বৈশ্বিক গণমাধ্যম গত একশ বছরে কি ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে, আর বিভিন্ন সংঘাতে কি ধরনের ভূমিকা রেখেছে, তা নিয়ে কিছু মতামত দিচ্ছিলাম। বাকি রয়ে গেছে স্নায়ুযুদ্ধপরবর্তী বিশ্বের অবস্থা নিয়ে কিছু ভাবনাচিন্তা লিপিবদ্ধ করা। সেটাই আজকে করছি।
গত পঁয়ত্রিশ বছরে বিশ্বে দুটো বিশাল ঘটনা ঘটে গেছে। এক, স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি, সাথে পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বে মুক্তবাণিজ্যের জয়যাত্রা। আরেকটা, টিভি-ইন্টারনেটের দ্রুত বর্ধন ও বিস্তার। প্রথম ফেইজে এ সমস্ত ডেভলপমেন্ট অত্যন্ত পজিটিভ ছিল, এবং বিশ্বের মানুষের মধ্যে বিভাজন কমিয়ে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে, সেটা অবশ্য এখনো চলমান। নাইন ইলেভেন পরবর্তী দ্বিতীয় ফেইজে চলছে একটু বিপরীত চিত্র।
আমাদের বয়েসীরা জানবে, নব্বই দশকে জার্মান ব্যান্ড স্করপিয়নসের একটা গান প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পায়। “উইন্ড অফ চেইঞ্জ” নামের সেই গানটি ১৯৮৯ সালে রাশিয়ার মস্কোতেও একটা কনসার্টে গায় তারা, যেটা হয়ত এর দশ বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। ভাগ্যচক্রে সেই কনসার্টের তিন মাসের মধ্যেই বার্লিন ওয়ালের পতন ঘটে আর দুই জার্মানির পুনর্মিলনের রাস্তা সুপ্রশস্ত হয়। তার দুই বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাধি রচিত হয়।
কমিউনিজমের অবসান আর স্নায়ুযুদ্ধের যবনিকাপাতের সাথে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে বিজয়ী পক্ষ কারা। মার্কিন ও পশ্চিমা প্রভাব সারা পৃথিবীতেই মুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আগের বিশ্ব ছিল মূলত দুই ভাগে বিভক্ত — সোভিয়েত ব্লক ও পশ্চিমা ব্লক। এরা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা বাণিজ্য ও যাতায়াত নিষেধাজ্ঞার দেয়াল তুলে রেখেছিল। আর এদের মাঝে তৃতীয় পক্ষ বা জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি, যারা আসলে তৃতীয় বিশ্ব, তারা প্রক্সি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। আবার সুযোগমত এসকল দেশের মূলত স্বৈরাচারী শাসকরা একেক পক্ষে যোগ দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করেছে।
স্নায়ুযুদ্ধের পর ন্যাচারালি বহু স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়। হয় স্বৈরাচারী কমুনিস্ট রেজিমগুলো থেকে সোভিয়েত সমর্থন প্রত্যাহারের কারণে, আর নয়ত আমেরিকার কমুনিস্টবিরোধী স্বৈরাচারী রেজিমের প্রয়োজনটা ফুরিয়ে যাবার কারণে।
একটা উদাহরণ আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আশির দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোট দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী অাপার্টহাইড রেজিমের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলশ্রুতিতে ১৯৯০এর ফেব্রুয়ারি মাসে নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ ২৭ বছরের বন্দীজীবনের অবসান ঘটে। মুক্তির পর একটা স্টেডিয়ামে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ মিশ্র জনতার উদ্দেশ্যে তিনি অসাধারণ একটা বক্তৃতা দেন। সে বছর মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় আপার্টহাইড বর্ণবৈষম্য প্রথা বন্ধ হয়। ১৯৯৪ সালে মুক্ত নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশ শাসন শুরু করে এএনসি। স্নায়ুযুদ্ধের পীকে মার্কিন মিত্র এই দেশটির সাথে পশ্চিমাদের বৈরী আচরণ ছিল কল্পনার বাইরে। মুক্তির এমনই সম্ভাবনা ছিল আরো বহু দেশে।
এই পটভূমিতেই আমরা নব্বই দশকে বড় হয়েছি। এরশাদের পতন বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের প্রথম পরিচ্ছেদ। নব্বই থেকে আসলেই একটা পরিবর্তনের, মুক্তির হাওয়া আমরা দেখেছি। নব্বইয়ের আগে আমাদের শিশুকালে কেবল একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল বিকেল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে এগারটা পর্যন্ত চলত। সবার নিত্যদিনের সকালে স্কুলের আলাপ ছিল আগের দিনে দেখা থান্ডারক্যাটস কার্টুন কিংবা দি এটীম টিভি সিরিজে কি হয়েছিল, সে কাহিনী। সবার লিভড এক্সপেরিয়েন্স ছিল একই।
সেসব পরিবর্তিত হয়ে যায় নব্বই দশকের শেষভাগে স্যাটেলাইট ও কেবল টিভির বদৌলতে। আগেও বিটিভি ছিল হলিউডি বা মার্কিন শো দিয়ে ভর্তি, কিছু কিছু ভারতীয়। এখন আরো সব কিছু ছেঁয়ে গেল ঐ দুই দেশী সংস্কৃতির জিনিসপত্র দিয়ে। পরে দেশীয় উদ্যোক্তাদের কারণে একাধিক দেশী কেবল ও স্যাটেলাইট চ্যানেল আসল।
কনজিউমার প্রডাক্টের ক্ষেত্রেও বিশাল একটা পরিবর্তন চলে আসে। আগে কোক-পেপসি আমাদের জন্য বেশ বিলাসের জিনিস ছিল। নব্বই দশকের শেষ নাগাদ এগুলি হয়ে গেল ডালভাত। অন্যান্য আরো অনেক ব্র্যান্ডও এল। প্রাইভেট ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের জয়যাত্রা — এবং পরে পলিটিকাল কানেকশনের মাধ্যমে তাদের অলিগোপোলি স্থাপন — এর শুরু সে সময়েই। কম্পিউটারও সস্তা ও সহজলভ্য হয় এমনকি বাংলাদেশেও। ইন্টারনেটও দ্রুত বাজার পায়। আমাদের প্রজন্ম ছিল তার প্রথম ব্যবহারকারী।
বলতে দ্বিধা নেই, আমেরিকার এই ক্যাপিটালিস্টিক কনজিউমার সংস্কৃতিই এ পরিবর্তনের পেছনে ছিল। পুরো বিশ্বে এখন সেটা ন্যাচারালি শেকড় গেঁড়েছে। শুধু যে আমেরিকার সফট পাওয়ার তা নয়, অন্যান্য দেশের কপিক্যাট সংস্কৃতিও ক্রমে বাজারে নিজস্ব স্থান তৈরি করে নিয়েছে। হলিউডি মুভি-টিভির একচ্ছত্র আধিপত্য এখন নেই। তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্কের সাথে। বলা যায়, আমেরিকায় যে ক্যাপিটালিস্ট কনজিউমারিজম আর বিজনেস কম্পিটিশন চালু ছিল, তাই এখন প্রতিফলিত হয়েছে বাকি বিশ্বে।
আমেরিকার বাইরে টিভিরেডিওর মত রেগুলার গণমাধ্যমের ওপর এর মূল প্রভাব আমার মতে দু’রকম। এক, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রভাব চলে গিয়ে প্রাইভেট প্রভাব বেড়েছে। অর্থাৎ একক ব্যবসায়ীরা তাদের রাজনৈতিক কিংবা অন্যরকম প্রভাব বিস্তারের একটা আউটলেট পেয়েছেন, যেখানে সরকারের প্রতিপত্তি নেই কিংবা কম। আর দ্বিতীয়ত, প্রচুর মানুষের কাছে টিভিকেবল ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে। মার্কেটপ্লেস অফ আইডিয়াজ যাকে বলে, সেখানে আনপ্রেসেডন্টেড একটা বুম তৈরি হয়েছে।
এসবের একটা পজিটিভ আউটকাম তো অবশ্যই আছে। সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের বাঁধাটা আগের মত নেই। কেউ এখন আর চিঠি লিখে জবাবের জন্য সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করে না। সোশাল মিডিয়ায় এমনকি ভিনদেশীদের সাথে যোগাযোগ সোজা হয়ে গেছে ট্রান্সলেট ফীচারের কারণে। যার যেটা জানতে মন চায়, যেখানে যেতে ইচ্ছে করে, সবই এভেইলেবল। ইনফরমেশনের এত বড় প্রোলিফারেশন ও ডেমোক্রেটাইজেশন আগে কখনো এই পরিসরে দেখা যায়নি। তার বিপরীতে প্রত্যেকের লিভড এক্সপেরিয়েন্স হয়ে গেছে ভিন্ন ভিন্ন।
এ পরিবর্তনের একটা বড় নেগেটিভ কনসিকোয়েন্স পলিটিকাল পোলারাইজেশন। স্যাটেলাইট ও কেবল চ্যানেলগুলি আগে যেমন আপামর সকল ধরনের মানুষের কাছে কন্টেন্ট পৌঁছে দিত, এখন তাদের কন্টেন্ট হয়েছে আরো বেশি মাইক্রো-টার্গেটেড। ধরুন, ধার্মিক মানুষ দিনের অধিকাংশ সময় তাদের পছন্দের চ্যানেলে পড়ে থাকে। তাদের জন্য পরিবেশিত খবর সে অনুসারে বায়াসড। একই কথা বলা চলে কোন না কোন দলের সমর্থনপুষ্ট টিভি চ্যানেলের জন্য। প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্যে চ্যানেলগুলো এই মডেল থেকে লাভ করতে তাদের কন্টেন্টগুলিকে বানাচ্ছে আরো বেশি ক্রাউড প্লিজিং ও চটকদার। এমন পোলারাইজড অবস্থা আগে ছিল না।
বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনপরবর্তী মার্কিন পলিটিকাল ডিসকোর্স পাবলিক মিডিয়াতে প্রচন্ড ডিভাইডেড। এখনো তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত। বাকি বিশ্বে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে ২০০০এর দশকে কেবল চ্যানেলগুলি যে ধরনের কাভারেজ করেছে, তাতে এক শ্রেণীর মার্কিন দর্শক তাদেরকে রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য হাসিলের যন্ত্র হিসাবে দেখেছে। ফলশ্রুতিতে মেইন স্ট্রীম মিডিয়া তার বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হারিয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্যতার এই গ্যাপটা ফিলআপ করার জন্য নতুন একটি সময়োপযোগী আবিষ্কার তৈরি হয়ে বসে ছিল নব্বইয়ের দশকে। সেটা ইন্টারনেট। প্রথম প্রথম ওয়েবসাইট ও ব্লগের মাধ্যমে অল্টারনেট মতামত ও “ভিন্ন সত্য” প্রকাশের মুক্ত ক্ষেত্র পায় নতুন প্রজন্মের স্বঘোষিত কলাম রাইটার, ব্লগার, “ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট” প্রমুখ। তারপর তো সোশাল মিডিয়া এল পুরো ব্যাপারটাকে উল্টে পাল্টে ডেমোক্রেটাইজ করে দিতে।
সময়ের সাথে সাথে জেনুইন কন্টেন্টের সাথে মিলেছে অসংখ্য খাদ। সংবাদপত্র-টিভি-রেডিও একসময় ছিল নিয়ন্ত্রিত বা রেগুলেটেড মিডিয়া। সাংবাদিকতার একটা ভাল স্ট্যান্ডার্ড ছিল, অবশ্য সেটা এখনো বহু আউটলেটের আছে। কিন্তু দ্রুত, সহজলভ্য ও নিজের কনফারমেশন বায়াসকে সমর্থন করে এমন লাইভ তথ্যের জন্য ক্ষু্ধার্ত জনতার সংখ্যা বেড়েছে। আর যথারীতি তাদের সন্তুষ্ট করতে ফেইক ওয়েবসাইট, ফেইক প্রোফাইল, পেইজ প্রভৃতিরও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। শুধুমাত্র একজন মানুষ একলাই এইসব তৈরি করে মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে।
এখন যে শুধুমাত্র লিখিত ফেইক নিউজ রয়েছে তা নয়, সাথে পাওয়া যায় ডক্টরড ইমেজ, নয়ত কন্টেক্সট বিহীন ছবি। আবার অডিও ভিডিওও এখন এডিট করা যায়, সহজলভ্য এআই অ্যাপ কাজগুলিকে সহজ করে দিয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে এখন পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা হলেও সচেতনতা বেড়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফ্রিকায় যে পরিমাণ ফেইক নিউজ আর গুজব চলে হোয়াটস্যাপ চ্যানেলগুলিতে, সেটা কল্পনার বাইরে। পাল্লা দিয়ে নিউজ সেল করতে একই কোয়ালিটিতে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, মেইনস্ট্রীম আউটলেটগুলিও। এ বছর ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ নিয়ে সে এলাকার সংবাদমাধ্যমগুলি যে পরিমাণ মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তাদের সাংবাদিকতা।
বাংলাদেশের অবস্থা এমন কিছু ভিন্ন নয়। বৃদ্ধ প্রজন্মের তো কোন আইডিয়াই নেই, তারা সকল কিছু বিশ্বাস করে। আর কিছু তরুণ আছে যারা এতটাই জাতীয়তাবাদী জোশে অন্ধ যে সত্যমিথ্যা আলাদা করার ক্ষমতা থাকলেও সেটা খাটানোর কোন সদিচ্ছা নেই।
এখন সামান্য খরচ করে একটি মাত্র রুম থেকে পুরো একটা ইউটিউব, স্ট্রীমিং কিংবা ইন্টারনেট টিভি চ্যানেল চালানো অসম্ভব নয়। একটা এমন চ্যানেল বানিয়ে তার নাম “সাউথ ডাকোটা এগজামিনার” ধরনের গালভরা নাম দিয়ে চালিয়ে দিলে তার গুজব এমনকি সাউথ ডাকোটার বাসিন্দারাও স্বয়ং খাবে।
মার্কিন ইন্টারনেট কম্পানিগুলি আজকাল কড়াকড়ির অনেক সিস্টেম দাঁড়া করিয়েছে, কিন্তু ফেইক কোন কিছু ধরতে সময় লাগে, আর তার মাঝেই ফেইক গোষ্ঠী গুজব রটিয়ে পগার পার। ওদিকে গুগল, ফেসবুক এরা আমেরিকা আর ইউরোপ বাদে বাইরের দেশে কন্টেন্ট মডারেট করতে তেমন পারদর্শী নয়।
মোদ্দা ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে প্রতিটি দেশে বিশাল বিভক্তি রেখা। ধর্ম, আদর্শ, গাত্রবর্ণ, ধনীগরীব প্রভৃতি বিভক্তিরেখা আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানুষের সংবেদনশীলতাটাও বেশি। যেখানে আমি স্বপরিচয়ের মানুষের অভাবে নিজের পাড়ায় দল পাঁকাতে পারছি না, সেটা অতি সহজে ইন্টারনেটে করতে পারছি। সহজে খুঁজে পাচ্ছি নিজের ফ্রিঞ্জ মতের সাথে একমত আরো এক দঙ্গল মানুষ। আমার নিজের ভুল বিশ্বাস বা ঘৃণাটা আরো পাকাপোক্ত হচ্ছে।
গুগল কিংবা সেরকম পার্সোনালাইজড সার্চও আগুনে ঘি ঢালছে। যেহেতু আমার সার্চ হিস্টরি তার অ্যালগরিদমের জানা, তাই সে খুঁজে খুঁজে সেসব খবরাখবর আমার সার্চ রেজাল্টে বাবল আপ করে যেগুলি আমার পছন্দ হবে। ফেইসবুকও সেভাবে আমার ফীড তৈরি করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে এ অবস্থার অবনতিই ঘটবে। এমনকি সফটওয়্যার কিভাবে কাজ করে সেসব জ্ঞান রাখা মানুষজনও এ ধরনের বায়াস থেকে মুক্ত নয়।
কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত থাকুন, এই ফ্র্যাগমেন্টেশন কিংবা বিভাজন আমেরিকার মত দেশের জন্য নতুন নয়। গত পোস্টে বলেছি কিভাবে সত্তরের দশকে এ ধরনের সামাজিক বিভাজন আমেরিকায় তৈরি হয়েছিল। তখনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা কমে গিয়েছিল, রাস্তাঘাটে কালচার ওয়ার চলেছে। কিন্তু সে অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে আমেরিকার জনগণ। এর কারণ বহু প্রজন্ম ধরে এদেশে স্বাধীন মতামত চর্চার পরিবেশ ও সহনশীলতা। টিভিতে যেমনই দেখাক না কেন, আমেরিকা এ ধরনের অবস্থা আগেও কাটিয়েছে এবং তারপরও বেঁচেবর্তে রয়েছে।
কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব হয়তবা এখনো পুরোপুরি খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনি। রেসপন্সিবল মাস মিডিয়া গড়ে ওঠার বহু নিয়ামক এবং চেক-ব্যালান্স সেসব দেশে অনুপস্থিত। এর দু রকমের ফলাফল সম্ভব। এক, প্রতিটি দেশের আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিভাজন প্রকট আকার ধারণ করবে। কোন কোন দেশে তার ফলাফল দাঁড়াতে পারে বিচ্ছিন্নতাবাদ আর গৃহযুদ্ধ। নয়ত রাজনৈতিক উত্থান-পতন।
দুই, পাশাপাশি দেশগুলির মধ্যে বৈরিতা বৃদ্ধি পাবে। যখন একেক দেশের জনগণ এমন কোন র্যালিইং কজ পাবে, যাতে নিজেদের বিভাজন ভুলে কোন কমন এনেমির বিরুদ্ধে একাট্টা হতে পারে, তখন জাতীয়তাবাদী কট্টরবাদ ও শত্রুতা বেড়ে যাবে।
এই দ্বিতীয় প্রকারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিপদজনক। এটা প্রাকৃতিকভাবে ঘটতে পারে, আবার সুবিধাবাদী কোন একনায়ক বা রাজনৈতিক দল নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যেও সে অবস্থার তৈরি করতে পারে। এভাবেই বলা যায় বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী শাসনের নতুন একটা যুগের সূচনা হয়েছে। পুতিন, শি, ওরতেগা, বুকেলে, এরদোয়ান, ট্রাম্প (যদিও তাকে এখনো সে কাতারে ফেলা যায়না), ওরবান, এদের উত্থানে সহায়তা করেছে সোশাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ।
এ অবস্থাটা তুলনীয় হতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউরোপের সাথে, যেখানে রেডিও ও সংবাদপত্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণলাভের মাধ্যমে হিটলারের নাৎসি পার্টি জার্মানিতে কিংবা স্তালিনের কমুনিস্ট পার্টি রাশিয়ায় নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করেছিল। তারপর ঘৃণার বিষবাষ্প উদগীরণ করেছিল নিজেদের এক শ্রেণীর নাগরিকের ওপর, কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশগুলির ভিন্ন “নিচু” জাতিগুলির ওপর।
আমার ভয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুটা হবে এরকম একটা পরিস্থিতিতে। প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় ক্যাটেগরির সংঘাতের কিছুটা প্রিভিউ আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। দেখুন, সুদানের গৃহযুদ্ধ, কংগোর M23 বিদ্রোহ, মায়ানমার, ইউক্রেন-রাশিয়া, ইসরাইল-গাজা প্রতিটা সংঘাতের চরিত্র এখন বদলে গেছে। প্রতিটাই ইন্টারনেট প্রপাগান্ডার ওপর নির্ভরশীল, কোন ক্ষেত্রে সরকারী সমর্থনপুষ্ট সেটা। প্রতিটা সংঘাতই কোন না কোন মাত্রায় ইন্টার্ন্যাশনালাইজড। আমরা কেউই চুপ করে বসে নেই ভিনদেশের সমস্যা নিয়ে মতামত তৈরি করতে, অন্যের ওপর সে মতামত চাপিয়ে দিতে।
সুতরাং ধরে রাখুন, গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি আর অন্যান্য নিয়ামক বিশ্লেষণ করে সবচে সম্ভাব্য ফলাফল হচ্ছে, নিউক্লিয়ার ওয়ার বা থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার ঘটার আগেই উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বে কনভেনশনাল সংঘর্ষে প্রচুর রক্তপাত হবে। হয়ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধই হবে না, তার জায়গায় আরেকটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ হবে, যেখানে অসংখ্য স্থানীয় প্রক্সি যুদ্ধে ইন্ধন যোগাবে স্থানীয় ও বিশ্বের পরাশক্তিগুলি।
হতে পারে আমি একটা অত্যাধিক নৈরাশ্যবাদী চিত্র দেখাচ্ছি। কিন্তু দেখাচ্ছি যে এটা অসম্ভব নয়। এটাই বটমলাইন। বর্তমান যুগের যোগাযোগ মাধ্যমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে মানুষের মাঝে শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরত আনা এখনো অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য সেই মানুষদেরই সচেতন হতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মকে অতীতে সংঘটিত ভয়াবহ সব অমানবিক পৈশাচিক অপরাধ থেকে রক্ষা করতে হলে সে সচেতনতা তৈরি ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫



