নুসরাত ফতেহ আলী খান আর তার ভাতিজা রাহাত বলিউডের মাধ্যমে খ্যাতির শীর্ষে উঠে আসলেও তাদের মূলধারা সুফী ভক্তিবাদী কাওয়ালী গান।
ভক্তিবাদের কথা উঠলে বাংলার সবাই বাউল গান চেনে। কিন্তু পুরো উপমহাদেশে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে নানারকম ভক্তিমূলক সাধনার গান। কাওয়ালী তার অন্যতম, যদিও বোধ করি ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে খুব কম মানুষই এসব ভক্তিবাদকে একই ছায়াতলে দেখার চেষ্টা করবে।
গত রাতে নুসরাত ফতেহ আলীর সুদীর্ঘ হাক্ব আলী, আলী মওলা গানটা কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে চলে গেলাম মীরাবাঈএর রাজস্থানী ভজনে, সেখান থেকে কবিরের নাথপন্থী না-হিন্দু না-মুসলিম পপুলিস্ট প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী ভজনে। এসব মিলিয়ে তিনটা অনুখন্ড লিখতে ইচ্ছে হল।
উত্তর ভারতে ইসলামের আগমনের সাথে সাথে বহু পারসিক-তুর্কী মুসলিম কর্মচারী ও সেনাপতি ভারতে আসেন। এদের সেকেন্ড থার্ড জেনারেশনের বংশধররা আমাদের মত অধুনা ইমিগ্র্যান্টদের স্টাইলে স্থানীয় ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে তাদের জাতিগত ঐতিহ্যের মিলন ঘটিয়ে জন্ম দেন নতুন এক সঙ্গীত ঘরানার, যার নাম হিন্দুস্তানী। আর দক্ষিণ ভারতের কর্নাটী সঙ্গীতে তখনও চলতে থাকে আদি ঘরানার ধারাবাহিকতা।
উত্তর ভারতের এই সুরকারদের মধ্যে সবচে অগ্রগণ্য আমীর খসরু। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সান্নিধ্যে সুফী ভক্তিবাদে শিক্ষা পান তিনি। প্রাচীন ভারতীয় সুরকলাকে সংস্কার করে নতুন রূপ দেন আমীর খসরু। এই কাওয়ালীর সুর ও বিষয়বস্তুর ঐতিহ্য আমীর খসরু পর্যন্ত ট্রেস করা যায়।
আলী মওলা গানটার মূল প্রতিপাদ্য ইসলামের অন্যতম হিরো হযরত আলীর গুণকীর্তন। এটা মূল ধারার সুন্নী ঐতিহ্যের সাথে খুব একটা যায় না। অর্থডক্স ইসলামে মানুষ হিসাবে যদি কাউকে অনুসরণ করা কর্তব্য সে একমাত্র হযরত মুহাম্মদ(সা)।
কিন্তু ইরানী জোরোয়াস্ত্রিয়ান ও শিয়া প্রভাবে হিরো ওয়ারশিপের যে ইন্দোআর্য ট্রাডিশন (তুলনা করুন শাহনামা-রামায়ণ-মহাভারতের সাথে), সেটা চলে এসেছে ভারতীয় ফোক ইসলামে। শিয়া ঐতিহ্য অনুযায়ী হযরত মুহাম্মদ(সা) নাকি গাদির খুম বলে বিদায়হজ্জ্বপরবর্তী এক ভাষণে সরাসরি আলীকে তার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে বলেন, যে কেউ আমাকে যদি মাওলা মানে, সে আলীকেও মাওলা মানে। মাওলা শব্দের অর্থ নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। কিন্তু সুফী সাধনার পরিপ্রেক্ষিতে মাওলা মানে ধরতে পারি ইন্টারসেসর — অর্থাৎ যার কিনা উচ্চতর দৈব শক্তির কাছে কারো পক্ষে সুপারিশের ক্ষমতা রয়েছে।
অপরদিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের চতুর্থ খলীফা হিসাবে আলী শক্তিরও একটি প্রতীক। তার তরবারি জুলফিকার খোদা-রাসুলের আশীর্বাদমন্ডিত, কিন্তু অত্যাচারী নয়, ন্যায়বিচারী। সেই লাইন ধরে আলী শেরে-ইয়াজদান — খোদার সিংহ। উল্লেখ্য, ইয়াজদান শব্দটা আরবী নয়, পুরনো ফারসীতে জোরোয়াস্ত্রিয়ান দেবতাদের নাম ছিল ‘ইয়াজাতা’। সেখান থেকে ইয়াজদান=খোদা।
তো এই গানটিতে ঘুরে ফিরে আলী, তার শক্তিমহিমা ও আধ্যাত্মিক গরিমার গুণকীর্তন হচ্ছে। পারসিককৃত ভারতীয় রাগ-সুরের ব্যবহারের পাশাপাশি কখনো কখনো ধুম-তানানা ধরনের অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে তাল দেয়া হচ্ছে। হয়তবা শব্দগুলোর লুক্বায়িত কোন অর্থ আছে, নয়ত সেগুলি আলীভক্ত শ্রোতার মনে একটা ইনটক্সিকেশন কিংবা ফানা তৈরির সহায়ক।
যারা নুসরাত ফতেহ আলীর গান বা কাওয়ালী পছন্দ করেন, তারা অবাক হতে পারেন যদি বলি কাওয়ালী আসলে ভারতীয় কীর্তন-ভজনের ঐতিহ্যেরই একটা এক্সটেনশন। দ্বিতীয় পর্বে দেব মীরাবাঈয়ের সেরকম একটা ভক্তির গান।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২১



“ভারতীয় ভক্তিবাদ – ১” লেখাটিতে একটি মন্তব্য পড়েছে