড়া তেমন কোন সৈন্য ছিল না, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এই সৈন্যসংখ্যা কম হবার কারণেই উমার রিদ্দার সময়কার বিদ্রোহী আরব গোত্রগুলিকে না চাইতেও ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠান। ‘ভন্ডনবী’ তুলায়হাকেও তার ট্রাইবসহ ইরাকে পাঠান তিনি। তুলায়হাকে সেনানেতৃত্বের মত গুরুত্বপূর্ণ পদ তিনি দেননি, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তার কৌশলগত উপদেশ ঠিকই মুসলিমদের কাজে লেগেছে। এ ছিল সাসানীদের অন্তর্কলহের ঠিক বিপরীত। আরব সেনাদলে যে সকলে মুসলিম ছিল তাও নয়, ইরাকের খ্রীষ্টান ট্রাইবগুলোর কিছু সদস্যও যুদ্ধে আরব পক্ষ নেয়। সিরিয়ার যুদ্ধে মক্কার কুরাইশ ও মদীনার আনসারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও দেখা যায় যে ইরাকে সে প্রক্রিয়াটায় বেশি অংশ নিয়েছে মধ্য আরব ও ইরাকের অ-কুরাইশ স্থানীয় আরব ট্রাইবগুলি।

এভাবে ইরাকবিজয় ছিল নেহাত আরব ট্রাইবগুলির কনসলিডেশনের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সিরিয়াতে মক্কার কুরাইশদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ছিল, জেরুজালেমের কারণে সেখানকার একটা ধর্মীয় গুরুত্বও ছিল। সেসব কোন কিছু ইরাকের বেলায় ছিল না। আরব কনসলিডেশন ও এসট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে যখনই সাসানী বা তাদের সমর্থকদের বাঁধা এসেছে, তখনই আরবদের সুযোগ চলে এসেছে আরো এলাকা হস্তগত করার। এভাবে ইরাক থেকে শুরু করে ক্রমে সাসানী সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের খোরাসান-হেরাতে ছড়িয়ে পড়ে আরব সেনাদল। আর সেভাবে তারা এসে হাজির হয় সিন্ধু উপত্যকায় — ঠিক ভারতের দোরগোড়ায়।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের জীবদ্দশাতেই ইরাকের রাজধানী ক্টেসিফোন বা আল-মাদাইন থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় আলহিরার নিকটবর্তী নতুন সৃষ্ট গ্যারিসন টাউন কুফাতে। এর মূল কারণ সম্ভবত মরু এলাকার নিজস্ব পাওয়ার বেসের কাছাকাছি থাকা, আর মরুর ট্রাইবগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার সুবিধা। এতে বোঝা যায়, ইরাকে সাম্রাজ্যবিস্তারের মূল লক্ষ্য সাসানী সাম্রাজ্যের ক্ষমতাকেন্দ্র দখল করা নয়, বরং ছিল আরব গোত্রগুলিকে একীভূত করে একই সিস্টেমের আওতাধীন করা।

উমার ও পরবর্তী খলীফারা ইরাকে বিভিন্ন আরব যাযাবর ট্রাইবকে ‘হিজরত’ কিংবা ‘স্বেচ্ছা নির্বাসন’ হতে উদ্বুদ্ধ করেন। এভাবে হিজরত ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়ে গেছে ইসলামের একটি অনানুষ্ঠানিক স্তম্ভ হিসাবে। হিজরতে উদ্বুদ্ধ করার পেছনে খেলাফতের নেতৃত্বস্থানীয়দের মূল লক্ষ্য ছিল পরিবর্তনশীল মানসিকতার বেদুঈনদেরকে আরবের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা, আর সম্ভব হলে সাসানীদের অবশিষ্ট সেনাদলের বিরুদ্ধে এদের ব্যবহার করা। এসকল বেদুঈন ট্রাইব কুফা কিংবা বসরার মত নতুন শহরে এসে বসতি গাড়ে। একেকটি ট্রাইবের জন্যে নির্ধারিত ছিল একেকটি মহল্লা। কোন ক্ষেত্রে বনেদী পারসিক মিত্র ‘দেহগান’ জমিদার আর ‘সাওয়ারী’ অশ্বারোহীদের জন্যেও নতুন এলাকা ছেড়ে দিতে তাদের বাধ্য করা হয়।

আরব ট্রাইবগুলি মরুতে বসবাসরত অবস্থায় মদীনায় ট্যাক্স পাঠাত, আর ইরাকে অভিবাসনের পর এখন তারা উল্টো পায় সরকারী ভর্তুকি। এরা কিন্তু ইরাকের আদি অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিজমা দখল করেনি। চাষাবাদে আরব বেদুঈনদের কোন আগ্রহ ছিল না, আগের চাষীদের থেকে কর আদায় করেই তারা ক্ষান্ত হয়েছে। যে করটা এসব আরামায়িকভাষী চাষীরা ইরানিদের দিত, তা এখন পাওয়া শুরু করে আরব গোত্রগুলো। আরবদের জনসংখ্যা বাড়া শুরু করলে কুফা-বসরা শহরে ধীরে ধীরে অশান্তি-অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম ও দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধে তার একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সে ব্যাপারে পরে বলব।

ইসলামী সরকার কেবল সেসব জমিগুলির অধিগ্রহণ করে যেগুলি শান্তিচুক্তিঅনুযায়ী স্থানীয়রা তাদের কাছে ছেড়ে দেয়, নয়ত যেগুলি আগে ছিল সাসানী সরকারের মালিকানাধীন, নতুবা তাদের মালিক যুদ্ধে নিহত হয়েছে কিংবা দেশান্তরী হয়েছে। সেসব জমির চাষাবাদ থেকে পাওয়া কর দিয়ে সরকার পরিচালিত হত।

সরকারী কাজে যেসব ইরানী জোরোয়াস্ত্রিয়ান ও অন্যান্য জাত-ধর্মের কর্মচারী ছিল, তাদের অবস্থানও অটুট থাকে। সরকারী ভাষা তখনও পাহলভী। উমারের সময় থেকে আশি বছর পরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাষাসংস্কারের আগে কোন খলীফা বা গভর্নর এসব প্রক্রিয়ার ওপর কোন হস্তক্ষেপ করেননি। সে ব্যাপারটা এই মুদ্রাগুলির মধ্যেও উঠে এসেছে।

সাসানী সম্রাটের মুখাবয়বওয়ালা এই মুদ্রা রাশিদুন খেলাফতের আমলে চালু তো ছিলই, উমাইয়া শাসনামলেও তার পরিবর্তন হয়নি। উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক সিরিয়ার মুদ্রার সংস্কার করে তার থেকে মানব অবয়ব বাদ দিয়ে দেন ৬৯৬ সালে। কিন্তু ইরাকের এই মুদ্রার কোন পরিবর্তন তিনি করেননি। উমাইয়াদের পর আব্বাসিয়া খেলাফতের বেশ কিছু প্রদেশেও এমন মুদ্রা চালু ছিল। অর্থাৎ ৬৩৪ থেকে শুরু করে ৭৮৬ পর্যন্ত দেড়শ বছর ইসলামী সাম্রাজ্যের পূর্বভাগের মুদ্রায় শুধু রাজার মুখচ্ছবি নয়, জোরোয়াস্ত্রিয়ান ধর্মের চাঁদতারা প্রতীক ও অগ্নিবেদী শোভা পেয়েছে।

আজ এ পর্যন্ত। আগামী পর্বে আসবে স্ট্যান্ডিং কালিফ অর্থাৎ দন্ডায়মান খলীফার অবয়ব ও বিকৃত ক্রুশ অংকিত সিরিয়ার তামার ফালস, যেটা ছিল প্রথম ইসলামী মৌলিক ডিজাইনের মুদ্রা। ঐ যে আব্দুল মালিকের কথা বললাম, তারই নির্দেশে মুদ্রিত। মানুষের ছবি তো বটেই, বিজ্যান্টিন বা সাসানী সম্রাটের নয়, স্বয়ং ইসলামের খলীফার! আর সাথে লিখব তার সেই সংস্কারের পটভূমি।

পেপার ট্রেইল

“জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও” — ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি এটা নাকি নবীজী বলেছেন। সত্যি কথা হলো, এটি একটি দা’য়ীফ (দুর্বল) হাদীস, সম্ভবত বানোয়াট। ইসলাম ও আরবের আদি ইতিহাসে চীনের সাথে তেমন কোন প্রত্যক্ষ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল না।

অবশ্য ইসলামের শুরুতে আরব দিগ্বিজয়ের ঝান্ডা পশ্চিমে ইউরোপ আর পূর্বে ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হতে বেশি সময় লাগেনি। নবীজীর প্রয়াণের বিশ বছরের মধ্যে দুই বড় পড়শী বিজ্যান্টিন সাম্রাজ্যের পূর্বভাগের একটা বড় অংশ আর সাসানীদের পুরো রাজ্য আরবদের করায়ত্ত হয়। এর মধ্যে ইরানের উত্তরপূর্বের খোরাসান (বর্তমান আফগান-ইরানের উত্তর সীমান্তে) মধ্য এশিয়ার প্রবেশপথ। এ এলাকার উত্তরের দুর্গম গিরিপথের মধ্যে দিয়েই প্রাচীন পরিব্রাজকরা চীনে যেতেন।

অর্থাৎ চীন ও আরব এ দুইয়ের মোলাকাত ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার।

চীনের তাং সাম্রাজ্যের মানচিত্র

এসময় চীনে তাং রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তী অন্যান্য রাজবংশের মত অন্তর্মুখী এরা ছিল না। বিশাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সমান অংশগ্রহণ ছিল রাজকার্য পরিচালনায়। এরকম কসমোপলিটান রাজ্যে পূর্বের কোরিয়ান, উত্তরের মোঙ্গোল, পশ্চিমের তুর্কী জাতিগোষ্ঠীগুলিকে যথাযোগ্য স্থান দেয়া হত। অবশ্যই যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা চীনের সম্রাট ‘স্বর্গপুত্রকে’ উপঢৌকন পাঠানো বন্ধ করত।

মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে সিল্করোডের বাণিজ্যপথ এসময় ভারতকে চীনের সাথে যুক্ত করে। মধ্য এশিয়া ছিল প্রাচ্য-প্রতীচ্যের এক মিলনস্থল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের উত্তরসূরী গ্রেকো-ব্যাক্ট্রিয়ান রাজারা যেমন ছিল আফগানে, সেরকম ফারগানা-তাশখন্দ-বুখারা-কাশগর-সমরখন্দ এসব শহরেও সগডিয়ানভাষী ইরানীশাসিত নগররাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। এরা ছিল বংশপরম্পরায় বণিক। আর নেস্টরিয়ান খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, মানিকিয়ান, ইহুদী, জোরোয়াস্ট্রিয়ান ইত্যাকার নানা ধর্মবিশ্বাসের অনুসারীদের আবাস ছিল এ রাজ্যগুলিতে।

সিল্ক রোডের ভারতীয়, পারসিক, চীনা অংশ

ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম চীনে প্রথম যায় এ পথেই। সম্ভবত অতীশ দীপংকরও এই রাস্তার পূর্বভাগ যেটা পাকিস্তানের গিলগিটের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেদিক দিয়ে তিব্বতে গেছেন। চীন থেকেও হিউয়েন সাং এ পথেই ভারত ও বাংলায় এসেছিলেন সংস্কৃত বৌদ্ধ পান্ডুলিপি সংগ্রহ করতে। তার সে অভিযানের গল্প পরবর্তীতে চীনা পুরাকাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যার ইংরেজী নাম ‘এ জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট’। আর তার অন্যতম প্রধান চরিত্র বানররাজা সুন উখোং। ছোটবেলায় আমরা এই কাহিনীর চীনা ছবিবই পড়েছি।

সিল্ক রোডের অন্যতম স্থলবন্দর চীনের দুনহুয়াংএর গুহায় আবিষ্কৃত হয়েছে দেয়ালচিত্র। এখানে ভারতীয় প্রভাবে আঁকা বৌদ্ধ জাতকের কাহিনী চিত্রিত।
বানর রাজা সুন উখোং, সম্ভবত চরিত্রটি ভারতের হনুমানজির অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট

তাং সাম্রাজ্যের শত্রু অবশ্য কম ছিল না। ইরানীরা যেমন তুরানের যাযাবরদের একরোখা বর্বর বলে তুলে ধরেছে শাহনামার মত মহাকাব্যে, তেমন চীনারাও এদেরকে ‘পশ্চিমের ডাকাত’ নামে ডাকত। বিভিন্ন ট্রাইবের তুর্কীভাষী এসকল জনপদ আবার নিজেদের মধ্যেও লড়ত। চীনাদের সাথে মিত্র হিসাবেও যোগ দিত, কখনো হত শত্রু। এসকল যাযাবরদের ঠান্ডা রাখার জন্যে তাদের সাথে তাং সম্রাটরা নানা কূটনৈতিক চুক্তি সাক্ষর করে। সে অনুযায়ী একে অন্যের পরিবারের সাথে বিবাহসূত্রে তারা আবদ্ধ হয়।

নতুন একটি সাম্রাজ্য অবশ্য চীনের দক্ষিণপশ্চিমে এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। সেটি তিব্বত। এরাও মূলত যাযাবর। আর সপ্তম শতক থেকে শুরু করে এরা চীনাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। তারিম বেসিন পুরোপুরি তিব্বতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াতে চীনাদের পশ্চিমে যাবার রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়াতে তাং বাণিজ্যপ্রভাব ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সবচে বড় প্রতিবন্ধক ছিল তিব্বত সাম্রাজ্য।

আরব সেনাদল এসময় মধ্য এশিয়ার মারি-সমরখন্দ জয় করে বেশি পূর্বে আর অগ্রসর হয়নি। এরপরে মধ্য এশিয়ার বিশাল স্তেপভূমি আর গোবি-তাকলামাকান মরুভূমি। জনশূন্য বিশাল এলাকার মাঝে একটি-দুটি মরূদ্যান শহর। কেন্দ্রীয় কোন শাসনব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে করারোপের মত যথেষ্ট জনসংখ্যা নেই। বিশাল সাম্রাজ্যও নেই জয় করার মত। তখন ইউরোপের সাথে সিল্ক রোড বাণিজ্যও তেমন বেশি নয়। সব মিলিয়ে উমায়্যা খলীফাদের তেমন কোন অর্থনৈতিক ইনসেন্টিভ ছিল না মধ্য এশিয়ার আরো অভ্যন্তরে ঢোকার।

সিল্ক রোডের পশ্চিম চীন প্রান্তের তুরপান শহরের প্রাচীন ভবন। তাকলা মাকান মরুভূমি পেরিয়ে চীনা তুর্কীস্তান কিংবা শিনজিয়াংএ এসে এই মরুদ্যান শহরে পৌঁছত সওদাগরি কাফেলা।

চীনাদের অবশ্য এ অঞ্চলের প্রতি প্রাচীনতা থেকে আগ্রহ ছিল। প্রথম চীনা সম্রাট শিহুয়াংতি মধ্য এশিয়াতে এক রাজপ্রতিনিধি পাঠান ‘রক্তঘর্ম’ অশ্ব খুঁজে নিয়ে আসার জন্যে। যুদ্ধে নাকি ভীষণ দ্রুততা দিত এ ঘোড়া। আরো নানা ভারতীয় বিলাসদ্রব্য পাওয়া যেত এখানকার বাজারে।

পূর্ব-পশ্চিমের মিলনস্থলের এ রাষ্ট্রগুলো তাই কখনো স্বাধীন, কখনো চীনা প্রটেক্টরেট, এভাবে চলছিল। নবাগত প্রতিবেশী উমাইয়্যা খিলাফতকে এরা চীনের বিরুদ্ধে ব্যালান্সিং অ্যাক্টের জন্যে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে ৭১৫তে একবার আর ৭১৭তে আরেকবার উমাইয়্যা সেনাদল তাংদের মিত্র তুর্কী জাত তুর্গেশদের মুখোমুখি হয়।

৭৪৭এ উমাইয়্যাদের পতন ঘটে আব্বাসী অভ্যুত্থানের মুখে। ক্ষমতার কেন্দ্র সিরিয়া থেকে পরিবর্তিত হয়ে আসে ইরাক-ইরানে। সাসানী সাম্রাজ্যেরই একরকম পুনরুত্থান ঘটে পারসিক প্রভাব বাড়ার সাথে। বাগদাদের আব্বাসী খলীফাদের দৃষ্টি হয় প্রাচ্যমুখী। আর নতুন ‘সাম্যবাদী’ খেলাফত প্রতিষ্ঠার সাথে বেশ একটা জিহাদী জোশও চলে আসে আরব-অনারব দু’জাতের মুসলিমদের মধ্যে।

আব্বাসী খেলাফতের মানচিত্র

৭৫১তে মধ্য এশিয়ার দুই রাজ্য ফারগানা আর শাশ (তাশখন্দ) একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। শাশের বিরুদ্ধে তাং সাম্রাজ্যের সাহায্য প্রার্থনা করে ফারগানা। কোরিয়ান তাং জেনারেল গাও শাশে আক্রমণ চালিয়ে সেখানকার অধিকর্তাকে হত্যা করেন। শাশের রাজপুত্র পালিয়ে গিয়ে আব্বাসী বিপ্লবের অন্যতম নেতা মারি-সমরখন্দের গভর্নর আবু মুসলিমের দরবারে গিয়ে হাজির হন। এভাবে আব্বাসীদের সাথে তাং সাম্রাজ্যের সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

আব্বাসী খেলাফতের সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হয় বৌদ্ধ তিব্বত সাম্রাজ্য। অমুসলিম তুর্কী যাযাবর তুর্গেশরাও সাহায্যের হাত বাড়ায়। সব মিলিয়ে প্রায় লাখখানেক সৈন্য নিয়ে বর্তমান কাজাকস্তানের তালাস নদীর উপত্যকায় সমবেত হয় আব্বাসী সেনাদল। চীনাদের সেনাশক্তিও কম ছিল না। অবশ্য এ সব সংখ্যার অনেক কমবেশি হতে পারে।

তিব্বতী সাম্রাজ্য, ৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ
বর্তমান কাজাখস্তানে অবস্থিত তালাস নদী

তিনদিনব্যাপী ভীষণ যুদ্ধ হয় দুই দলের মধ্যে। যুদ্ধের শেষভাগে তাংদের মিত্র কারলুক তুর্কী যাযাবররা দলত্যাগ করে শত্রুদের সাথে যোগ দেয়। তাতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় চীনা সেনাশক্তি। সেনাপতি গাও পশ্চিম থেকে জান নিয়ে পালিয়ে ফেরেন মূল তাং ভূমিতে। প্রতিশোধ নেবার জন্যে নতুন সেনাদল গড়ে তুলতে না তুলতেই ৭৫৫তে খোঁজ আসে যে বেজিংয়ের দিকে এক বিশাল বিদ্রোহীদল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে তাং সেনাপতি আন লুশান। নিজেকে তিনি ইয়ান নামে নতুন এক বংশের সম্রাট দাবি করে বসেছেন। আব্বাসীদের কথা ভুলে সেনাপতি গাওকে উল্টোদিকে রওনা দিতে হয় তাং সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য।

আন লুশান বিদ্রোহে পরবর্তী আট বছর বিপর্যস্ত হয় সমগ্র উত্তর চীন। পশ্চিমে সাম্রাজ্যপ্রসারের স্বপ্ন আপাতত শিকেয় তুলে রাখতে হয় তাংদের।

তালাসের যুদ্ধ, ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দ

অপরদিকে আবু মুসলিমের জিহাদী জোশেও ব্রেক কষে দেন নতুন আব্বাসী খলীফা আল-মনসুর। আবু মুসলিমের জনপ্রিয়তা আর বিশেষত শিয়া মতাদর্শীদের অন্ধ সমর্থনের কারণে শত্রুতা বেড়ে চলে খলীফার সাথে। ষড়যন্ত্র করে ‘জিন্দিক’ বা ধর্মপরিত্যাগকারী সাব্যস্ত করে আবু মুসলিমকে হত্যা করেন আল-মনসুর। এরপর আব্বাসীরাও মধ্য এশিয়ায় নতুন সামরিক অভিযান পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

অর্থাৎ দুই সাম্রাজ্যই মোটামুটি একটা স্থিতিশীলতায় আসে। শ’দুয়েক বছর ধরে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের একটা সীমানা দাঁড়া হয়ে যায় এ অঞ্চলে। এ সীমানা অবশ্য দ্বাদশ শতাব্দীতে পদদলিত করে চেঙ্গিস খান আর তার মোঙ্গোল হোর্ড।

তালাসের যুদ্ধ নিয়ে আজকালকার মানুষ খুব বেশি কিছু জানে না। চীনারা এর কিছু বিবরণ লিখে গেছে। তাতে নিজেদের পরাজয়ের সাফাই গেয়েছে। আর আরব ইতিহাসবিদরাও দুয়েক জায়গায় এর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু খুব বেশি গুরুত্ব দেননি।

কিন্তু এ যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এরপর মধ্য এশিয়ার পশ্চিমভাগ সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে, যদিও এরা ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করে আরো শ’খানেক বছর পর। চীনা বাণিজ্য যায় কমে।

মধ্য এশিয়া হয়ে ভারত থেকে চীনে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের যে সাপ্লাই লাইন সেটা কেটে যায়। অবশ্য এসময় ভারতে নতুন করে হিন্দু ধর্মের প্রভাব বাড়ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের জন্যে চীনা-জাপানী-কোরিয়ানদের তাই খুঁজে নিতে হয় স্বকীয়তা। এর ফলে শুরু হয় শাওলিন, চান, জেন, প্রভৃতি স্থানীয় জাতের বৌদ্ধধর্ম। তাদের শিল্পসংস্কৃতিও ভারতীয় প্রভাব থেকে স্বাধীন হতে থাকে।

চীনা ‘চান’ বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম নিদর্শন ‘হাস্যরত বুদ্ধ’। আসলে ইনি লোককাহিনীতে বর্ণিত এক চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু। ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মে এরকম কিছু নেই। অর্থাৎ চীনা বৌদ্ধ ধর্ম হয়ে গেছে স্বতন্ত্র।

এ হল তালাস যুদ্ধের কালচারাল ইমপ্যাক্ট। এর থেকেও বড় যে ইমপ্যাক্ট তা টেকনোলজিকাল। সেটা হলো কাগজ তৈরির প্রযুক্তি। নবম শতকের আগে শুধুমাত্র চীনারা জানত কিভাবে তুঁত গাছের বাকল থেকে মালবেরি পেপার প্রস্তুত করা যায়। এ ছিল তাংদের রাষ্ট্রীয় টপ সিক্রেট জ্ঞান। সিল্ক রোডের কোন বণিকের সাধ্য ছিল না কাগজ তৈরির কারখানায় ঢোকার। চীনের বাইরে বাকি বিশ্বের লেখাপড়া চলত ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরায় (শার্ড) আঁকিবুঁকি করে, নয়ত পশুর চামড়ার পার্চমেন্টে লিখে। এসবই ছিল খুব কঠিন প্রক্রিয়া।

চীনের ফাং মাতানে আবিষ্কৃত প্রাচীনতম কাগজের নিদর্শন, আনুমানিক দ্বিতীয় খৃষ্টপূর্বাব্দ।

তালাস যুদ্ধে আব্বাসীরা হাজার কয়েক তাং সৈন্য ও প্রযুক্তিবিদদের যুদ্ধবন্দী করে। এদের মধ্যে ছিল কাগজওয়ালারাও। প্রথমে সমরখন্দে এদের নিয়ে যাওয়া হয়। কাগজ বানানোর কৌশল তাদের কাছ থেকে শিখে নেয় স্থানীয় শিল্পীরা। এর বছর পঞ্চাশেক পরেই বাগদাদে কাগজ তৈরির কারখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

কাগজের প্রযুক্তিলাভের ফলে আব্বাসী খেলাফতে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিস্তারে বিশাল একটা বিপ্লব আসে। শুধু কুরআন-হাদীস নয়, দর্শন-বিজ্ঞানেরও চর্চা সহজলভ্য করে দেয় কাগজ। এ জোয়ারে সওয়ার হয়ে আসে নবম-দশম শতকের ইসলামী স্বর্ণযুগ। কাগজে যেভাবে কালিকলমে লেখার প্রক্রিয়া, ক্যালিগ্রাফি একমাত্র সে মিডিয়ামেই সম্ভব। চীনাদের ক্যালিগ্রাফি সর্বজনবিদিত। সম্ভবত একইভাবে আরবী ক্যালিগ্রাফিরও যাত্রা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্য আর পশ্চিমা বিশ্বের প্রথম লাইব্রেরিগুলিও প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাসী খেলাফতে।

১১৮০তে পূর্ব ইরানে কাগজে তৈরি কুরআনের ক্যালিগ্রাফিক ফোলিও (নিউ ইয়র্কের মেট মিউজিয়াম)
ডানে একাদশ শতকের চীনা সং রাজবংশের সময়কালীন কাগজে আঁকা ক্যালিগ্রাফি (তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম)

একাদশ-দ্বাদশ শতকের মধ্যে কাগজ পৌঁছে যায় স্পেনের উমায়্যা খেলাফতে। সেখানে পড়তে আসা ইউরোপীয়রাও পায় কাগজ তৈরির প্রযুক্তি। তারপর পঞ্চদশ শতকে গুটেনবের্গ, বাঁধানো বই, রেনেসাঁস, এজ অফ রিজন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই ‘পেপার ট্রেইল’ ধরে সামনে হাঁটলে আমরা এরকম বৈপ্লবিক অনেক কিছুই পাই। আজকে কাগজ নষ্ট করতে আমাদের বাঁধে না। অথচ ছোটবেলায় শিখেছি কাগজ অমূল্য একটা জিনিস। আসলেই তাই! প্রমিথিউসের আগুন চুরির মত কাগজের রহস্যটাকেও ভেদ করে কেড়ে নিয়ে আসতে হয়েছিল বাকি বিশ্বের জন্যে। যদি না এরকমটা হত, তালাসের যুদ্ধ না হত, আর যুদ্ধে আব্বাসীরা না জিতত, তাহলে হয়ত কাগজের জন্যে ইউরোপকে অপেক্ষা করে বসে থাকতে হত আরো একশ’ বছর। সেই অল্টারনেট হিস্টরি কল্পনার কাজটা আপনাদের হাতে সমর্পণ করে আজকের মত শেষ করলাম।

আফ্রিকার দাসবাণিজ্য

হাতির দাঁতে বানানো অসাধারণ এ মুখোশটি প্রদর্শিত হচ্ছে নিউ ইয়র্কের মেট মিউজিয়ামে। তৈরির স্থান পশ্চিম আফ্রিকার বেনিন সাম্রাজ্য, কাল আনুমানিক ১৫২০। মডেল, সাম্রাজ্যের অধিকর্তার (ওবা) রাণীমাতা স্বয়ং। মাতৃকুলীন সমাজব্যবস্থায় তাঁর অপরিসীম প্রভাব ছিল, যেটা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে তাঁর প্রতিচ্ছবিতে।

হাতির দাঁতে তৈরি বেনিনের রাণীমাতার আদলে মুখোশ, নিউ ইয়র্ক মেট মিউজিয়াম, ষোড়শ শতক।

ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল আফ্রিকার মানুষ উন্নত সভ্যতা স্থাপনের উপযুক্ত নয়। এ চিন্তার মূলে দাসপ্রথা আর বহু শতক পূর্বের দু’জাতের সমতাপূর্ণ সম্পর্কের বিস্মরণ। তারপর আবিষ্কৃত হয় কিছু অসাধারণ ব্রোঞ্জ মূর্তি, আর বেনিন রাজ্য থেকে লুটতরাজ করে ব্রিটিশরা নিয়ে আসে এরকম কিছু প্রাচীন নিদর্শন। এসব মন্দ কাজের ভাল প্রতিফলও আসে। পশ্চিমা গবেষকরা ত্রিশের দশক থেকে নতুন করে আফ্রিকার প্রাচীন ইতিহাস উদ্ঘাটনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ফিরে আসি মুখোশ প্রসঙ্গে। একটু খেয়াল করে দেখলে মুখোশের চারধারে একটা অদ্ভূত জিনিস চোখে পড়বে। রাণীমাতার কোঁকড়ানো চুলের একেকটি বিনুনি কিন্তু চুল নয়! অদলাবদলি করে মাডফিশ নামে এক মাছের প্রতিকৃতি, আর এক পর্তুগীজ নাবিকের শ্মশ্রুমন্ডিত মুখাবয়ব! (২য় ছবি)

বেনিনের রাণীমাতার মুখোশের ডিটেইল।

আইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের অবক্ষয়ের মধ্যে উত্থান স্বাধীন পর্তুগাল রাজ্যের। চতুর্দশ শতকে আরব প্রযুক্তি সম্বল করে একটি নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন প্রিন্স হেনরি দ্য ন্যাভিগেটর। নতুন নতুন দূরপাল্লার সব জাহাজ তৈরি শুরু হয়। সেগুলি নিয়ে আটলান্টিকের তীর ধরে দক্ষিণে যাত্রা শুরু করে তারা। মূল লক্ষ্য, ইতালির জেনোয়িজ আর তুরস্কের অটোমানদের একচেটিয়া প্রাচ্যদেশীয় বাণিজ্যের বিকল্প পথ বের করা।

সেই অভিযানের প্রথম পর্ব আমেরিকা-ভারত নয়, ছিল আফ্রিকার আবিষ্কার। ১৪৬০ থেকে শুরু করে ১৪৯০এর দশক পর্যন্ত পর্তুগীজরা একে একে কাবো ভের্দে দ্বীপপুঞ্জ, সেনেগাল, গাম্বিয়া, সিয়েরা লেওন, নাইজেরিয়া, বেনিন প্রভৃতি অধুনা আফ্রিকান দেশগুলির উপকূলে অবতরণ করে।

এসব সাবসাহারান দেশগুলি মোটেও অনুন্নত ছিল না, কোন কোনটি ছিল পুরোদস্তুর সাম্রাজ্য। এদের মধ্যে মালি, বেনিন, সোনিনকে, মালিনকে ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। কিছু কিছু জাতি সাক্ষর ছিল যেমন মালির তিমবাক্তু ইসলামী-আরবী সংস্কৃতির ধ্বজাধারী ছিল। আর বেনিন-নাইজেরিয়ার রাজ্যগুলি সাক্ষর না হলেও কাঠ, আইভরি, ব্রোঞ্জ শিল্পে অগ্রসর ছিল।

পর্তুগীজদেরকে এসব জাতি প্রথমে ভেবেছিল তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের প্রত্যাবর্তিত আত্মা হিসাবে। তাদের ধর্মে সাগর ছিল জীবিত-মৃতের মধ্যে পৃথককারী পর্দা। পর্তুগীজদের শ্বেত বর্ণও তাদের সে ধারণার সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ প্রথম সে মোলাকাতে আমেরিকার অ্যাজটেক-ইংকাদের মত শ্বেতাঙ্গদের দৈবশক্তির প্রতিনিধি হিসাবে ভাবার যথেষ্ট কারণ ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে যত সময় গেছে দু’জাতির মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রগাঢ় হয়েছে। পর্তুগীজ বণিকরা বেনিন, সাপি, কোংগো রাজ্যে তৈরি আইভরি বা হোয়াইট গোল্ড নিয়ে স্বদেশে বিক্রি করেছে। বিনিময়ে আফ্রিকার রাজ্যগুলি কিনেছে পর্তুগীজ আগ্নেয়াস্ত্র।

আজকে অনেকে আফ্রিকান বলতে একটি অভিন্ন জাতি ভেবে থাকলে ভুল ভাববেন। বিভিন্ন ভাষাপরিবারের বিভিন্ন গোষ্ঠী কালের পরিক্রমায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে। এদের মধ্যে সংঘাতও হয়েছে। উপকূলীয় রাজ্যগুলির জন্যে অভ্যন্তরের সাম্রাজ্যগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে বন্দুক ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিনি পর্তুগীজ সল্ট সেলারে চিত্রিত হয়েছে ইউরোপীয় যোদ্ধা, ষোড়শ শতক, ম্যুজে দ্য কে-ব্রঁলি

এছাড়াও পর্তুগালে ছিল সোনা, মরিচ ও রকসল্টের বিশাল চাহিদা। সেগুলিরও সাপ্লাই আসে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে। ৩য় ছবির বেনিন আইভরিতে তৈরি সল্টসেলারটিতে পর্তুগীজ যোদ্ধাকে চিত্রিত করা হয়েছে।

আরো যে রসদটির যোগান দেয় পর্তুগীজদের নেটিভ দোসররা তা হলো কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। আটলান্টিকের দাসবাণিজ্যের শুরু কিন্তু এটা নয়। আফ্রিকার রাজ্যগুলিতে আগে থেকেই দাসপ্রথা ছিল। ভিন্নজাতের শত্রুদের পরাজিত করে দাস বানিয়ে তাদের গতর খাঁটানো হত। তাছাড়াও উত্তরের ‘বারবারি কোস্টের’ মুসলিম রাজ্যগুলি দাসব্যবসা করত। একই রকম অবস্থা বিরাজমান ছিল ভারত মহাসাগরের উপকূলে। সেখানে জানজিবার দ্বীপ ছিল আরবে দাস রপ্তানির ঘাঁটি।

পর্তুগীজ-স্প্যানিশ ও পরবর্তীকালের ব্রিটিশ-ফরাসী-ডাচরা কিন্তু চাইলেই হৈচৈ করে আফ্রিকান দাস ধরে নিয়ে যেতে পারত না। আফ্রিকার অভ্যন্তর অঞ্চলে ঢোকার সাধ্য তাদের ছিল না। কারণ জলাজঙ্গলের ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগশোককে তারা ভীষণ ভয় পেত। আর কম লোকবল নিয়ে বিশাল সেনাশক্তির সাম্রাজ্যগুলির মোকাবিলা করার সাহস-সামর্থ্যও তাদের ছিল না। আফ্রিকার কলোনিয়ালাইজেশন তুলনামূলক অধুনার ইতিহাস — মোটে ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ। ততদিনে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে।

ঊনবিংশ শতকের পশ্চিমাদের মত মধ্যযুগীয় পর্তুগীজরা যে কৃষ্ণাঙ্গ মানেই দাস এরকম মনোভাব পোষণ করেনি। বরং তারা নিজেদের পড়শী গ্রানাদার মুসলিম রাজ্যগুলিতে দেখেছে শ্বেতাঙ্গ খ্রীষ্টানদের ধরে দাস বানানো হয়েছে। কোন ক্ষেত্রে অনেক ইউরোপীয় দেশে ঋণগ্রস্তরাও দাসে পরিণত হত। অপরদিকে তুরস্ক ও উত্তর আফ্রিকার সুলতানরাও দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ দেশগুলি থেকে ক্রীতদাস পাচার করত। তাদের অনেকে ছিল সেক্সুয়াল স্লেভ যাদের স্থান হত সুলতানের হারেমে — ছেলে-মেয়ে দুইই।

অর্থাৎ পর্তুগীজদের সাথে প্রথম মোলাকাতের পর আফ্রিকার একাধিক প্রভাবশালী রাজ্যই তাদের দাস সাপ্লাই দিয়েছে। আর কৃষ্ণাঙ্গ মানেই দাস এটাও ইউরোপে ছিল না। ৪র্থ ও ৫ম ছবিতে রেনেসাঁস যুগে অংকিত চিত্রকর্মে বনেদী কৃষ্ণাঙ্গ দুই ব্যক্তির ছবি দিয়েছি। সত্যি বলতে একটা সময় দাস আর বনেদীবংশ মিলে কৃষ্ণাঙ্গরা লিসবন শহরের জনসংখ্যার দশ শতাংশ হয়ে যায়।

১৫৭০ থেকে ১৫৮০র মধ্যে আঁকা এ ছবিতে পর্তুগালের লিসবন বন্দরের দৈনন্দিন দৃশ্য দেখানো হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ ঘোড়সওয়ারের পাশাপাশি আরো বেশ কিছু কসমোপলিটান ব্যাপারস্যাপার চলে এসেছে।
১৫২০/২৫এ ডাচ চিত্রকর ইয়ন মোশতারতের আঁকা পোরট্রেট অফ অ্যান আফ্রিকান ম্যান।

দাসবাণিজ্যে জোয়ার আসতে শুরু করে আমেরিকার আবিষ্কার ও স্প্যানিশদের প্রতিপত্তি বাড়ার সাথে সাথে। একটি ত্রিমুখী বাণিজ্যের সূচনা হয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে। আফ্রিকা থেকে ‘কাঁচামাল’ নিয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে খালাস। সে ‘কাঁচামালের’ শ্রমে উৎপন্ন চিনি, রাম ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য নিয়ে ইউরোপের বাজারে বিক্রি। তারপর ইউরোপের বন্দুক ও ফিনিশড গুডস নিয়ে আফ্রিকায় যাত্রা, বিনিময়ে আবার ‘কাঁচামাল’ জাহাজে উঠানো।

আফ্রিকান শ্রমের এরকম এবিউজ হয়ত হত না যদি না কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন পশ্চিম আফ্রিকার রাজ্যগুলিকে ওলটপালট করে দিত। প্রাচীন মালি সাম্রাজ্য ভেঙে তৈরি ছোট ছোট রাজ্যগুলির সাথে নতুন বড় সাম্রাজ্যগুলির সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। সপ্তদশ শতকে ঘানার আশান্তি সাম্রাজ্য বেশ প্রতাপশালী হয় ওঠে। কৃষিতে কিছু উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ফলে তারা উত্তরে ও পশ্চিমে মালিংকে রাজ্যগুলির সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এর ফলশ্রুতিতে যুদ্ধলব্ধ দাসদের একটা বিশাল বাজার তৈরি হয়।

একই ঘটনা ঘটে আরেকটু পূর্বে। নবাগত দাহোমে জাতি মূল জনগোষ্ঠী এদোদের ওপর শাসন কায়েম করে। সে ব্যবস্থায় বিজিতরা ছিল দাস। দাহোমের উপকূলেও দাসরপ্তানিকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

অর্থাৎ আফ্রিকার পলিটিকাল ল্যান্ডস্কেপ ছিল আটলান্টিক দাসব্যবসার বিশাল আকারের অন্যতম বড় কারণ। ব্রিটিশ-ফরাসী-ডাচরা হয় সেই মার্কেটের এন্ড ইউজার। যদি আফ্রিকান মিডলম্যানরা বলত দাস সাপ্লাই বন্ধ, তাহলে ইউরোপীয়দের পক্ষে শ্রম আমদানির উপায় হত হয় ইনডেনচার্ড সার্ভিচ্যুড — যেটার শিকার দাসপ্রথাপরবর্তীকালে দরিদ্র আইরিশ-স্কটিশ-ইংলিশরা হয়েছে। নয়ত পেইড লেবার।

ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ আর মার্কিনরাই আবার প্রথম দাসব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করে। প্রথমে নিজেদের বন্দরে ক্রীতদাস রপ্তানি নিষিদ্ধ করে এই শতকের প্রথমভাগে। এরপর ব্রিটিশরা জোরপূর্বক স্প্যানিশ-পর্তুগীজ জাহাজে হামলা চালিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্ত করত। ব্রিটিশ-ফরাসীরা উত্তর আফ্রিকার বারবারি কোস্টের সুলতানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় সেসব রাজ্যের জলদস্যুতা আর শ্বেতাঙ্গ নাবিকদের ধরে দাস বানানোর প্রতিশোধ হিসাবে। (৬ষ্ঠ ছবি)

অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগে উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়ার তুর্কিসমর্থিত দা’ইয়ির রাজ্যে শ্বেতাঙ্গ দাসত্বের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলি শোরগোল তোলে। ব্রিটিশ এক কাপ্তানের বর্ণনা সম্বলিত এই পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয় তখন। ১৮১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আলজিয়েরস আক্রমণ করে।

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি নতুন দাস রপ্তানি বন্ধ হলেও মার্কিনদের স্বদেশে এতদিনে যেসব কৃষ্ণাঙ্গ দাসের আগমন হয়েছে, তাদের দাস বংশধরদের মুক্তির কোন ব্যবস্থা হয়নি। তার জন্যে তাদের অপেক্ষা করতে হয় আরো কয়েক দশক ও একটি যুদ্ধের জন্য। পশ্চিমা ও পশ্চিমাশাসিত দেশগুলির মধ্যে সবচে’ শেষে দাসপ্রথা রহিত হয় পর্তুগীজ ব্রাজিলে — ১৮৮০র দশকে।

আরব দেশগুলিতে দাসবাণিজ্য চলে ত্রিশের দশক পর্যন্ত। প্রকারান্তরে এখনো তা চলছে। ৭ম ছবিতে মক্কার এক বণিকের পাশে তার শ্বেতাঙ্গ দাসকে দেখা যাচ্ছে। তার চেহারাতে পূর্ব ইউরোপীয় স্লাভিক ছাঁচ দৃশ্যমান। এরা অটোমান সাম্রাজ্যে পরিচিত ছিল সিরকাসিয়ান হিসাবে।

মক্কার হেজাজী সওদাগরের সাথে তার শ্বেতাঙ্গ সিরকাসিয়ান দাস, ১৮৮৬-৮৭

আফ্রিকান আমেরিকানদের বেদনাময় ইতিহাস এখনো মার্কিন রাজনীতিতে অহরহ আসে। এই বিতর্কে কতটা হিস্টরিকাল কনটেক্সট টানা হয় তা খুবই প্রশ্নসাপেক্ষ। এতে কোন সন্দেহ নেই, মার্কিনদের দাসপ্রথার ক্ষণস্থায়ী ও তুলনামূলক অধুনা ইতিহাসে এর আগের একাধিক শতকের ব্রিটিশ-ফরাসী-ডাচ-স্প্যানিশ-পর্তুগীজ ইতিহাস ঢাকা পড়ে গেছে।

আরো ঢাকা পড়ে গেছে আটলান্টিক দাসব্যবসার কৃষ্ণাঙ্গ মদদকারীদের ইতিহাস। পোস্ট কলোনিয়াল আফ্রিকার প্রথম স্বাধীন দেশ ঘানা। তার প্রথম প্রেসিডেন্ট কয়ামে ন্ক্রুমা প্যান-আফ্রিকান জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা (৭ম ছবিতে চে গেবারার সাথে)। তার হাত ধরেই আরো বহু সাবসাহারান দেশ স্বাধীন হয়। সেসব দেশের স্কুল কারিকুলামে পড়ানো হয় প্রাচীন আফ্রিকান দেশগুলির প্রতিপত্তি-অগ্রগতির কথা। বলা হয়, শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক শক্তিদের অত্যাচারের কথা। সবই খাঁটি কথা। কিন্তু শুধু চেপে যাওয়া হয় ন্ক্রুমার স্বগোষ্ঠী আশান্তিরাই যে ছিল অন্যতম মদদকারী দাসরপ্তানীকারী রাজ্য সে কথা। চেপে যাওয়া হয় পশ্চিম আফ্রিকার এলিট বংশগুলির কথা, যারা দাসব্যবসা করে স্বদেশে বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে ভাল একটি ভবিষ্যত দিয়ে গেছে।

কিউবার বিপ্লবী চে গেবারার সাথে ঘানার প্রেসিডেন্ট কওয়ামে ঙ্ক্রুমা, ১৯৬৫। চে সে যাত্রায় আটটি আফ্রিকান দেশ সফর করে বাছবিচার করেন কোন কোনটিতে বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্র রয়েছে।

২০১৯এ ওয়াল স্ট্রীট জার্নালে একটি সাড়াজাগানো আর্টিকেল লিখে আফ্রিকান জাতীয়তাবাদীদের রোষের শিকার হন আদাওবি নওয়াউবানি নামের এক নাইজেরিয়ান পুরস্কারবিজয়ী লেখক। আজকের পলিটিকাল ক্লাইমেটে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অবিচার নিয়ে যারা সঙ্গত কারণেই সোচ্চার, আশা করি সেটা করার পাশাপাশি মুদ্রার এপিঠটাও তারা একটু উল্টে দেখবেন। আদাওবির লেখাটি পড়তে নিচের ছবিতে ক্লিক করুন।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!