মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্লেগের সময় প্রিন্স প্রস্পেরো নামে এক রাজকুমার তাঁর বন্ধুবান্ধব, পরিবার, আর সমশ্রেণীর অভিজাতদের নিয়ে বহু বছরের রসদসমেত চলে গেলেন দূরের এক দুর্গে। সে দুর্গে অতন্দ্র প্রহরা, কাকপক্ষীরও সাধ্য নেই সেখানে প্লেগের জীবাণু নিয়ে ঢোকে। বহির্বিশ্বের মৃত্যুর বাস্তবতাকে ভুলতে আর দৈনন্দিন জীবনের একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্যে প্রস্পেরো একটা পার্টি দিলেন। যেনতেন পার্টি নয়, দুর্গবাসী অতিথিরা সেখানে আসবেন ছদ্মবেশে, রহস্যাবৃত হয়ে — যাকে ইংরেজীতে বলে মাস্কারেড।
প্রেতাত্মার রাত্রি
হ্যালোউইন সমাগত প্রায়। অক্টোবর শেষের এই উৎসব আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশে নানা নামে পালিত হয়। এদেশের বাচ্চারা ভূত-প্রেত-দত্যি-দানোর সাজ পড়ে পাড়ার বাড়ি বাড়ি যায় ভয় দেখাতে। ট্রিক অর ট্রীট বলে টফি-চকলেট আদায় করে নেয়।
এই উৎসব মার্কিনদেশে এসেছে ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড থেকে। এখন সেক্যুলার অনুষ্ঠান হিসাবে পালিত হলেও, খ্রীষ্টধর্মের ঐতিহ্যের অংশ এটা। হ্যালোউইন মানে হ্যালোড ইভ়নিং বা পবিত্র রাত্রি, যে রাত সকল সন্তের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার জন্যে উৎসর্গীকৃত। কিন্তু এর শিকড় প্রাক-খ্রীষ্টান কেল্টিক ড্রুইড ঐতিহ্যে, যার বৈশিষ্ট্য পূর্বপুরুষ আর প্রকৃতিদেবীর আরাধনা। বর্তমান যুগে সে ঐতিহ্যের বাহক আইরিশরা হ্যালোউইনকে সাওয়িন নাইট বা পবিত্ররাত্রি হিসাবে পালন করে — শুধু সেটা তাদের ক্যাথলিক ধর্মে এসে নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।
স্টারি নাইট – ২
ভিনসেন্ট কি রোগে ভুগেছিলেন সে নিয়ে আজও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। অনেক রকম থিওরি আছে, যার শুরু হ্য়ত বাইপোলার ডিজ়অর্ডার দিয়ে, আর শেষ টেম্পোরাল লোব এপিলেপ্সি দিয়ে। ডন ম্যাকলীনের গানের মত আমার ভাবতে ইচ্ছে করে ভ্যান গঘ় আসলে অসুস্থ ছিলেন না। তাঁর মানসপটে পৃথিবী ও মানুষ ছিল অন্যরকম, অনেকটা তাঁর ছবির প্যালেটের মত। তাঁর সাথে অনেকেরই খাপ খায়নি, ঝগড়া বেঁধেছে। কিন্তু খেটে খাওয়া দুর্ভাগা মানুষের পাশে দাঁড়াতে তো তাঁর কখনো বাঁধেনি। তাঁর প্রথাবিরোধী স্বভাব আর বিদেশী পরিচয়কে অনেক স্বদেশী, ফরাসী সন্দেহের চোখে দেখেছে। তারপরও তো নানা শহরে-গ্রামে তাঁর হাতে গোনা হলেও বন্ধু জুটেছে। ভ্যান গঘ়ের কোন মানসিক বিকৃতি ছিল না, তাঁর মন ছিল পরিষ্কার। সেখানে মানুষের আচার, ধর্ম, ধন, সামাজিক অবস্থান তাদের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। গরিমা-লালসা-ছলনার স্থান নেই সেখানে। সেখানে ঈশ্বর পথহারা দুর্ভাগাদের নিশ্চিত শেষ আশ্রয়! শিল্পের অনুপ্রেরণা সেখানে খ্যাতি কিংবা অর্থ নয়, বরং অনন্যোপায়ের মর্মপ্রকাশের একমাত্র উপায়! আর সেই নিষ্কলুষ চিত্তেই পরিপূর্ণরূপে অনুভব করা সম্ভব নীল-হলদে স্টারি নাইটের মাহাত্ম্য!
স্টারি নাইট – ১
পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টরা ছিলেন সনাতন ইমপ্রেশিনজ়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুরোভাগে। তাঁরা বললেন, নিখুঁত প্রতিলিপি দেখতে ভাল, কিন্তু মানুষের মন আর আবেগকে সমুচিত নাড়া দেয় না। শিল্পীর মানসপটে একটা দৃশ্য কী অনুভূতি জাগ্রত করেছিল তা আঁকতে হলে চাই রং আর কাঠামোর পরিবর্তন। তাঁরা মোটা তুলি ধরলেন, বাঁছাই করলেন এমনসব রংয়ের কম্বিনেশন, যেগুলি সনাতনরা দেখে সংয়ের পোশাক বলে গালি দিবেন। কিন্তু তাঁদের সাহসী রংতুলিতে যেসব ছবি ফুঁটে উঠলো, সময় লাগলেও রসিকরা বোঝা শুরু করলেন সেগুলির মর্যাদা। ততদিনে ভ্যান গঘ় মনের বোঝা সইতে না পেরে ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছেন।


