যদি ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের পতনের জন্য মোঙ্গলরা শতভাগ দায়ী না হয়ে থাকে, তাহলে সে মিথটা তৈরি করলো কে?
ওপরের চিত্রঃ চতুর্দশ শতাব্দীতে তৈরি রশীদ আল দীন হামদানির রচিত জামিয়া আল তাওয়ারিখের একটি কপিতে বাগদাদের মোঙ্গল অবরোধের চিত্র। মাঞ্জানিক বা ত্রেবুশে নামক সীজ উইপন দেখা যাচ্ছে। পন্টুন ব্রীজের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নদীপথে পাগড়িপরিহিত কয়েকটি মানুষের পালানোর দৃশ্য রয়েছে— হতে পারে তাদের মাঝে বাগদাদের খলীফা স্বয়ং।
মোঙ্গল অবরোধের মুখে আব্বাসীয় বাগদাদের পতন হয় ১২৫৮ সালে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। মধ্য এশিয়া, ককেশাস, সিরিয়া ও আনাতোলিয়ার বিভিন্ন মুসলিম রাজ্য মোঙ্গলদের আক্রমণে ধরাশায়ী হচ্ছিল ১২১০এর দশক থেকেই। এটা অবশ্যই সঠিক যে এসব এলাকার সন্ত্রস্ত লোকজন মোঙ্গলদের ভয়ে পালাচ্ছিল।

এরকম রেফ্যুজি পরিবারে জন্ম ইবনে তাইমিয়ার। বাগদাদের পতনের বহু বছর পরে জন্মালেও মোঙ্গলবিদ্বেষ তার ছিল ষোল আনা। সিরিয়া-মিশরের মামলুক রাজ্যে বসবাস করে তুলনামূলক নিরাপত্তায় থেকে মোঙ্গলবিরোধী নানা ফতোয়া দেন তিনি। মোঙ্গলরা তার জীবৎকালেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদেরকে “মুশরিক” বা অ্যাপোস্টেট আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা জায়েজ, এমনটা রয়েছে তার ফতোয়ায়। এই একই ব্যক্তি ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এমন ফতোয়া দেন যে, কোন বিধর্মী মানুষ ইসলামের নবী ও কুরআনের ব্যাপারে কোন কটূক্তি করলে বা সমালোচনা করলে তাকে হত্যা করা যাবে।
ইবনে তাইমিয়ার এমন ফতোয়াবাজির পেছনে ছিল সিরিয়া-মিশরের নতুন শাসক গোষ্ঠী মামলুকদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্য। বাগদাদের পতনের পর এরাই একমাত্র মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। শেষ পর্যন্ত আইন জালুতের যুদ্ধে এরাই মোঙ্গলদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।
মূলত ইবনে তাইমিয়ার মোঙ্গলবিদ্বেষই পরবর্তী ইতিহাসলেখকদের পক্ষপাতী করে তুলেছে। তাকে অনেকে প্রোটো-সালাফী বলেন, আর শিয়া ও সুফী ধর্মবিশ্বাসের গোড়াতেও আঘাতের জন্য তার দুর্নাম রয়েছে। মোঙ্গলরা আবার সুফীদের পৃষ্ঠপোষক ছিল।
হয়ত বুঝাতে পারছি যে চতুর্দশ শতকের এই স্কলার আর তার পরবর্তী অনুসারীরা মোঙ্গলদের তুলনামূলক নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে সচেষ্ট ছিলেন। সত্যি বলতে কি, মধ্যযুগে ইসলামী ইতিহাস লেখকদের বেশির ভাগই নিরপেক্ষ ছিলেন না। আর মোঙ্গল শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তারা মুসলিম আরব ও তুর্কীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিল। সে কারণে তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য পরবর্তীতে কাউকে পাওয়া যায়নি।
মোঙ্গলদের আক্রমণের সমসাময়িক ইতিহাসের বড়জোর চারটি উৎস পাওয়া যায়। বার হেব্রেউস নামে এক খ্রীষ্টান পাদ্রী সেসব ঘটনাবলী যেমন বলেছেন, তেমন বলেছেন রাশিদ আল দীন হামদানি— ইনি ছিলেন মোঙ্গলদের “পালিত” ইতিহাসবিদ। প্রথমজন বলেছেন যে, শহরের খ্রীষ্টান অধিবাসীদের প্রাণরক্ষা হয় হালাকু খানের নেস্টরিয়ান খ্রীষ্টান স্ত্রীর হস্তক্ষেপে। দ্বিতীয়জন অপরদিকে বলেছেন, আট লক্ষ মানুষকে মোঙ্গলরা হত্যা করে।
জুভায়নি নামে আরেক মুসলিম ইতিহাসবিদ মোঙ্গলদের সাথেই ছিলেন। তিনি বাগদাদের পতনের সরাসরি স্বাক্ষী। তিনি বলেছেন আব্বাসী খেলাফতের পতন আসলে খোদাপ্রদত্ত শাস্তি।

অপরদিকে আল হাওয়াদিস নামে আরেকটি উৎস অসম্ভব নিষ্ঠুরতার বিবরণী দিয়েছে। চল্লিশ দিন যাবত নাকি পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিশেষে হত্যা করেছে মোঙ্গলরা। লুকোনো ধন-সম্পদের খোঁজ পেতে অকথ্য শারীরিক নিপীড়ন করেছে সাধারণ মানুষদের। খলীফার মসজিদ মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। মৃতের স্তূপ জমে গেছে রাস্তায়।
মুশকিল হল, আল হাওয়াদিস যে আসলে কে লিখেছিলেন, তার হদিস পাওয়া যায় না। বহুদিন ধারণা ছিল ইবনে আলফুওয়াতি নামে এক ইতিহাসবিদ লিখেছেন। কিন্তু সেটা নাকচ হয়ে গেছে। তারপরও প্রামাণ্য দলীল হিসাবে এই বেনামী পুস্তক এখনো ইতিহাসের উৎস হিসাবে গৃহীত হয়।
একটা কাহিনী ইসলামী ইতিহাসে বেশ প্রচলিত যে, আব্বাসী খলীফা আল মুস্তা’সিমকে নাকি কার্পেটে পেঁচিয়ে তার ওপর ঘোড়া চালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। এর কারণ নাকি, রাজকীয় রক্ত মাটিতে ফেলা মোঙ্গল ঐতিহ্যে বারণ, তাতে অমঙ্গল হয়। মজার ব্যাপার হল, মোঙ্গলদের বহু বিধি-নিষেধ ও ট্যাবু থাকলেও এই কার্পেট পদ্ধতির হদিশ তাদের রেকর্ডে পাওয়া যায় না।
ইন্টারেস্টিংলি ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পরেই এই গল্প মার্কো পোলো আবার শুনেছেন ভিন্নভাবে। সে গল্পে হালাকু খানের মোঙ্গলরা নাকি খলীফাকে সোনাদানায় ভরপুর একটি কক্ষে খাদ্যছাড়া বন্দী করে রেখে অনাহারে মারে। কেননা তাদের দৃষ্টিতে নাকি মূল্যবান ধাতু ও রত্নের প্রতি আব্বাসী খলীফার অত্যন্ত লোভ ছিল। যথোপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য এমন উদাহরণমূলক শাস্তি।
একই কাহিনীর দুই রূপ যেখানে, আর লিখিত হয়েছে পরবর্তী যুগের ইতিহাসবিদদের শোনা কানকথায়, সেখানে সত্যের ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। এ কারণে বর্তমান ইতিহাসবিদরা এই কার্পেট কাহিনীকে অপ্রামাণ্য ঘটনা বা অ্যাপোক্রাইফার কাতারে ফেলেন।
হাজার হাজার মানুষ হত্যার ব্যাপারটা যতটা সত্য তার থেকে বেশি প্রচারণা বলে মনে হয়। প্রথমত, মোঙ্গলরা আসলেই অনেক হত্যা করেছিল, তবে সংখ্যাটা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। হত্যা যে “নির্বিচার” তা কিন্তু নয়। প্রথমে শত্রুপক্ষকে অস্ত্রসমর্পণ ও মহান খানকে অধিপতি বলে মেনে নেবার একটা সুযোগ দেয়া হত। সেটি করলে প্রাণরক্ষা হত। একাধিক মুসলিম শাসক তাই করে বেঁচে গেছিলেন। তা না করলে গর্দান যেত অনেকের — তবে যারা “অবাধ্য অর্বাচীন” নেতা ও চামচা, কেবল তাদের। আব্বাসী খলীফার দরবারে যাদের উপস্থিতি ছিল ও পরামর্শদাতা ছিলেন তাদেরই প্রাণভয় ছিল বেশি। কিন্তু যারা খলীফাকে “সঠিক” পরামর্শ দিয়েও কোন ফায়দা করতে পারেনি, তাদের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। বিশেষ করে আব্বাসী খলীফার তদকালীন শিয়া উজির ইবনে আলকামি— তাকে স্বপদেই বহাল রেখেছিল নতুন শাসকরা। সে প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত একটু পরে বলছি।
দ্বিতীয়ত, মোঙ্গল ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অন্তত বাগদাদে পাওয়া যায় না। তার কারণ বাগদাদ এখনো বিশাল শহর, এবং হয়তবা সেসব প্রমাণ নতুন শহরের নিচে চাপা পড়ে গেছে। মোঙ্গল হত্যাযজ্ঞের নিদর্শন পাওয়া যায় কেবল রাশিয়ার রিয়াজান আর কিয়েভের নিকটবর্তী ইয়ারোস্লাভল শহরে। সেখানে গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। বহু কংকালের মস্তক ছিল বিচ্ছিন্ন।

কিন্তু সমস্যা হলো সংখ্যাতে। কিয়েভান রুস ও মস্কো প্রিন্সিপালিটির শহরগুলির জনসংখ্যা খুব বেশি ছিল না। রিয়াজান বা ইয়ারোস্লাভলের সে সময়কার জনসংখ্যা বড়জোর পনের থেকে ত্রিশ হাজার। আর গণকবরে আবিষ্কৃত হয়েছে মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের থেকে কম। সে আমলের বিচারে এটা বড় সংখ্যা নয়।
তাহলে বাগদাদের ধ্বংসে আট দশ লক্ষ মৃত এ ধরনের যে সংখ্যা মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদরা বলেন, সেটাকে অবশ্যই প্রশ্ন করা সমীচীন — যেখানে পুরো বাগদাদের জনসংখ্যাই ছিল দশ লাখ। সে আমলের বিচারে শহরটি অবশ্যই একটা মেট্রোপোলিস ছিল। কিন্তু আট লক্ষ সেরকমই একটা অতিরঞ্জিত সংখ্যা।
তাই দুইভাবে ইতিহাসের ঐ সকল রেকর্ডকে ইন্টারপ্রেট করা হয়। এক, মোঙ্গলদের অনুগতরাই এই ধরনের ভীতি ছড়িয়েছে— কেননা তাতেই ওদের লাভ। ভয় পেলে শত্রুরা যুদ্ধ ব্যতিরেকে আত্মসমর্পণ করবে। তাই এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে আট লক্ষ সংখ্যাটি মোঙ্গল শাসক গাজান খানেরই ইতিহাসবিদ রাশিদ আল দীন হামদানি লিখে গেছেন।
আর দুই, ইবনে তাইমিয়ার মত মোঙ্গল হেটার ফতোয়াবাজদের কথা যেটা বললাম। মোঙ্গলদের রক্তপিপাসু প্রমাণ করতে তারা ইচ্ছা করেই এ সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত করে বলবে। তাতে ওদের শাসক মামলুকদেরই লাভ। ফতোয়া বা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের শাসনকে পোক্ত রাখতে পারবে।
হোয়াট এবাউট ইসলামিক গোল্ডেন এইজ?
অনেকে বলেন বাগদাদের জ্ঞানপীঠগুলি নাকি মোঙ্গলরা ধ্বংস করে ফেলে। বাইত আল হিকমাহ নামক বিশাল লাইব্রেরির লাখ লাখ বই নাকি ফোরাত নদীতে ফেলে দেয়া হয়, আর বইয়ের কালির রঙে নাকি কালো হয়ে যায় নদীর পানি। এসবই পরবর্তী ইতিহাসবিদদের সেকেন্ড বা থার্ড হ্যান্ড একাউন্ট। বলা ভাল বানোয়াট একাউন্ট।

ব্যাপার হল, বাইত আল হিকমাহ মোঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হয়েছে, সেরকম কোন সমসাময়িক লিখিত ইতিহাস নেই। ইন ফ্যাক্ট বাইত-আল হিকমাহ বলে কোন একক স্থাপনা ছিল কিনা— তারও কোন প্রমাণ নেই। যে কোন লাইব্রেরি বা জ্ঞানাহরণের কেন্দ্রকেই আক্ষরিক অর্থে বাইত-আল হিকমাহ বা “জ্ঞানের ঘর” বলা যায়।
তবে ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে যে, বাগদাদের লাইব্রেরিতে রক্ষিত বইপুস্তক, হালাকু খানেরই উপদেষ্টা নাসির আল দীন তুসি— যিনি ছিলেন শিয়া মুসলিম স্কলার এবং হালাকুবাহিনী কর্তৃক আহমদী হাসাসিনদের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত— তাঁর নির্দেশে অন্যত্র সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তরিত করা হয়। বিখ্যাত মাদ্রাসা আল মুস্তানসিরিয়াও মোঙ্গল আক্রমণের পরে বহু দিন চালু ছিল। খলীফার প্রাসাদও অক্ষত ছিল।
মোঙ্গলদের কিন্তু রিপুটেশন ছিল আর্টিজান ও স্কলারদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা। নাসির আল দীন তুসি যার কথা বললাম, তিনি তাদের একজন। এই ভদ্রলোকেরই অনুরোধে মোঙ্গলশাসিত নতুন ইলখানাত রাজ্যে একটি বিখ্যাত অ্যাস্ট্রনমিকাল অবজারভেটরি স্থাপিত হয়। মারাগা নামের এই অবজারভেটরির গবেষণা আর মোঙ্গলশাসিত চীন থেকে আসা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন তুসি। কোপারনিকাসের আগেই তিনি হেলিওসেন্ট্রিক থিওরি নিয়ে কাজ করেন। এবং টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক ঘূর্ণনের তত্ত্ব নাকচ করে দেন। ত্রিকোণমিতি ও বীজগণিতেরও প্রগতি সাধিত হয় মারাগায়।




মোঙ্গলরা তাদের নতুন শাসিত এলাকার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারেও মনোযোগী ছিল। ইলখানাতের শাসক গাজান খানের পৃষ্ঠপোষকতায় রাশিদ আল দীন হামদানি লেখেন বিশাল এক ইতিহাসগ্রন্থ যার নাম জামিয়া আল তাওয়ারিখ। সে আমলের লিখিত ইতিহাসের একটা অসামান্য উৎস এটি। ভদ্রলোক মোঙ্গল আক্রমণের মোটামুটি ভয়াবহ চিত্রই এঁকেছেন— কারণটা আগেই বলেছি।
মোঙ্গল রাজ্যের সমসাময়িক মিশরে আরেক অসামান্য ইতিহাসবিদের জন্ম হয় যার নাম ইবনে খালদুন। তিনি শুধু ইতিহাসবিদই নন, ইতিহাসের বিভিন্ন স্রোত কিভাবে কাজ করে, তার সাথে হিউম্যান সাইকোলজির কানেকশন, তা বোঝার ও বোঝাবার প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। তাঁর বিখ্যাত বইয়ের নাম আল মুকাদ্দামা। মামলুকদের রাজত্বে তাঁর কর্মকান্ড হলেও মোঙ্গলদের সম্পর্কে লিখে গেছেন তিনি।
তাঁর সাথে মোঙ্গল শাসক তৈমুরের সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তৈমুরকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিদ্যানিষ্ঠ হিসাবেই দেখিয়েছেন। আবার মোঙ্গলদের নিষ্ঠুরতার ব্যাপারে তার জানা থাকলেও তাদের ধর্মসংক্রান্ত সহিষ্ণুতা ও দক্ষ শাসনপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক দেখা যায় তাকে। মোঙ্গল যাযাবরদের বিপরীতে বরং তদকালীন আরব যাযাবরদের ব্যাপারেই তার অভিযোগ ছিল বেশি — যে তারা যেখানেই যায় সব কিছু ছারখার করে ছাড়ে।
সুতরাং জ্ঞানবিজ্ঞানের ধ্বংসকারী নয়, বরং নতুন পৃষ্ঠপোষক ছিল মোঙ্গল শাসকরা।
সত্যি বলতে কি, মোঙ্গলদের আসার আগে আব্বাসী খেলাফতের আমলেই দেখা গেছে ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার ক্রমাগত অবক্ষয়। হারভার্ডের এক গবেষক পরিসংখ্যানসহকারে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে একাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাগদাদ ও ইসলামী এলাকাগুলিতে প্রাপ্ত পান্ডুলিপিতে মৌলিক বিজ্ঞানচর্চার বিষয়বস্তু কমে এসেছে, বেড়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যামূলক ও ডেরিভেটিভ কাজ।
এর কারণ বলা যেতে পারে অষ্টম-নবম শতকে র্যাশনালিস্ট থিংকারদের থেকে পৃষ্ঠপোষকতা সরিয়ে ইসলামী স্কলারদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া। বিশেষ ট্যালেন্ট খুঁজে তাদের ডেভলপ করার থেকে বিশাল সংখ্যায় মাদ্রাসাছাত্রদের গতানুগতিক প্রথাভিত্তিক আনুগত্যের শিক্ষা দেয়া শুরু হয়। সুফী আধ্যাত্মিকতাবাদে বেশি নদর দেয়াও আরেকটা কারণ। এমন না যে, এই সিস্টেম থেকেও মেধাবীরা বেরিয়ে আসত না। তবে সংখ্যায় কম।

আরেকটা ব্যাপার হল উঠতি মনীষীদের জন্য বাগদাদ একমাত্র জায়গা ছিল না। বাগদাদ আসলে নামেমাত্র ইসলামী বিশ্বের রাজধানী ছিল। কিন্তু পুরো সাম্রাজ্য ততদিনে ছোট ছোট একাধিক রাজ্যে ভেঙে পড়েছে। সেলজুক, সামানী, গজনবী, খওয়ারিজমী, আইয়ুবী, আর্তুকী, মামলুক — নানা রকম অনারব ফার্সী তুর্কী মুসলিম শাসকরা সেসবের সুলতান, তারা কেবল নামেমাত্র খলীফাকে মান্য করতেন। কিন্তু প্রকৃতার্থে তারা স্বাধীন ও প্রতাপশালী সার্বভৌম শাসক ছিলেন। কোন ক্ষেত্রে শক্তিশালী সুলতানরা খলীফাকে সরিয়ে নিজের পছন্দমত মানুষকে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করতেন।
এ সকল স্বাধীন সুলতানদের রাজসভায় বহু মনীষীর স্থান হয়েছিল। আর বাগদাদের “বায়তুল হিকমাহর” সকল জ্ঞানও ততদিনে মোটামুটি ছড়িয়ে পড়েছে তিমবাক্তু-গ্রানাদা থেকে কাবুল-হেরাত পর্যন্ত।
যেমন ইবনে আলনাফিস নামক আরেক মনীষী চিকিৎসাবিদ ছিলেন মোঙ্গল নয়, মামলুক পৃষ্ঠপোষকতায়। তিনিও, তুসি যেমন টলেমিকে ভুল প্রমাণ করেন, তেমনি গ্রীক দার্শনিক গ্যালেনের মানবদেহে রক্তচলাচলব্যবস্থার তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে প্রায় আধুনিক একটি ব্যাখ্যা দেন। যাতে হৃদপিন্ড ছিলে রক্ত চলাচলের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক। আরো পরে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা এর প্রমাণ আবিষ্কার করেন।
অর্থাৎ বাগদাদ ওয়াজ বাই নো মীনস এ ইউনিক প্লেস ফর নলেজ!

একটু বলে রাখা ভাল, বাগদাদের এই মহাপতনের পেছনের কাহিনী। ১২৫০এর দশকে পাঁচ শতকের পুরনো আব্বাসী খেলাফত আর আগের মত নেই। ঘুনেধরা সাম্রাজ্যের প্রতীকী শাসক খলীফাদের জীবনযাত্রা খামখেয়ালিপনা আর আরাম-আয়েশে কাটে। তাদের সরাসরি শাসনকৃত এলাকা ছিল কেবল বাগদাদ ও তার আশেপাশে। এর বাইরে তার হুকুম সীমিত ছিল। সে সব এলাকায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন বহিরাগত আগ্রাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করেছে। খলীফা ফরমান জারি করে এসকল রাজ্যের সুলতানদের স্বীকৃতির বিনিময়ে মহামূল্য বাৎসরিক উপঢৌকন পেতেন। তাই দিয়ে তার রাজ্যের খোরপোশ চলত।
১২১৯এ পেরিফেরির মুসলিম ভূমিগুলিতে মোঙ্গল আগ্রাসন শুরু হয়। সে সময়ে খলীফা আল মুস্তানসির বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বিলাসব্যাসন কমিয়ে নিরাপত্তার পেছনে যথেষ্ট মনোযোগ দেন। কিন্তু তার পরবর্তী খলীফা আল মূস্তা’সিম তেমন কাজের ছিলেন না। অনেক খরচ করে আবারো মক্কায় বাৎসরিক অফিশাল হজ্জ্ব কাফেলা পাঠানো শুরু করেন। প্রশাসনে শিয়া মন্ত্রী থাকলেও সুন্নী মোল্লাদের প্ররোচনায় শিয়াবিরোধী যে সকল মব অ্যাটাক শুরু হয়, সেগুলির বিহিত তিনি করেননি। শিয়া-সুন্নী একাধিক দাঙ্গা তাঁর আমলে সংঘটিত হয়। এমন কি, এক শিয়াবিরোধী দাঙ্গায় স্বয়ং খলীফার পুত্র অংশ নেয়। শিয়ারা এ কারণে তার ওপর নাখোশ ছিল, যেটা পরবর্তীতে মোঙ্গলদের পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।
যখন মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়ার খওয়ারিজম নামক সুন্নীশাসিত মহাশক্তিশালী রাজ্যকে নিজেদের দখলে নিয়ে আসে, আর আনাতোলিয়া ও জাজিরার প্রাক্তন আর্তুকী-আইয়ুবী শাসকরাও মোঙ্গলদের বশ্যতা স্বীকার করে তাদের ট্রিবিউট পাঠাতে শুরু করে, তখনো খলীফার বোধোদয় হয়নি যে মোঙ্গলরা বাগদাদ দখল করতে সক্ষম। তার ঔদ্ধত্য ছিল যে, বাগদাদের পুরু সুউচ্চ দেয়াল ডিঙিয়ে কোন স্তেপ যাযাবরের আসা অসম্ভব। আর সেরকমটা হলেও সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তার সহায়তায় এগিয়ে আসবে।
১২৫৮এর আগে অন্তত দু’বার মোঙ্গলদের সাথে সংঘাতে আব্বাসী সেনাদলের ক্ষণস্থায়ী সীমিত জয়ের কারণে তার আত্মবিশ্বাস আরো পাকা হয়। হালাকু খান আল মুস্তা’সিমের আনুগত্য দাবি করে একাধিক চিঠি পাঠিয়েছিলেন, আর তলব করেছিলেন তার দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের। আল মুস্তা’সিম সেসব আদেশ মানেননি। তার উজির আলকামি অবশ্য সে কথা গ্রাহ্য করার উপদেশ দিয়েছিলেন।
যখন শেষমেশ বাগদাদের দরজার সামনে মোঙ্গলরা নানা জাতের সীজ উইপন নিয়ে বসে গেল, তখন খলীফাকে সাহায্য করার মত মুসলিম শক্তি ছিল কেবল একটাই। সেটা সিরিয়া ও মিশরের নতুন শাসকগোষ্ঠী মামলুকরা। ভাগ্যের পরিহাস যে এই মামলুকরা সুলতান হিসাবে খলীফার স্বীকৃতি চেয়েও পায়নি। কেননা, এরা ছিল তুর্কী ক্রীতদাস থেকে সেনাপতি হয়ে ভুঁইফোঁড় রাজা বনা তুর্কীজাত। বনেদী বংশের রক্ত না থাকায় আইয়ুবীদের সরিয়ে ক্ষমতায় বসা মামলুকদের সে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন খলীফা আল মুস্তা’সিম।
অনেকে বলবেন, মামলুকরা পশ্চিমে হোলিল্যান্ডে ক্রুসেডারদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিল তাই আব্বাসীদের সাহায্য করেনি। ব্যাপার হল, সপ্তম ক্রুসেডে মামলুকরা ক্রুসেডারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। আর সে ঘটনাও বাগদাদ পতনের ছয় বছর আগের। মামলুক সুলতানরা এ সময়ে অতুলনীয় সামরিক গৌরব আর শক্তিমত্তার অধিকারী ছিলেন। সমস্যা ছিল কেবল তাদের ট্রাইবাল নেতাদের মধ্যে কোন্দল, আর শুধুমাত্র নিজেদের রাজ্যকেই মোঙ্গলদের হাত থেকে রক্ষা করার স্পৃহা।

তাই স্বাভাবিকভাবেই মামলুকরা আল মুস্তা’সিমকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি। আখেরে তাদের ভালই হয়েছে। কারণ তাদের ভূমিতে চলে আসতে আসতে মোঙ্গলরা নিজেদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ শুরু করে দেয়। সিরিয়ায় আইন জালুতের যুদ্ধে মোঙ্গলদের সম্মুখ অগ্রগতি চিরতরে বন্ধ করে দেয় মামলুকরা।
১২৫৮ সালে আল মুস্তা’সিমের পরাজয়ের পর বাগদাদের খ্রীষ্টানদের পাশাপাশি প্রাণরক্ষা হয় অধিকাংশ শিয়া মুসলিমদের। আলকামির অনুরোধে নাকি হালাকু টলেছিলেন। খলীফার আমলের শিয়া-সুন্নী দাঙ্গার ভূমিকা যে এর পেছনে ছিল না, সেটা নাকচ করে দেয়া যায় না।
বাগদাদে মোঙ্গল আক্রমণের পরে ইলখানাত নামক যে রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তার শাসকরা ছিল মোঙ্গল। প্রথমদিকে কার্যত মোঙ্গলিয়ার গ্রেট খানের আনুগত্য মানলেও দ্রুত এরা স্বাধীন রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আর বাগদাদের পতনের চল্লিশ বছরের মধ্যেই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়।
তাদের প্রশাসনে মুসলিমদের সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকারও পুরো সময়টা ছিল। চীনে কুবলাই খানের ইউয়ান সাম্রাজ্যেও চীনাদের এই অধিকার ছিল না। চীনে যেমন কুবলাই খান তার নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে তাঁর দরবার ও রাজ্যের ঐশ্বর্যের জন্য পরিচিত হয়েছেন, ইলখানাত রাজ্যের ক্ষেত্রেও সেরকমটা বলা যেতে পারত, যদি না ইসলামী ইতিহাসবিদরা মোঙ্গলদের নন্দঘোষ বানিয়ে সকলে দোষ না চাপাতেন।

মোঙ্গল শাসকরা তাঁদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই ইতিহাসবিদদের কাছে এখন বেশি স্বীকৃতি পান। পরবর্তী ওসমানী তুর্কী ও ভারতের মোঘলরাও সে ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী।
বাগদাদের এই পতন অবশ্যই একটা বিশাল প্যারাডাইম শিফট ছিল। আগের যুগে মুসলিম শাসক মাত্রই খলীফার অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন। ব্যাপারটা একরকম কাল্টের মত দাঁড়িয়ে গেছিল। খলীফা কেবল সুলতানের ছাপ্পরটুকু মারবেন। কিন্তু সভ্য দুনিয়া আবর্তিত হত সেটা ঘিরেই। দুনিয়ার কেন্দ্র ছিল বাগদাদ— যদিও তার বিদ্যা ধন রত্ন ততদিনে চলে গেছে আরো দূর-দূরান্তে।
বাগদাদের পতনের ফলে পুরনো সেই অচলায়তন ভেঙে গেল। বাগদাদ থেকে কালচারাল শিফটটা হলো আরো পূর্বে। ইরানের তাব্রিজ হল নতুন ইলখানাত রাজ্যের রাজধানী। পারসিক সংস্কৃতিরও একটা পুনর্জাগরণ সৃষ্টি হল। ইলখানাতের মানচিত্র আর বর্তমান ইরানের মানচিত্র অনেকখানি একই। ফার্সী ভাষা সাহিত্য একটা কালচারাল রিভাইভালের মধ্য দিয়ে যায়, যেটা ইনহেরিট করে পরবর্তী সাফাভী ইরান।
পূর্ব থেকে পশ্চিমে মোঙ্গলদের এই বিশাল বিজয়ের আরেকটা ফল হল বাণিজ্যপথ খুলে যাওয়া। সুদূর চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সর্বত্র মোঙ্গলদের কথায় বাঘে-মহিষ এক ঘাটে পানি খেত। কুবলাই খানের ইউয়ান রাজ্য আর ইলখানাত উভয়েই ছিল কসমোপলিটান ও বাণিজ্যমুখী। বিশ্বের ইতিহাসে এ সময়কে বলা হয় “প্যাক্স মোঙ্গোলিকা” — মোঙ্গোলদের (স্থাপিত) শান্তি।

সেই বাণিজ্যের পথে আগে যে আব্বাসী খেলাফতের ইসলামী ভূমি মিডলম্যানের ভূমিকায় ছিল, সেটাও মোঙ্গলদের সরাসরি কব্জায় এল। ফলে ইতিহাসের একটা সামান্য সময় ইউরোপ থেকে চীন পর্যন্ত বাণিজ্য পণ্য এবং আইডিয়ার যাতায়াত প্রায় উন্মুক্ত ছিল।
তাই এ কথা যদি কেউ বলেন, মোঙ্গলপরবর্তী ইসলামী ভূমি ছিল অনগ্রসর, বিজ্ঞানবিস্মৃত সেটা বললে ভুল বলা হবে। এটা ঠিক যে, মোঙ্গলরা বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ধর্মচিন্তার পরিবর্তে সুফী আধ্যাত্মিকতাবাদকে বেশি দাম দিত, কেননা তার সাথে মোঙ্গল এনিমিস্ট মিস্টিসিজমের অনেক কিছু মিলে যেত। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অবহেলা তারা করেনি। করলে বাগদাদের অবরোধে চীন থেকে সীজ উইপন নিয়ে আসার মত ইনজিনিয়ারিং তেলেসমাতি তারা দেখাত না।
একই কারণে বলতে পারি, অন্য পোস্টে দেখানো প্রাক-মোঙ্গল ও মোঙ্গলপরবর্তী পাঁচটি মুদ্রার মধ্যে গুণগত বা শিল্পগত কোন তফাৎ যে নেই, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫



