মসলিনের মৃত্যু

ওপরের ছবিঃ ১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ শিল্পী রেনাল্ডির অংকিত চিত্রে ভারতের এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত নারীকে হুঁকাসেবনরত দেখা যাচ্ছে, পরনে মসলিন। সম্ভবত ঢাকায় আঁকা।

ঢাকার মসলিন বুননশিল্পকে নাকি ব্রিটিশরা উদ্দেশ‍্যমূলকভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তন্তুবাঈদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল যাতে আর কখনো তাঁত বুনতে না পারে। ১৭৫০এর দশকে যে বাংলার জিডিপি নাকি সারা বিশ্বের ২৫ শতাংশ ছিল, সেটা নাকি ১৯০০ সালে ২ শতাংশে এসে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধীর লেখা আর তাঁর স্বরাজ-স্বদেশী আন্দোলন আর বহু ব্রিটিশবিরোধী বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই দাবিগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু এগুলির পেছনে সত‍্যতা কতটুকু?

আমার মনে সব সময় প্রশ্ন ছিল, ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো আসলে বেনিয়া। বাণিজ‍্য যেদেশ মুখী হোক না কেন, মধ‍্যসত্ত্বভোগী হিসাবে তাদেরই লাভ। এমনকি ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের আগে একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা ইউরোপ ও এশিয়ার অন‍্যান‍্য দেশের সাথে বাণিজ‍্য চালিয়েই ধনাঢ‍্য হয়ে উঠেছিল। তাহলে এই মসলিনের মত সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে মেরে ফেলাটা কিভাবে উদ্দেশ‍্যপ্রণোদিত হয়!



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৬৬৫ সালের মোঘল মিনিয়েচারে সম্রাট দারা শিকোর সাথে সুলায়মান শিকো— উভয়েই পাতলা মসলিনপরিহিত

প্রথমে বলি আঙুল কাটার এই অপবাদটা কোত্থেকে এল। এই কাহিনীটা রয়েছে উইলিয়াম বোল্টসের “কনসিডারেশনস ফর ইন্ডিয়ান এফেয়ার্স” নামক বইয়ে। ভদ্রলোক ডাচ হয়ে জন্ম নিলেও পরে ইংল‍্যান্ড চলে যান। বেশ কিছু বছর বেংগলে ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন।

১৭৫৯ সালে সে ক‍্যারিয়ার শুরু করার পর নিজে গোপনে প্রাইভেট ট্রেড শুরু করেন, যেটা সে সময়ে ছিল কোম্পানির আইনবহির্ভূত। ফলে ১৭৬৮ সালে তার চাকরি যায়, এবং বেংগল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। বইটি লেখেন ১৭৭২ সালে— অর্থাৎ সেসবের পর। তাঁতীদের আঙুল কেটে ফেলার মত অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর প্রাক্তন প্রভুদের ব‍্যাপারে আরো নানা অপবাদ রয়েছে এই বইয়ে। ফলে কোনভাবেই তাঁকে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক বলা যায় না।

তাছাড়া তিনি এই অভিযোগ যে সময়ে করেছেন সে সময়েই যে বেংগলের বস্ত্রশিল্পে ধ্বস নামে, তার কোন প্রমাণ নেই। বরং তথ‍্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, সেটার শুরু আরো পরে — অন্তত ১৮২৫ সালের পর।

ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের স্ত্রী রাণী হেনরিয়েটা মারিয়া (১৬০৯-৬৯)। চিত্রের কাল ১৬৭০ থেকে ১৬৯৯। রাণীর জামার হাত ও গলার অংশবিশেষ মসলিনের কাপড়ে তৈরি।

এ ব‍্যাপারে আমি মূলত শরণাপন্ন হয়েছি ইন্দ্রজিৎ রায় বলে একজন বাঙালি ইকনমিক হিস্টরিয়ানের লেখা একাডেমিক পেপারের ওপর। ২০০৯ সালে ইকনমিক হিস্টরি রিভিউ নামক প্রখ‍্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়। বহু সমসাময়িক উৎস আর নিজের ও অন‍্যান‍্য গবেষণা থেকে লব্ধ তথ‍্যউপাত্ত তিনি এখানে দিয়েছেন। তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় ধ্বসটা ১৭৬০এর দশকে ঘটেনি। এই পেপার ছাড়াও ‌অন‍্যান‍্য আনুষঙ্গিক তথ‍্য ব‍্যবহার করেছি।

প্রথমত ইন্দ্রজিৎ একটা ভাল পটভূমিকা দিয়েছেন পুরো শিল্প কিভাবে বুম করল তা নিয়ে। বহু আগ থেকেই বঙ্গ বস্ত্রশিল্পের জন‍্য ভূবনবিখ‍্যাত হলেও তার বুমটা হয় ইউরোপীয় মার্ক‍্যান্টাইলিজম তথা ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলির পিঠে সওয়ার হয়ে। ১৬০০ সালে কোম্পানির যাত্রা শুরু হলেও প্রথমে বঙ্গে তাদের মনোযোগটা ছিল না, ছিল ইন্দোনেশিয়ার স্পাইস আইল‍্যান্ডসের ওপর। যখন তারা দেখল যে ইন্দোনেশিয়ানরা মশলা বিক্রির বিনিময়ে ভারতীয় ক‍্যালিকো ও মসলিন কিনতে চায়, তখন সেসব সংগ্রহের জন‍্য ভারতে তাদের ফ‍্যাক্টরি গড়ে উঠতে শুরু করে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৮০১ সালে অংকিত চিত্রে ফরাসী সম্রাট নাপোলেওনের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী জোসেফিন, পরনে মসলিন

হুগলিতে প্রথম ফ‍্যাক্টরি চালু হয় ১৬৫১তে। তারপর ঢাকা আর মালদহ। ঢাকা বিখ‍্যাত ছিল সবচেয়ে উন্নত মানের “ফুটি” কার্পাস তুলার জন‍্য। মসলিন তৈরি হত তার থেকেই। কিন্তু পুরো ফ‍্যাব্রিক শিল্পের কেবল একটা ছোট হাইএন্ড অংশ ছিল মসলিন। বাকিটা ছিল বঙ্গ ও ভারতের অন‍্যান‍্য প্রদেশ থেকে আসা বিভিন্ন গুণ ও মূল‍্যের ফ‍্যাব্রিক। বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ যে বলা হয়, সেটা কেবল মসলিন হতে পারে না, বরং সকল গুণ ও মানের পণ‍্যের কারণে।

শুধু ইন্দোনেশিয়া নয়, খোদ ইউরোপেও এসব কাপড় জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৭৯০ নাগাদ যুক্তরাজ‍্য ছাড়াও পর্তুগাল, ডেনমার্ক, জার্মানি ছিল বড় বাজার। মসলিন ছিল রাজা-মহারাজা আর তাদের দরবারের পছন্দের কাপড়। রাজা দ্বিতীয় চার্লস স্বয়ং ভারতীয় সুতি ও মসলিন পরে ঘুরে বেড়াতেন। বলা যায় ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে ভারতীয় কাপড়ের ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর ছিলেন। বেশ কিছু মোঘল ও ইউরোপীয় বনেদী লোকজনের চিত্র দিয়েছি, যাতে তাদেরকে মসলিনপরিহিত দেখা যাচ্ছে।

ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মসলিন, তারিখ বলা হচ্ছে ১৮৭২এর আশেপাশে
ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত “মলমল খাস” গ্রেডের ঢাকাই মসলিন, তারিখ ১৮৫১
নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্টে সংরক্ষিত ঢাকাই জামদানি, তারিখ ১৮৮০
জাপানে রপ্তানিকরা সারাসা নামক ভারতীয় সুতি বস্ত্র, ১৮০০এর দশক

বিভিন্ন অফিশিয়াল হিসাব ঘাঁটিয়ে পেপারটিতে এসেছে যে, ১৬৫৮ থেকে ১৬৭৮এর মধ‍্যে কেবলমাত্র ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বস্ত্র ব‍্যবসার পরিমাণ ১৫ গুণ বৃদ্ধি লাভ করে। সেটা বাৎসরিক গড়ে ১৪.৫%। ১৬৭৮ থেকে ১৬৮৩ ছিল আরো বেগবান— বাৎসরিক ৯৬.৭৫%, অর্থাৎ প্রতি বছর পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছিল!

এর বিপরীতে কিন্তু ব্রিটেনের কাপড় প্রস্তুতকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এতদিন স্থানীয় যারা উল আর লিনেনের কাপড় তৈরি ও ব‍্যবসা করত, তারা হঠাৎ করে নতুন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হল। কেননা লিনেন-উলের বিপরীতে ভারতীয় সুতি কাপড় ছিল অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক। বনেদীরা যেখানে মসলিন পড়ছে, সেখানে সাধারণ মানুষও সুতি কাপড়ের দিকে ঝুঁকছে। আর সুতি কাপড়ের কাঁচামাল তুলার উৎপাদন ইংল্যান্ডের জলবায়ুতে অসম্ভব।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




অসন্তোষ থেকে কিছু ভাঙচুরও হল। ফলে ব্রিটিশ সরকার — মাইন্ড ইউ, দে আর নট দ‍্য সেইম অ‍্যাজ দ‍্য কম্পানি — ভারতীয় সুতি কাপড়ে ১৬৮৫তে ১০% শুল্ক আরোপ করে। ১৬৯০এ সেটা বেড়ে হয় ২০%।

কিন্তু এর বিপরীতে প্রাপ্ত আমদানি-রপ্তানি তথ‍্যে দেখা যায়, ১৬৯৮-১৭০০ পিরিয়ডে ব‍্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.৮৫ গুণ। অর্থাৎ ইংলিশ প্রটেকশনিস্টদের শত অভিযোগ ও শুল্ক সত্ত্বেও ভারতীয় কাপড়ের চাহিদা বাড়বাড়ন্তই ছিল।

ফলে আরো অভিযোগের মুখে কঠোরতম অবস্থান নিতে বাধ‍্য হয় ব্রিটিশ সরকার। ১৭০০ সালের ক‍্যালিকো অ‍্যাক্টে ভারতীয় সুতি কাপড় আমদানি পুরোপুরি নিষেধ করে দেয়া হয়। কাউকে যদি সেটা ব‍্যবহার করতে দেখা যায়, তাহলে বিশাল অংকের জরিমানা অবধারিত। তবে রি-এক্সপোর্ট করা যাবে, ১৫ শতাংশ শুল্কের পর।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




এর ফলে উল্টো কালোবাজারের প্রভাব গেল বেড়ে। আর রি-এক্সপোর্ট মার্কেট ছিল নেদারল‍্যান্ডস, ইউরোপের অন‍্যত্র আর আমেরিকান কলোনিগুলিতে। বিশেষ করে আমেরিকান সাউথে লিনেন ও উলের থেকে কটন ফ‍্যাব্রিক ছিল বেশি গ্রহণযোগ‍্য।

ইংল‍্যান্ডে প্রকাশিত একটি বইয়ে দেখানো মসলিন প্রস্তুতপ্রক্রিয়া, ১৮৬৬

আরো কিছু কথা না বললেই নয়। ইংলিশ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছাড়াও এ ব‍্যবসায় ছিল ডাচ ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু নেদারল‍্যান্ডসে এমন কোন উচ্চ শুল্ক ছিল না। তাছাড়াও এশিয়ার অন‍্যান‍্য দেশ, যেমন জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসের রাজ‍্যগুলি, পারস‍্য ও গাল্ফে বেংগল ফ‍্যাব্রিকের অসম্ভব চাহিদা ছিল। দুই ঈস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি মিলে সে ব‍্যবসাটাও করত।

ফলে ১৭১৫ থেকে ১৭৪০এর মধ‍্যে বিজনেস গ্রোথ হয় ৭ গুণ। ব্রিটিশ কাপড় প্রস্তুতকারকদের চলমান অভিযোগের মধ‍্যে ১৭২১ সালে আরোপিত আরো একটি প্রোহিবিশন অ‍্যাক্টও এ ব‍্যবসার গতি বন্ধ করতে পারেনি।

ব‍্যবসায় একটু মন্দা আসে ১৭৫০এর শেষ থেকে ১৭৬০এর দশক পর্যন্ত। এর মূল কারণ ফ্রান্সের সাথে ইংল‍্যান্ডের চলমান বিশ্ব‍ব‍্যাপী সেভেন ইয়ার্স যুদ্ধ (১৭৫৬-৬৩)। এসকল যুদ্ধের একটি হল পলাশী। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ কেবল এই যুদ্ধ নয়, তার আগে বর্গীদের আক্রমণ, আর পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পরেও চলমান নানা অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত ছিল — যেমন বক্সারের যু্দ্ধ (১৭৬৪)। ১৭৭০এর আগে কোম্পানি বঙ্গের প্রশাসনে তেমন কোন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ফরাসীদের সাথে যুদ্ধের আগ থেকেই কিন্তু শুধু ভারতীয় নয়, ফ্রান্স থেকে আসা রেশমী কাপড় নিয়েও বেশ উৎকন্ঠিত ছিল কাপড় প্রস্তুতকারীরা। ফরাসী রেশম আর ভারতীয় ক‍্যালিকোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বহু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাজারে হাজারে কর্মী চাকরি হারিয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অভুক্ত, বস্ত্রহীন জীবনযাপন করছে। ১৭৫০/৬০এর দশকে ইংল‍্যান্ডের শ্রমজীবী শ্রেণীর এই বাস্তবতা একাধিক ঐতিহাসিক উৎসে পাওয়া যায়।

স্বভাবতই ভারতীয় সুতি নয় শুধু, ফরাসী মালের ওপরও কঠোর শুল্ক আরোপিত হয়। সেটা চালু ছিল ১৮৬০এর দশক পর্যন্ত, যেখানে ভারতীয় পণ‍্যের ওপর শুল্ক প্রত‍্যাহার করে নেয়া হয় ১৮২৬ নাগাদ।

ইন্দ্রজিতের পেপারে দেখানো বঙ্গের বস্ত্র আমদানি রপ্তানির চার্ট

উপাত্ত দেখে জানা যায় যে, ১৮০০ সালের আশপাশ দিয়ে ছিল বঙ্গের বস্ত্রবাণিজ‍্যের পীক। ১৭৯৩ সালে বঙ্গের বস্ত্রশিল্পে — মসলিনসহ সকল ফ‍্যাব্রিকে — কোম্পানির বিনিয়োগ ছিল ৬৬ লক্ষ সিক্কা রূপী। ১৭৯৫এ কোম্পানি তার “সার্ভ‍্যান্টদের” প্রাইভেট বা ফ্রী ট্রেড করার অনুমতি দেয়। অর্থাৎ তারা সামান‍্য ফীয়ের বিনিময়ে কোম্পানির জাহাজ ও গুদাম ব‍্যবহার করে নিজেরা ব‍্যবসা করতে পারবে। কোম্পানির মনোপলি ভাঙার কারণে সম্ভবত একটা বড় বুস্ট পায় বস্ত্রশিল্প।

১৮০০এর পর একটা মন্দা দেখা দেয় মার্কেটে। এর কারণ আবারো ইউরোপের ডামাডোল। নাপোলেওঁ বোনাপার্ত প্রায় পুরো ইউরোপ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ওপর আরোপিত হয়েছে কন্টিনেন্টাল ব্লকেড। ফরাসী নৌবাহিনীর চোখ এড়িয়ে কোন জাহাজ ভেড়ানোর উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় কাপড়ের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৮১৫তে নাপোলেওনের পরাজয়ের পর আবার ব‍্যবসায় প্রাণ ফিরে আসে। ১৮১৬এর দিকে আরেকটা পীক দেখা যায়। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের যে শুল্কটা ভারতীয় বস্ত্রের ওপর ছিল, সেটা প্রত‍্যাহার করা হয় ১৮২৬ সালে। রপ্তানিতে ধ্বসটা নামে ১৮৩০এর দশকে আর কলকাতার বস্ত্রের রপ্তানি তারপর ধীরে ধীরে প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে আসে।

ইন্দ্রজিতের পেপার থেকে কলকাতা বন্দর হতে রপ্তানিকৃত সূতিবস্ত্রের পরিসংখ‍্যান

তার মানে দাঁড়াচ্ছে শুল্কের প্রভাব রপ্তানির অধঃপতনের সাথে সরাসরি কোরিলেটেড নয়।

১৮৩০এর পর থেকে ট্রেন্ড পুরোপুরি বিপরীতমুখী— অর্থাৎ বহির্বিশ্ব থেকে বস্ত্র কলকাতার বন্দরে আসছে, আর তার বৃদ্ধি হয়েছে এক্সপোনেনশিয়াল। ভারতে বাইরে থেকে আমদানি করতে কর দিতে হত কেবল ২.৫%। এটা কোম্পানির হাতে ছিল, ব্রিটেনের শুল্কটা তাদের হাতে ছিল না।

এই যে বাইরের কাপড়ের এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ, এর কারণটা আর কিছুই নয়, শিল্প বিপ্লব। যার ফলে মিলের কটন ইয়ার্ন আর তৈরি কাপড় অসম্ভব সস্তায় বিক্রি করা সম্ভব হয়।

ইন্দ্রজিতের পেপার থেকে বিলেতে আমদানিনিষিদ্ধ বেআইনী সূতি কাপড়ের ব‍্যবসার পরিসংখ‍্যান

১৭৩০এর দশক থেকেই বস্ত্রশিল্পে নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হতে শুরু করে। ১৮০০ সালের পর থেকে ইংল‍্যান্ডে যে হারে মিল গড়ে উঠতে শুরু করে তা ছিল দেখার মত। ১৮০০ সালের আগে যেখানে বহু মিল ছিল ওয়াটার হুইল চালিত, সেগুলিও পরিবর্তিত হয়ে যায় বাষ্পচালিত প্রযুক্তিতে।

অপরদিকে তুলোর মত কাঁচামালও সস্তায় আসতে শুরু করে নতুন এক জায়গা থেকে — আমেরিকান সাউথ। আগের কনজিউমার, এখন মাস প্রডিউসার। তাদের জলবায়ুও তুলোর উপযুক্ত। সেখানে ক্রীতদাসের পারিশ্রমিকহীন শ্রমের ওপর ভর করে আর কটন জিনের মত যন্ত্রের আবিষ্কারের (১৭৯৩) কারণে তুলোর প্রস্তুতিখরচ অত্যন্ত কমে যায়। ১৮৬০ নাগাদ সারা বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ তুলো আসত আমেরিকান সাউথ থেকে।

ইংল‍্যান্ডের নতুন প্রযুক্তির মিলগুলিতে কাজ করত মূলত অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। আগের তাঁতীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই আবার অসন্তোষ বাড়তে শুরু করল। “লাডাইট” নামক গোষ্ঠিটির উদ্ভব এখানেই। এরা রাতবিরাতে ফ‍্যাক্টরিতে আক্রমণ চালিয়ে কটন মিলের পার্টস ধ্বংস করে ফেলত। মিলের মালিক-কর্মচারীদের বেনামী চিঠি দিয়ে হুমকি দিত। এদের পীক ছিল ১৮১০এর দশকে। লিভারপুল ও অন‍্যান‍্য কিছু শহরে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেলে ১২,০০০ সেনা পাঠিয়ে সেসব দমন করা হয়। লাডাইটদের নেতাদের অনেকের গর্দান যায়। বহু সাধারণ লাডাইটকে নির্বাসনের প্রাণদন্ড দেয়া হয়— এরাই এসে হাজির হয় অস্ট্রেলিয়ার পেনাল কলোনিগুলির মত জায়গায়।

১৭১৯-২০ সালে স্পাইটলফীল্ড এলাকার তাঁতকর্মীদের রায়টের ফলে ব্রিটিশ সরকার ক‍্যালিকো এক্ট ১৭২১ প্রবর্তন করে। সংবাদপত্রের এই কার্টুনে তাঁতশিল্পে জড়িত নানা শ্রমিকদের আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যাচ্ছে।
১৮১১ সালের কার্টুনে দেখানো হয়েছে লাডাইটরা কিভাবে তাঁতযন্ত্র ধ্বংস করত
১৭৯০এর দশকে আমেরিকার মিসিসিপিতে কটন প্ল‍্যান্টেশন ও দাসশ্রমের চিত্র
১৮০৮ সালে চ‍্যারিংক্রস পিলোরি — লাডাইটদের জনসম্মুখে বিচার করে প্রাণদন্ড ও নির্বাসন দেয়া হয়

মেকানাইজেশেনের উপযুক্ত কাঁচামাল কটনও সহজলভ‍্য হয়। দেখা যায় প্রযুক্তির সাহায‍্যে অদক্ষ শ্রমিকও মাইলের পর মাইল কাপড় বানাচ্ছে। অর্থাৎ শিল্পায়নের মাধ‍্যমে ইংল‍্যান্ডের স্থানীয় তাঁতীদের কোমর বঙ্গের তাঁতীদের আগেই ভেঙে দেয়া হয়।

নাপোলেওনিক যুদ্ধগুলির পরে মার্কেটের চরিত্রও পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইউরোপের এলিটদের কম্পোজিশন আর আগের মত নেই। আগে রাজার কাছ থেকে বিশাল জোতদারি নিয়ে যারা ধনী হয়ে পড়েছিল, তাদের সময় শেষ— অনেকেই গিয়োটিনে মাথা খুইয়েছে। তাদের স্থান নিয়েছে নুভো রিশ বণিক ও শিল্পপতিরা। এদের কাছে মসলিনের মত কাপড়ের কদরটা আর তেমন ছিল না। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণেও এরা আগের এলিটদের ন‍্যায় কনজারভেটিভ ছিল না।

ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের অগ্রগতির একটা ছোট চিত্র দিই। ১৭৮৮ সালে ব্রিটেনে ৫০ হাজারের মত স্পিন্ডল ছিল তাঁতবুননের জন‍্য। বাষ্পচালিত মিল আসার পর ১৮১২ সালে সে সংখ‍্যা দাঁড়ায় ৪৬ লক্ষে। ১৮৩৫ সালে ব্রিটেনে এক হাজার মিল ছিল, তাদের সিংহভাগ ছিল বাষ্পচালিত। স্পিন্ডলের সংখ‍্যা ৯৫ লক্ষ!

১৭৭০এর দশকে ব্রিটেনে প্রচলিত ওয়াটারহুইলচালিত তাঁতশিল্প
১৮৩৪ সালের চিত্রে ইংল‍্যান্ডের বাষ্পচালিত পাওয়ার লুম
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়াতে টেক্সটাইল মিলে শিশুশ্রমিক, ১৯১০ সাল। যুক্তরাজ‍্যে ১৯৩৩এ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৮এ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
কানেকটিকাটের একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত কটন জিন যন্ত্র। ১৭৯৩ সালে আবিষ্কৃত এ যন্ত্র অত‍্যন্ত সহজে তুলো থেকে তার বীজগুলি আলাদা করে ফেলত।
ইয়র্কশায়ারের সল্টস মিল ভবন, একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারখানা ও টেক্সটাইল মিল, ১৮৫৩ সালে স্থাপিত

শিল্পবিপ্লবের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পরবর্তী ধাক্কাটা আসে বঙ্গ ও ভারতের ওপর। ১৮০০ সাল নাগাদ বঙ্গের এ শিল্পে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৭০০ সাল থেকে কর্মসংস্থানের প্রায় চার গুণ প্রবৃদ্ধি ঘটে। ১৮০০র পর থেকে ব্রিটেন ও ইউরোপ যন্ত্রের মাধ‍্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণ করা শুরু করলে বহির্বিশ্বের বাজার ভারতের হাতছাড়া হয়ে যায়। উল্টো তাদের উদ্বৃত্তের বাজারে পরিণত হয় ভারত। ইন্দ্রজিতের পেপারে হিসাব করে বলা হয়েছে, ১৮৬০ সাল নাগাদ প্রায় ৫,৬৩,০০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অবলুপ্ত হয়। অর্থাৎ পুরো শিল্পের ২৮ শতাংশ।

তবে দুটো ব‍্যাপার বলা জরুরী। কোম্পানির বিভিন্ন দলিলে এই বিপর্যয়ের অ‍্যাকনলেজমেন্ট আছে। প্রশাসকরা পাবলিকলি এ ব‍্যাপারে কমেন্ট করেছেন, তবে সেগুলি আফটার দ‍্য ফ‍্যাক্ট হিসাবে। তাতে তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতা প্রমাণ হয় না। একটি দলিলে বরং উল্লেখ রয়েছে তাদের সংবেদনশীলতার কথা। “They recommended that British piece goods should be sold in Bengal ‘without interfering with or proving injurious to the interest of the native manufacturers, whom we [the Court of Directors] conceive ourselves likewise bound to protect to the utmost of our power’.”

আরেকটা ব‍্যাপার হল, বিলেত (এবং অল্প কিছু মার্কিন) থেকে আসা কাপড়ে স্থানীয় বাজার পুরোপুরি সয়লাব হতে পারেনি। ইন্দ্রজিতের চার্টের ইম্পোর্ট পীক এক্সপোর্ট পীকের চার গুণ, তাও প্রায় আশি বছর পর। এর মধ‍্যে ইন্টার্নাল ডিমান্ড অবশ‍্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া যে কোন প্রডিউসার তাদের কনজামশনের পর উদ্বৃত্তটাই বাইরে পাঠায়। যন্ত্রায়িত না হলে তাদের কনজামশনের একটা ছোট অংশই এক্সপোর্ট হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ নতুন ইম্পোর্ট ইন্টারনাল মার্কেটের একটা সাইজেবল অংশ দখল করতে পারলেও পুরোটা পারেনি।

এর এনেকডোটাল এভিডেন্সও পাওয়া যায়। বিলেতী কাপড় মূলত জনপ্রিয় ছিল নতুন উঠতি শিক্ষিত মধ‍্যবিত্তের মাঝে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের জমিদার পরিবার এমনকি শহুরে নারীদের মাঝে তখনো মসলিন বা দেশি কাপড়ের মর্যাদা আর আরামটাই ছিল বেশি। বিলেতী মেশিনমেড কাপড় দৈনিক ব‍্যবহার্য হলেও সে গুণমানের নয়। এই একই কারণে বিলেতেও কিছু ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের কুটিরশিল্পও বেঁচে গেছিল। টুইডের ব‍্যাপারে খুঁজে দেখবেন।

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, সত‍্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী, বিংশ শতকের শুরুর দিকে
আয়ারল‍্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে ঐতিহ‍্যবাহী টুইড ফ‍্যাব্রিকের “ওকিং”, ১৭৭২
“বাঙালী বাবু”, ১৮৯০এর কলকাতা থেকে পোস্টকার্ড

আর বঙ্গের দরিদ্র গ্রাম্য মানুষের কাছে তো ঐ বিলাতী ইম্পোর্টেড মাল পৌঁছাতই না। তারা তাদের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য অনুযায়ী ঘরেই মোটা সুতি কাপড় প্রস্তুত করত আর তাই পরিধান করত।

অর্থাৎ কেবল মাঝারি গ্রেডের সুতি কাপড়ের বাজারটাই বিলেতী কাপড়ের দখলে আসে। বিলাসী মসলিন কিংবা গরিবের মোটা কাপড়ের মার্কেট ডিস্প্লেস হয়নি। এর প্রমাণও কিছুটা দিতে পারি মিউজিয়াম স্পেসিমেন থেকে। ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্ট মিউজিয়াম, নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট, এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে যে মসলিন সংরক্ষিত আছে, এদের বুননকাল অন্তত ১৮৫০এর পর। অর্থাৎ মসলিনের কমার্শিয়াল মার্কেট প্রায় অবলুপ্ত হলেও কুটিরশিল্প ও বিলাসী দ্রব্য হিসাবে এদের অস্তিত্ব চালু থেকেছে— সেগুলি বানানোর প্রক্রিয়া তখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এরই লেগেসি আমরা এখনো পাই জামদানির মত দেশী ঐতিহ‍্যবাহী শিল্পের মধ‍্যে। মসলিনের মৃত‍্যুটা সম্ভবত হয়েছে ১৮৫০এর পরে, যখন এত পাতলা কাপড়ের গ্রহণযোগ‍্যতা আর ইউরোপীয় ও ভারতীয় ফ‍্যাশনে ছিল না।

ওদিকে বিলেতী আমদানি কাপড়ের চাহিদা কলকাতার আশপাশেই বেশি ছিল। নতুন বড়লোক হওয়া জমিদার পরিবারের যেমন অভাব ছিল না, তেমন কোম্পানির ব‍্যুরোক্রেসি ও ব‍্যবসার সাথে সম্পৃক্ত বাঙালি মধ‍্যবিত্ত “ভদ্দরনোক” “বাবু” টাইপ একটি শ্রেণীও গড়ে উঠছিল। শিল্প বিপ্লবের ফলে নানা প্রযুক্তি ও পণ‍্য যেমন সুলভ হয়ে পড়ে, তার ফলেই এই মধ‍্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান সম্ভব হয়— যেমনটা ঘটছিল খোদ ইউরোপেও। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আদলে তাই বাঙালি রেনেসাঁসও সম্ভব হয়ে ওঠে এ সময়ে। পোশাকের ফ‍্যাশানেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যেমন আধুনিক কালের শাড়ি ফ‍্যাশন ও ব্লাউজ প্রচলনের ক্রেডিটটা ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের দেয়া যায়। এনারা বিলেতী পণ‍্য ব‍্যবহারের চেষ্টা না করলেও তাদের অনুসারীদের সকলে নিশ্চয় এত বাছবিচার করেনি।

১৮৩০এর দশকের পর থেকে তৈরি কাপড় নয়, বরং র’ কটনটাই কলকাতা থেকে বেশি রপ্তানি হয়েছে। তার দামটাই বেশি ছিল, কেননা কাপড় তৈরির পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলি ইংল‍্যান্ডেই বেশি এফিশেন্ট ও মাস প্রডিউসিবল ছিল। ফলে বঙ্গের “ডিইনডাস্ট্রিয়ালাইজেশন” সংক্রান্ত যে গালগল্প বলা হয়, সেটাই ঘটে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গের হোম ইন্ডাস্ট্রিকে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে ইংল‍্যান্ডের মেশিন ইন্ডাস্ট্রির দানবীয় শক্তির সাথে।

ভারতের নাগপুরে টাটা পরিবারের এমপ্রেস কটন মিলস, ১৮৭৭

এমন নয় যে, ঐ শিল্পের সাথে পাল্লা দেবার প্রচেষ্টা বঙ্গে হয়নি। কিন্তু সে ছিল “টু লিটল, টু লেইট।” বঙ্গের প্রথম কটন মিল স্থাপিত হয় কলকাতার অদূরে বৌরিয়াতে, ১৮১৮ সালে। ব্রিটিশ মেশিনারি ও ব্রিটিশ মহিলাদের সাহায‍্যে স্থানীয় শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চালানোর চেষ্টা করে ব্রিটিশ মালিকপক্ষ। কিন্তু ব‍্যবসায়িক সাফল‍্য আসেনি। হতে পারে কলকাতার এডজাসেন্ট মার্কেট বিলাতী আমদানিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। পরে মিলটি জুটমিলে পরবর্তিত হয়ে যায়। আরো বহু পরে, ১৯০০ সাল অতিবাহিত হলে বঙ্গে লাভজনক কটন মিল স্থাপিত হয়।

তবে বঙ্গে যা সম্ভব হয়নি তা সম্ভব হয় ভারতের পশ্চিমে। ১৮৫৪ সালে পার্সি শিল্পপতি কোয়াসজি নানাভাই দাবর (১৮১৫-৭৩) বোম্বেতে চালু করেন বোম্বে স্পিনিং এন্ড উইভিং কম্পানি— যার মূল ভিত্তি ছিল বাষ্পচালিত কটন মিল। শুরুতে ১৭,০০০ স্পিন্ডল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ১৮৭০এর দশকে সে সংখ‍্যা দাঁড়ায় ৪৫ হাজার। ১৮৫৬তে দ্বিতীয় আরেকটি মিল বোম্বে থ্রোসল মিলও প্রতিষ্ঠা করেন একই ভদ্রলোক। তাতে ছিল ২০,০০০ স্পিন্ডল।

বিগ পিকচারে দেখতে পাই— ১৮৭০এর দশকে ভারতে ৪৭টি কটন মিল ছিল। সে সংখ‍্যাটা ধীরে ধীরে বেড়েছে, কমেনি— যদি ব্রিটিশদের তেমন ইচ্ছা থাকত, কমতে পারত। ১৮৮০এ ৫৮টি, ১৮৮৩তে ৭৯টি, ১৯০০ সালে ১৯৩টি, ১৯১৪ সালে ২৭১টি, ১৯২৯ সালে ৩৩৪টি। এ সব মিলের অধিকাংশ গড়ে উঠেছে ভারতের বোম্বে ও আহমদাবাদ এলাকায়। কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৪,৫০,০০০ শ্রমিকের। অর্থাৎ বঙ্গে যতটুকু কর্মসংস্থান বিনষ্ট হয়েছিল, প্রায় সমপরিমাণ।

ঘরে চর্কা কেটে তৈরি সুতায় প্রস্তুত কাপড় পরিধান করতেন গান্ধীজী, ১৯৪৬এর ছবি

গান্ধী ঘরে চর্কা কেটে যেভাবে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করেন, তাতে তিনি ব্রিটিশ বা ভারতীয় কটনমিল শিল্পের মধ‍্যে ফারাক করেননি। যদি তাঁর দেখানো স্বদেশী সফল হত — সংগত কারণেই সফল হয়নি — তাহলে শুধু ব্রিটিশ কাপড়ের বাজার নয়, ভারতীয় স্থানীয় কটনমিলগুলিও ক্ষতির সম্মুখীন হত। সে কারণে এ ব‍্যাপারে নেহরু গান্ধীর স্বপক্ষে ছিলেন না বলে জানা যায়।

ভারতে স্থানীয় যন্ত্রশিল্প স্থাপিত হলেও অবশ‍্যই সেটা বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের কারিগরদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হাতে তৈরি কাপড়ের দামও কমে গেছে যন্ত্রের কাপড়ের প্রতিযোগিতার কারণে। ১৮০০ সালের পীকের হিসাবে ১৮৬০এ এসে বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের মনেটারি ভ‍্যালু হয়ে দাঁড়ায় ১.৫ শতাংশ।

১৯২১ সালের বোম্বে ক্রনিকলে প্রকাশিত পাবলিক এনাউন্সমেন্টঃ গান্ধীজীর সভাপতিত্বে বিদেশী কাপড়ে অগ্নিসংযোগ করা হবে, সকলকে খাদি কাপড়ে আসার অনুরোধ

আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, মেশিনমেড কাপড় কেবল মিডল গ্রেডের বাজার দখল করেছে। মসলিনের মত হাইএন্ড আর মোটা কাপড়ের লো এন্ড চালু থেকেছে আরো বহু বছর।

ইন্দ্রজিতের পেপারটা আমার মূল উৎস হলেও এখানে বহু তথ‍্য দিয়েছি যেগুলি সরাসরি ইকনমিক হিস্টরির সাথে সম্পর্কিত নয়। এই থিওরির বিপরীতেও বহু গবেষণা রয়েছে। তবে আমার দৃষ্টিতে সেগুলি বায়াসড— কারণ দুটি সেল্ফ-ডিক্লেয়ার্ড আইডিওলজিকাল গ্রুপ এদের লেখক। এক, মার্ক্সিস্ট ইতিহাসবিদ, আর দুই, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ। এদের লেন্স শুরু থেকেই একচোখা।

সারাংশে, বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ মূলে ব্রিটিশ বৈষম‍্যমূলক বাণিজ্যনীতি যতটা, তার থেকে অনেক অনেক বেশি শিল্পবিপ্লবের যন্ত্রায়ন আর ফ্রী ট্রেড ভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়ন।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0

ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫




আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!