এনাইকনিজম

প্রথম দুটো ছবি খেয়াল করুন। তুলনা করুন তৃতীয় ছবির সাথে — মূল তফাৎ ধরা পড়ছে?



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




প্রথম ছবিটি ইহুদী উপাসনালয় কিংবা সিনাগগের অভ‍্যন্তরের স‍্যাংকচুয়ারির ছবি। দ্বিতীয়টি মসজিদের মিহরাব — আরো স্পষ্ট করে বললে মসজিদ আল-আকসার। তৃতীয়টা টিপিকাল ঈস্টার্ন অর্থডক্স চার্চের অল্টার। ক‍্যাথলিক চার্চ প্রায় একই রকম। প্রটেস্ট‍্যান্টদের কথা পরে বলছি।

আবার একটু ভাল করে দেখুন, তফাতটা চোখে পড়ছে কিনা?

তিনটার মধ‍্যে চোখে লাগার মত করে আলাদা দেখতে হল অর্থডক্স অল্টারটি। কেননা এখানে দেখা যাচ্ছে যীশুখ্রীষ্ট, মাতা মেরীসহ বিভিন্ন সন্তদের ছবি বা আইকন।

সিনাগগ ও মসজিদের ভেতরে সেরকম কিছু নেই। নবী-সন্ত দূরের কথা, কোন মানুষের কিংবা জীবিত প্রাণীরও চিত্র নেই। দুটোতেই বিভিন্ন অ‍্যাবস্ট্রাক্ট নকশা দেখা যাচ্ছে। আর আছে হিব্রু কিংবা আরবী ক‍্যালিগ্রাফিতে লেখা দোয়া-দরূদ, সূরার অংশ।

ইহুদী ও ইসলাম ধর্মকে এ কারণে লোগোসেন্ট্রিক বলা হয়। কারণ উভয়েই তাদের ধর্মগ্রন্থের লিখিত বাণীকেই পবিত্র মনে করে এবং সেটা প্রদর্শনের মধ‍্যে পুণ‍্য খুঁজে পায়। সিনাগগের স‍্যাংকচুয়ারিতে নকশা করা বিশাল বিশাল প্সাল্টের বা তোরাও রাখা থাকে। সেটার থেকে রেবাই তোলাওয়াতের মত সুর করেই পড়েন।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ইসলাম আর ইহুদী ধর্মে জীবিত প্রাণী এঁকে বা মূর্তি গড়ে দেখানোর ব‍্যাপারে কমন অনীহা — যাকে বলে এনাইকনিজম। দুটো ধর্মই সেমিটিক ফ‍্যামিলির। আর ইসলামপূর্ব আরবদের মধ‍্যে একাধিক দেবতার আরাধনা চালু থাকলেও এনাইকনিজম ছিল তার অন‍্যতম বৈশিষ্ট‍্য। পাথরে গড়া মূর্তির পরিবর্তে মুখাবয়বহীন চৌকোনা পাথরের চারপাশে আবর্তন করে প্রার্থনা করত তারা।

আধুনিক ইহুদী ও ইসলাম ধর্ম যে পরিমাণ আইকোনোক্লাস্ট অর্থাৎ প্রাণীর ইমেজকে বিনাশ করতে সচেষ্ট, অর্থডক্স ও ক‍্যাথলিক খ্রীষ্টান ধর্ম তার বিপরীত। সেখানে নবী-সন্তদের ইমেজ বা আইকন উপাসনার উদ্দেশ‍্যেই চার্চে রাখা হয়। এর শুরু মূলত “রেলিক” — যীশু ও সন্তদের দেহাবশেষ অথবা স্পর্শকৃত বস্তুকে “ইন্টারসেসর” বা স্রষ্টার কাছে পাপমু্ক্তির দোহাই হিসাবে ব‍্যবহারের কারণে। বলা যায় যখন থেকে অর্থডক্স ও ক‍্যাথলিক ক্রিশ্চানিটিতে রেলিক “পূজা” শুরু, তখন থেকেই আইকন “পূজাও” শুরু।

ইহুদী ও ইসলাম ধর্মের এনাইকনিজমের মূল ভিত্তি মুসানবীকে প্রদত্ত টেন কমান্ডমেন্টসের দ্বিতীয় কমান্ডমেন্ট — দাউ শ‍্যাল্ট নট মেইক গ্রেভেন ইমেজেস। কুরআনে অবশ‍্য সোজাসাপ্টা ইমেজের কথা বলা নেই— আছে পূজার উদ্দেশ‍্যে গড়া প্রতিমার ব‍্যাপারে নিষেধাজ্ঞা। আসলে এটাই সেকেন্ড কমান্ডমেন্টেরও মূল কথা— “উপাসনার নিমিত্তে প্রতিমা গড়ো না।” ইমেজ শব্দের পরিবর্তে আইডোল বা প্রতিমা বলাটা বেশি সঠিক। প্রকৃতপক্ষে উপাসনার উদ্দেশ‍্য ব‍্যতিরেকে ভাস্কর্য ও চিত্র অংকনের ব‍্যাপারে সুস্পষ্টতা নেই। সেটার ভিত্তি কুরআন নয়, বুখারীর হাদীস।

তাই মজার ব‍্যাপার হল, আদিতে ইহুদী ও ইসলাম ধর্মের কোনটিতেই চিত্রাংকন বা ভাস্কর্যনির্মাণ বিরোধী এমন ব্ল‍্যাংকেট নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার কোন চিহ্ন দেখা যায় না। দুই ধর্মের অনুসারীরাই অসংখ‍্য মুদ্রা, ভাস্কর্য, ইলুমিনেটেড ম‍্যানুস্ক্রিপ্ট বানিয়েছে, তাতে এমনকি ধর্মীয় সন্তদেরও ছবি স্থান পেয়েছে। আদি ইসলামে এর উল্লেখযোগ‍্য উদাহরণ পেতে হলে খিরবাত আল মাফজার নামক মরুপ্রাসাদে পাওয়া উমাইয়া খলীফাদের মূর্তি কিংবা সিংহ-হরিণের চিত্রসংবলিত মোজাইক গুগল করে দেখুন।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মধ‍্যযুগীয় সুন্নী ইরানে বহু হাতে আঁকা ম‍্যানুস্ক্রিপ্টে ফেরেশতার তো বটেই, মুহাম্মদ(সা)এরও অবয়ব দেখানো হয়েছে। তবে তাঁর চেহারা ঢেকে দেয়া হয়েছে সাদা রঙের পর্দায়। উল্লেখযোগ্য ব‍্যাপার হল, ইহুদী পান্ডুলিপি প্রস্তুতকারকরাও একই সময়ে একই ধরনের চিত্র আঁকছিলেন — যাতে তাদের নবীদের চেহারাও এভাবে ঢেকে দেয়া ছিল। এই ধরনের চিত্রাংকনের লজিক ছিল যে কোন প্রাণীর ছবি আঁকলে যদি সেটা লাইফলাইক না হয়, কার্টুনিশ হয় কিংবা তার মানবীয় কোন গুণাবলী বিচ‍্যুত হয় যেমন কোন একটি অঙ্গ না দেখানো হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ ইমেজের ক‍্যাটেগরিতে পড়ে না। মোঘল মুসলিম ম‍্যানুস্ক্রিপ্ট মেকারদের লজিক ছিল একই।

ইমেজ ব‍্যবহারের একটা আদি ইসলামী উদাহরণ পাওয়া যায় প্রথম দিককার উমাইয়া মু্দ্রায়, যার ছবি দিয়েছি। দন্ডায়মান খলীফা নামের এই মুদ্রায় সম্ভবত খলীফা আবদুল মালেককে দেখানো হয়েছে। এটি স্বর্ণমুদ্রা, এর মত তামার মু্দ্রাও তৈরি হয়েছিল, যার একাধিক স্পেসিমেন আমার ব‍্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে।

দণ্ডায়মান খলীফা, আব্দুল মালিক, ৬৯৬/৭ খৃষ্টাব্দ
দণ্ডায়মান খলীফা, আব্দুল মালিক, ৬৯৬/৭ খৃষ্টাব্দ

উমাইয়া অনেক খলীফাকে পরবর্তীকালের একাধিক আলেম ভর্ৎসনা করলেও আব্দুল মালেক তাদের কাছে ভাল মানুষ বলেই গণ‍্য। তার রাজত্বকালেই হঠাৎ করে মানুষের চিত্রসংবলিত মু্দ্রা পরিবর্তিত হয়ে এপিগ্রাফিক অর্থাৎ কেবল বাণীসংবলিত হয়ে যায়। সম্ভবত ইসলামের আবির্ভাবের এই আশি বছর পরেও ইসলামের নিয়মকানুন প্রস্তরীভূত হবার প্রক্রিয়া চলমান ছিল, এবং হঠাৎ করে আলেমদের মতামত গ্রেভেন ইমেজের স্ট্রিক্ট অপোজিশনে চলে যায় (কোন কোন আলেম নাকি কুরআনের বাণীসহ মুদ্রার বিরুদ্ধেই ছিলেন কারণ মানুষ তা অপবিত্রভাবে ব‍্যবহার করবে)। এপিগ্রাফিক স্বর্ণমুদ্রারও ছবি দিয়েছি।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




স্বর্ণ দিনার, আব্দুল মালিক, ৬৯৭/৮ খৃষ্টাব্দ
স্বর্ণ দিনার, আব্দুল মালিক, ৬৯৭/৮ খৃষ্টাব্দ

যা হোক, ইন্টারেস্টিং জিনিস হল, হয়ত এই হঠাৎ বিপ্লবী পরিবর্তন আরব খলীফাদের তদকালীন শত্রু বিজ‍্যান্টাইন সাম্রাজ্যের অর্থডক্স ধর্মানুসারী শাসকদেরও প্রভাবিত করে।

আদি ইসলামের সমসাময়িক বিজ‍্যান্টিন মুদ্রা দেখিয়েছি। ক্রুশসহ সম্রাট দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ানের দন্ডায়মান মূর্তি এক পিঠে। অন‍্য পিঠে স্বয়ং যীশুখ্রীষ্টের মুখাবয়ব। এটাই বর্তমান অর্থডক্স খ্রীষ্টধর্মমতে স্বাভাবিক।

স্বর্ণ সলিডাস, দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান, ৬৮৫-৯৫ খৃষ্টাব্দ
স্বর্ণ সলিডাস, দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান, ৬৮৫-৯৫ খৃষ্টাব্দ

কিন্তু অষ্টম শতকের শুরুর দিকে এসে এর বিপরীত একটা চিন্তাধারা বিজ‍্যান্টিন সাম্রাজ‍্যে শুরু হয়ে যায়। সম্রাট তৃতীয় লিও দ‍্য ইসাউরিয়ানের আদি আবাস ছিল সিরিয়া। আরব মুসলিমদের সাথে তার বাতচিত শুধু যে ছিল তা নয়, আরবীতেই সেটা হত। হয়ত সেই সেমিটিক পটভূমি থেকেই তার চিন্তা ছিল “আইকোনোক্লাস্টিক।” আবার হতে পারে, একই সময়ে সীমান্তের ওপারে খলীফা দ্বিতীয় ইয়াজিদ যে ধরনের ফতোয়া দিয়ে খ্রীষ্টান আইকনসমূহ ধ্বংস করে দেন, তার একটা প্রভাব এসে পড়ে পশ্চিম দিকে।

বিজ‍্যান্টিন সাম্রাজ্যেও লিওর নির্দেশে “গ্রেভেন ইমেজ” ভেঙে ফেলার মহোৎসব শুরু হয়ে যায়। নিজের অনুগত দার্শনিক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সাহায্য‍ে স্ট্রিক্ট এনাইকনিজমের পথে সাম্রাজ্যটিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন তিনি। কারণ হিসাবে সেকেন্ড কমান্ডমেন্টসহ অন‍্যান‍্য যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান যুগের ইসলাম ও ইহুদী ধর্মের মত এই যুক্তিও দেয়া হয় যে, চিত্রকর বা ভাস্কর যেহেতু তাদের সৃষ্টিতে প্রাণ দিতে অক্ষম, সেহেতু এটা খোদার ওপর খোদকারির ব‍্যর্থ প্রচেষ্টা, শয়তানের প্রলোভনে প্ররোচিত হওয়া।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




লিওর এই নির্দেশ আরোপিত হয় সর্বাধিক চালু রৌপ‍্যমুদ্রার ক্ষেত্রেও। তার ছবি দিয়েছি। দেখুন আগের মত সম্রাট ও যীশুখ্রীষ্টের ছবি নেই। গ্রীকে কিছু বাণী আর অপর পৃষ্ঠে ক্রুশের ছবি। বলতে গেলে হুবহু উমাইয়া খেলাফতের এপিগ্রাফিক মুদ্রার মত।

রৌপ্য মিলারেসিওন, তৃতীয় লিও, ৭২০-৪১ খৃষ্টাব্দ
রৌপ্য মিলারেসিওন, তৃতীয় লিও, ৭২০-৪১ খৃষ্টাব্দ

বলা বাহুল‍্য, লিওর আইকোনোক্লাজম বেশিদিন প্রলম্বিত হয়নি। তার প্রচন্ড বিরোধিতা ছিল সাম্রাজ্যের প্রায় সর্বত্র — বিশেষ করে ক‍্যাথলিক ইতালিতে। তার পু্ত্রের মৃত‍্যুর পর আবার সব আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তার দুই দশক পর আরো দুই সম্রাটেরও প্রচেষ্টা ছিল এনাইকনিজম প্রতিষ্ঠার। নবম দশকের মধ‍্যভাগ থেকে বিজ‍্যান্টিন আইকোনোক্লাজমের সমাধি রচিত হয়।

তবে ঐ যে কয়েক পোস্ট আগে বলছিলাম গুটেনবের্গ বাইবেলের কথা? যার থেকে শুরু করে প্রটেস্ট‍্যান্ট রিফর্মেশন? সে সময়ে মুদ্রিত বাইবেল পড়ে ইউরোপের মানুষ বুঝতে শুরু করে “গ্রেভেন ইমেজে” খোদার আপত্তির ব‍্যাপারটা। আর ক‍্যাথলিকদের জাঁকজমকের সাথে রেলিক ও আইকন নিয়ে শোভাযাত্রাটা কতটা সেই অনুশাসনবিরোধী, এটাও এই আদি প্রটেস্ট‍্যান্টদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

তাই শেষ ছবিটা দিয়েছি ক‍্যালভিনিস্ট চার্চের অল্টারের। এখানে ক্রুশ ব‍্যতীত কোন “গ্রেভেন ইমেজ” বা আইডোল নেই। তবে এই প্রটেস্ট‍্যান্টরা “অরিজিনাল মীনিংয়ে” অনুশাসনটা মানেন। মানে “উপাসনার নিমিত্তে” না হলে চিত্র ও ভাস্কর্য জায়েজ।

অর্থাৎ বর্তমান যুগের অধিকাংশ প‍্র‍্যাকটিসিং খ্রীষ্টানদের তুলনায় তাদের আব্রাহামিক ভাই প্র‍্যাকটিসিং মুসলিম আর প্র‍্যাকটিসিং ইহুদীদের মধ‍্যেই বেশি সাদৃশ‍্য।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0

ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫




আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!