“মুহাম্মদ — তদীয় পিতা আব্দুল্লাহ, তদীয় পিতা আব্দুল মু্ত্তালিব… (প্রভৃতি প্রভৃতি) …তদীয় পিতা শীস, তদীয় পিতা আদম আলাইহিস সালাম।”
যে কোন “সীরাত” বা নবীচরিতে অবশ্য অবশ্যই মুহাম্মদ(সা)এর এমন বংশপরম্পরা বা সিলসিলা একেবারে আদম(আ) পর্যন্ত পাওয়া যাবে। ওসমানী তুর্কী খলীফাদেরও বংশলতিকা দেখিয়েছি, যেখানে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদকে দাবি করা হচ্ছে সরাসরি মুহাম্মদের(সা) মাধ্যমে আদম(আ) হতে বংশোদ্ভূত।


ওসমানী তুর্কীদের বংশলতিকাটি অবশ্যই বানোয়াট এবং রাজনৈতিক লেজিটিমেসি বাড়ানোর জন্যেই তৈরি। মুহাম্মদ(সা)এর যে বংশলতিকা সীরাতে পাওয়া যায়, সেরকমটাও কুরআনে সরাসরি নেই। কিন্তু আরবরা যে ইসমাঈলের(আ) থেকে উদ্ভূত এবং মুহাম্মদের(সা) যে ইসমাইল(আ)এর থ্রুতে ইব্রাহিম(আ) থেকে বংশোদ্ভব, এ ব্যাপারে সমর্থন সেখানে রয়েছে।
অপর দুই আব্রাহামিক ধর্মের কি অবস্থা?
নিউ টেস্টামেন্টে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ বংশলতিকা রয়েছে, যাতে কিং ডেভিডের থ্রুতে এডাম পর্যন্ত যীশুর পূর্বপুরুষ দেখানো হয়েছে (ছবি দেখুন, মধ্যযুগীয় বংশলতিকার ম্যানুস্ক্রিপ্ট)। ওল্ড টেস্টামেন্টেও প্রাচীন হিব্রু কিংদের এরকম বংশলতিকা রয়েছে। তাদের পুরো জাতিটিরই বংশোদ্ভব আরবদের মত পবিত্র। আইজ্যাকের বারো পুত্রের বারোটি ট্রাইব থেকে।


এমন বংশলতিকার উদাহরণ শুধু আব্রাহামিক ধর্মে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যত্রও পাওয়া যায়। যেমন সুমেরিয়ান কিং লিস্ট বলে একটি অতি প্রাচীন ট্যাবলেটে সুমেরের বিভিন্ন রাজার বংশপরম্পরা দেয়া হয়েছে (ছবিতে অনুবাদের অংশবিশেষ)। বহু বছর চেষ্টার পর সুমেরিয়ান লিপির পাঠোদ্ধারের পর এই কিং লিস্টের সাথে নিউ আর ওল্ড টেস্টামেন্টের কিং লিস্ট বা জিনিয়ালজির সাদৃশ্য দেখে বিবলিকাল আর্কিওলজিস্টরা হতবাক হয়ে যান।
ধর্মগ্রন্থে এসব জিনিয়ালজি দেখানোর প্রচ্ছন্ন কারণ অবশ্যই স্বীয় স্বীয় ধর্মের প্রচারকদের এনসেস্ট্রাল ও পলিটিকাল লেজিটিমেসি সুদৃঢ় করা। কুরআনে পর্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, আরবীতে নাযিল হবার কারণ আরবদের নিকট মুহাম্মদকে প্রেরণ। অর্থাৎ গুরুত্বটা কিন্তু আরবদের বংশগত। ইহুদীদের আইজ্যাকের বংশগত লেজিটিমেসির থেকে কম নয়। জিসাসও সেরকম হাউজ অফ ডেভিডের বংশধর— একার্থে তার কিংডমেরও দাবিদার, যে কারণে সেকেন্ড টেম্পলের সানহেড্রিন নামক এলিটদের সাথে রাজনৈতিক লেজিটিমেসির সংঘাত হওয়াতে তার ক্রুসিফিকশন।


যা হোক, বর্তমান যুগে এ সকল ধর্মগুলি কি তাদের স্ব স্ব নবী ও সন্তদের বংশ হতে নিজেদের ধর্মীয় নেতাদের বেছে নেয় কিনা, এটা আমার তুলনামূলক আলোচনার বিষয়বস্তু। বর্তমান কালের কিছু ধর্মে বংশপরম্পরায় নেতৃত্ব হস্তান্তর হয়। যেমন, তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে দালাই লামা কদিন পর যাকে পরবর্তী নেতা হিসাবে নির্বাচন করবেন, তিনি হবেন বুদ্ধেরই কোন না কোন অবতারের পুনর্জন্মপ্রাপ্ত পুণ্যাত্মা।
সুন্নি ইসলামে বংশপরম্পরায় ধর্মীয় নেতৃত্ব নির্বাচন অপরিহার্য নয়। সেরকম বংশপরম্পরা থেকে থাকলে সেটা এক্সট্রা পয়েন্ট। কিন্তু সবার আগে পুণ্যবান সদচরিত্র ধর্মভীরু হওয়া চাই। ওসমানী সুলতানরা মুহাম্মদ(সা) থেকে সিলসিলা দাবি করলেও সেটা তাদের ধর্মীয় কর্তৃত্বে খুব বেশি লেজিটিমেসি যোগ করে না, কিন্তু পলিটিকাল লেজিটিমেসি বাড়ায়। একই ভাবে জর্দানের রাজবংশ নিজেদের হাশেমী দাবি করলেও সেটা পলিটিকাল, রিলিজাস লেজিটিমেসির জন্য নয়। উল্লেখ্য, এ পরিবার প্রকৃতপক্ষে মক্কার “শরীফ” ছিল, সৌদিরা তাদের উৎখাত করে।
সুন্নি ইসলামের সাথে এদিক দিয়ে মেলে ইহুদী ধর্মীয় নেতৃত্ব। সেখানও রেবাই হবার জন্য বা ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য কোন রক্তের পরীক্ষা দিতে হয় না। স্কলারশিপের মাধ্যমে যারা নিজেদের উৎকর্ষ দেখাতে পারে, তারা স্বীয় গুণে একেক লেভেল অতিক্রম করে সমাজের গ্রহণযোগ্যতা অনুযায়ী ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হন। সুন্নী মুসলিমদের মত এদেরও একজন কেন্দ্রীয় নেতা নেই। সুন্নী ইসলামে আঞ্চলিক ইমাম ও আলেমদের যে ডিসেন্ট্রালাইজড অথোরিটি, অধিকাংশ মেইনস্ট্রীম ইহুদী বিশ্বাসেও তাই। তবে সুন্নী ইসলামের মতই যদি ভাল বংশপরিচয় থাকে, তাহলে সেটা এক্সট্রা পয়েন্ট। যেমন, কোহেন শেষ নাম যাদের তারা অ্যারনের বংশোদ্ভূত। লেভাইটরা জেকবের ছেলে লেভির থেকে। এই দুই বংশের রেবাইরা অতুলনীয় মর্যাদা পান — যদি তাঁরা সেরকম চরিত্রের অধিকারী হন। তবে আধুনিক ইহুদী প্র্যাক্টিসে তাঁদের বংশপরিচয়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
একই ব্যাপার খেয়াল করি প্রটেস্ট্যান্ট ক্রিশ্চানিটিতে। সেখানেও যথেষ্ট লেখাপড়া এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি পড়ার পর কাউকে চার্চের দায়িত্ব ছাড়া যায়। এসকল রেভারেন্ডদেরও অথোরিটি ডিসেন্ট্রালাইজড। তাদের বংশপরিচয় নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা নেই।
ওদিকে ক্যাথলিক ও অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটিতে ব্যাপারটা অন্যরকম। সেখানে পোপ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশপের কাছে “পরম্পরায়” রিলিজাস অথোরিটি এসেছে। এটা ঠিক বংশীয় পরম্পরা নয়, স্পিরিচুয়াল ডিসেন্ট — অর্থাৎ আধ্যাত্মিক পরম্পরা। যীশুখ্রীষ্টের কোন সরাসরি বংশধর নেই। কিন্তু সেন্ট পিটারের মাধ্যমে হোলি চার্চ স্থাপন যীশুখ্রীষ্টের শেষ ইচ্ছা ও তারই পরম্পরা। ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসে একে বলে এপোস্টোলিক অথোরিটি। তারপরও যথেষ্ট পড়াশুনা ও “উইজডম” আহরণের পরই বিশপ কিংবা পোপ হওয়া যায়।
এই স্পিরিচুয়াল অথরিটির ব্যাপারটা আবার সুফী ইসলামে রয়েছে। কোন তরিকার পীরের পুত্রের কাছেই যে বংশপরম্পরায় পীরত্ব যাবে তা নয়, কিন্তু আত্মার সম্পর্কে সম্পর্কিত সবচেয়ে নিকট মুরিদই হয়ত ভবিষ্যতে সেই পীরের স্থান নেবে। এর সবচে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ শামসে তাবরিজী আর তার আধ্যাত্মিক শিষ্য মাওলানা রূমী। ইহুদী ধর্মেও কিন্তু “সুফী” টাইপ অর্ডার আছে, যেখানে একইভাবে ধর্মীয় কর্তৃত্ব হস্তান্তর হয়।
ক্যাথলিক চার্চের আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এরা বিভিন্ন অর্ডারে বিভক্ত হলেও অথোরিটি অত্যন্ত হিয়েরার্কিকাল, এবং সেন্ট্রালাইজড। “অল রোডস লীড টু রোম।” প্রটেস্ট্যান্ট ক্রীশ্চানিটি, অধিকাংশ ইহুদী এবং সুন্নী ইসলাম এর বিপরীত।
এখানে এসে আবার ক্যাথলিক চার্চের অথোরিটি-হিয়েরার্কি মেলে টুয়েলভার শিয়া ইসলামের সাথে— মানে যারা বারো ইমামে বিশ্বাসী। এদের মূল কেন্দ্র ইরানের কোম শহর— বলা যায় শিয়া রোম। এ শহরে গেলে পাগড়ি, জোব্বা ও দাড়ি ছাড়া কিছু চোখে পড়বে না। এখান থেকেই ধর্মীয় নেতাদের কাউন্সিল আয়াতোল্লা নির্বাচন করেন, ফতওয়া প্রকাশ করেন। তাদের হিয়েরার্কিতেও নানা রকম পদবীর পরে শেষ ধাঁপ আয়াতোল্লা। সেরকম ক্যাথলিক ধর্মে বিশপ থেকে পোপ।

এখন ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, শিয়া ধর্মমতে মুহাম্মদ(সা)এর বংশপরম্পরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্নী বিশ্বাসমতে মুহাম্মদ(সা) খতমে নবুয়্যত অর্থাৎ ঐশ্বরিক বার্তাপ্রেরণের সমাপ্তি। সে কারণেই নাকি তাঁর কোন পুত্রসন্তান নেই (খেয়াল করুন যীশুর সাথে মেলে)। তাঁর এক পুত্র ইব্রাহিম শিশুবয়েসে মৃত্যুবরণ করে সে কারণেই। মুহাম্মদের(সা) পর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মালিক তার বংশের কেউ নয়। বরং উম্মাহ— মানে মুসলিম জনগণ। এ কারণে মুরুব্বীদের অর্থাৎ এল্ডার কাউন্সিলের মতামত অনুযায়ী নেতৃত্ব ঠিক করা হয়। যেটা ঘটেছিল প্রথম খলীফা আবু বকরের(রা) ক্ষেত্রে।
টুয়েলভার শিয়া অপরদিকে আবু বকর, উমর, উসমান(রা) প্রমুখকে অভিশাপ দেয়! কেন? কারণ মুহাম্মদ(সা)এর মাগফিরাতের কিছুদিন আগে গাদির খুম নামে একটি স্থানে নাকি কতিপয় নিকট সাহাবীদের সমাবেশে তিনি আলীকে(রা) তার উত্তরসূরী হিসাবে মনোনীত করেন। খলীফা হিসাবে আবু বকরের মনোনয়ন তার সেই উইলের লংঘন।
এখনো শিয়ারা গাদির খুমের দিনটিকে তৃতীয় ঈদ হিসাবে পালন করে, এবং আযানে আলী ওলীআল্লাহ বলে। এখানে আলীর(রা) কাছে মুহাম্মদের স্পিরিচুয়াল অথোরিটি আর আলীর(রা) স্ত্রী, মুহাম্মদের(রা) কন্যা ফাতেমার(রা) থ্রুতে সরাসরি বংশপরম্পরা — উভয় খতিয়ানেই একটা বিশাল পরম্পরা রয়েছে। শিয়া বিশ্বাসে এটা একটা কেন্দ্রীয় ব্যাপার। আলী ও ফাতেমার(রা) থেকে শুরু হওয়া বংশপরম্পরাকে শিয়া মতে বলে আহল-আল-বাইত — অর্থাৎ নবীজির হাউজ!
এটা ডিভাইন কিংশিপের মতই একটা ব্যাপার। এই সেন্ট্রাল আর্গুমেন্টে শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে চরম মতভেদ। শিয়া মতের বারো ইমামও বংশপরম্পরায় আহল আল-বাইতের অংশ। তারা ইমাম হিসাবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় প্রকার নেতৃত্বের দাবিদার। অন্যদিকে যদিও সুন্নি উমাইয়া খলীফারা বংশপরম্পরায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করতেন, ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার আলেমদের কাছেই সোপর্দ করতেন।
বর্তমান যুগের শিয়া ইরানেও এই সিলসিলার ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হয়তবা তাদের প্রাচীন পারসিক রাজবংশ কিংবা জরথুস্ত্রের প্রিস্টদের বংশের অবচেতন স্মৃতি। আয়াতোল্লা খোমেনি এবং আয়াতোল্লা খামেনেয়ি উভয়েই সপ্তম শিয়া ইমাম মুসা আল কাজিম হতে বংশোদ্ভব দাবি করেন। সে দাবি অনুযায়ী তারা মুহাম্মদের(সা) মত না হলেও আলীর(রা) মত ইনফ্যালিবল — ভ্রমের ঊর্ধ্বে।
অর্থাৎ সেন্ট্রালাইজড অথোরিটি আর ডিভাইন অথোরিটি — এই দুই হিসাবে ক্যাথলিক আর ঈস্টার্ন অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটির পাশেই দাঁড়াবে শিয়া ইসলাম। আর তার বিপরীতে মুখোমুখি স্থান নেবে সুন্নী ইসলাম, প্রটেস্ট্যান্ট ক্রিশ্চানিটি আর অধিকাংশ ইহুদী ধর্মবিশ্বাস।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫



