খোদা যদি মঙ্গলের অধিকর্তা হন, তাহলে কেন তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীতে এত যুদ্ধ, এত অশান্তি? যদি তিনি সুবিচারের বিধায়ক হন, তাহলে দুনিয়া জুড়ে কেন এত অবিচার?
যে কোন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ — কিংবা ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ — এ প্রশ্নের সহজ সদুত্তর দিতে কুণ্ঠিত হবেন। আধুনিক কালের আব্রাহামিক ধর্মে এই প্রশ্নকে “কোশ্চেন অফ ইভেল” বলা হয়।
এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত মানুষের ফ্রী উইল বা ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা আর প্রি-ডেস্টিনেশন বা ললাটলিখন।
পৃথিবীর প্রাচীন সনাতনী ধর্মগুলির একটা বৈশিষ্ট্য হলে “মুভেবিলিটি অফ গড(স)” — মানে দেবতা অবিচল নন, প্রার্থনা ও পূজা-অর্চনা করে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের মাধ্যমে তাঁকে ইচ্ছার অনুকূলে আনা সম্ভব। সেখানে পুণ্যকর্ম বা পাপ কাজ করলেই যে সেরকম কর্মফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে তা নয়, দেবতার আশীর্বাদের জন্য তাঁকে অবশ্যই তোঁয়াজের ওপর রাখতে হবে।

ইহুদী, খ্রীষ্ট, ইসলাম— আব্রাহামিক সকল ধর্মেই সর্বপ্রভু সর্বজ্ঞ এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের নির্ধারক। প্রতিটি মানুষের অবধারিত নিয়তির জ্ঞান তাঁর আছে। কে স্বর্গবাসী আর কে নরকবাসী, তার ললাটলিখন চূড়ান্ত।
তাহলে খোদার নিকট প্রার্থনা করার কিংবা পুণ্যকর্ম করার ইনসেন্টিভটা কোথায়? আমার সামনে যদি একটা পাপ ও একটা পুণ্যের রাস্তা খোলা থাকে, তাহলে আমি তো চাইলে যে কোনটাই নিতে পারি, স্পেশালি যেখানে আমার ভাগ্যলিখন ইতিমধ্যেই ঠিক হয়ে আছে?
এখানেই মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রশ্ন। এ কারণে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মে একটা রিকনসিলিয়েশন করা হয়। সেটা হলো, আমার ইচ্ছার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই আমার স্বর্গ-নরকপ্রাপ্তির নির্ধারক। সর্বজ্ঞ স্রষ্টা সে ফলাফল আগে থেকেই জানেন কিন্তু আমার কার্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন না। এছাড়া ভাল না মন্দ কোন নিয়তে আমি কাজটি করছি — কর্মফল যাই হোক না কেন, সেটা স্রষ্টার জ্ঞানে রয়েছে। সে কারণে ক্ষমাপ্রার্থনাসাপেক্ষে আমার পাপমোচনের শক্তিও তাঁর রয়েছে। বাট… সব কিছু প্রিডেস্টাইনড।
ইহুদী ধর্মে পৃথিবীর যত অশান্তি-অবিচারের মূল কারণ হিসাবে এই ফ্রী উইলকেই ধরা হয়। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা স্রষ্টা দিয়েছেন, তার কর্মফলও তাঁর ইতিমধ্যে জানা এবং তিনিই তা দেবেন, কিন্তু মানুষের কর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন না।
অপরদিকে খ্রীষ্টান ধর্মে শয়তানকে এক মহাপ্ররোচক হিসাবে দেখানো হয়। আদি পূর্বপুরুষ আদম-হাওয়া যেভাবে নিষ্পাপ অবস্থা থেকে শয়তানের প্ররোচনায় নিপতিত হন, তার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যীশুর ঐশ্বরিক রূপের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
এখানে শয়তানের প্রশ্ন চলে এল। শয়তানের প্রকৃতিটা তাহলে কি? তারও কি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে? তার কি খোদার ইচ্ছার আওতার বাইরে অমঙ্গল ঘটানোর ক্ষমতা আছে?
ইহুদী বিশ্বাসে শয়তান খ্রীষ্টধর্মের মত নয়। সেখানে শয়তান খোদারই ইচ্ছাধীন ফেরেশতা। পরকালে প্রসিকিউটরের বা অ্যাকিউজারের ভূমিকা তার। কিন্তু মানুষকে প্ররোচিত করার মত ফিজিকাল চরিত্রে তাকে খুব একটা দেখা যায় না। ভাল-মন্দ উভয়েরই মালিক স্রষ্টা স্বয়ং। শয়তান — বরং বলা ভাল মানুষের মনের শয়তান — মন্দ কাজের এজেন্ট। এখানে ইসলামের অসম্ভব মিল আছে ইহুদী ধর্মের সাথে। শয়তান যত বড় অমঙ্গলেরই এজেন্ট হোক না কেন, খোদার সমান শক্তি তার নেই।
ওদিকে খ্রীষ্টধর্মে আবার শয়তানের চরিত্র আরো প্রকটভাবে পরিস্ফূটিত। সে কেবল খারাপের এজেন্ট নয়, সে স্বয়ং খোদার শত্রু। বেহেশত থেকে নিপতিত প্রিন্স অফ ডার্কনেস। সে প্রতিনিয়ত খোদার মঙ্গলের বিপরীত অমঙ্গল ছড়িয়ে যাচ্ছে। তার চরিত্রটা এতটাই সবল যে খ্রীষ্টধর্মকে জরথুস্ত্রবাদের ডুয়ালিজমের কাছাকাছি ধরা যায়। জরথুস্ত্রবাদে আহুরা মাজদা মঙ্গলের শক্তি, আলোর রাজ্যের অধিকর্তা। আর আহরিমান অন্ধকারের, অমঙ্গলের। সেখানে আহুরা মাজদার কোন ক্ষমতা নেই আহরিমানের এজেন্সির ওপর। উল্লেখ্য, আধুনিক ফার্সিতে ইসলামের শয়তানের সমার্থক শব্দ আহরিমান।
খ্রীষ্টধর্ম সম্ভবত জরথুস্ত্রবাদের প্রভাবে সেকেন্ড টেম্পল পিরিয়ডে এই ধ্যানধারণাগুলিই অ্যাবজর্ব করেছে। বিশেষ করে, জর্দান-ইসরাইলের সীমান্তে পাওয়া কুমরান স্ক্রোলস বা ডেড সী স্ক্রোলস নামক প্রথম শতকের পান্ডুলিপিতে দেখা যায়, ওল্ড টেস্টামেন্টের বাইরেও নানা গ্নস্টিক ধর্মবিশ্বাস এই বিচ্ছিন্ন ইহুদী লোকালয়ে কিভাবে শেকড় গেড়েছিল। সে পান্ডুলিপিতেই পাওয়া যায় লাইট আর ডার্কনেসের মধ্যে চিরায়ত দ্বন্দ্বের চিত্র। ছবি দিয়েছি, ইসরাইল মিউজিয়ামে দেখে আসা ডেড সী স্ক্রোলের।
এদিকে শয়তানের প্রকৃতির প্রশ্নে ইসলাম বলা চলে খ্রীষ্টধর্ম আর ইহুদী ধর্মের মাঝামাঝি। সেখানে শয়তানের চরিত্র সলিড। তার প্ররোচনা চলমান। কিন্তু শেষ চয়েজটা মানুষের। সে মঙ্গলের পথে চলবে নাকি শয়তানের প্ররোচনায় ভুলবে।

তবে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, শয়তানকে একেবারে রক্তমাংসের ফিজিক্যাল বিইং হিসাবে কেবল নবী-রাসূলরাই দেখতে পেয়েছেন। যীশু খ্রীষ্ট তার সার্মন চলমান অবস্থায় শয়তান তিনবার মঙ্গলকামনাকারী ছদ্মবেশে তাকে দুনিয়ার সকল ক্ষমতা এনে দেবার প্রলোভন দেখায়। যীশুকে সে প্ররোচনা টলায়নি।
এমন প্ররোচনা বা টেমটেশনের গল্প ইহুদী ওল্ড টেস্টামেন্টে নেই বললেই চলে। বরং বোধিপ্রাপ্তির আগে গৌতমবুদ্ধকে ধ্বংসের দেবতা মার যেভাবে শক্তি ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে প্ররোচিত করতে চেয়েছিল, সে কাহিনীর সাথে যীশুর টেমটেশনের কাহিনী প্রায় পুরো মিলে যায়।
ইসলামেও এ ধরনের টেমটেশনের স্থান রয়েছে। যেমন ইব্রাহিম(আ) যখন ইসমাইল(আ)কে নিয়ে কুরবানির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তখন একাধিকবার শয়তান তাঁদের প্ররোচনার চেষ্টা করে। হজ্জ্বের সময় আধুনিক মুসলিমরা প্রতীকী শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে সেই কাহিনীর রিএন্যাক্টমেন্ট করেন।


ওল্ড টেস্টামেন্টে আবার কিছু কাহিনী আছে যেখানে সদগুণের মানুষও দুর্ভাগ্যকবলিত হন — অর্থাৎ শয়তানের প্ররোচনার ব্যাপারটা অনুপস্থিত। যেমন জোব বা আইয়ুবের(আ) কাহিনী। চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হন এই নবী, তাঁর সকল সন্তান দুর্ঘটনায় মারা যায়, শরীরে অমোচনীয় রোগ বাসা বাঁধে। জোব অত্যন্ত পরিতাপ করেন, তাঁর প্রশ্ন ছিল কেন তাঁরই এমন দুর্ভাগ্য হল।
এখানে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং কুরআন একই অবস্থানে। খোদা কখনো তাঁর প্রিয় বান্দাদেরই ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দুর্দশামুক্তি দেন। যদিও সে পরীক্ষার ফলাফল তাঁর জানা! কিন্তু মানুষ হিসাবে আমরা জানি না খোদা কি জানেন। অতএব ধৈর্যের পরীক্ষায় উৎরানোর চেষ্টা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। খোদার ওপর বিশ্বাস রাখলে এ সকলের যে শেষ ফলাফল সেটা তুলনামূলক বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। কিন্তু সে সকল আউটকাম আগে থেকে জানার মত সর্বজ্ঞতা আমাদের নেই। সেটা একমাত্র খোদার এজেন্সি।

খ্রীষ্টধর্মে ধৈর্যের পরীক্ষার ব্যাপারটার থেকে শয়তানের প্ররোচনা এবং যীশুর আশ্রয় প্রার্থনার ব্যাপারটা বেশি আসে। যদি আমার ওপর কোন গজব নাজিল হয়ই, তা অবশ্যই শয়তানের প্ররোচনার কারণে। হতে পারে সদগুণের অধিকারী হয়েও আমার সে নিয়ে গর্ব বেশি। সেটাই শয়তানের প্ররোচনা। সে কারণে যীশুর আশ্রয়ে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে সমর্পণ করলে তবেই এই দুঃখ থেকে মুক্তি। এ হিসাবে খ্রীষ্টধর্মের থেকে ইহুদী ও ইসলাম ধর্ম কাছাকাছি। সেখানে মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ের মালিক আল্লাহ। খ্রীষ্টধর্মে স্রষ্টা ভালরই স্রষ্টা, কিন্তু খারাপটার উৎপত্তি শয়তানের প্ররোচনা ও মানুষের ফ্রীউইল থেকে।
আবার ইহুদী পুস্তকে শয়তান খোদার আজ্ঞাবহ, “ফলেন এন্জেল” নয়, যেমনটা ক্রিশ্চানিটিতে। ইসলামে শয়তান “ফলেন এনজেল” কিংবা জ্বীন — কেননা ফেরেশতাদের খোদার আদেশ অমান্য করার শক্তি নেই।
ওপরের আলোচনার অনেক কিছুই পরস্পরবিরোধী ঠেকবে। এই প্রবলেম অফ ইভেল নিয়ে ইহুদী ধর্মে এখনো বিতর্কের শেষ নেই। ইসলামেও অনেক স্ববিরোধিতা রয়েছে — হয়ত খ্রীষ্টধর্ম আর ইহুদী ধর্মের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থান নেবার প্রচেষ্টার কারণে।
তবে অতীতে অন্যান্য অবস্থানও তিন ধর্মের প্রখ্যাত চিন্তকদের ছিল। যেমন, ইহুদী ধর্মে মাইমনিডিস, খ্রীষ্টান ধর্মে সেন্ট টমাস অ্যাকিনাস আর ইসলাম ধর্মে ইবনে রুশদের অবস্থান র্যাশনালিস্ট। মানে মানুষের ফ্রীউইল প্রায় শতভাগ, এবং খোদা তার প্রতিফলের বিচার করতে কোন আর্বিট্রারিনেস বা স্বেচ্ছাচারিতা দেখান না। নেচার ইজ ইম্যুটেবল। প্রাকৃতিক নিয়মের কোন ব্যত্যয় নেই (উল্লেখ্য, এ দর্শনে ইনএক্সপ্লিকেবল মিরেকলের স্থান নেই)।
আবার ইহুদী নাহমানিডেস আর মুসলিম আল-গাজালীর অবস্থান এদের প্রায় বিপরীত। তাদের হিসাবে মানুষের আল-কদর বা ললাটলিখন চূড়ান্ত, এ সীমানার মধ্যেই তার ফ্রীউইল সীমাবদ্ধ। যদি ব্যত্যয় ঘটে তবে সেটার কারণ খোদার আর্বিট্রারি ইন্টারভেনশন (এখানে মিরেকলের সুযোগ আছে)।

অতীতে আদি ইসলামের একটি দার্শনিক গ্রুপের অস্তিত্ব ছিল যাদেরকে “কদরিস্ট” নাম দেয়া হয়েছে। উমাইয়া ও আদি আব্বাসী খেলাফতের সময়ের — অর্থাৎ ইসলামের স্বর্ণযুগের সময়কার এসকল চিন্তাবিদরা মানুষের শতভাগ ফ্রীউইল রয়েছে দাবি করতেন। খোদা মানুষের সকল কাজের বিচারক আর প্রতিফলের বিধায়ক কেবল। প্রিডেস্টিনেশন বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তি বলে কিছু নেই।
এই চিন্তাধারা মানুষকে শতভাগ এজেন্সি দেয়। কদরিস্টদের দর্শন পরবর্তী মু’তাজিলা স্কুলের দার্শনিকরা কিছু পরিবর্তনসহকারে গ্রহণ করে নেন। আর এ সকল স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দর্শন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় আ’শারীপন্থীদের এবং ইমাম গাজালীর সুফী আধ্যাত্মিক চিন্তাপ্রসূত ডিটারমিনিজম সর্বজনগৃহীত হবার পর থেকে। সুন্নী ইসলামে এখন প্রিডেস্টিনি শতভাগ স্বীকৃত, আর শিয়া ইসলামে ফ্রীউইলের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এখনো রয়েছে।
এ সকল জটিল দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই আব্রাহামিক ধর্মগুলির হাজার হাজার পৃষ্ঠার ধর্মগ্রন্থে অনুপস্থিত। কিন্তু পুস্তকের পাতা থেকেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় গুরুরা প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেছেন, একেক সময় একেক উত্তর দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও নতুন জবাবের উদ্ভব ঘটা অসম্ভব নয়। যে কোন ধর্মেরই বিবর্তন কিন্তু সর্বদা চলমান। ফলে আজ আমরা যে ধরনের ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে আছি, আগামী একশ বছরে তার ব্যাপক মৌলিক দার্শনিক পরিবর্তন কিন্তু একেবারে অসম্ভব নয়।




This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫





