মসলিনের মৃত্যু

ওপরের ছবিঃ ১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ শিল্পী রেনাল্ডির অংকিত চিত্রে ভারতের এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত নারীকে হুঁকাসেবনরত দেখা যাচ্ছে, পরনে মসলিন। সম্ভবত ঢাকায় আঁকা।

ঢাকার মসলিন বুননশিল্পকে নাকি ব্রিটিশরা উদ্দেশ‍্যমূলকভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তন্তুবাঈদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল যাতে আর কখনো তাঁত বুনতে না পারে। ১৭৫০এর দশকে যে বাংলার জিডিপি নাকি সারা বিশ্বের ২৫ শতাংশ ছিল, সেটা নাকি ১৯০০ সালে ২ শতাংশে এসে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধীর লেখা আর তাঁর স্বরাজ-স্বদেশী আন্দোলন আর বহু ব্রিটিশবিরোধী বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই দাবিগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু এগুলির পেছনে সত‍্যতা কতটুকু?

আমার মনে সব সময় প্রশ্ন ছিল, ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো আসলে বেনিয়া। বাণিজ‍্য যেদেশ মুখী হোক না কেন, মধ‍্যসত্ত্বভোগী হিসাবে তাদেরই লাভ। এমনকি ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের আগে একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা ইউরোপ ও এশিয়ার অন‍্যান‍্য দেশের সাথে বাণিজ‍্য চালিয়েই ধনাঢ‍্য হয়ে উঠেছিল। তাহলে এই মসলিনের মত সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে মেরে ফেলাটা কিভাবে উদ্দেশ‍্যপ্রণোদিত হয়!

১৬৬৫ সালের মোঘল মিনিয়েচারে সম্রাট দারা শিকোর সাথে সুলায়মান শিকো— উভয়েই পাতলা মসলিনপরিহিত

প্রথমে বলি আঙুল কাটার এই অপবাদটা কোত্থেকে এল। এই কাহিনীটা রয়েছে উইলিয়াম বোল্টসের “কনসিডারেশনস ফর ইন্ডিয়ান এফেয়ার্স” নামক বইয়ে। ভদ্রলোক ডাচ হয়ে জন্ম নিলেও পরে ইংল‍্যান্ড চলে যান। বেশ কিছু বছর বেংগলে ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন।

১৭৫৯ সালে সে ক‍্যারিয়ার শুরু করার পর নিজে গোপনে প্রাইভেট ট্রেড শুরু করেন, যেটা সে সময়ে ছিল কোম্পানির আইনবহির্ভূত। ফলে ১৭৬৮ সালে তার চাকরি যায়, এবং বেংগল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। বইটি লেখেন ১৭৭২ সালে— অর্থাৎ সেসবের পর। তাঁতীদের আঙুল কেটে ফেলার মত অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর প্রাক্তন প্রভুদের ব‍্যাপারে আরো নানা অপবাদ রয়েছে এই বইয়ে। ফলে কোনভাবেই তাঁকে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক বলা যায় না।

তাছাড়া তিনি এই অভিযোগ যে সময়ে করেছেন সে সময়েই যে বেংগলের বস্ত্রশিল্পে ধ্বস নামে, তার কোন প্রমাণ নেই। বরং তথ‍্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, সেটার শুরু আরো পরে — অন্তত ১৮২৫ সালের পর।

ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের স্ত্রী রাণী হেনরিয়েটা মারিয়া (১৬০৯-৬৯)। চিত্রের কাল ১৬৭০ থেকে ১৬৯৯। রাণীর জামার হাত ও গলার অংশবিশেষ মসলিনের কাপড়ে তৈরি।

এ ব‍্যাপারে আমি মূলত শরণাপন্ন হয়েছি ইন্দ্রজিৎ রায় বলে একজন বাঙালি ইকনমিক হিস্টরিয়ানের লেখা একাডেমিক পেপারের ওপর। ২০০৯ সালে ইকনমিক হিস্টরি রিভিউ নামক প্রখ‍্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়। বহু সমসাময়িক উৎস আর নিজের ও অন‍্যান‍্য গবেষণা থেকে লব্ধ তথ‍্যউপাত্ত তিনি এখানে দিয়েছেন। তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় ধ্বসটা ১৭৬০এর দশকে ঘটেনি। এই পেপার ছাড়াও ‌অন‍্যান‍্য আনুষঙ্গিক তথ‍্য ব‍্যবহার করেছি।

প্রথমত ইন্দ্রজিৎ একটা ভাল পটভূমিকা দিয়েছেন পুরো শিল্প কিভাবে বুম করল তা নিয়ে। বহু আগ থেকেই বঙ্গ বস্ত্রশিল্পের জন‍্য ভূবনবিখ‍্যাত হলেও তার বুমটা হয় ইউরোপীয় মার্ক‍্যান্টাইলিজম তথা ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলির পিঠে সওয়ার হয়ে। ১৬০০ সালে কোম্পানির যাত্রা শুরু হলেও প্রথমে বঙ্গে তাদের মনোযোগটা ছিল না, ছিল ইন্দোনেশিয়ার স্পাইস আইল‍্যান্ডসের ওপর। যখন তারা দেখল যে ইন্দোনেশিয়ানরা মশলা বিক্রির বিনিময়ে ভারতীয় ক‍্যালিকো ও মসলিন কিনতে চায়, তখন সেসব সংগ্রহের জন‍্য ভারতে তাদের ফ‍্যাক্টরি গড়ে উঠতে শুরু করে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৮০১ সালে অংকিত চিত্রে ফরাসী সম্রাট নাপোলেওনের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী জোসেফিন, পরনে মসলিন

হুগলিতে প্রথম ফ‍্যাক্টরি চালু হয় ১৬৫১তে। তারপর ঢাকা আর মালদহ। ঢাকা বিখ‍্যাত ছিল সবচেয়ে উন্নত মানের “ফুটি” কার্পাস তুলার জন‍্য। মসলিন তৈরি হত তার থেকেই। কিন্তু পুরো ফ‍্যাব্রিক শিল্পের কেবল একটা ছোট হাইএন্ড অংশ ছিল মসলিন। বাকিটা ছিল বঙ্গ ও ভারতের অন‍্যান‍্য প্রদেশ থেকে আসা বিভিন্ন গুণ ও মূল‍্যের ফ‍্যাব্রিক। বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ যে বলা হয়, সেটা কেবল মসলিন হতে পারে না, বরং সকল গুণ ও মানের পণ‍্যের কারণে।

শুধু ইন্দোনেশিয়া নয়, খোদ ইউরোপেও এসব কাপড় জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৭৯০ নাগাদ যুক্তরাজ‍্য ছাড়াও পর্তুগাল, ডেনমার্ক, জার্মানি ছিল বড় বাজার। মসলিন ছিল রাজা-মহারাজা আর তাদের দরবারের পছন্দের কাপড়। রাজা দ্বিতীয় চার্লস স্বয়ং ভারতীয় সুতি ও মসলিন পরে ঘুরে বেড়াতেন। বলা যায় ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে ভারতীয় কাপড়ের ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর ছিলেন। বেশ কিছু মোঘল ও ইউরোপীয় বনেদী লোকজনের চিত্র দিয়েছি, যাতে তাদেরকে মসলিনপরিহিত দেখা যাচ্ছে।

ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মসলিন, তারিখ বলা হচ্ছে ১৮৭২এর আশেপাশে
ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত “মলমল খাস” গ্রেডের ঢাকাই মসলিন, তারিখ ১৮৫১
নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্টে সংরক্ষিত ঢাকাই জামদানি, তারিখ ১৮৮০
জাপানে রপ্তানিকরা সারাসা নামক ভারতীয় সুতি বস্ত্র, ১৮০০এর দশক

বিভিন্ন অফিশিয়াল হিসাব ঘাঁটিয়ে পেপারটিতে এসেছে যে, ১৬৫৮ থেকে ১৬৭৮এর মধ‍্যে কেবলমাত্র ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বস্ত্র ব‍্যবসার পরিমাণ ১৫ গুণ বৃদ্ধি লাভ করে। সেটা বাৎসরিক গড়ে ১৪.৫%। ১৬৭৮ থেকে ১৬৮৩ ছিল আরো বেগবান— বাৎসরিক ৯৬.৭৫%, অর্থাৎ প্রতি বছর পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছিল!

এর বিপরীতে কিন্তু ব্রিটেনের কাপড় প্রস্তুতকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এতদিন স্থানীয় যারা উল আর লিনেনের কাপড় তৈরি ও ব‍্যবসা করত, তারা হঠাৎ করে নতুন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হল। কেননা লিনেন-উলের বিপরীতে ভারতীয় সুতি কাপড় ছিল অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক। বনেদীরা যেখানে মসলিন পড়ছে, সেখানে সাধারণ মানুষও সুতি কাপড়ের দিকে ঝুঁকছে। আর সুতি কাপড়ের কাঁচামাল তুলার উৎপাদন ইংল্যান্ডের জলবায়ুতে অসম্ভব।

অসন্তোষ থেকে কিছু ভাঙচুরও হল। ফলে ব্রিটিশ সরকার — মাইন্ড ইউ, দে আর নট দ‍্য সেইম অ‍্যাজ দ‍্য কম্পানি — ভারতীয় সুতি কাপড়ে ১৬৮৫তে ১০% শুল্ক আরোপ করে। ১৬৯০এ সেটা বেড়ে হয় ২০%।

কিন্তু এর বিপরীতে প্রাপ্ত আমদানি-রপ্তানি তথ‍্যে দেখা যায়, ১৬৯৮-১৭০০ পিরিয়ডে ব‍্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.৮৫ গুণ। অর্থাৎ ইংলিশ প্রটেকশনিস্টদের শত অভিযোগ ও শুল্ক সত্ত্বেও ভারতীয় কাপড়ের চাহিদা বাড়বাড়ন্তই ছিল।

ফলে আরো অভিযোগের মুখে কঠোরতম অবস্থান নিতে বাধ‍্য হয় ব্রিটিশ সরকার। ১৭০০ সালের ক‍্যালিকো অ‍্যাক্টে ভারতীয় সুতি কাপড় আমদানি পুরোপুরি নিষেধ করে দেয়া হয়। কাউকে যদি সেটা ব‍্যবহার করতে দেখা যায়, তাহলে বিশাল অংকের জরিমানা অবধারিত। তবে রি-এক্সপোর্ট করা যাবে, ১৫ শতাংশ শুল্কের পর।

এর ফলে উল্টো কালোবাজারের প্রভাব গেল বেড়ে। আর রি-এক্সপোর্ট মার্কেট ছিল নেদারল‍্যান্ডস, ইউরোপের অন‍্যত্র আর আমেরিকান কলোনিগুলিতে। বিশেষ করে আমেরিকান সাউথে লিনেন ও উলের থেকে কটন ফ‍্যাব্রিক ছিল বেশি গ্রহণযোগ‍্য।

ইংল‍্যান্ডে প্রকাশিত একটি বইয়ে দেখানো মসলিন প্রস্তুতপ্রক্রিয়া, ১৮৬৬

আরো কিছু কথা না বললেই নয়। ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছাড়াও এ ব‍্যবসায় ছিল ডাচ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু নেদারল‍্যান্ডসে এমন কোন উচ্চ শুল্ক ছিল না। তাছাড়াও এশিয়ার অন‍্যান‍্য দেশ, যেমন জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসের রাজ‍্যগুলি, পারস‍্য ও গাল্ফে বেংগল ফ‍্যাব্রিকের অসম্ভব চাহিদা ছিল। দুই ঈস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি মিলে সে ব‍্যবসাটাও করত।

ফলে ১৭১৫ থেকে ১৭৪০এর মধ‍্যে বিজনেস গ্রোথ হয় ৭ গুণ। ব্রিটিশ কাপড় প্রস্তুতকারকদের চলমান অভিযোগের মধ‍্যে ১৭২১ সালে আরোপিত আরো একটি প্রোহিবিশন অ‍্যাক্টও এ ব‍্যবসার গতি বন্ধ করতে পারেনি।

ব‍্যবসায় একটু মন্দা আসে ১৭৫০এর শেষ থেকে ১৭৬০এর দশক পর্যন্ত। এর মূল কারণ ফ্রান্সের সাথে ইংল‍্যান্ডের চলমান বিশ্ব‍ব‍্যাপী সেভেন ইয়ার্স যুদ্ধ (১৭৫৬-৬৩)। এসকল যুদ্ধের একটি হল পলাশী। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ কেবল এই যুদ্ধ নয়, তার আগে বর্গীদের আক্রমণ, আর পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পরেও চলমান নানা অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত ছিল — যেমন বক্সারের যু্দ্ধ (১৭৬৪)। ১৭৭০এর আগে কোম্পানি বঙ্গের প্রশাসনে তেমন কোন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি।

ফরাসীদের সাথে যুদ্ধের আগ থেকেই কিন্তু শুধু ভারতীয় নয়, ফ্রান্স থেকে আসা রেশমী কাপড় নিয়েও বেশ উৎকন্ঠিত ছিল কাপড় প্রস্তুতকারীরা। ফরাসী রেশম আর ভারতীয় ক‍্যালিকোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বহু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাজারে হাজারে কর্মী চাকরি হারিয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অভুক্ত, বস্ত্রহীন জীবনযাপন করছে। ১৭৫০/৬০এর দশকে ইংল‍্যান্ডের শ্রমজীবী শ্রেণীর এই বাস্তবতা একাধিক ঐতিহাসিক উৎসে পাওয়া যায়।

স্বভাবতই ভারতীয় সুতি নয় শুধু, ফরাসী মালের ওপরও কঠোর শুল্ক আরোপিত হয়। সেটা চালু ছিল ১৮৬০এর দশক পর্যন্ত, যেখানে ভারতীয় পণ‍্যের ওপর শুল্ক প্রত‍্যাহার করে নেয়া হয় ১৮২৬ নাগাদ।

ইন্দ্রজিতের পেপারে দেখানো বঙ্গের বস্ত্র আমদানি রপ্তানির চার্ট

উপাত্ত দেখে জানা যায় যে, ১৮০০ সালের আশপাশ দিয়ে ছিল বঙ্গের বস্ত্রবাণিজ‍্যের পীক। ১৭৯৩ সালে বঙ্গের বস্ত্রশিল্পে — মসলিনসহ সকল ফ‍্যাব্রিকে — কোম্পানির বিনিয়োগ ছিল ৬৬ লক্ষ সিক্কা রূপী। ১৭৯৫এ কোম্পানি তার “সার্ভ‍্যান্টদের” প্রাইভেট বা ফ্রী ট্রেড করার অনুমতি দেয়। অর্থাৎ তারা সামান‍্য ফীয়ের বিনিময়ে কোম্পানির জাহাজ ও গুদাম ব‍্যবহার করে নিজেরা ব‍্যবসা করতে পারবে। কোম্পানির মনোপলি ভাঙার কারণে সম্ভবত একটা বড় বুস্ট পায় বস্ত্রশিল্প।

১৮০০এর পর একটা মন্দা দেখা দেয় মার্কেটে। এর কারণ আবারো ইউরোপের ডামাডোল। নাপোলেওঁ বোনাপার্ত প্রায় পুরো ইউরোপ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ওপর আরোপিত হয়েছে কন্টিনেন্টাল ব্লকেড। ফরাসী নৌবাহিনীর চোখ এড়িয়ে কোন জাহাজ ভেড়ানোর উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় কাপড়ের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৮১৫তে নাপোলেওনের পরাজয়ের পর আবার ব‍্যবসায় প্রাণ ফিরে আসে। ১৮১৬এর দিকে আরেকটা পীক দেখা যায়। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের যে শুল্কটা ভারতীয় বস্ত্রের ওপর ছিল, সেটা প্রত‍্যাহার করা হয় ১৮২৬ সালে। রপ্তানিতে ধ্বসটা নামে ১৮৩০এর দশকে আর কলকাতার বস্ত্রের রপ্তানি তারপর ধীরে ধীরে প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে আসে।

ইন্দ্রজিতের পেপার থেকে কলকাতা বন্দর হতে রপ্তানিকৃত সূতিবস্ত্রের পরিসংখ‍্যান

তার মানে দাঁড়াচ্ছে শুল্কের প্রভাব রপ্তানির অধঃপতনের সাথে সরাসরি কোরিলেটেড নয়।

১৮৩০এর পর থেকে ট্রেন্ড পুরোপুরি বিপরীতমুখী— অর্থাৎ বহির্বিশ্ব থেকে বস্ত্র কলকাতার বন্দরে আসছে, আর তার বৃদ্ধি হয়েছে এক্সপোনেনশিয়াল। ভারতে বাইরে থেকে আমদানি করতে কর দিতে হত কেবল ২.৫%। এটা কোম্পানির হাতে ছিল, ব্রিটেনের শুল্কটা তাদের হাতে ছিল না।

এই যে বাইরের কাপড়ের এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ, এর কারণটা আর কিছুই নয়, শিল্প বিপ্লব। যার ফলে মিলের কটন ইয়ার্ন আর তৈরি কাপড় অসম্ভব সস্তায় বিক্রি করা সম্ভব হয়।

ইন্দ্রজিতের পেপার থেকে বিলেতে আমদানিনিষিদ্ধ বেআইনী সূতি কাপড়ের ব‍্যবসার পরিসংখ‍্যান

১৭৩০এর দশক থেকেই বস্ত্রশিল্পে নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হতে শুরু করে। ১৮০০ সালের পর থেকে ইংল‍্যান্ডে যে হারে মিল গড়ে উঠতে শুরু করে তা ছিল দেখার মত। ১৮০০ সালের আগে যেখানে বহু মিল ছিল ওয়াটার হুইল চালিত, সেগুলিও পরিবর্তিত হয়ে যায় বাষ্পচালিত প্রযুক্তিতে।

অপরদিকে তুলোর মত কাঁচামালও সস্তায় আসতে শুরু করে নতুন এক জায়গা থেকে — আমেরিকান সাউথ। আগের কনজিউমার, এখন মাস প্রডিউসার। তাদের জলবায়ুও তুলোর উপযুক্ত। সেখানে ক্রীতদাসের পারিশ্রমিকহীন শ্রমের ওপর ভর করে আর কটন জিনের মত যন্ত্রের আবিষ্কারের (১৭৯৩) কারণে তুলোর প্রস্তুতিখরচ অত্যন্ত কমে যায়। ১৮৬০ নাগাদ সারা বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ তুলো আসত আমেরিকান সাউথ থেকে।

ইংল‍্যান্ডের নতুন প্রযুক্তির মিলগুলিতে কাজ করত মূলত অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। আগের তাঁতীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই আবার অসন্তোষ বাড়তে শুরু করল। “লাডাইট” নামক গোষ্ঠিটির উদ্ভব এখানেই। এরা রাতবিরাতে ফ‍্যাক্টরিতে আক্রমণ চালিয়ে কটন মিলের পার্টস ধ্বংস করে ফেলত। মিলের মালিক-কর্মচারীদের বেনামী চিঠি দিয়ে হুমকি দিত। এদের পীক ছিল ১৮১০এর দশকে। লিভারপুল ও অন‍্যান‍্য কিছু শহরে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেলে ১২,০০০ সেনা পাঠিয়ে সেসব দমন করা হয়। লাডাইটদের নেতাদের অনেকের গর্দান যায়। বহু সাধারণ লাডাইটকে নির্বাসনের প্রাণদন্ড দেয়া হয়— এরাই এসে হাজির হয় অস্ট্রেলিয়ার পেনাল কলোনিগুলির মত জায়গায়।

১৭১৯-২০ সালে স্পাইটলফীল্ড এলাকার তাঁতকর্মীদের রায়টের ফলে ব্রিটিশ সরকার ক‍্যালিকো এক্ট ১৭২১ প্রবর্তন করে। সংবাদপত্রের এই কার্টুনে তাঁতশিল্পে জড়িত নানা শ্রমিকদের আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যাচ্ছে।
১৮১১ সালের কার্টুনে দেখানো হয়েছে লাডাইটরা কিভাবে তাঁতযন্ত্র ধ্বংস করত
১৭৯০এর দশকে আমেরিকার মিসিসিপিতে কটন প্ল‍্যান্টেশন ও দাসশ্রমের চিত্র
১৮০৮ সালে চ‍্যারিংক্রস পিলোরি — লাডাইটদের জনসম্মুখে বিচার করে প্রাণদন্ড ও নির্বাসন দেয়া হয়

মেকানাইজেশেনের উপযুক্ত কাঁচামাল কটনও সহজলভ‍্য হয়। দেখা যায় প্রযুক্তির সাহায‍্যে অদক্ষ শ্রমিকও মাইলের পর মাইল কাপড় বানাচ্ছে। অর্থাৎ শিল্পায়নের মাধ‍্যমে ইংল‍্যান্ডের স্থানীয় তাঁতীদের কোমর বঙ্গের তাঁতীদের আগেই ভেঙে দেয়া হয়।

নাপোলেওনিক যুদ্ধগুলির পরে মার্কেটের চরিত্রও পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইউরোপের এলিটদের কম্পোজিশন আর আগের মত নেই। আগে রাজার কাছ থেকে বিশাল জোতদারি নিয়ে যারা ধনী হয়ে পড়েছিল, তাদের সময় শেষ— অনেকেই গিয়োটিনে মাথা খুইয়েছে। তাদের স্থান নিয়েছে নুভো রিশ বণিক ও শিল্পপতিরা। এদের কাছে মসলিনের মত কাপড়ের কদরটা আর তেমন ছিল না। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণেও এরা আগের এলিটদের ন‍্যায় কনজারভেটিভ ছিল না।

ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের অগ্রগতির একটা ছোট চিত্র দিই। ১৭৮৮ সালে ব্রিটেনে ৫০ হাজারের মত স্পিন্ডল ছিল তাঁতবুননের জন‍্য। বাষ্পচালিত মিল আসার পর ১৮১২ সালে সে সংখ‍্যা দাঁড়ায় ৪৬ লক্ষে। ১৮৩৫ সালে ব্রিটেনে এক হাজার মিল ছিল, তাদের সিংহভাগ ছিল বাষ্পচালিত। স্পিন্ডলের সংখ‍্যা ৯৫ লক্ষ!

১৭৭০এর দশকে ব্রিটেনে প্রচলিত ওয়াটারহুইলচালিত তাঁতশিল্প
১৮৩৪ সালের চিত্রে ইংল‍্যান্ডের বাষ্পচালিত পাওয়ার লুম
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়াতে টেক্সটাইল মিলে শিশুশ্রমিক, ১৯১০ সাল। যুক্তরাজ‍্যে ১৯৩৩এ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৮এ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
কানেকটিকাটের একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত কটন জিন যন্ত্র। ১৭৯৩ সালে আবিষ্কৃত এ যন্ত্র অত‍্যন্ত সহজে তুলো থেকে তার বীজগুলি আলাদা করে ফেলত।
ইয়র্কশায়ারের সল্টস মিল ভবন, একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারখানা ও টেক্সটাইল মিল, ১৮৫৩ সালে স্থাপিত

শিল্পবিপ্লবের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পরবর্তী ধাক্কাটা আসে বঙ্গ ও ভারতের ওপর। ১৮০০ সাল নাগাদ বঙ্গের এ শিল্পে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৭০০ সাল থেকে কর্মসংস্থানের প্রায় চার গুণ প্রবৃদ্ধি ঘটে। ১৮০০র পর থেকে ব্রিটেন ও ইউরোপ যন্ত্রের মাধ‍্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণ করা শুরু করলে বহির্বিশ্বের বাজার ভারতের হাতছাড়া হয়ে যায়। উল্টো তাদের উদ্বৃত্তের বাজারে পরিণত হয় ভারত। ইন্দ্রজিতের পেপারে হিসাব করে বলা হয়েছে, ১৮৬০ সাল নাগাদ প্রায় ৫,৬৩,০০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অবলুপ্ত হয়। অর্থাৎ পুরো শিল্পের ২৮ শতাংশ।

তবে দুটো ব‍্যাপার বলা জরুরী। কোম্পানির বিভিন্ন দলিলে এই বিপর্যয়ের অ‍্যাকনলেজমেন্ট আছে। প্রশাসকরা পাবলিকলি এ ব‍্যাপারে কমেন্ট করেছেন, তবে সেগুলি আফটার দ‍্য ফ‍্যাক্ট হিসাবে। তাতে তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতা প্রমাণ হয় না। একটি দলিলে বরং উল্লেখ রয়েছে তাদের সংবেদনশীলতার কথা। “They recommended that British piece goods should be sold in Bengal ‘without interfering with or proving injurious to the interest of the native manufacturers, whom we [the Court of Directors] conceive ourselves likewise bound to protect to the utmost of our power’.”

আরেকটা ব‍্যাপার হল, বিলেত (এবং অল্প কিছু মার্কিন) থেকে আসা কাপড়ে স্থানীয় বাজার পুরোপুরি সয়লাব হতে পারেনি। ইন্দ্রজিতের চার্টের ইম্পোর্ট পীক এক্সপোর্ট পীকের চার গুণ, তাও প্রায় আশি বছর পর। এর মধ‍্যে ইন্টার্নাল ডিমান্ড অবশ‍্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া যে কোন প্রডিউসার তাদের কনজামশনের পর উদ্বৃত্তটাই বাইরে পাঠায়। যন্ত্রায়িত না হলে তাদের কনজামশনের একটা ছোট অংশই এক্সপোর্ট হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ নতুন ইম্পোর্ট ইন্টারনাল মার্কেটের একটা সাইজেবল অংশ দখল করতে পারলেও পুরোটা পারেনি।

এর এনেকডোটাল এভিডেন্সও পাওয়া যায়। বিলেতী কাপড় মূলত জনপ্রিয় ছিল নতুন উঠতি শিক্ষিত মধ‍্যবিত্তের মাঝে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের জমিদার পরিবার এমনকি শহুরে নারীদের মাঝে তখনো মসলিন বা দেশি কাপড়ের মর্যাদা আর আরামটাই ছিল বেশি। বিলেতী মেশিনমেড কাপড় দৈনিক ব‍্যবহার্য হলেও সে গুণমানের নয়। এই একই কারণে বিলেতেও কিছু ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের কুটিরশিল্পও বেঁচে গেছিল। টুইডের ব‍্যাপারে খুঁজে দেখবেন।

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, সত‍্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী, বিংশ শতকের শুরুর দিকে
আয়ারল‍্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে ঐতিহ‍্যবাহী টুইড ফ‍্যাব্রিকের “ওকিং”, ১৭৭২
“বাঙালী বাবু”, ১৮৯০এর কলকাতা থেকে পোস্টকার্ড

আর বঙ্গের দরিদ্র গ্রাম্য মানুষের কাছে তো ঐ বিলাতী ইম্পোর্টেড মাল পৌঁছাতই না। তারা তাদের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য অনুযায়ী ঘরেই মোটা সুতি কাপড় প্রস্তুত করত আর তাই পরিধান করত।

অর্থাৎ কেবল মাঝারি গ্রেডের সুতি কাপড়ের বাজারটাই বিলেতী কাপড়ের দখলে আসে। বিলাসী মসলিন কিংবা গরিবের মোটা কাপড়ের মার্কেট ডিস্প্লেস হয়নি। এর প্রমাণও কিছুটা দিতে পারি মিউজিয়াম স্পেসিমেন থেকে। ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্ট মিউজিয়াম, নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট, এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে যে মসলিন সংরক্ষিত আছে, এদের বুননকাল অন্তত ১৮৫০এর পর। অর্থাৎ মসলিনের কমার্শিয়াল মার্কেট প্রায় অবলুপ্ত হলেও কুটিরশিল্প ও বিলাসী দ্রব্য হিসাবে এদের অস্তিত্ব চালু থেকেছে— সেগুলি বানানোর প্রক্রিয়া তখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এরই লেগেসি আমরা এখনো পাই জামদানির মত দেশী ঐতিহ‍্যবাহী শিল্পের মধ‍্যে। মসলিনের মৃত‍্যুটা সম্ভবত হয়েছে ১৮৫০এর পরে, যখন এত পাতলা কাপড়ের গ্রহণযোগ‍্যতা আর ইউরোপীয় ও ভারতীয় ফ‍্যাশনে ছিল না।

ওদিকে বিলেতী আমদানি কাপড়ের চাহিদা কলকাতার আশপাশেই বেশি ছিল। নতুন বড়লোক হওয়া জমিদার পরিবারের যেমন অভাব ছিল না, তেমন কোম্পানির ব‍্যুরোক্রেসি ও ব‍্যবসার সাথে সম্পৃক্ত বাঙালি মধ‍্যবিত্ত “ভদ্দরনোক” “বাবু” টাইপ একটি শ্রেণীও গড়ে উঠছিল। শিল্প বিপ্লবের ফলে নানা প্রযুক্তি ও পণ‍্য যেমন সুলভ হয়ে পড়ে, তার ফলেই এই মধ‍্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান সম্ভব হয়— যেমনটা ঘটছিল খোদ ইউরোপেও। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আদলে তাই বাঙালি রেনেসাঁসও সম্ভব হয়ে ওঠে এ সময়ে। পোশাকের ফ‍্যাশানেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যেমন আধুনিক কালের শাড়ি ফ‍্যাশন ও ব্লাউজ প্রচলনের ক্রেডিটটা ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের দেয়া যায়। এনারা বিলেতী পণ‍্য ব‍্যবহারের চেষ্টা না করলেও তাদের অনুসারীদের সকলে নিশ্চয় এত বাছবিচার করেনি।

১৮৩০এর দশকের পর থেকে তৈরি কাপড় নয়, বরং র’ কটনটাই কলকাতা থেকে বেশি রপ্তানি হয়েছে। তার দামটাই বেশি ছিল, কেননা কাপড় তৈরির পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলি ইংল‍্যান্ডেই বেশি এফিশেন্ট ও মাস প্রডিউসিবল ছিল। ফলে বঙ্গের “ডিইনডাস্ট্রিয়ালাইজেশন” সংক্রান্ত যে গালগল্প বলা হয়, সেটাই ঘটে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গের হোম ইন্ডাস্ট্রিকে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে ইংল‍্যান্ডের মেশিন ইন্ডাস্ট্রির দানবীয় শক্তির সাথে।

ভারতের নাগপুরে টাটা পরিবারের এমপ্রেস কটন মিলস, ১৮৭৭

এমন নয় যে, ঐ শিল্পের সাথে পাল্লা দেবার প্রচেষ্টা বঙ্গে হয়নি। কিন্তু সে ছিল “টু লিটল, টু লেইট।” বঙ্গের প্রথম কটন মিল স্থাপিত হয় কলকাতার অদূরে বৌরিয়াতে, ১৮১৮ সালে। ব্রিটিশ মেশিনারি ও ব্রিটিশ মহিলাদের সাহায‍্যে স্থানীয় শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চালানোর চেষ্টা করে ব্রিটিশ মালিকপক্ষ। কিন্তু ব‍্যবসায়িক সাফল‍্য আসেনি। হতে পারে কলকাতার এডজাসেন্ট মার্কেট বিলাতী আমদানিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। পরে মিলটি জুটমিলে পরবর্তিত হয়ে যায়। আরো বহু পরে, ১৯০০ সাল অতিবাহিত হলে বঙ্গে লাভজনক কটন মিল স্থাপিত হয়।

তবে বঙ্গে যা সম্ভব হয়নি তা সম্ভব হয় ভারতের পশ্চিমে। ১৮৫৪ সালে পার্সি শিল্পপতি কোয়াসজি নানাভাই দাবর (১৮১৫-৭৩) বোম্বেতে চালু করেন বোম্বে স্পিনিং এন্ড উইভিং কম্পানি— যার মূল ভিত্তি ছিল বাষ্পচালিত কটন মিল। শুরুতে ১৭,০০০ স্পিন্ডল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ১৮৭০এর দশকে সে সংখ‍্যা দাঁড়ায় ৪৫ হাজার। ১৮৫৬তে দ্বিতীয় আরেকটি মিল বোম্বে থ্রোসল মিলও প্রতিষ্ঠা করেন একই ভদ্রলোক। তাতে ছিল ২০,০০০ স্পিন্ডল।

বিগ পিকচারে দেখতে পাই— ১৮৭০এর দশকে ভারতে ৪৭টি কটন মিল ছিল। সে সংখ‍্যাটা ধীরে ধীরে বেড়েছে, কমেনি— যদি ব্রিটিশদের তেমন ইচ্ছা থাকত, কমতে পারত। ১৮৮০এ ৫৮টি, ১৮৮৩তে ৭৯টি, ১৯০০ সালে ১৯৩টি, ১৯১৪ সালে ২৭১টি, ১৯২৯ সালে ৩৩৪টি। এ সব মিলের অধিকাংশ গড়ে উঠেছে ভারতের বোম্বে ও আহমদাবাদ এলাকায়। কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৪,৫০,০০০ শ্রমিকের। অর্থাৎ বঙ্গে যতটুকু কর্মসংস্থান বিনষ্ট হয়েছিল, প্রায় সমপরিমাণ।

ঘরে চর্কা কেটে তৈরি সুতায় প্রস্তুত কাপড় পরিধান করতেন গান্ধীজী, ১৯৪৬এর ছবি

গান্ধী ঘরে চর্কা কেটে যেভাবে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করেন, তাতে তিনি ব্রিটিশ বা ভারতীয় কটনমিল শিল্পের মধ‍্যে ফারাক করেননি। যদি তাঁর দেখানো স্বদেশী সফল হত — সংগত কারণেই সফল হয়নি — তাহলে শুধু ব্রিটিশ কাপড়ের বাজার নয়, ভারতীয় স্থানীয় কটনমিলগুলিও ক্ষতির সম্মুখীন হত। সে কারণে এ ব‍্যাপারে নেহরু গান্ধীর স্বপক্ষে ছিলেন না বলে জানা যায়।

ভারতে স্থানীয় যন্ত্রশিল্প স্থাপিত হলেও অবশ‍্যই সেটা বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের কারিগরদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হাতে তৈরি কাপড়ের দামও কমে গেছে যন্ত্রের কাপড়ের প্রতিযোগিতার কারণে। ১৮০০ সালের পীকের হিসাবে ১৮৬০এ এসে বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের মনেটারি ভ‍্যালু হয়ে দাঁড়ায় ১.৫ শতাংশ।

১৯২১ সালের বোম্বে ক্রনিকলে প্রকাশিত পাবলিক এনাউন্সমেন্টঃ গান্ধীজীর সভাপতিত্বে বিদেশী কাপড়ে অগ্নিসংযোগ করা হবে, সকলকে খাদি কাপড়ে আসার অনুরোধ

আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, মেশিনমেড কাপড় কেবল মিডল গ্রেডের বাজার দখল করেছে। মসলিনের মত হাইএন্ড আর মোটা কাপড়ের লো এন্ড চালু থেকেছে আরো বহু বছর।

ইন্দ্রজিতের পেপারটা আমার মূল উৎস হলেও এখানে বহু তথ‍্য দিয়েছি যেগুলি সরাসরি ইকনমিক হিস্টরির সাথে সম্পর্কিত নয়। এই থিওরির বিপরীতেও বহু গবেষণা রয়েছে। তবে আমার দৃষ্টিতে সেগুলি বায়াসড— কারণ দুটি সেল্ফ-ডিক্লেয়ার্ড আইডিওলজিকাল গ্রুপ এদের লেখক। এক, মার্ক্সিস্ট ইতিহাসবিদ, আর দুই, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ। এদের লেন্স শুরু থেকেই একচোখা।

সারাংশে, বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ মূলে ব্রিটিশ বৈষম‍্যমূলক বাণিজ্যনীতি যতটা, তার থেকে অনেক অনেক বেশি শিল্পবিপ্লবের যন্ত্রায়ন আর ফ্রী ট্রেড ভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়ন।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...






আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




বাগদাদের পতন ও মোঙ্গল মিথ

চতুর্দশ শতাব্দীতে তৈরি রশীদ আল দীন হামদানির রচিত জামিয়া আল তাওয়ারিখের একটি কপিতে বাগদাদের মোঙ্গল অবরোধের চিত্র। মাঞ্জানিক বা ত্রেবুশে নামক সীজ উইপন দেখা যাচ্ছে। পন্টুন ব্রীজের ব‍্যবহার দেখা যাচ্ছে। নদীপথে পাগড়িপরিহিত কয়েকটি মানুষের পালানোর দৃশ‍্য রয়েছে— হতে পারে সেটা খলীফা স্বয়ং।

যদি ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের পতনের জন‍্য মোঙ্গলরা শতভাগ দায়ী না হয়ে থাকে, তাহলে সে মিথটা তৈরি করলো কে?

ওপরের চিত্রঃ চতুর্দশ শতাব্দীতে তৈরি রশীদ আল দীন হামদানির রচিত জামিয়া আল তাওয়ারিখের একটি কপিতে বাগদাদের মোঙ্গল অবরোধের চিত্র। মাঞ্জানিক বা ত্রেবুশে নামক সীজ উইপন দেখা যাচ্ছে। পন্টুন ব্রীজের ব‍্যবহার দেখা যাচ্ছে। নদীপথে পাগড়িপরিহিত কয়েকটি মানুষের পালানোর দৃশ‍্য রয়েছে— হতে পারে তাদের মাঝে বাগদাদের খলীফা স্বয়ং।

মোঙ্গল অবরোধের মুখে আব্বাসীয় বাগদাদের পতন হয় ১২৫৮ সালে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। মধ‍্য এশিয়া, ককেশাস, সিরিয়া ও আনাতোলিয়ার বিভিন্ন মুসলিম রাজ্য মোঙ্গলদের আক্রমণে ধরাশায়ী হচ্ছিল ১২১০এর দশক থেকেই। এটা অবশ‍্যই সঠিক যে এসব এলাকার সন্ত্রস্ত লোকজন মোঙ্গলদের ভয়ে পালাচ্ছিল।

ত্রয়োদশ শতকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় মোঙ্গল আক্রমণের অগ্রগতির চিত্র

এরকম রেফ্যুজি পরিবারে জন্ম ইবনে তাইমিয়ার। বাগদাদের পতনের বহু বছর পরে জন্মালেও মোঙ্গলবিদ্বেষ তার ছিল ষোল আনা। সিরিয়া-মিশরের মামলুক রাজ্যে বসবাস করে তুলনামূলক নিরাপত্তায় থেকে মোঙ্গলবিরোধী নানা ফতোয়া দেন তিনি। মোঙ্গলরা তার জীবৎকালেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদেরকে “মুশরিক” বা অ‍্যাপোস্টেট আখ‍্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা জায়েজ, এমনটা রয়েছে তার ফতোয়ায়। এই একই ব‍্যক্তি ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এমন ফতোয়া দেন যে, কোন বিধর্মী মানুষ ইসলামের নবী ও কুরআনের ব‍্যাপারে কোন কটূক্তি করলে বা সমালোচনা করলে তাকে হত্যা করা যাবে।

ইবনে তাইমিয়ার এমন ফতোয়াবাজির পেছনে ছিল সিরিয়া-মিশরের নতুন শাসক গোষ্ঠী মামলুকদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ‍্য। বাগদাদের পতনের পর এরাই একমাত্র মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। শেষ পর্যন্ত আইন জালুতের যুদ্ধে এরাই মোঙ্গলদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

মূলত ইবনে তাইমিয়ার মোঙ্গলবিদ্বেষই পরবর্তী ইতিহাসলেখকদের পক্ষপাতী করে তুলেছে। তাকে অনেকে প্রোটো-সালাফী বলেন, আর শিয়া ও সুফী ধর্মবিশ্বাসের গোড়াতেও আঘাতের জন‍্য তার দুর্নাম রয়েছে। মোঙ্গলরা আবার সুফীদের পৃষ্ঠপোষক ছিল।

হয়ত বুঝাতে পারছি যে চতুর্দশ শতকের এই স্কলার আর তার পরবর্তী অনুসারীরা মোঙ্গলদের তুলনামূলক নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে সচেষ্ট ছিলেন। সত‍্যি বলতে কি, মধ‍্যযুগে ইসলামী ইতিহাস লেখকদের বেশির ভাগই নিরপেক্ষ ছিলেন না। আর মোঙ্গল শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তারা মুসলিম আরব ও তুর্কীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিল। সে কারণে তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য পরবর্তীতে কাউকে পাওয়া যায়নি।

মোঙ্গলদের আক্রমণের সমসাময়িক ইতিহাসের বড়জোর চারটি উৎস পাওয়া যায়। বার হেব্রেউস নামে এক খ্রীষ্টান পাদ্রী সেসব ঘটনাবলী যেমন বলেছেন, তেমন বলেছেন রাশিদ আল দীন হামদানি— ইনি ছিলেন মোঙ্গলদের “পালিত” ইতিহাসবিদ। প্রথমজন বলেছেন যে, শহরের খ্রীষ্টান অধিবাসীদের প্রাণরক্ষা হয় হালাকু খানের নেস্টরিয়ান খ্রীষ্টান স্ত্রীর হস্তক্ষেপে। দ্বিতীয়জন অপরদিকে বলেছেন, আট লক্ষ মানুষকে মোঙ্গলরা হত‍্যা করে।

জুভায়নি নামে আরেক মুসলিম ইতিহাসবিদ মোঙ্গলদের সাথেই ছিলেন। তিনি বাগদাদের পতনের সরাসরি স্বাক্ষী। তিনি বলেছেন আব্বাসী খেলাফতের পতন আসলে খোদাপ্রদত্ত শাস্তি।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




তারিখে জাহানগুশায়ে জুভাইনি নামক পান্ডুলিপিতে আতা-মালির জুভাইনিকে মোঙ্গল শাসক আরগুন আগার কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণরত দেখলে হয়েছে। ১২৯০এর তৈরি প্রথম দিককার পারসিক মিনিয়েচার, ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত।

অপরদিকে আল হাওয়াদিস নামে আরেকটি উৎস অসম্ভব নিষ্ঠুরতার বিবরণী দিয়েছে। চল্লিশ দিন যাবত নাকি পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিশেষে হত‍্যা করেছে মোঙ্গলরা। লুকোনো ধন-সম্পদের খোঁজ পেতে অকথ‍্য শারীরিক নিপীড়ন করেছে সাধারণ মানুষদের। খলীফার মসজিদ মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। মৃতের স্তূপ জমে গেছে রাস্তায়।

মুশকিল হল, আল হাওয়াদিস যে আসলে কে লিখেছিলেন, তার হদিস পাওয়া যায় না। বহুদিন ধারণা ছিল ইবনে আলফুওয়াতি নামে এক ইতিহাসবিদ লিখেছেন। কিন্তু সেটা নাকচ হ‍য়ে গেছে। তারপরও প্রামাণ‍্য দলীল হিসাবে এই বেনামী পুস্তক এখনো ইতিহাসের উৎস হিসাবে গৃহীত হয়।

একটা কাহিনী ইসলামী ইতিহাসে বেশ প্রচলিত যে, আব্বাসী খলীফা আল মুস্তা’সিমকে নাকি কার্পেটে পেঁচিয়ে তার ওপর ঘোড়া চালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। এর কারণ নাকি, রাজকীয় রক্ত মাটিতে ফেলা মোঙ্গল ঐতিহ্যে বারণ, তাতে অমঙ্গল হয়। মজার ব‍্যাপার হল, মোঙ্গলদের বহু বিধি-নিষেধ ও ট্যাবু থাকলেও এই কার্পেট পদ্ধতির হদিশ তাদের রেকর্ডে পাওয়া যায় না।

ইন্টারেস্টিংলি ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পরেই এই গল্প মার্কো পোলো আবার শুনেছেন ভিন্নভাবে। সে গল্পে হালাকু খানের মোঙ্গলরা নাকি খলীফাকে সোনাদানায় ভরপুর একটি কক্ষে খাদ‍্যছাড়া বন্দী করে রেখে অনাহারে মারে। কেননা তাদের দৃষ্টিতে নাকি মূল‍্যবান ধাতু ও রত্নের প্রতি আব্বাসী খলীফার অত‍্যন্ত লোভ ছিল। যথোপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য এমন উদাহরণমূলক শাস্তি।

একই কাহিনীর দুই রূপ যেখানে, আর লিখিত হয়েছে পরবর্তী যুগের ইতিহাসবিদদের শোনা কানকথায়, সেখানে সত‍্যের ব‍্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। এ কারণে বর্তমান ইতিহাসবিদরা এই কার্পেট কাহিনীকে অপ্রামাণ‍্য ঘটনা বা অ‍্যাপোক্রাইফার কাতারে ফেলেন।

হাজার হাজার মানুষ হত্যার ব‍্যাপারটা যতটা সত্য তার থেকে বেশি প্রচারণা বলে মনে হয়। প্রথমত, মোঙ্গলরা আসলেই অনেক হত্যা করেছিল, তবে সংখ‍্যাটা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। হত্যা যে “নির্বিচার” তা কিন্তু নয়। প্রথমে শত্রুপক্ষকে অস্ত্রসমর্পণ ও মহান খানকে অধিপতি বলে মেনে নেবার একটা সুযোগ দেয়া হত। সেটি করলে প্রাণরক্ষা হত। একাধিক মুসলিম শাসক তাই করে বেঁচে গেছিলেন। তা না করলে গর্দান যেত অনেকের — তবে যারা “অবাধ‍্য অর্বাচীন” নেতা ও চামচা, কেবল তাদের। আব্বাসী খলীফার দরবারে যাদের উপস্থিতি ছিল ও পরামর্শদাতা ছিলেন তাদেরই প্রাণভয় ছিল বেশি। কিন্তু যারা খলীফাকে “সঠিক” পরামর্শ দিয়েও কোন ফায়দা করতে পারেনি, তাদের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। বিশেষ করে আব্বাসী খলীফার তদকালীন শিয়া উজির ইবনে আলকামি— তাকে স্বপদেই বহাল রেখেছিল নতুন শাসকরা। সে প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত একটু পরে বলছি।

দ্বিতীয়ত, মোঙ্গল ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অন্তত বাগদাদে পাওয়া যায় না। তার কারণ বাগদাদ এখনো বিশাল শহর, এবং হয়তবা সেসব প্রমাণ নতুন শহরের নিচে চাপা পড়ে গেছে। মোঙ্গল হত‍্যাযজ্ঞের নিদর্শন পাওয়া যায় কেবল রাশিয়ার রিয়াজান আর কিয়েভের নিকটবর্তী ইয়ারোস্লাভল শহরে। সেখানে গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। বহু কংকালের মস্তক ছিল বিচ্ছিন্ন।

রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়েছে নয়টি গণকবর— যাতে আবিষ্কৃত হয়েছে তিনশ মানুষের দেহাবশেষ। এক ক্ষেত্রে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের মানুষের পরিচয় মিলেছে।

কিন্তু সমস‍্যা হলো সংখ‍্যাতে। কিয়েভান রুস ও মস্কো প্রিন্সিপালিটির শহরগুলির জনসংখ্যা খুব বেশি ছিল না। রিয়াজান বা ইয়ারোস্লাভলের সে সময়কার জনসংখ‍্যা বড়জোর পনের থেকে ত্রিশ হাজার। আর গণকবরে আবিষ্কৃত হয়েছে মোট জনসংখ‍্যার এক শতাংশের থেকে কম। সে আমলের বিচারে এটা বড় সংখ‍্যা নয়।

তাহলে বাগদাদের ধ্বংসে আট দশ লক্ষ মৃত এ ধরনের যে সংখ‍্যা মধ‍্যযুগীয় ইতিহাসবিদরা বলেন, সেটাকে অবশ‍্যই প্রশ্ন করা সমীচীন — যেখানে পুরো বাগদাদের জনসংখ‍্যাই ছিল দশ লাখ। সে আমলের বিচারে শহরটি অবশ‍্যই একটা মেট্রোপোলিস ছিল। কিন্তু আট লক্ষ সেরকমই একটা অত‍িরঞ্জিত সংখ‍্যা।

তাই দুইভাবে ইতিহাসের ঐ সকল রেকর্ডকে ইন্টারপ্রেট করা হয়। এক, মোঙ্গলদের অনুগতরাই এই ধরনের ভীতি ছড়িয়েছে— কেননা তাতেই ওদের লাভ। ভয় পেলে শত্রুরা যুদ্ধ ব‍্যতিরেকে আত্মসমর্পণ করবে। তাই এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে আট লক্ষ সংখ‍্যাটি মোঙ্গল শাসক গাজান খানেরই ইতিহাসবিদ রাশিদ আল দীন হামদানি লিখে গেছেন।

আর দুই, ইবনে তাইমিয়ার মত মোঙ্গল হেটার ফতোয়াবাজদের কথা যেটা বললাম। মোঙ্গলদের রক্তপিপাসু প্রমাণ করতে তারা ইচ্ছা করেই এ সংখ‍্যাকে অতিরঞ্জিত করে বলবে। তাতে ওদের শাসক মামলুকদেরই লাভ। ফতোয়া বা ধর্মকে ব‍্যবহার করে নিজেদের শাসনকে পোক্ত রাখতে পারবে।

হোয়াট এবাউট ইসলামিক গোল্ডেন এইজ?

অনেকে বলেন বাগদাদের জ্ঞানপীঠগুলি নাকি মোঙ্গলরা ধ্বংস করে ফেলে। বাইত আল হিকমাহ নামক বিশাল লাইব্রেরির লাখ লাখ বই নাকি ফোরাত নদীতে ফেলে দেয়া হয়, আর বইয়ের কালির রঙে নাকি কালো হয়ে যায় নদীর পানি। এসবই পরবর্তী ইতিহাসবিদদের সেকেন্ড বা থার্ড হ‍্যান্ড একাউন্ট। বলা ভাল বানোয়াট একাউন্ট।

বাগদাদের আব্বাসী খেলাফতের পাঠাগারে অধ্যয়নরত বিদ্বানদের চিত্র — ১২৩৭ সালে ইয়াহিয়া আল-ওয়াসিতির অঙ্কিত মাকামা-আল-হারিরি পাণ্ডুলিপি থেকে, ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত

ব‍্যাপার হল, বাইত আল হিকমাহ মোঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হয়েছে, সেরকম কোন সমসাময়িক লিখিত ইতিহাস নেই। ইন ফ‍্যাক্ট বাইত-আল হিকমাহ বলে কোন একক স্থাপনা ছিল কিনা— তারও কোন প্রমাণ নেই। যে কোন লাইব্রেরি বা জ্ঞানাহরণের কেন্দ্রকেই আক্ষরিক অর্থে বাইত-আল হিকমাহ বা “জ্ঞানের ঘর” বলা যায়।

তবে ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে যে, বাগদাদের লাইব্রেরিতে রক্ষিত বইপুস্তক, হালাকু খানেরই উপদেষ্টা নাসির আল দীন তুসি— যিনি ছিলেন শিয়া মুসলিম স্কলার এবং হালাকুবাহিনী কর্তৃক আহমদী হাসাসিনদের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত— তাঁর নির্দেশে অন‍্যত্র সংরক্ষণের জন‍্য স্থানান্তরিত করা হয়। বিখ‍্যাত মাদ্রাসা আল মুস্তানসিরিয়াও মোঙ্গল আক্রমণের পরে বহু দিন চালু ছিল। খলীফার প্রাসাদও অক্ষত ছিল।

মোঙ্গলদের কিন্তু রিপুটেশন ছিল আর্টিজান ও স্কলারদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা। নাসির আল দীন তুসি যার কথা বললাম, তিনি তাদের একজন। এই ভদ্রলোকেরই অনুরোধে মোঙ্গলশাসিত নতুন ইলখানাত রাজ্যে একটি বিখ‍্যাত অ‍্যাস্ট্রনমিকাল অবজারভেটরি স্থাপিত হয়। মারাগা নামের এই অবজারভেটরির গবেষণা আর মোঙ্গলশাসিত চীন থেকে আসা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন তুসি। কোপারনিকাসের আগেই তিনি হেলিওসেন্ট্রিক থিওরি নিয়ে কাজ করেন। এবং টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক ঘূর্ণনের তত্ত্ব নাকচ করে দেন। ত্রিকোণমিতি ও বীজগণিতেরও প্রগতি সাধিত হয় মারাগায়।

বাগদাদের আল-মুস্তান্সিরিয়া মাদ্রাসার প্রধান ফটক
বাগদাদের আব্বাসী প্রাসাদের আঙ্গিনা
বর্তমান ইরানের পূর্ব আযারবাইজান প্রদেশের মারাগা অবজারভেটরির ধ্বংসাবশেষ
মারাগা অবজারভেটরির প্রতিষ্ঠাতা নাসির আল-দীন তুসির আবিষ্কৃত তুসি-কাপলের মধ্যযুগীয় চিত্র

মোঙ্গলরা তাদের নতুন শাসিত এলাকার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার ব‍্যাপারেও মনোযোগী ছিল। ইলখানাতের শাসক গাজান খানের পৃষ্ঠপোষকতায় রাশিদ আল দীন হামদানি লেখেন বিশাল এক ইতিহাসগ্রন্থ যার নাম জামিয়া আল তাওয়ারিখ। সে আমলের লিখিত ইতিহাসের একটা অসামান‍্য উৎস এটি। ভদ্রলোক মোঙ্গল আক্রমণের মোটামুটি ভয়াবহ চিত্রই এঁকেছেন— কারণটা আগেই বলেছি।

মোঙ্গল রাজ‍্যের সমসাময়িক মিশরে আরেক অসামান্য ইতিহাসবিদের জন্ম হয় যার নাম ইবনে খালদুন। তিনি শুধু ইতিহাসবিদই নন, ইতিহাসের বিভিন্ন স্রোত কিভাবে কাজ করে, তার সাথে হিউম‍্যান সাইকোলজির কানেকশন, তা বোঝার ও বোঝাবার প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। তাঁর বিখ‍্যাত বইয়ের নাম আল মুকাদ্দামা। মামলুকদের রাজত্বে তাঁর কর্মকান্ড হলেও মোঙ্গলদের সম্পর্কে লিখে গেছেন তিনি।

তাঁর সাথে মোঙ্গল শাসক তৈমুরের সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তৈমুরকে অত‍্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিদ্যানিষ্ঠ হিসাবেই দেখিয়েছেন। আবার মোঙ্গলদের নিষ্ঠুরতার ব‍্যাপারে তার জানা থাকলেও তাদের ধর্মসংক্রান্ত সহিষ্ণুতা ও দক্ষ শাসনপ্রক্রিয়ার ব‍্যাপারে খুবই ইতিবাচক দেখা যায় তাকে। মোঙ্গল যাযাবরদের বিপরীতে বরং তদকালীন আরব যাযাবরদের ব‍্যাপারেই তার অভিযোগ ছিল বেশি — যে তারা যেখানেই যায় সব কিছু ছারখার করে ছাড়ে।

সুতরাং জ্ঞানবিজ্ঞানের ধ্বংসকারী নয়, বরং নতুন পৃষ্ঠপোষক ছিল মোঙ্গল শাসকরা।

সত‍্যি বলতে কি, মোঙ্গলদের আসার আগে আব্বাসী খেলাফতের আমলেই দেখা গেছে ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার ক্রমাগত অবক্ষয়। হারভার্ডের এক গবেষক পরিসংখ‍্যানসহকারে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে একাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাগদাদ ও ইসলামী এলাকাগুলিতে প্রাপ্ত পান্ডুলিপিতে মৌলিক বিজ্ঞানচর্চার বিষয়বস্তু কমে এসেছে, বেড়েছে ধর্মীয় ব‍্যাখ‍্যামূলক ও ডেরিভেটিভ কাজ।

এর কারণ বলা যেতে পারে অষ্টম-নবম শতকে র‍্যাশনালিস্ট থিংকারদের থেকে পৃষ্ঠপোষকতা সরিয়ে ইসলামী স্কলারদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া। বিশেষ ট‍্যালেন্ট খুঁজে তাদের ডেভলপ করার থেকে বিশাল সংখ‍্যায় মাদ্রাসাছাত্রদের গতানুগতিক প্রথাভিত্তিক আনুগত‍্যের শিক্ষা দেয়া শুরু হয়। সুফী আধ‍্যাত্মিকতাবাদে বেশি নদর দেয়াও আরেকটা কারণ। এমন না যে, এই সিস্টেম থেকেও মেধাবীরা বেরিয়ে আসত না। তবে সংখ‍্যায় কম।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিক চেনির পেপার “রিলিজিওন এন্ড দ্য রাইজ এন্ড ফল অফ ইসলামিক সায়েন্স” থেকে উদ্ধৃত চার্টে দেখানো হয়েছে ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা চালু হবার ৫০ বছরের মধ্যে বৈজ্ঞানিক পাণ্ডুলিপির সংখ্যার ক্রমাবনতি শুরু হয়

আরেকটা ব‍্যাপার হল উঠতি মনীষীদের জন‍্য বাগদাদ একমাত্র জায়গা ছিল না। বাগদাদ আসলে নামেমাত্র ইসলামী বিশ্বের রাজধানী ছিল। কিন্তু পুরো সাম্রাজ্য ততদিনে ছোট ছোট একাধিক রাজ্যে ভেঙে পড়েছে। সেলজুক, সামানী, গজনবী, খওয়ারিজমী, আইয়ুবী, আর্তুকী, মামলুক — নানা রকম অনারব ফার্সী তুর্কী মুসলিম শাসকরা সেসবের সুলতান, তারা কেবল নামেমাত্র খলীফাকে মান‍্য করতেন। কিন্তু প্রকৃতার্থে তারা স্বাধীন ও প্রতাপশালী সার্বভৌম শাসক ছিলেন। কোন ক্ষেত্রে শক্তিশালী সুলতানরা খলীফাকে সরিয়ে নিজের পছন্দমত মানুষকে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করতেন।

এ সকল স্বাধীন সুলতানদের রাজসভায় বহু মনীষীর স্থান হয়েছিল। আর বাগদাদের “বায়তুল হিকমাহর” সকল জ্ঞানও ততদিনে মোটামুটি ছড়িয়ে পড়েছে তিমবাক্তু-গ্রানাদা থেকে কাবুল-হেরাত পর্যন্ত।

যেমন ইবনে আলনাফিস নামক আরেক মনীষী চিকিৎসাবিদ ছিলেন মোঙ্গল নয়, মামলুক পৃষ্ঠপোষকতায়। তিনিও, তুসি যেমন টলেমিকে ভুল প্রমাণ করেন, তেমনি গ্রীক দার্শনিক গ‍্যালেনের মানবদেহে রক্তচলাচলব‍্যবস্থার তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে প্রায় আধুনিক একটি ব‍্যাখ‍্যা দেন। যাতে হৃদপিন্ড ছিলে রক্ত চলাচলের কেন্দ্রীয় ব‍্যবস্থাপক। আরো পরে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা এর প্রমাণ আবিষ্কার করেন।

অর্থাৎ বাগদাদ ওয়াজ বাই নো মীনস এ ইউনিক প্লেস ফর নলেজ!

বাগদাদে মোঙ্গোল আক্রমণের ঠিক পূর্বের রাজনৈতিক মানচিত্র — আব্বাসী খলীফার রাজত্ব খুব ক্ষুদ্র এবং কেবল বাগদাদ ঘিরেই

একটু বলে রাখা ভাল, বাগদাদের এই মহাপতনের পেছনের কাহিনী। ১২৫০এর দশকে পাঁচ শতকের পুরনো আব্বাসী খেলাফত আর আগের মত নেই। ঘুনেধরা সাম্রাজ‍্যের প্রতীকী শাসক খলীফাদের জীবনযাত্রা খামখেয়ালিপনা আর আরাম-আয়েশে কাটে। তাদের সরাসরি শাসনকৃত এলাকা ছিল কেবল বাগদাদ ও তার আশেপাশে। এর বাইরে তার হুকুম সীমিত ছিল। সে সব এলাকায় ইতিমধ‍্যে বিভিন্ন বহিরাগত আগ্রাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করেছে। খলীফা ফরমান জারি করে এসকল রাজ‍্যের সুলতানদের স্বীকৃতির বিনিময়ে মহামূল‍্য বাৎসরিক উপঢৌকন পেতেন। তাই দিয়ে তার রাজ্যের খোরপোশ চলত।

১২১৯এ পেরিফেরির মুসলিম ভূমিগুলিতে মোঙ্গল আগ্রাসন শুরু হয়। সে সময়ে খলীফা আল মুস্তানসির বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বিলাসব‍্যাসন কমিয়ে নিরাপত্তার পেছনে যথেষ্ট মনোযোগ দেন। কিন্তু তার পরবর্তী খলীফা আল মূস্তা’সিম তেমন কাজের ছিলেন না। অনেক খরচ করে আবারো মক্কায় বাৎসরিক অফিশাল হজ্জ্ব কাফেলা পাঠানো শুরু করেন। প্রশাসনে শিয়া মন্ত্রী থাকলেও সুন্নী মোল্লাদের প্ররোচনায় শিয়াবিরোধী যে সকল মব অ‍্যাটাক শুরু হয়, সেগুলির বিহিত তিনি করেননি। শিয়া-সুন্নী একাধিক দাঙ্গা তাঁর আমলে সংঘটিত হয়। এমন কি, এক শিয়াবিরোধী দাঙ্গায় স্বয়ং খলীফার পুত্র অংশ নেয়। শিয়ারা এ কারণে তার ওপর নাখোশ ছিল, যেটা পরবর্তীতে মোঙ্গলদের পরোক্ষভাবে সাহায‍্য করে।

যখন মোঙ্গলরা মধ‍্য এশিয়ার খওয়ারিজম নামক সুন্নীশাসিত মহাশক্তিশালী রাজ‍্যকে নিজেদের দখলে নিয়ে আসে, আর আনাতোলিয়া ও জাজিরার প্রাক্তন আর্তুকী-আইয়ুবী শাসকরাও মোঙ্গলদের বশ‍্যতা স্বীকার করে তাদের ট্রিবিউট পাঠাতে শুরু করে, তখনো খলীফার বোধোদয় হয়নি যে মোঙ্গলরা বাগদাদ দখল করতে সক্ষম। তার ঔদ্ধত‍্য ছিল যে, বাগদাদের পুরু সুউচ্চ দেয়াল ডিঙিয়ে কোন স্তেপ যাযাবরের আসা অসম্ভব। আর সেরকমটা হলেও সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তার সহায়তায় এগিয়ে আসবে।

১২৫৮এর আগে অন্তত দু’বার মোঙ্গলদের সাথে সংঘাতে আব্বাসী সেনাদলের ক্ষণস্থায়ী সীমিত জয়ের কারণে তার আত্মবিশ্বাস আরো পাকা হয়। হালাকু খান আল মুস্তা’সিমের আনুগত‍্য দাবি করে একাধিক চিঠি পাঠিয়েছিলেন, আর তলব করেছিলেন তার দরবারের গণ‍্যমান‍্য ব‍্যক্তিদের। আল মুস্তা’সিম সেসব আদেশ মানেননি। তার উজির আলকামি অবশ্য সে কথা গ্রাহ্য করার উপদেশ দিয়েছিলেন।

যখন শেষমেশ বাগদাদের দরজার সামনে মোঙ্গলরা নানা জাতের সীজ উইপন নিয়ে বসে গেল, তখন খলীফাকে সাহায‍্য করার মত মুসলিম শক্তি ছিল কেবল একটাই। সেটা সিরিয়া ও মিশরের নতুন শাসকগোষ্ঠী মামলুকরা। ভাগ‍্যের পরিহাস যে এই মামলুকরা সুলতান হিসাবে খলীফার স্বীকৃতি চেয়েও পায়নি। কেননা, এরা ছিল তুর্কী ক্রীতদাস থেকে সেনাপতি হয়ে ভুঁইফোঁড় রাজা বনা তুর্কীজাত। বনেদী বংশের রক্ত না থাকায় আইয়ুবীদের সরিয়ে ক্ষমতায় বসা মামলুকদের সে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন খলীফা আল মুস্তা’সিম।

অনেকে বলবেন, মামলুকরা পশ্চিমে হোলিল‍্যান্ডে ক্রুসেডারদের নিয়ে ব‍্যতিব‍্যস্ত ছিল তাই আব্বাসীদের সাহায্য করেনি। ব‍্যাপার হল, সপ্তম ক্রুসেডে মামলুকরা ক্রুসেডারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। আর সে ঘটনাও বাগদাদ পতনের ছয় বছর আগের। মামলুক সুলতানরা এ সময়ে অতুলনীয় সামরিক গৌরব আর শক্তিমত্তার অধিকারী ছিলেন। সমস‍্যা ছিল কেবল তাদের ট্রাইবাল নেতাদের মধ‍্যে কোন্দল, আর শুধুমাত্র নিজেদের রাজ‍্যকেই মোঙ্গলদের হাত থেকে রক্ষা করার স্পৃহা।

১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরে সংঘটিত মান্সুরার যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনী মামলুকদের সুলতানা শাজার আল-দুরের সেনাবাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় — এমনকি ফ্রান্সের রাজা নবম লুই পর্যন্ত যুদ্ধবন্দী হন (ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত চতুর্দশ শতকের ইউরোপীয় ইল্যুমিনেটেড ম্যানুস্ক্রিপ্ট)

তাই স্বাভাবিকভাবেই মামলুকরা আল মুস্তা’সিমকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি। আখেরে তাদের ভালই হ‍য়েছে। কারণ তাদের ভূমিতে চলে আসতে আসতে মোঙ্গলরা নিজেদের মধ‍্যেই গৃহযুদ্ধ শুরু করে দেয়। সিরিয়ায় আইন জালুতের যুদ্ধে মোঙ্গলদের সম্মুখ অগ্রগতি চিরতরে বন্ধ করে দেয় মামলুকরা।

১২৫৮ সালে আল মুস্তা’সিমের পরাজয়ের পর বাগদাদের খ্রীষ্টানদের পাশাপাশি প্রাণরক্ষা হ‍য় অধিকাংশ শিয়া মুসলিমদের। আলকামির অনুরোধে নাকি হালাকু টলেছিলেন। খলীফার আমলের শিয়া-সুন্নী দাঙ্গার ভূমিকা যে এর পেছনে ছিল না, সেটা নাকচ করে দেয়া যায় না।

বাগদাদে মোঙ্গল আক্রমণের পরে ইলখানাত নামক যে রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তার শাসকরা ছিল মোঙ্গল। প্রথমদিকে কার্যত মোঙ্গলিয়ার গ্রেট খানের আনুগত‍্য মানলেও দ্রুত এরা স্বাধীন রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আর বাগদাদের পতনের চল্লিশ বছরের মধ্যেই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়।

তাদের প্রশাসনে মুসলিমদের সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকারও পুরো সময়টা ছিল। চীনে কুবলাই খানের ইউয়ান সাম্রাজ‍্যেও চীনাদের এই অধিকার ছিল না। চীনে যেমন কুবলাই খান তার নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে তাঁর দরবার ও রাজ্যের ঐশ্বর্যের জন্য পরিচিত হয়েছেন, ইলখানাত রাজ্যের ক্ষেত্রেও সেরকমটা বলা যেতে পারত, যদি না ইসলামী ইতিহাসবিদরা মোঙ্গলদের নন্দঘোষ বানিয়ে সকলে দোষ না চাপাতেন।

জামিয়া আল তাওয়ারিখ পাণ্ডুলিপিতে দেখানো হয়েছে প্রথম মুসলিম ইলখান শাসক গাজান খানের ইসলামগ্রহণ ও কুরআন পাঠের চিত্র

মোঙ্গল শাসকরা তাঁদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন‍্যই ইতিহাসবিদদের কাছে এখন বেশি স্বীকৃতি পান। পরবর্তী ওসমানী তুর্কী ও ভারতের মোঘলরাও সে ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী।

বাগদাদের এই পতন অবশ‍্যই একটা বিশাল প‍্যারাডাইম শিফট ছিল। আগের যুগে মুসলিম শাসক মাত্রই খলীফার অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন। ব‍্যাপারটা একরকম কাল্টের মত দাঁড়িয়ে গেছিল। খলীফা কেবল সুলতানের ছাপ্পরটুকু মারবেন। কিন্তু সভ্য দুনিয়া আবর্তিত হত সেটা ঘিরেই। দুনিয়ার কেন্দ্র ছিল বাগদাদ— যদিও তার বিদ‍্যা ধন রত্ন ততদিনে চলে গেছে আরো দূর-দূরান্তে।

বাগদাদের পতনের ফলে পুরনো সেই অচলায়তন ভেঙে গেল। বাগদাদ থেকে কালচারাল শিফটটা হলো আরো পূর্বে। ইরানের তাব্রিজ হল নতুন ইলখানাত রাজ্যের রাজধানী। পারসিক সংস্কৃতিরও একটা পুনর্জাগরণ সৃষ্টি হল। ইলখানাতের মানচিত্র আর বর্তমান ইরানের মানচিত্র অনেকখানি একই। ফার্সী ভাষা সাহিত্য একটা কালচারাল রিভাইভালের মধ‍্য দিয়ে যায়, যেটা ইনহেরিট করে পরবর্তী সাফাভী ইরান।

পূর্ব থেকে পশ্চিমে মোঙ্গলদের এই বিশাল বিজয়ের আরেকটা ফল হল বাণিজ্যপথ খুলে যাওয়া। সুদূর চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সর্বত্র মোঙ্গলদের কথায় বাঘে-মহিষ এক ঘাটে পানি খেত। কুবলাই খানের ইউয়ান রাজ‍্য আর ইলখানাত উভয়েই ছিল কসমোপলিটান ও বাণিজ‍্যমুখী। বিশ্বের ইতিহাসে এ সময়কে বলা হয় “প্যাক্স মোঙ্গোলিকা” — মোঙ্গোলদের (স্থাপিত) শান্তি।

“প্যাক্স মোঙ্গোলিকা” বা মোঙ্গোলদের স্থাপিত “শান্তি” ইউরোপ থেকে চীন পর্যন্ত বিশাল পরিসরে মুক্ত বাণিজ্য আর চিন্তার প্রসারের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়

সেই বাণিজ‍্যের পথে আগে যে আব্বাসী খেলাফতের ইসলামী ভূমি মিডলম‍্যানের ভূমিকায় ছিল, সেটাও মোঙ্গলদের সরাসরি কব্জায় এল। ফলে ইতিহাসের একটা সামান্য সময় ইউরোপ থেকে চীন পর্যন্ত বাণিজ‍্য পণ‍্য এবং আইডিয়ার যাতায়াত প্রায় উন্মুক্ত ছিল।

তাই এ কথা যদি কেউ বলেন, মোঙ্গলপরবর্তী ইসলামী ভূমি ছিল অনগ্রসর, বিজ্ঞানবিস্মৃত সেটা বললে ভুল বলা হবে। এটা ঠিক যে, মোঙ্গলরা বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ধর্মচিন্তার পরিবর্তে সুফী আধ‍্যাত্মিকতাবাদকে বেশি দাম দিত, কেননা তার সাথে মোঙ্গল এনিমিস্ট মিস্টিসিজমের অনেক কিছু মিলে যেত। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অবহেলা তারা করেনি। করলে বাগদাদের অবরোধে চীন থেকে সীজ উইপন নিয়ে আসার মত ইনজিনিয়ারিং তেলেসমাতি তারা দেখাত না।

একই কারণে বলতে পারি, অন্য পোস্টে দেখানো প্রাক-মোঙ্গল ও মোঙ্গলপরবর্তী পাঁচটি মুদ্রার মধ‍্যে গুণগত বা শিল্পগত কোন তফাৎ যে নেই, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...






আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ইনোলা গে, লিটলবয় ও অন্যান্য

ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই ভার্জিনিয়ার শ‍্যান্টিলি শহরে উদভার-হাজি সেন্টার নামে ৭৬০,০০০ বর্গফুটের বিশাল এক স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম। সেখানে গেলে দেখতে পাবেন “ইনোলা গে” নামে বি-টুয়েন্টি-নাইন সুপারফর্ট্রেস বোমারু বিমানটি। অনেকের কাছে হয়ত নামটা পরিচিত ঠেকবে। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর প্রথম আণবিক বোমা ফেলে এই বিমানটিই।

মে মাসে ঈস্ট কোস্ট ট্রিপে ভার্জিনিয়া-ডিসি-নিউইয়র্ক ছাড়াও ডিট‍্যুর নিয়েছিলাম আমেরিকায় আমার প্রথম বাসস্থান স্টেট কলেজে। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যখন প্রথম পদার্পণ করি, তখন এক দয়ালু বড় ভাই দু সপ্তাহ স্বগৃহে থাকতে দিয়েছিলেন, ক‍্যাম্পাসটাও ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। তখন রেডিয়েশন সায়েন্স এন্ড ইনজিনিয়ারিং সেন্টারের আঙিনায় ব্রিজীল নিউক্লিয়ার রিএক্টর বিল্ডিং দেখে বেশ ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। এটি এখনো পর্যন্ত আমেরিকায় চালু থাকা সবচেয়ে পুরনো পারমাণবিক চুল্লী। ১৯৫৫ সালে চালু হওয়া এই রিএক্টরটাও এবার বাইরে থেকে দেখে এলাম। তারও ভিডিও দিয়েছি।

আর শেষ ছবিতে আমার সংগ্রহের একটা ডাকটিকেট। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত এই ডাকটিকিটটি “অ‍্যাটমস ফর পীস” শিরোনামে ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘে দেয়া প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের একটি বিখ‍্যাত বক্তৃতার স্মারক। বর্তমান বিশ্ব কিন্তু এখনো সেই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পারমাণবিক ব‍্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

আজকের যুগের ভূরাজনীতির সাথে এই তিনটি আলাদা জিনিস মিলিয়ে কিছু বলি।

১৯৪৫ সালে ইনোলা গে বিমানটি হিরোশিমার ওপর ৬ই আগস্ট ১০,০০০ পাউন্ড ওজনের লিটলবয় নামের পারমাণবিক বোমা ফেলে। এতে প্রায় দেড় লাখ জাপানি মারা যায়, আহত-নিহতের সংখ্যা পরে বেড়ে আড়াই লাখে দাঁড়ানো অসম্ভব নয়। কারণ পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে অনেকের মরণব্যাধি ক‍্যান্সার হয়। মৃতদের প্রায় ২০ হাজার ছিল জাপানি সৈন্য, ২০ হাজার কোরিয়ান দাসশ্রমিকও ছিল।

স্টেট-অফ-দ‍্য-আর্ট বি-২৯ সুপারফর্ট্রেস বিমানটিকে অ্যাটম বোমা ফেলার জন‍্যই নির্বাচিত করেছিলেন পাইলট মেজর পল টিবেটস। প্লেনটির ডাকনাম তাঁরই দেয়া, নিজের মায়ের নামে। উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের তিনিয়ান এয়ার বেইস থেকে আরো দুটি বি-২৯এর সাথে ১২ জন ক্রু নিয়ে ৬ ঘন্টা উড্ডয়নের পর হিরেশিমার আকাশে পৌঁছায় ইনোলা গে। সকাল ৮টা ১৫তে ত্রিশ হাজার ফীট থেকে বোমাটি ফেলা হয়। দুই হাজার ফীটে এসে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের শক্তি ছিল পনের কিলোটন।

বিস্ফোরণের ফলে ৪.৮ বর্গমাইল এলাকাব‍্যাপী প্রচন্ড ধ্বংসযজ্ঞ হয়। হিরোশিমার সত্তর ভাগ দালান পুরোপুরি মাটিতে মিশে যায়। বোমা ফেলা শেষে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর আরো ৬ ঘন্টা উড়ে তিনিয়ান বেইসে ফিরে আসে ইনোলা গে। তিনদিন পর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমা ফ‍্যাটম‍্যান নিক্ষেপের অভিযানেও বক্সকার নামে অ‍ন‍্য আরেকটি বি-২৯এর সঙ্গী ছিল ইনোলা গে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মজার ব্যাপার, ১৯৪৭এর পর বিমানটিকে রিটায়ার করার পর তাকে ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এক অজপাড়াগাঁয়ের এয়ারবেইসে অযত্নে অবহেলায় পঁচছিল ইনোলা গে। আশির দশকে এক দল সামরিক ইতিহাস এনথুসিয়াস্ট ও ভেটেরানদের কর্মসূচিতে ইনোলা গের সংরক্ষণে মনোযোগী হয় স্মিথসোনিয়ান।

কিন্তু নব্বই দশকে প্রথমবার যখন একে ডিসপ্লেতে আনা হয়, তখন জাপানী ভিক্টিমদের কথাগুলি এত ফলাও করে বলা হয় যে ভেটেরানরা ক্ষুব্ধ হন। তারা চেয়েছিলেন, পুরো যুদ্ধের পটভূমিও তুলে ধরা হোক যাতে মানুষ বুঝতে পারে এই বোমা ফেলার প্রয়োজনীয়তা কি ছিল। আমি জাস্ট তিন বাক‍্যে সে কাজ সারি।

পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ‍্যাটম বোমা ছাড়া‌ই ফায়ারবমিং ও অন‍্যান‍্য কারণে সব মিলিয়ে ২০ লাখের মত জাপানী সামরিক ও বেসামরিক জনগণ মারা যায়। আবার অন‍্যদিকে চীন ও এশিয়ার অন‍্যান‍্য অঞ্চলে জাপানী লাগামহীন বোমাবর্ষণ, আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের শিকার হয়ে মারা যায় ১ থেকে ২ কোটি সামরিক-বেসামরিক মানুষ। এ সংখ‍্যাগুলি ফ‍্যাটম‍্যান ও লিটলবয়ের ক‍্যাজুয়াল্টির সাথে তুলনা না করলে অ‍্যাটম বোমা ফেলার প্রেক্ষাপটটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

লিটলবয় নামের বোমাটি ছিল ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি। ১০,০০০ পাউন্ড ওজনের মোটে ১৪১ পাউন্ড ছিল ইউরেনিয়াম, আর তারও ১ পাউন্ডের কম ওজন পারমাণবিক চেইন রিয়‍্যাকশনের মধ‍্য দিয়ে যায়। লস আলামোস ন‍্যাশনাল ল‍্যাবরেটরিতে তৈরি বোমাটির ইউরেনিয়াম ছিল গড়ে ৮০ শতাংশ “এনরিচড।”

এখানেই বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে আনছি। ইরানের আয়াতোল্লা রেজিম ইউরেনিয়াম এনরিচ করেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এটা অ‍্যাটমিক ওয়াচডগ আইএইএ বলছে। এর অর্থ কি?

প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামে তিন ধরনের আইজোটোপ বিদ‍্যমান। ইউ-২৩৮, ইউ-২৩৫, ইউ-২৩৪। দ্বিতীয়টি আণবিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে এটি এক শতাংশেরও কম। এ কারণে পরিশোধনের মাধ‍্যমে ২৩৫এর পরিমাণ বৃদ্ধি পারমাণবিক বোমা (কিংবা শক্তিচুল্লী) তৈরির জন্য অত্যাবশ‍্যক। সাধারণত ক‍্যাসকেডেড গ‍্যাস সেন্ট্রিফিউজের মাধ‍্যমে এই পরিশোধন প্রক্রিয়া চলে।

এখন ব‍্যাপার হচ্ছে, নিউক্লিয়ার রিঅ‍্যাক্টর যার মাধ‍্যমে আমরা বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করি, যেমন রূপপুর পাওয়ার প্ল‍্যান্ট, আর পারমাণবিক বোমা — উভয়ের জন‍্যই ইউরেনিয়াম এনরিচ বা পরিশোধন করা প্রয়োজন। তবে দুটোর মাত্রা ভিন্ন, প্রক্রিয়া এক।

অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ কাজ যেমন শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি আর অশান্তিপূর্ণ কাজ যেমন বোমা বানানোর প্রযুক্তি মূলে এক। আধুনিক কালের চুল্লীর জন্য ইউরেনিয়াম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পরিশোধন করলেই চলে। আর বোমার জন্য কমপক্ষে ২০ শতাংশের বেশি পরিশোধন করতে হয়। কোন দেশ যদি ৫ শতাংশের ওপর পরিশোধন করে, তাহলে কোন উন্নত শিক্ষিত দেশের মানুষই বিশ্বাস করবে না যে তাদের উদ্দেশ‍্য শান্তিপূর্ণ!

বলে রাখা ভাল, চুল্লীর অনেক প্রকারভেদ আছে, কিছু পরীক্ষামূলক আছে যাতে ইউরেনিয়ামের পরিশোধিত অংশ ২০ শতাংশ বা বেশি। আবার চুল্লী ও বোমা দুটোই ইউরেনিয়াম ছাড়া অন‍্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে তৈরি হতে পারে। তবে ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি করা সবচেয়ে সোজা ও কম ব‍্যয়বহুল।

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার প্রথম সফল ব‍্যবহারের পর পরই চু্ল্লী নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায়। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির এই ব্রীজীল রিয়‍্যাক্টরটি সে শুরুর দিককার চুল্লী। প্রথমে এত ব‍্যবহৃত ইউরেনিয়ামের পরিশোধনের মাত্রা ছিল ২০ শতাংশ — যা কিনা উইপনস গ্রেড!

পঞ্চাশের দশকে অন্যান্য দেশও দ্রুত পারমাণবিক বোমা টেকনোলজিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯৫২তে, ফ্রান্স ১৯৬০এ আর চীন ১৯৬৪ সালে আণবিক বোমার সফল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়।

তদকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের প্রশাসন পারমাণবিক বোমা প্রযুক্তির বিস্তার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালের অনুমানে ২৫ বছরের মধ‍্যে, অর্থাৎ ১৯৮০ নাগাদ, আরো ২৫টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রধারী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। এ কারণে বিস্তার রোধের একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রশাসন উঠেপড়ে লাগে। আবার একই সাথে শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন পারমাণবিক চু্ল্লীর সুফল যাতে বিভিন্ন দেশ আহরণ করতে পারে, সে চিন্তাটাও তাদের ছিল। আইজেনহাওয়ারের অ‍্যাটমস ফর পীস বক্তৃতাটার সারবস্তু তাই-ই।

ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সহযোগিতার মাধ‍্যমে যে আন্তর্জাতিক চুক্তিটি ১৯৭০ সালে দাঁড়া হয়, তার নাম এনপিটি — নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি। এর আগেই ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হ‍য় জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইন্টারন‍্যাশনাল অ‍্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি — আইএইএ।

চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের ১৮০টি দেশ— কেবল ইসরাইল, ভারত, পাকিস্তান বাদে। উত্তর কোরিয়া ১৯৮৫ সালে স্বাক্ষর করলেও ২০০৩ সালে সদস‍্যপদ প্রত‍্যাহার করে নেয়।

চুক্তিটির মূল স্তম্ভ তিনটি – ১. পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তাররোধ, ২. নিরস্ত্রীকরণ, ৩. শান্তিপূর্ণ ব‍্যবহার। প্রথমত, পাঁচটি পরাশক্তি আইনতভাবে পারমাণবিক বোমা প্রযুক্তির বৈধ মালিক, এর বাইরে চুক্তির অধিভুক্ত দেশ পারমাণবিক অস্ত্র গবেষণা ও উৎপাদন করবে না। দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে অ‌ধিভু্ক্ত হবার জন্য পারমাণবিক বোমা পরিত্যাগ করতে হবে। সোভিয়েত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ‍্যে শান্তিচুক্তির আওতায় একাধিকবার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ঘটেছে। ফলে বহু উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম বিপরীত প্রক্রিয়ার মধ‍্যে দিয়ে গিয়ে কম পরিশোধিত লো এনরিচড ইউরেনিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে। এবং সেটা ব‍্যবহৃত হয়েছে পারমানবিক চুল্লিতে। এমনকি মারিকনরা রুশদের থেকে সেই জ্বালানী কিনেও নিয়েছে।

শান্তিপূর্ণ ব‍্যবহারের ক্ষেত্রে দুটো জিনিস উল্লেখযোগ্য‍। এক, সব সদস্য দেশ এক অপরের সাথে পরমাণু প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে পারবে। দুই, কিন্তু ব‍্যাপারটার মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। মধ‍্যস্থতা ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে আইএইএ। এ কারণেই আইএইএ সকল সদস্য দেশের — ইরানসহ — পারমাণবিক স্থাপনাগুলি পর্যবেক্ষণ করে।

এই চুক্তিটি হবার আগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিচুল্লিকে কয়েক দফা আপগ্রেডের মধ‍্য দিয়ে যেতে হয়। যেসব রিয়‍্যাক্টরে উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম ব‍্যবহৃত হত, তাদের সকলকে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে লো এনরিচড ইউরেনিয়াম ব‍্যবহারোপযোগী করে তোলা হয়। এ সময়েই পেন স্টেটের রিঅ‍্যাক্টরটিও আপগ্রেড করে ৩.৫ শতাংশ এনরিচড ইউরেনিয়ামের উপযোগী করা হয়।

ইসরাইল, চীন ও ফ্রান্স এনপিটি চুক্তিটি তৈরি হবার আগেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে। পাকিস্তান ও ভারত চুক্তিতে অংশ না নিয়ে “স্বাধীনভাবে” পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে। বর্তমানে ভারতকে চু্ক্তির বাইরেও নির্ভরযোগ‍্য পার্টনার ধরা হয়। পাকিস্তান তেমনটা নয় কারণ উত্তর কোরিয়া ও ইরানে প্রযুক্তি পাচারের ব‍্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। প্রথম প্রথম এদের দুজনের ওপর স‍্যাংকশন আরোপিত হলেও সময়ের সাথে সাথে স্ক্রুটিনাইজেশন কমে এসেছে, কেননা তারা কথায় কথায় একে অপরকে বা অন্য কাউকে পারমানবিক বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, এমন হুমকি দেয় না। এবং তাদের পারমানবিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার মূল ভিত্তিগুলি মোটামুটি সকলের জানা। আর ইসরাইল খোলাখুলিভাবে তাদের পারমানবিক অস্ত্রের মালিকানা নিয়ে কোন কথা বলে না। কিন্তু ধরা হয় তাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি হুমকি না আসলে তারা সেটা ব‍্যবহার করবে না।

অতীতে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল। ইরাকের সাদ্দাম রেজিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন‍্যতম কারণ তাদের অতীত কার্যক্রম, যেটা তারা গোপনে ধ্বংস করে ফেলে — কিন্তু পাবলিকলি স্বীকার করেনি ইরানের কারণে। সিরিয়া ও লিবিয়ার রেজিমগুলিও স্বেচ্ছায় সে কার্যক্রম পরিত্যাগ করে। দক্ষিণ আফ্রিকাও। এদের প্রত‍্যেকের ওপরই এনপিটির ব‍্যতিক্রম কাজ করায় স‍্যাংকশন ছিল। পাবলিকলি কার্যক্রম পরিত‍্যাগের পর দেশ তিনটির ওপর স‍্যাংকশন প্রত‍্যাহার করা হয়।

যে দেশটি সবচেয়ে সমস‍্যা তৈরি করে সেটি উত্তর কোরিয়া। প্রথমে তারা এনপিটির অংশ হয়ে চীন ও রাশিয়া থেকে “শান্তিপূর্ণ” ব‍্যবহারের জন‍্য আইএইএর আওতায় নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি আমদানি করে। কিন্তু ক্রমে আইএইএ খুঁজে পায় যে উত্তর কোরিয়া উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম পরিশোধন করছে এবং তাদের অঘোষিত স্থাপনা আছে। জাতিসংঘে যখন তাদের ওপর স‍্যাংকশন আসার শতভাগ সম্ভাবনা, তখন তারা সাথে সাথে এনপিটি থেকে সদস‍্যপদ প্রত‍্যহার করে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা চালায়। মানে তারা আসলেই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি ব‍্যবহার করেছে প্রযুক্তি আহরণের জন্য, বোমা তৈরির উদ্দেশ‍্যে। তারপর থেকে কঠিন স‍্যাংকশন রয়েছে তাদের ওপর।

উত্তর কোরিয়া যেভাবে এনপিটিকে ব‍্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে নেয়, এটা এনপিটির গ‍্যারান্টর শক্তিগুলি সহজে মানতে পারেনি। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক করে চাইলেও সৌদীকে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি দেবে না। ইরানের ক্ষেত্রেও কোরিয়ার মত নানা চুক্তি যে কাজে দেবে না, এ ব‍্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলির অধিকাংশই একমত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক কনফ্রন্টেশনের একটা বড় কারণ ১৭ই মেতে আএইএর প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখিত হয় যে, ইরান আরো বেশি ইউরেনিয়াম পরিশোধিত করেছে। তাদের হাতে ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ এনরিচড ইউরেনিয়াম আছে। এছাড়াও একাধিক অঘোষিত স্থাপনা আছে যেখানে আইএইএকে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়নি।

ইরান ভারত-পাকিস্তান-ইসরাইলের মত মুখ বন্ধ না রেখে প্রকাশ‍্যে তা ব‍্যবহার করে ইসরাইলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার পাবলিক হুমকি প্রায়ই দিয়ে আসে। তাদের আয়াতোল্লা রেজিমের মুখে সর্বদা মর্গ বার আমেরিকা স্লোগান। কখনই মার্কিন জনগণ বিশ্বাস করবে না যে পারমানবিক সক্ষমতা পেলে ইরান থেকে তারা নিরাপদ। এ ব‍্যাপারে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান পার্টির মধ‍্যে কোনও মতপার্থক্য নেই। শুধুমাত্র পার্থক্য কিভাবে সমস‍্যাটা সমাধান করা সমীচীন।

যা হোক, শেষ করি ব্রিজীল রিয়‍্যাক্টর দিয়ে। এই স্থাপনাটি কিন্তু সাধারন মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত। যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বা সাধারণ মানুষ তাদের ড্রাইভার্স লাইসেন্স দাখিল করে রিয়‍্যাক্টরটি ঘুরে দেখতে পারে। শুধু ড্রাইভার্স লাইসেন্স চায় মানে হল বিদেশী নাগরিকও সহজে গিয়ে ঘুরে আসতে পারে। আমি যদিও যাইনি, কিন্তু আমার নাইজেরিয়ান ও আমিরাতী সহপাঠী প্রথম সপ্তাহের ওপেন হাউজে গিয়ে ঘুরে এসেছিল।

শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করলে কোন নিউক্লিয়ার স্থাপনাই লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। যেসকল রেজিম সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে তাদের স্থাপনায় লুকিয়ে গবেষণা করে, মুখের এক সাইড দিয়ে বলে শান্তিপূর্ণ গবেষণা, আরেক সাইড দিয়ে বলে আরেকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, তাদের সাথে শান্তিচুক্তির কোন মূল্য নেই। এসকল রেজিম পদচ‍্যুত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দেশের নাগরিকদের আর বাকি দুনিয়ায় শান্তির কোন সম্ভাবনা নেই।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...






আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




আশুরা, ইওম কিপ্পুর, ঈস্টার

গত সপ্তাহে মুসলিম বিশ্বে উদযাপিত হল পবিত্র আশুরা। ইসলামী বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাসের দশম দিন আশুরা। ইহুদী পঞ্জিকার প্রথম মাসের দশম দিন ইওম কিপ্পুরের সাথে আশুরা পুরোপুরি মিলে যায়। হাদীসেও উল্লেখিত, মদীনায় নবাগত হিজরতকারী মুসলিমরা যখন সেখানকার ইহুদী জনগোষ্ঠীকে “আশুরা” পালন করতে দেখল, তখন মুহাম্মদ(সা) থেকে নির্দেশ ছিল যেন তারা ইহুদিদের মত একদিন রোজা না রেখে দুদিন বা তিন দিন রাখে।

ইহুদী ক‍্যালেন্ডার সৌর-চান্দ্র মিক্সড আর ইসলামী ক‍্যালেন্ডার চান্দ্র। কোন কোন বছর হয়, যখন আশুরা আর ইওম কিপ্পুর প্রায় একই দিনে পালিত হয়, বা একদিন আগে পরে।

সুন্নি মুসলিমদের কাছে আশুরার মূল তাৎপর্য শিয়াদের মত কারবালার শোকাবহ ঘটনাবলী নয়। বরং একাধিক নবীর জীবনের গুরুত্ববহ ঘটনাগুলি এই আশুরার দিনেই ঘটে। যদিও কুরআনের নয় — সুন্নাহর সূত্রে। ইন ফ‍্যাক্ট কুরআনে আশুরার উল্লেখ নেই। তবে মুহাম্মদ(সা) এ‌ দিন পালন করতেন। হাদীসমতে এই দিনে আদম(আ) আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে পাপমুক্ত হন। নূহনবীর বজরা এসে ভিরে আরারাত পর্বতে। ইউসুফ(আ) হন কারামুক্ত। মুসানবী বনি ইসরাইলদের নিয়ে লোহিত সাগরের মাঝে রাস্তা বানিয়ে মিশর থেকে কানানে এসে পৌঁছান। (খেয়াল করুন ইহুদী বলিনি! ইসরায়েলাইট বা বনি ইসরাইল বলা বেশি যথার্থ! কেন, সেটা বিশাল ইতিহাস!)

সাধারণত সুন্নি ইসলামে ভাবগাম্ভীর্যের সাথে দিবসটি পালিত হয়। ব‍্যক্তিপরিসরে সুন্নিরা নফল নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, তাওবা করে। যদিও এগুলো সুন্নাহ, মানে অবশ্যপালনীয় নয়, তারপরও ধর্মপ্রাণ মানুষ এসব ইবাদতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। বিশাল উৎসবমুখর শিয়া জনসমাবেশের ব‍্যাপারটা সুন্নি আশুরার সাথে যায় না। ক্ষমাপ্রার্থনা, বিপৎমু্ক্তি ও শুকরিয়া জ্ঞাপনের দিন হিসাবে মিতাচারীভাবেই উদযাপিত হয়। কোন ক্ষেত্রে কিছু পরিবারকে দেখা যায় বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বন্টন করছে, কিংবা মসজিদে দান করছে।

সুন্নি ইসলামে আশুরা, ইহুদী ধর্মে ইওম কিপ্পুর আর ইভানজেলিকাল ক্রিশ্চানিটিতে লেন্ট প্রায় একইরকম ভাবগাম্ভীর্য আর আত্মানুসন্ধানের মাধ‍্যমে পালিত হয়।
সুন্নি ইসলামে আশুরা, ইহুদী ধর্মে ইওম কিপ্পুর আর ইভানজেলিকাল ক্রিশ্চানিটিতে লেন্ট প্রায় একইরকম ভাবগাম্ভীর্য আর আত্মানুসন্ধানের মাধ‍্যমে পালিত হয়।

অপরদিকে ইহুদী বছরের প্রথম দিন রোশ হাশানা থেকে শুরু করে দশম দিন ইওম কিপ্পুর পর্যন্ত পুরো সম‍য়টাই পবিত্র। ইওম কিপ্পুরের তাৎপর্য হল এই দিনে মোজেস টেন কমান্ডমেন্টস নিয়ে সিনাই পর্বত থেকে ফিরে আসেন।

ইওম কিপ্পুরও ইহুদী ধর্মের সবচেয়ে বড় প্রায়শ্চিত্তের দিন। এই এক রাতে নাকি খোদা বহু পাপ ক্ষমা করে দেন। আরবী দিনলিপির মত সন্ধ্যায় শুরু হয় প্রার্থনা আর রোজা। টানা ২৫ ঘন্টা উপবাসে থাকতে হয়। মুসলিমদের মতই খাদ‍্য ও পানীয় সম্পূর্ণ পরিহার করতে হয়।

রোশ হাশানাও বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। মহর্রমের প্রথম দিনে অবশ‍্য মুসলিমদের এমন কোন ধর্মীয় উৎসব নেই। রোশ হাশানার সন্ধ‍্যায় মেষের শিংয়ে তৈরি শোফার বাজিয়ে বর্ষবরণ করা হয়। মোমবাতি জ্বলে আনন্দ প্রকাশের জন্য। সিনাগগে বিশেষ প্রার্থনার পাশাপাশি আপেল ও মধুসহকারে বিশেষ আহারাদি পরিবেশন করা হয়।

এখন আসুন দেখি, আব্রাহামিক অপর ধর্ম ক্রিশ্চানিটিতে কি অবস্থা!

খ্রীষ্টধর্মে ইওম কিপ্পুরের সাথে ক‍্যালেন্ডারে মিলার মত দিন নেই। ইওম কিপ্পুর বছরবিভেদে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে পড়ে। তবে আশুরা বছর ঘুরে ঘুরে কোন না কোন সময় প্রায় একই ধাঁচের একটি খ্রীষ্টান উৎসবের আশপাশে পড়তে পারে। সেটি হল ঈস্টার, আর মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু এ‌ পুরো সপ্তাহটিকে বলে হোলি উইক।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ইন্টারেস্টিংলি, মুসলিম আশুরার অন‍্যতম তাৎপর্য যে মুসা(আ)এর মিশর থেকে কানানে “হিজরত”(!), ঈস্টারও একদিক দিয়ে তার সাথে সম্পর্কিত। কারণ যীশুখ্রীষ্ট ক্রুশবিদ্ধ হবার আগে যে রোববার জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, সেদিন ইহুদী পাসওভার উৎসব পালিত হচ্ছিল। পাসওভার মোজেসের লোহিত সাগর পার হবার সেই ঘটনারই স্মারক দিবস!

ক‍্যাথলিক ক্রিশ্চানিটিতে, আর কিছু হাইচার্চ প্রটেস্টেন্ট বিশ্বাসে— ঈস্টারের পুরো উৎসবটা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে, গুড ফ্রাইডের চল্লিশ দিন আগে। জেরুজালেমে প্রবেশের আগে যীশু চল্লিশ দিন মরুভূমিতে আত্মানুসন্ধানে উপবাস ও ধ‍্যানরত ছিলেন, শয়তানের প্ররোচনায় অটল ছিলেন — তারই স্মৃতিতে এমন নিয়ম। উল্লেখ‍্য, গৌতমবুদ্ধও ঊনপঞ্চাশ দিন বোধি বৃক্ষের নিচে ধ‍্যানস্থ ছিলেন! মুহাম্মদ(সা)ও হিরা গুহায় অন্তত একমাস ধ‍্যানস্থ থাকার পর তাঁর নিকট কুরআনের আয়াত নাযিল হতে শুরু করে!

যা হোক, অধিকাংশ “ইভানজেলিকাল” প্রটেস্ট‍্যান্টরা ক‍্যাথলিকদের মত এত জাঁক করে ঈস্টার করে না। “লেন্টের” ঐ চল্লিশ দিন ধর্মপ্রাণ মানুষ মূলত ব‍্যক্তিগত উপাসনা, উপবাস ও অনুদানের মাধ‍্যমে প্রায়শ্চিত্তসহকারে যীশুখ্রীষ্টের সান্নিধ‍্যলাভের চেষ্টা করেন। উপবাসের জন্য পানাহার সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হয় না। শুধুমাত্র শেষ রোববার ঈস্টারের দিনটি হবে আনন্দের (“ঈদ”)— কারণ গুড ফ্রাইডেতে ক্রুশবিদ্ধ হবার পর ঐ দিনই যীশু পুনরুজ্জীবন নিয়ে দৈবরূপে ফিরে আসেন।

সুতরাং দেখতে পাচ্ছেন, মুসলিম আশুরা, ইহুদী ইওম কিপ্পুর আর খ্রীষ্টান গুড ফ্রাইডে / ঈস্টার সানডের মধ‍্যে একটা আত্মিক যোগাযোগ আছে।

এখন আসি এই লেখার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অংশে! শিয়া আশুরা বনাম ক‍্যাথলিক হোলি উইকের তুলনা! কদিন আগে বলা ক‍্যাথলিক ক্রিশ্চানিটি বনাম শিয়া ইসলামের হিয়েরার্কি আর বংশীয় লেজিটিমেসির মিলের মত।

শিয়া ইসলামে আশুরার মূল তাৎপর্য সুন্নি ইসলামের থেকে অনেক অনেক আলাদা! দিবসটি যতটা না বিপৎমুক্তি কিংবা ধন‍্যবাদপ্রকাশের, তার থেকে বেশি শোক আর বিলাপের। কেননা, মুহাম্মদ(সা)এর ওফাতের পঞ্চাশ বছরের মধ‍্যে একটি নয়, দু দুটো গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, আরো একটি আসন্ন। কারবালার যুদ্ধে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে শহীদ হন হুসেইন বিন আলী(রা)— যিনি স্বয়ং নবীজির দৌহিত্র এবং আহলে বাইতের তৃতীয় ইমাম। তাঁর শত্রু খেলাফত তসরুপকারী উমাইয়া পরিবারের মুয়াবিয়া(রা) আর পুত্র ইয়াজিদ।

এই কাহিনী অসামান্য ট্র‍্যাজিডিতে রূপ পেয়েছে হাজার বছরের শিয়া ঐতিহ্যে। ভারতীয় উপমহাদেশ ব‍্যতীত আর কোন সুন্নি ঐতিহ্যে কিন্তু আশুরা শোকের কারবালা দিবস হিসাবে পালিত হয় না— সৌদিতে তেমনটা পালন একেবারে নিষিদ্ধ। ভারতীয় উপমহাদেশ ব‍্যতিক্রম হবার কারণ বোধ করি এখানে বড় সংখ‍্যার শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস ও সুফী ঘরানার সিনক্রেটিজম ও ধর্মীয় সহনশীলতা।

এদিকে শিয়ারা যেমন মিথ‍্যা ও অনাচারের বিরুদ্ধে হুসেইন(রা)এর অকৃত্রিম আত্মোৎসর্গ স্মরণ করেন, ক‍্যাথলিকরা হোলি উইকের মূল সময়টা একইভাবে যীশুখ্রীষ্টের আত্মদানকে স্মরণ করেন। দুটি চরিত্রই অনেকটাই “ট্র‍্যাজিক হিরোর” পর্যায়ে। ছবিতে দেখিয়েছি ক‍্যাথলিক কোন এলাকার রাস্তায় যীশুর চিত্র, আর তুলনার জন্য দিয়েছি ইরানের প্রখ‍্যাত কাশান শহরের রাস্তার দেয়ালে আঁকা হুসেইন(রা)এর চিত্র। প্রেক্ষাপট জানা না থাকলে অনেকে হয়ত দ্বিতীয় ছবিটি যীশুর বলে ভুল করতে পারেন!

ওপরে, মেক্সিকোর রাস্তায় যীশুর চিত্র। নিচে, ইরানের পবিত্র কাশান শহরে ইমাম হুসেইনের চিত্র।
ওপরে, মেক্সিকোর রাস্তায় যীশুর চিত্র। নিচে, ইরানের পবিত্র কাশান শহরে ইমাম হুসেইনের চিত্র।

প্রটেস্ট‍্যান্ট খ্রীষ্টান আর সুন্নি মুসলিমরা যেভাবে প্রাইভেটলি ঈস্টার বা আশুরা উদযাপন করেন, শিয়া মুসলিম আর ক‍্যাথলিকরা তার বিপরীত। পুরো কয়েক সপ্তাহব‍্যাপী আপামর জনসাধারণ কমিউনালি উৎসব করে। শুধু যে দল বেঁধে গীর্জা বা মাজারে শরীফে যাওয়া তা নয়, রীতিমত ধর্মীয় রিচুয়াল প্রসেশন তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছবিতে দেখিয়েছি, কিভাবে ক‍্যাথলিকরা যীশুসহ মাতা মেরী ও যোসেফের মূর্তিসংবলিত কিংবা রেলিকবাহী ফ্লোট “পাসোস”, তার পাশাপাশি আশুরার মিছিলে হুসেইন(রা)এর প্রতীকী শবাধার বহন করে নিয়ে যাবার চিত্র। ফার্সিতে একে বলে নাখল গর্দানি। দুটোই অনেকটা হিন্দু রথযাত্রা উৎসবের মত।

ওপরে, স্পেনের লেওন শহরে পাম সানডে প্রসেশন; নিচে, ইরানের শিয়া ঐতিহ‍্য নাখল গার্দানি
ওপরে, স্পেনের লেওন শহরে পাম সানডে প্রসেশন; নিচে, ইরানের শিয়া ঐতিহ‍্য নাখল গার্দানি

এই প্রসেশন অবশ‍্যই শোক ও বিলাপের উদ্দেশ‍্যে। শিয়া মোল্লা এবং ক‍্যাথলিক বিশপরা ধর্মের নিষেধ দেখিয়ে যতই অনুৎসাহী করুন না কেন, কোন না কোন মিছিলে অত‍্যুৎসাহী ব‍্যক্তিদের দেখা যাবেই, যারা নিজেদের শরীর রক্তাক্ত করছে — শিয়া মিছিলে ধারালো ছররা দিয়ে, আর ক‍্যাথলিক প্রসেশনে চাবুক মেরে কিংবা শরীরে ক্রুসিফিকশনের মত পেরেক মেরে। ফার্সিতে বলে জাঞ্জিরজানি, ইংরেজীতে সেল্ফ ফ্ল‍্যাজেলেশন। ইউরোপের ক‍্যাথলিক সম্প্রদায়ে এ ব‍্যাপারটা সচরাচর আর দেখা যায় না। কিন্তু ফিলিপাইনে গেলে সেই প্রাচীন রিচুয়ালের দেখা মেলে। পাশাপাশি ছবি দিয়েছি ফিলিপিনো ক‍্যাথলিক ও আফগান শিয়া সম্প্রদায়ের। যদি সেল্ফ-হার্ম নাও ঘটে, শিয়া মজলিসে ড্রামের তালে তালে অন্তত বুক ও কপাল জোরে জোর চাপড়ানোর সীন অবশ‍্যই চোখে পড়বে, একে বলে সিনা-জানি। শিয়া ড্রেস কোড সাধারণত সম্পূর্ণ কালো কাপড় পরিধান।

ওপরে, ফিলিপাইনের লেন্ট উৎসবে ধর্মপ্রাণের সেল্ফ-ফ্ল‍্যাজেলেশন; নিচে, আফগানিস্তানের কান্দাহারে তাজিয়া মিছিলে জানজিরজানি
ওপরে, ফিলিপাইনের লেন্ট উৎসবে ধর্মপ্রাণের সেল্ফ-ফ্ল‍্যাজেলেশন; নিচে, আফগানিস্তানের কান্দাহারে তাজিয়া মিছিলে জানজিরজানি

আরেকটা ব‍্যাপারে দুই উৎসবে অসম্ভব মিল। সেটা তাজিয়া এবং প‍্যাশন প্লে। তাজিয়া বলতে আসলে কারবালার ঘটনাবলীর রিএন‍্যাক্টমেন্ট বোঝানো হয়। মধ‍্যযুগীয় পোশাকআশাক পরে তাতে অংশগ্রহণকারীরা ঢাল-তলওয়ার নিয়ে নকল যুদ্ধ করে। প‍্যাশন প্লেতেও রোমান সৈন্যের সাজে একদল মানুষ যীশু খ্রীষ্টের বেশধারী কোন এক অভাগাকে বলপূর্বক ক্রুশবহন করিয়ে নিয়ে যায়। এ ধরনের নাটকে অংশ নিতে পারাটা বিশাল পুণ্যের ব‍্যাপার। শিয়ারা আরো করে রওজাখানি বা মর্সিয়াখানি— বিলাপসহকারে কারবালার পদ‍্য সুর করে আবৃত্তি করা। সন্ধ‍্যায় জ্বলে মোমবাতি।

ওপরে, টেক্সাসের সান আন্টোনিওতে প‍্যাশন প্লে; নিচে ইরানের তেহরানে তাজিয়া মিছিলে কারবালার কাহিনীর রিএন‍্যাক্টমেন্ট
ওপরে, টেক্সাসের সান আন্টোনিওতে প‍্যাশন প্লে; নিচে ইরানের তেহরানে তাজিয়া মিছিলে কারবালার কাহিনীর রিএন‍্যাক্টমেন্ট

আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব‍্যাপার হল, ঈস্টারের আগ দিয়ে যেমন ক‍্যাথলিকরা চল্লিশ দিনের ব্রত পালন করে, আশুরাতেও সেরকম চল্লিশ দিন পর শিয়া মুসলিমরা “আরবাঈন” নামে চল্লিশার মত একটি অনুষ্ঠান করে।

দুই ধর্মের এত মিল থাকা সত্ত্বেও এসকল রীতিনীতি যে একে অপর থেকে ধার করা তা নয়। বরং এসকল সংস্কৃতির প্রি-ক্রিশ্চান ও প্রি-ইসলামিক কমন রিচুয়ালেরই অবচেতন স্মৃতি। ক‍্যাথলিক ধর্ম আসলে প্রাচীন রোম আর বিভিন্ন আঞ্চলিক পেগান বিলিফ সিস্টেমকে ক্রিশ্চিয়ানাইজ করে চালু রেখেছে।

ওপরে, স্পেনের জামোরায় লেন্টের সন্ধ‍্যায় মশাল মিছিল; নিচে, ইরাকের বাগদাদে মহরর্মের মশাল মিছিল।
ওপরে, স্পেনের জামোরায় লেন্টের সন্ধ‍্যায় মশাল মিছিল; নিচে, ইরাকের বাগদাদে মহরর্মের মশাল মিছিল।

অপরদিকে শিয়া ইসলামে অনেক ব‍্যাপার আছে যেগুলি তাদের প্রাক্তন জরথুস্ত্রবাদী বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। আশুরার রিচুয়ালের হুসেইন বনাম ইয়াজিদ এ কারণে গুড ভার্সাস ইভেল, লাইট ভার্সাস ডার্কনেস প্রভৃতি জোরোয়াস্ট্রিয়ান বিশ্বাসে নিহিত। হিরো ওয়ারশিপ একটা বড় ব‍্যাপার— বিশেষ করে যদি নিজের মনের দৃঢ় বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে সেই আত্মদান হয়। ফিরদাউসির শাহনামাতে প্রাচীন ইরানের হিরোদের এমন শহীদী আত্মদান আর তাদের মৃত‍্যুর পর জনতার পাবলিক শোকপ্রকাশের গল্প লিপিবদ্ধ আছে।

ক্রিশ্চান অনেক সন্ত যেমন পৌত্তলিক রোমসাম্রাজ‍্যের বিরুদ্ধে নিজ বিশ্বাসে অটল থাকার কারণে কলোসিয়ামে সিংহের খাদ‍্য হয়েছিলেন, হাসান-হুসেন তেমনি আলীর পার্টি বা “শিয়া” বিশ্বাস, ইমামতি/খেলাফতির ন‍্যায়সঙ্গত অধিকার প্রকাশে অটল থাকার কারণে কারবালায় শাহাদত পেয়েছেন। নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মিথ‍্যার বিরুদ্ধে সত্যের চরম আত্মদান তাই শিয়া আশুরার মূল থীম।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সকল আব্রাহামিক ধর্মেই আশুরার মত সিমিলার একটি উৎসব রয়েছে। আবার আরেকটু গভীরে গেলে তাদের আচারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। তাতে একপাশে পড়বে সুন্নি মুসলিম, অধিকাংশ প্রটেস্ট‍্যান্ট খ্রীষ্টান আর ইহুদীরা। আর আবারো বিপরীতে পড়বে শিয়া মুসলিম এবং অর্থডক্স ও ক‍্যাথলিক খ্রীষ্টান।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...






আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ফ্রী উইল

খোদা যদি মঙ্গলের অধিকর্তা হন, তাহলে কেন তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীতে এত যুদ্ধ, এত অশান্তি? যদি তিনি সুবিচারের বিধায়ক হন, তাহলে দুনিয়া জুড়ে কেন এত অবিচার?

যে কোন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ — কিংবা ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ — এ প্রশ্নের সহজ সদুত্তর দিতে কুণ্ঠিত হবেন। আধুনিক কালের আব্রাহামিক ধর্মে এই প্রশ্নকে “কোশ্চেন অফ ইভেল” বলা হয়।

এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত মানুষের ফ্রী উইল বা ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা আর প্রি-ডেস্টিনেশন বা ললাটলিখন।

পৃথিবীর প্রাচীন সনাতনী ধর্মগুলির একটা বৈশিষ্ট‍্য হলে “মুভেবিলিটি অফ গড(স)” — মানে দেবতা অবিচল নন, প্রার্থনা ও পূজা-অর্চনা করে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের মাধ‍্যমে তাঁকে ইচ্ছার অনুকূলে আনা সম্ভব। সেখানে পুণ‍্যকর্ম বা পাপ কাজ করলেই যে সেরকম কর্মফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে তা নয়, দেবতার আশীর্বাদের জন্য তাঁকে অবশ‍্যই তোঁয়াজের ওপর রাখতে হবে।

চিত্রকরের কল্পনায় গ্রীক দেবরাজ জিউসের কাছে পশুবলি দিচ্ছে এরিস্টোমেনিস
চিত্রকরের কল্পনায় গ্রীক দেবরাজ জিউসের কাছে পশুবলি দিচ্ছে এরিস্টোমেনিস

ইহুদী, খ্রীষ্ট, ইসলাম— আব্রাহামিক সকল ধর্মেই সর্বপ্রভু সর্বজ্ঞ এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ‍্যতের নির্ধারক। প্রতিটি মানুষের অবধারিত নিয়তির জ্ঞান তাঁর আছে। কে স্বর্গবাসী আর কে নরকবাসী, তার ললাটলিখন চূড়ান্ত।

তাহলে খোদার নিকট প্রার্থনা করার কিংবা পুণ‍্যকর্ম করার ইনসেন্টিভটা কোথায়? আমার সামনে যদি একটা পাপ ও একটা পুণ‍্যের রাস্তা খোলা থাকে, তাহলে আমি তো চাইলে যে কোনটাই নিতে পারি, স্পেশালি যেখানে আমার ভাগ‍্যলিখন ইতিমধ্যেই ঠিক হয়ে আছে?

এখানেই মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রশ্ন। এ কারণে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মে একটা রিকনসিলিয়েশন করা হয়। সেটা হলো, আমার ইচ্ছার স্বাধীনতা অবশ‍্যই আছে, এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই আমার স্বর্গ-নরকপ্রাপ্তির নির্ধারক। সর্বজ্ঞ স্রষ্টা সে ফলাফল আগে থেকেই জানেন কিন্তু আমার কার্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন না। এছাড়া ভাল না মন্দ কোন নিয়তে আমি কাজটি করছি — কর্মফল যাই হোক না কেন, সেটা স্রষ্টার জ্ঞানে রয়েছে। সে কারণে ক্ষমাপ্রার্থনাসাপেক্ষে আমার পাপমোচনের শক্তিও তাঁর রয়েছে। বাট… সব কিছু প্রিডেস্টাইনড।

ইহুদী ধর্মে পৃথিবীর যত অশান্তি-অবিচারের মূল কারণ হিসাবে এই ফ্রী উইলকেই ধরা হয়। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা স্রষ্টা দিয়েছেন, তার কর্মফলও তাঁর ইতিমধ‍্যে জানা এবং তিনিই তা দেবেন, কিন্তু মানুষের কর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন না।

অপরদিকে খ্রীষ্টান ধর্মে শয়তানকে এক মহাপ্ররোচক হিসাবে দেখানো হয়। আদি পূর্বপুরুষ আদম-হাওয়া যেভাবে নিষ্পাপ অবস্থা থেকে শয়তানের প্ররোচনায় নিপতিত হন, তার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যীশুর ঐশ্বরিক রূপের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




গুস্তাভ দোরের শিল্পে আদম-হাওয়ার স্বর্গ থেকে পতন

এখানে শয়তানের প্রশ্ন চলে এল। শয়তানের প্রকৃতিটা তাহলে কি? তারও কি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে? তার কি খোদার ইচ্ছার আওতার বাইরে অমঙ্গল ঘটানোর ক্ষমতা আছে?

ইহুদী বিশ্বাসে শয়তান খ্রীষ্টধর্মের মত নয়। সেখানে শয়তান খোদারই ইচ্ছাধীন ফেরেশতা। পরকালে প্রসিকিউটরের বা অ‍্যাকিউজারের ভূমিকা তার। কিন্তু মানুষকে প্ররোচিত করার মত ফিজিকাল চরিত্রে তাকে খুব একটা দেখা যায় না। ভাল-মন্দ উভয়েরই মালিক স্রষ্টা স্বয়ং। শয়তান — বরং বলা ভাল মানুষের মনের শয়তান — মন্দ কাজের এজেন্ট। এখানে ইসলামের অসম্ভব মিল আছে ইহুদী ধর্মের সাথে। শয়তান যত বড় অমঙ্গলেরই এজেন্ট হোক না কেন, খোদার সমান শক্তি তার নেই।

ওদিকে খ্রীষ্টধর্মে আবার শয়তানের চরিত্র আরো প্রকটভাবে পরিস্ফূটিত। সে কেবল খারাপের এজেন্ট নয়, সে স্বয়ং খোদার শত্রু। বেহেশত থেকে নিপতিত প্রিন্স অফ ডার্কনেস। সে প্রতিনিয়ত খোদার মঙ্গলের বিপরীত অমঙ্গল ছড়িয়ে যাচ্ছে। তার চরিত্রটা এতটাই সবল যে খ্রীষ্টধর্মকে জরথুস্ত্রবাদের ডুয়ালিজমের কাছাকাছি ধরা যায়। জরথুস্ত্রবাদে আহুরা মাজদা মঙ্গলের শক্তি, আলোর রাজ্যের অধিকর্তা। আর আহরিমান অন্ধকারের, অমঙ্গলের। সেখানে আহুরা মাজদার কোন ক্ষমতা নেই আহরিমানের এজেন্সির ওপর। উল্লেখ‍্য, আধুনিক ফার্সিতে ইসলামের শয়তানের সমার্থক শব্দ আহরিমান।

গুস্তাভ দোরের উডকাটে স্বর্গ থেকে লুসিফার (শয়তানের) বিতাড়ন

খ্রীষ্টধর্ম সম্ভবত জরথুস্ত্রবাদের প্রভাবে সেকেন্ড টেম্পল পিরিয়ডে এই ধ‍্যানধারণাগুলিই অ‍্যাবজর্ব করেছে। বিশেষ করে, জর্দান-ইসরাইলের সীমান্তে পাওয়া কুমরান স্ক্রোলস বা ডেড সী স্ক্রোলস নামক প্রথম শতকের পান্ডুলিপিতে দেখা যায়, ওল্ড টেস্টামেন্টের বাইরেও নানা গ্নস্টিক ধর্মবিশ্বাস এই বিচ্ছিন্ন ইহুদী লোকালয়ে কিভাবে শেকড় গেড়েছিল। সে পান্ডুলিপিতেই পাওয়া যায় লাইট আর ডার্কনেসের মধ‍্যে চিরায়ত দ্বন্দ্বের চিত্র। ছবি দিয়েছি, ইসরাইল মিউজিয়ামে দেখে আসা ডেড সী স্ক্রোলের।

এদিকে শয়তানের প্রকৃতির প্রশ্নে ইসলাম বলা চলে খ্রীষ্টধর্ম আর ইহুদী ধর্মের মাঝামাঝি। সেখানে শয়তানের চরিত্র সলিড। তার প্ররোচনা চলমান। কিন্তু শেষ চয়েজটা মানুষের। সে মঙ্গলের পথে চলবে নাকি শয়তানের প্ররোচনায় ভুলবে।

গুস্তাভ দোরের উডকাট, পতিত স্বর্গদূত মেফিস্টোফিলিস
গুস্তাভ দোরের উডকাট, পতিত স্বর্গদূত মেফিস্টোফিলিস

তবে একটা ইন্টারেস্টিং ব‍্যাপার হল, শয়তানকে একেবারে রক্তমাংসের ফিজিক‍্যাল বিইং হিসাবে কেবল নবী-রাসূলরাই দেখতে পেয়েছেন। যীশু খ্রীষ্ট তার সার্মন চলমান অবস্থায় শয়তান তিনবার মঙ্গলকামনাকারী ছদ্মবেশে তাকে দুনিয়ার সকল ক্ষমতা এনে দেবার প্রলোভন দেখায়। যীশুকে সে প্ররোচনা টলায়নি।

এমন প্ররোচনা বা টেমটেশনের গল্প ইহুদী ওল্ড টেস্টামেন্টে নেই বললেই চলে। বরং বোধিপ্রাপ্তির আগে গৌতমবুদ্ধকে ধ্বংসের দেবতা মার যেভাবে শক্তি ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে প্ররোচিত করতে চেয়েছিল, সে কাহিনীর সাথে যীশুর টেমটেশনের কাহিনী প্রায় পুরো মিলে যায়।

ইসলামেও এ ধরনের টেমটেশনের স্থান রয়েছে। যেমন ইব্রাহিম(আ) যখন ইসমাইল(আ)কে নিয়ে কুরবানির উদ্দেশ‍্যে যাত্রা করেন, তখন একাধিকবার শয়তান তাঁদের প্ররোচনার চেষ্টা করে। হজ্জ্বের সময় আধুনিক মুসলিমরা প্রতীকী শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে সেই কাহিনীর রিএন‍্যাক্টমেন্ট করেন।

মধ‍্যযুগীয় শিল্পকর্মে যীশুকে শয়তানের প্রথম প্ররোচনা
মধ‍্যযুগীয় শিল্পকর্মে যীশুকে শয়তানের প্রথম প্ররোচনা
পারসিক পান্ডুলিপিতে শাহনামার কাহিনীর ফারামার্জ কর্তৃক আহরিমানবধ
পারসিক পান্ডুলিপিতে শাহনামার কাহিনীর ফারামার্জ কর্তৃক আহরিমানবধ

ওল্ড টেস্টামেন্টে আবার কিছু কাহিনী আছে যেখানে সদগুণের মানুষও দুর্ভাগ‍্যকবলিত হন — অর্থাৎ শয়তানের প্ররোচনার ব‍্যাপারটা অনুপস্থিত। যেমন জোব বা আইয়ুবের(আ) কাহিনী। চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হন এই নবী, তাঁর সকল সন্তান দুর্ঘটনায় মারা যায়, শরীরে অমোচনীয় রোগ বাসা বাঁধে। জোব অত‍্যন্ত পরিতাপ করেন, তাঁর প্রশ্ন ছিল কেন তাঁরই এমন দুর্ভাগ‍্য হল।

এখানে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং কুরআন একই অবস্থানে। খোদা কখনো তাঁর প্রিয় বান্দাদেরই ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দুর্দশামুক্তি দেন। যদিও সে পরীক্ষার ফলাফল তাঁর জানা! কিন্তু মানুষ হিসাবে আমরা জানি না খোদা কি জানেন। অতএব ধৈর্যের পরীক্ষায় উৎরানোর চেষ্টা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। খোদার ওপর বিশ্বাস রাখলে এ সকলের যে শেষ ফলাফল সেটা তুলনামূলক বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। কিন্তু সে সকল আউটকাম আগে থেকে জানার মত সর্বজ্ঞতা আমাদের নেই। সেটা একমাত্র খোদার এজেন্সি।

জোবের ধৈর্যপরীক্ষা, গুস্তাভ দোরের উডকাট
জোবের ধৈর্যপরীক্ষা, গুস্তাভ দোরের উডকাট

খ্রীষ্টধর্মে ধৈর্যের পরীক্ষার ব‍্যাপারটার থেকে শয়তানের প্ররোচনা এবং যীশুর আশ্রয় প্রার্থনার ব‍্যাপারটা বেশি আসে। যদি আমার ওপর কোন গজব নাজিল হয়ই, তা অবশ্যই শয়তানের প্ররোচনার কারণে। হতে পারে সদগুণের অধিকারী হয়েও আমার সে নিয়ে গর্ব বেশি। সেটাই শয়তানের প্ররোচনা। সে কারণে যীশুর আশ্রয়ে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে সমর্পণ করলে তবেই এই দুঃখ থেকে মুক্তি। এ হিসাবে খ্রীষ্টধর্মের থেকে ইহুদী ও ইসলাম ধর্ম কাছাকাছি। সেখানে মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ের মালিক আল্লাহ। খ্রীষ্টধর্মে স্রষ্টা ভালরই স্রষ্টা, কিন্তু খারাপটার উৎপত্তি শয়তানের প্ররোচনা ও মানুষের ফ্রীউইল থেকে।

আবার ইহুদী পুস্তকে শয়তান খোদার আজ্ঞাবহ, “ফলেন এন্‌জেল” নয়, যেমনটা ক্রিশ্চানিটিতে। ইসলামে শয়তান “ফলেন এনজেল” কিংবা জ্বীন — কেননা ফেরেশতাদের খোদার আদেশ অমান্য করার শক্তি নেই।

ওপরের আলোচনার অনেক কিছুই পরস্পরবিরোধী ঠেকবে। এই প্রবলেম অফ ইভেল নিয়ে ইহুদী ধর্মে এখনো বিতর্কের শেষ নেই। ইসলামেও অনেক স্ববিরোধিতা রয়েছে — হয়ত খ্রীষ্টধর্ম আর ইহুদী ধর্মের মধ‍্যে মাঝামাঝি অবস্থান নেবার প্রচেষ্টার কারণে।

তবে অতীতে অন্যান্য অবস্থানও তিন ধর্মের প্রখ‍্যাত চিন্তকদের ছিল। যেমন, ইহুদী ধর্মে মাইমনিডিস, খ্রীষ্টান ধর্মে সেন্ট টমাস অ‍্যাকিনাস আর ইসলাম ধর্মে ইবনে রুশদের অবস্থান র‍্যাশনালিস্ট। মানে মানুষের ফ্রীউইল প্রায় শতভাগ, এবং খোদা তার প্রতিফলের বিচার করতে কোন আর্বিট্রারিনেস বা স্বেচ্ছাচারিতা দেখান না। নেচার ইজ ইম‍্যুটেবল। প্রাকৃতিক নিয়মের কোন ব‍্যত‍্যয় নেই (উল্লেখ‍্য, এ দর্শনে ইনএক্সপ্লিকেবল মিরেকলের স্থান নেই)।

আবার ইহুদী নাহমানিডেস আর মুসলিম আল-গাজালীর অবস্থান এদের প্রায় বিপরীত। তাদের হিসাবে মানুষের আল-কদর বা ললাটলিখন চূড়ান্ত, এ সীমানার মধ‍্যেই তার ফ্রীউইল সীমাবদ্ধ। যদি ব‍্যত‍্যয় ঘটে তবে সেটার কারণ খোদার আর্বিট্রারি ইন্টারভেনশন (এখানে মিরেকলের সুযোগ আছে)।

ইবনে রুশদ, চতুর্দশ শতকের ইতালিয়ান শিল্পী বোনআইউতোর চিত্রকর্ম
ইবনে রুশদ, চতুর্দশ শতকের ইতালিয়ান শিল্পী বোনআইউতোর চিত্রকর্ম

অতীতে আদি ইসলামের একটি দার্শনিক গ্রুপের অস্তিত্ব ছিল যাদেরকে “কদরিস্ট” নাম দেয়া হয়েছে। উমাইয়া ও আদি আব্বাসী খেলাফতের সময়ের — অর্থাৎ ইসলামের স্বর্ণযুগের সময়কার এসকল চিন্তাবিদরা মানুষের শতভাগ ফ্রীউইল রয়েছে দাবি করতেন। খোদা মানুষের সকল কাজের বিচারক আর প্রতিফলের বিধায়ক কেবল। প্রিডেস্টিনেশন বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তি বলে কিছু নেই।

এই চিন্তাধারা মানুষকে শতভাগ এজেন্সি দেয়। কদরিস্টদের দর্শন পরবর্তী মু’তাজিলা স্কুলের দার্শনিকরা কিছু পরিবর্তনসহকারে গ্রহণ করে নেন। আর এ সকল স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দর্শন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় আ’শারীপন্থীদের এবং ইমাম গাজালীর সুফী আধ‍্যাত্মিক চিন্তাপ্রসূত ডিটারমিনিজম সর্বজনগৃহীত হবার পর থেকে। সুন্নী ইসলামে এখন প্রিডেস্টিনি শতভাগ স্বীকৃত, আর শিয়া ইসলামে ফ্রীউইলের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এখনো রয়েছে।

এ সকল জটিল দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই আব্রাহামিক ধর্মগুলির হাজার হাজার পৃষ্ঠার ধর্মগ্রন্থে অনুপস্থিত। কিন্তু পুস্তকের পাতা থেকেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় গুরুরা প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেছেন, একেক সময় একেক উত্তর দিয়েছেন। ভবিষ‍্যতেও নতুন জবাবের উদ্ভব ঘটা অসম্ভব নয়। যে কোন ধর্মেরই বিবর্তন কিন্তু সর্বদা চলমান। ফলে আজ আমরা যে ধরনের ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে আছি, আগামী একশ বছরে তার ব‍্যাপক মৌলিক দার্শনিক পরিবর্তন কিন্তু একেবারে অসম্ভব নয়।

ইসরাইল মিউজিয়ামে ডেড সী স্ক্রোলস এগজিবিট
ইসরাইল মিউজিয়ামে ডেড সী স্ক্রোলস এগজিবিট
ইসরাইল মিউজিয়ামে ডেড সী স্ক্রোলস এগজিবিট
ইসরাইল মিউজিয়ামে ডেড সী স্ক্রোলস এগজিবিট
ডেড সী স্ক্রোলসের একাংশ
ডেড সী স্ক্রোলসের একাংশ


আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!