ইডিয়ট বক্স

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ দর্শিত টেলিভিশন ব্রডকাস্ট কোন ঐতিহাসিক মুহূর্তটির, কেউ কি বলতে পারবেন?

যদি বলেন ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাইয়ে আটলান্টিকের দুপাশে ৩২ ঘন্টাব‍্যাপী প্রচারিত ব্রডকাস্ট, তাহলে আপনার আন্দাজ নির্ভুল! 

১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযান উপলক্ষ‍্যে টানা দুই দিন টিভি সম্প্রচারের শেষাংশ

ঐতিহাসিক ঐ দিনটি মানব ইতিহাসে স্মরণীয় মানুষের প্রথম সফল চন্দ্রাভিযানের কারণে। এতদিন কল্পনার জগতে গ্রহান্তরে যে পদচারণ করেছে মানুষ, তা বাস্তবে রূপান্তরিত হল।

আর হ‍্যাঁ, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রেখে যে বলেছিলেন “দ‍্যাটস ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম‍্যান, ওয়ান জায়ান্ট লীপ ফর ম‍্যানকাইন্ড,” সে কেবল ঐতিহাসিক নয়, এক দিক দিয়ে যুদ্ধে বিজয় ঘোষণার দলিল। যে যুদ্ধে পরাজিত পক্ষকেও নীল আর্মস্ট্রং তার বিজয়ে শামিল রেখেছেন “ম‍্যানকাইন্ডের” অংশ হিসাবে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




পরাজিত পক্ষ অবশ‍্যই তদকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্পেস রেইসে আমেরিকার দুই পা আগে থেকেও এভাবে চন্দ্রাভিযানের মত বিশাল কর্মযজ্ঞে বিফল হওয়াটা সোভিয়েতের ঠিক মেনে উঠতে পারার কথা না।

যা হোক, আমার আজকের লেখা চন্দ্রাভিযান নিয়ে নয়, বরং যেই গণমাধ‍্যমটির সাহায‍্যে পুরো বিশ্ববাসী ঐতিহাসিক সেই বিজয়টি সরাসরি দেখতে পেল, সেটিকে ন‍িয়ে। আজকের সুপরিচিত টেলিভিশন নিয়ে।

আগের পোস্টগুলিতে বলেছি সংবাদপত্র ও রেডিওতে প্রযুক্তিগত ও সাংবাদিকতার অগ্রগতির ফলে কি পরিমাণ সামাজিক প্রভাব পড়েছিল মানুষের ওপর। দুবেলা সংবাদপত্র যদি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর রেডিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পছন্দের গণমাধ‍্যম হয়, তাহলে টিভি হবে স্নায়ুযুদ্ধের ফেভারিট।

আর টিভি-ফিল্মের প্রপাগান্ডা ব‍্যবহারে দুই পরাশক্তির কেউই পিঁছিয়ে থাকেনি। আগের যুগে নাৎসি ও স্তালিনী রেজিম যদি প্রপাগান্ডার মাস্টার হয়ে থাকে, তো এবার টিভি দিয়ে তাদের টেক্কা দেয়াটা কেবল মার্কিন-সোভিয়েতেরই সাজে!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। জাপানে মার্কিন অ্যাটম বোমা বিস্ফোরণের বেশ কয়েক বছরের মধ্যেই ইউরোপের মানচিত্রের মাঝ বরাবর নেমে আসে লৌহপ্রাচীর। পূর্ব জার্মানিসহ পূর্ব ইউরোপের একাধিক দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পশ্চিমা দেশগুলির সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায় রাশিয়ার।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৯৬২ সালে সোভিয়েত কৃত্রিম উপগ্রহ ভোস্তক ৩ ও ৪এ দুই সোভিয়েত নভোচারী ৪ দিন ব‍্যাপী মহাশূন‍্যযানে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। সারা বিশ্বে সেই সফলতা ফলাও করে প্রচারিত হয়। অবশ্য আগের বছরই ভোস্তক ১এ গাগারিন হয়েছিলেন প্রথম নভোচারী।

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। আন্তঃমহাদেশ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। প্রক্সি ওয়ার শুরু হয় ইতালি, গ্রীস, কোরিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে।

যুক্তরাষ্ট্রে স্নায়ুযুদ্ধের পাবলিক প্রতিক্রিয়া শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। টিভি পঞ্চাশের দশকে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। টিভির স্ক্রীনে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দৈনিক আন্তর্জাতিক খবর সচিত্র দেখতে শুরু করল মার্কিনীরা। পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ আর হিরোশিমা-নাগাসাকির আহত-নিহতদের চিত্র আর কারো কাছে অপরিচিত থাকলো না।

১৯৫৪ সাল আমেরিকার জন‍্য ছিল রেড স্কেয়ারের পীক টাইম — আর সেই উইচহান্টের মিডিয়া ফেইস ছিলেন সেনেটর ম‍্যাকার্থি। অবশ‍্য তাঁর বিরোধিতাকারী এড মারোও জনপ্রিয়তার দিক থেকে কম যাননি।

কম‍্যুনিস্ট ব্লকের সাথে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার শেষ পরিণতির ভয় থেকে যে রাজনৈতিক নিপীড়ন শুরু হল, তার নাম “রেড স্কেয়ার।” সরকারের ভেতরেও রুশ গুপ্তচর আবিষ্কৃত হতে শুরু করে। সেনেটর ম‍্যাকার্থি তার কমিশনের মাধ‍্যমে বহু বিখ‍্যাত মার্কিন টিভি, রেডিও ও ফিল্মের তারকা, গায়ক আর সাংবাদিকদের কম‍্যুনিস্ট তকমা দিয়ে একঘরে করার ব‍্যবস্থা করেন। এ সব ঘটনাই ছিল টিভির পর্দায় প্রচারিত। আর জনমনে প্রচন্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

অ‍্যাটম বোমার ভয় এমনকি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের ভেতরেও ঢুকে পড়ত। এডুকেশনাল ভিডিওতে দেখানো হত কিভাবে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে হবে — যদিও এগুলি যতটা ছিল কার্যকরী তার থেকে বেশি ভীতিপ্রদর্শক। অনেক বাড়িতে তৈরি হয় বাংকার বা সেইফ রুম। এ আশায় যে, তাতে ঢুকে বসে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়া যাবে তেজস্ক্রিয়তা কেটে যাওয়া পর্যন্ত।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




টিভি ও মিডিয়ার মাধ‍্যমেই আবার জনমনে প্রচারিত এ ভয়টাও আবার পাল্টা কেটে যেতে শুরু করে। মানুষ নিয়তি মেনে নিয়ে “ডোন্ট ওয়ারি বি হ‍্যাপি” ধরনের মূলমন্ত্র নিয়ে দিনাতিপাত শুরু করে। এ ধরনের ফেটালিজম প্রচারেরও মূল মাধ‍্যম ছিল টিভি ও ফিল্ম। স্ট‍্যানলি কুব্রিকের চলচ্চিত্র “ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের” অল্টারনেট টাইটেল ইচ্ছা করে দেয়া হয়েছিল “How I learned to stop worrying and love the bomb.” ছবিটিতে কিভাবে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ‍্যে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারে, সেটা বেশ রসিকতার সাথে দেখানো হয়েছে।

১৯৬৪ — স্ট‍্যানলি কুবরিকের মুভি ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ— পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের মত একটি সিরিয়াস ব‍্যাপারকে কমেডির সাহায‍্যে খুব লাইট করে দর্শকদের মনোরঞ্জন করা হয়েছে। দেখার মত ছবি!

ষাটের দশক নাগাদ আমেরিকার জনসংখ্যার নব্বই শতাংশ বাড়িতে টিভি ছিল। কালার টিভিরও জয়যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। পুরো দেশে একাধিক টিভি চ‍্যানেল। তাদের প্রচারণার সরকারী নিয়ন্ত্রক তখনো নেই। যুদ্ধংদেহী কম‍্যুনিস্টবিরোধী মতামত মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারত।

আভ‍্যন্তরীণ রাজনীতিতেও টিভির গুরুত্ব প্রতীয়মান হয়ে ওঠে ১৯৬০ সালে প্রচারিত নিক্সন-কেনেডি ডিবেটের মধ‍্যে। সেই প্রথম কোন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিতর্ক সরাসরি নানা মাধ‍্যমে সম্প্রচারিত হয়। অধিকতর তরুণ কেনেডির টীম বুদ্ধি করে তাকে হাই কন্ট্রাস্টের স‍্যুট পড়ায়, হলিউডি মেকাপ আর্টিস্ট দিয়ে তার চেহারাটাকে রূপালী পর্দায় সুচারুরূপে ফুঁটিয়ে তোলে। নিক্সন অপরদিকে ম‍্যাড়মেড়ে রঙের ধূসর স‍্যুট পড়ে গেছিলেন। মেকাপ ভাল না থাকায় তার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি পর্যন্ত টিভির পর্দায় ক্লোজআপ শটে বোঝা যাচ্ছিল। কেনেডির মত সর্বদা তাঁর মুখে হাসিও ছিল না, তিনি ছিলেন অনেকটা সিরিয়াস টাইপের মানুষ।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৯৬০ সালের টিভি বিতর্কে কেনেডির সুচতুর টিভি কৌশল নিক্সনকে পর্যুদস্ত করে, অথচ রেডিও শ্রোতারা ভেবেছিলেন নিক্সন ভাল করছেন।

বিতর্কের পর টিভি দর্শকদের কাছে কেনেডি ভয়াবহ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অথচ যারা রেডিওতে বিতর্কটি শোনে, তাদের মতামত ছিল নিক্সন বেশি ভাল করেছেন। সেবারের নির্বাচনের ফলাফল টিভি স্টার কেনেডিরই অনুকূলে যায়। ভাগ‍্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, কেনেডির গুপ্তহত‍্যার সংবাদও টিভিতে লাইভ প্রচারিত হয়, প্রখ‍্যাত সাংবাদিক ওয়াল্টার কংক্রাইটের শোকাহত চেহারার স্মৃতি অনেক মার্কিন মনে রেখেছে।

১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে জনমানুষের বেশি নজরে পড়তে শুরু করে। যুদ্ধক্ষেত্রে টিভি সাংবাদিকরা স্বয়ং উপস্থিত হয়ে ফুটেজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসত। মার্কিন জওয়ানরা কি পরিমাণ বৈরিতার মুখোমুখি আর কতটা কঠিন ভিয়েতনামের শত্রুদের সংকল্প, তা সরাসরি টিভির পর্দায় দেখে মার্কিনীরা। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ওপর বীতশ্রদ্ধ হতে শুরু করে অনেকে।

১৯৬৩ সালে সোপ অপেরার নিয়মিত সম্প্রচার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, ওয়াল্টার কংক্রাইটের রিপোর্টে ব্রেকিং নিউজঃ কেনেডি গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত।

“ডোন্ট ওয়ারি বি হ‍্যাপি” মন্ত্র থেকে হিপি কালচারের উদ্ভব হল এবার। এরা যে কোন প্রকারে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাবার কনস্ক্রিপশন নোটিশ এড়িয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করে। বহু সাধারণ তরুণও পালিয়ে ফেরে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করে বিশ্ববিদ‍্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। কোথাও কোথাও দেশদরদী “পেট্রিয়টদের” সাথে এদের হাতাহাতি লেগে যেত। পুলিশও বিক্ষোভে অশান্তি শুরু হলে কড়া হস্তক্ষেপ করত। এসব কিছুই টিভির পর্দা এড়িয়ে যেতে পারেনি।

নিক্সন শেষমেশ টিভি মাধ‍্যমকে জয় করতে সক্ষম হন, তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত‍্যাহার। কিন্তু পাবলিকলি তা বললেও ভেতরে ভেতরে নিক্সন প্রশাসন কম‍্যুনিস্ট বিরোধী যুদ্ধে আরো পাঁকে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ভিয়েতকং দমানোর জন্য এবার শুরু হয় কম্বোডিয়ায় বোমাবর্ষণ। তার প্রশাসন অনেক কিছু ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করলেও টিভির ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ভেতরের খবর ঠিকই বের করে নিয়ে আসে। ওয়াটারগেট কেলেংকারি শুরুর আগে পেন্টাগন পেপারস নামে আরেকটি কেলেঙ্কারিতে নিক্সন প্রশাসন জড়িত ছিল। টিভির পর্দায় প্রচারিত ষাট মিনিটের একটি ডকুমেন্টারিতে সেসব গোমর ফাঁস করা হয়। সিবিএসে সে আমলে একটি টিভি শো শুরু হয়েছিল, যেটা এখনো চালু — তার নামও সিক্সটি মিনিটস।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




১৯৬৮ সালের সিক্সটি মিনিটস রিপোর্টে উঠে এসেছে সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোলারাইজড অবস্থা ও পুলিস ব্রুটালিটির চিত্র। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধিতার পীস সীজন।
১৯৬৮ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষে তর্ক বিতর্ক ছিল নিত‍্যদিনের ব‍্যাপার — এবিসি নিউজের রিপোর্ট
১৯৭০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সরেজমিন মার্কিন রিপোর্ট, যেখানে ক্যামেরাম্যান স্বয়ং গোলাগুলির মধ‍্যে পড়ে যায়, মাঝখান থেকে বের হয়ে আসে বহু তরুণ মার্কিনের অসহায় সৈনিকজীবনের চিত্র।
১৯৭১ সালে পেন্টাগন পেপারস ফাঁসের হোতা ড‍্যানিয়েল এলসবার্গ স্বেচ্ছায় আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন, তার কারণেই নিক্সন প্রশাসনের নানা কেলেঙ্কারির খবর বের হয়ে আসতে শুরু করে।
১৯৭৪ সালে প্রচারিত নিক্সনের কালো অধ‍্যায় শীর্ষক ডকুমেন্টারি।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মার্কিন টিভি যেমন দেশবাসীকে জটিল পরিস্থিতিতে একতায় শামিল করতে পেরেছিল, যেমন কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের ১৪ দিনের দৈনিক খবর প্রচার করে কিংবা কেনেডির অন্ত‍্যেষ্টিক্রিয়ার সরাসরি সম্প্রচারের মাধ‍্যমে, সেই টিভি এখন মার্কিন জনগণকে বিষিয়ে তুলল নিজেদের সরকারের ওপর।

এইখানেই সোভিয়েত টিভির সাথে মার্কিন টিভির একটা মোটা দাগের পার্থক‍্য দেখাতে চাই। যেখানে মার্কিন টিভি যা চায় তাই প্রচার করত, কিংবা একাধিক প্রাইভেট ফর প্রফিট চ‍্যানেল ছিল, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নে চ‍্যানেল ছিল মাত্র দুটো। এবং দুটোই ছিল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত। চব্বিশ ঘণ্টা প্রচারিত হত না। যা প্রচারিত হত, তা সম্পূর্ণরূপে সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী। দিনের একটা বিশাল সময় জুড়ে বিটিভির বাতাবি লেবু ফলনের মত খবর সম্প্রচারিত হত — কোথায় কোন যৌথখামার তাদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কোটার অধিক উৎপাদন করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছে ইত্যাদি খবর। লেনিনের আদর্শ নিয়ে বিদগ্ধ আলোচনা, কিংবা কম‍্যুনিস্ট পার্টি কনফারেন্সের বোরিং কচকচানি। বছরের দুয়েকটা দিন সম্প্রচারে থাকত জাতীয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজ আর তাতে নানারকম ভীতিকর অস্ত্রের প্রদর্শনী — যে প্রদর্শনী আমেরিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনো হয়নি।

১৯৭০ সালে অথর্ব পার্টি নেতাদের সামনে কুচকাওয়াজ চালাচ্ছে সোভিয়েত সেনাদল — মে মাসের জাতীয় দিবসে তাদের বড় বড় মিসাইলগুলি টেনে বের করে নিয়ে আসা হত প্রদর্শনীর জন‍্য।

বাইরের দুনিয়ার খুব কম খবরই সোভিয়েত টিভিতে আসত। মার্কিনীরা অ‍্যাটম বোমা নিয়ে পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই যতটা সচেতন ছিল, এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরোধী হয়, সেই সচেতনতা সোভিয়েতে তৈরি হয় কেবল আশির দশকের গর্বাচভ আমলে — যখন কিছুটা মু্ক্তির ছোঁয়া লাগে সেদেশে। এর আগে সোভিয়েত সরকারের তথা রাষ্ট্রীয় ইমেজ ক্ষুন্ন হয়, এমন সংবাদ প্রচারণা ছিল পুরো কল্পনার বাইরে। প্রথম যখন আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা হস্তক্ষেপ শুরু হয়, তখন সে খবরের মূল প্রতিপাদ‍্য ছিল দুই দেশের সমাজতন্ত্রী সরকারের বন্ধুত্ব আর কিভাবে রুশরা আফগানদের ডাকে সাড়া দিয়ে বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে — অবশ‍্যই গ্রাউন্ড রিয়েলিটি ছিল ভিন্ন।

চেরনোবিল দুর্ঘটনার খবরও কয়েক সেকেন্ডের বেশি টিভি টাইম পায়নি। যখন দেশের নেতা মৃত‍্যুবরণ করতেন, কিংবা গোপন ক‍্যুয়ের মাধ‍্যমে তাকে সরিয়ে দেয়া হত, তখন টিভিতে টানা সম্প্রচারিত হত চাইকভস্কির সয়ান লেকের ব‍্যালে নৃত‍্য। মানুষজন আন্দাজ করত কিছু একটা চলছে ক্রেমলিনে। কিন্তু টিভির হর্তাকর্তারা নতুন নেতৃত্ব আসা পর্যন্ত কি করা উচিত তা জানত না কিংবা নিজের থেকে ডিসিশন নিয়ে পরে ধরা খাবার চান্স নিতে রাজি ছিল না। তাই পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিকঠাক সেটল করার আগ পর্যন্ত সয়ান লেকের টিংটিং বাদ‍্যনৃত‍্য শুনতে বাধ‍্য ছিল রুশরা। এর সাথে তুলনা করুন মার্কিন টিভি চ‍্যানেলের কেওস — কেনেডির মৃত‍্যুর খবর সরাসরি সম্প্রচার কিংবা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বদনাম। কংগ্রেসের পাবলিক হিয়ারিংগুলি পর্যন্ত এখনো সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

১৯৭৫ সালে সোভিয়েত টিভিতে প্রচারিত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল‍্য নিয়ে তৈরি তথ‍্যচিত্র — শিরোনাম “নতুন দিন।”

আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ টিভির বদৌলতেই সোভিয়েত ও মার্কিনদের মধ্যে একটা ছোটখাট রাপ্রশমঁ শুরু হয়। রীগ‍্যান প্রথম প্রথম বেশ যুদ্ধংদেহী থাকলেও টিভিতে সেনসেশনাল একটি মুভি “দ‍্য ডে আফটার” দেখে তার মনে একটা পরিবর্তন আসে। সে চলচ্চিত্রে খুবই ভিজুয়ালি অ‍্যাপিলিং উপায়ে পারমাণবিক যুদ্ধে কি ধরনের ধ্বংস ও মৃত‍্যু হতে পারে সেটা দেখানো হয়েছে। ওদিকে গর্বাচভ আর আফগান কাগমারিতে আটকে যাওয়া রুশরাও শান্তির জন‍্য আঁকুপাকু করছে। এ সময়েই দুই দেশের মধ‍্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই ক বছর আগে রুশরা তার শর্ত মেনে না চলায় যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তিটি নাকচ করে দেয়।

যেটা দু দেশের সাধারণ মানুষ জানত না অবশ‍্য, সেটা হল দুই দেশেরই নিউক্লিয়ার ফোর্স দুয়েকবার মিসাইল নিক্ষেপের প্রায় দোরগোড়ায় ছিল। সর্বশেষ গর্বাচভের পূর্বসূরী আন্দ্রপভের সময়। মৃত‍্যশয‍্যায় থাকা এই নেতা হয়ত আরেকটু হলেই সে বোতামটা চেপে দিতেন।

১৯৮৩ সালে দ‍্য ডে আফটার নামে প্রচারিত এই টিভি ফিল্মের আর্লি রিলিজ দেখেন রিগ‍্যান — তারপর সোভিয়েতের সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা সীমিত করার ব‍্যাপারে তার মতে পরিবর্তন আসে।
১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের কিছুদিনের মধ‍্যেই পাকিস্তানে সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামী আফগান মুজাহিদীনদের সাথে দেখা করতে যান মার্কিন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জ্বিগনিউ ব্রেজিনিস্কি।
১৯৮০ সালে সোভিয়েত টিভি চ‍্যানেলে আফগানিস্তান নিয়ে সংবাদ, কিভাবে মিত্র হিসাবে রুশ সেনারা গেছে আফগানিস্তানের “বিপ্লবী সরকারকে সাহায‍্য করতে।” পশ্চিমারা অনেক খারাপ এবং নায়ীভ ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি।

আশির দশক থেকে আরেকটা বিশাল পরিবর্তন আসতে শুরু করে মার্কিন টিভিতে। ওভার দ‍্য এয়ার সম্প্রচারের পাশপাশি চলে প্রিমিয়াম কেবল আর স‍্যাটেলাইট সম্প্রচার। বিজ্ঞাপন রেভেন‍্যু থেকে মার্কিন চ‍্যানেলগুলি এই বিনিয়োগের খরচগুলি তুলতে পারত। পক্ষান্তরে সোভিয়েত টিভিতে কোন বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হত না, শেষ দিকে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু পণ‍্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হত। মেয়েরা কি ধরনের জামাকাপড় পড়বে তারও নির্দেশনা ওপরমহল থেকে ঠিক করে দেয়া হত।

কেবল ও স‍্যাটেলাইটের পাশাপাশি বিনোদনের জগতেও মার্কিনীরা তাদের সফট পাওয়ার প্রদর্শন করতে শুরু করে। আমাদের প্রজন্ম মাত্রই বড় হয়েছি জনপ্রিয় মার্কিন সিরিজ দেখে — এ টীম, ফল গাই, নাইট রাইডার, থান্ডারক‍্যাটস, ম‍্যাকগাইভার প্রভৃতি সবই ছিল মার্কিন শো। জেমস বন্ড আর স্পাই থ্রিলারগুলো স্নায়ুযুদ্ধেরই লেগেসি। পাশাপাশি অনেক সোশাল জাস্টিসের ব‍্যাপারও মার্কিন শোগুলিতে ছিল — ধরুন রুটসের কথা, এক কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের জীবনকাহিনী। সিভিল রাইটস মুভমেন্টের দশ বছরের মধ‍্যেই এই মিনি সিরিজটি ব‍্যাপক জনপ্রিয়তা পায় — বিটিভিতেও দেখানো হয়েছিল।

১৯৭৭ সালে মার্কিন মিনিসিরিজ “রুটস” সারা দেশে (ও বিশ্বে) সারা ফেলে দেয়, মার্কিন ইতিহাসে ক্রীতদাসদের অবর্ণনীয় অবস্থার এমন নাটকীয় উপস্থাপনা এর আগে টিভি বা ফিল্ম কোন পর্দাতেই হয়নি।
১৯৮১ সালে এমটিভির প্রথম সম্প্রচার — ভিডিও কিলড দ‍্য রেডিও স্টার!
১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া টিভি সিরিজ দ‍্য এ টীম — বাংলাদেশেও আমাদের মধ‍্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

মার্কিন সফট পাওয়ারের যদি সবচেয়ে ভাল কোন উদাহরণ থেকে থাকে, হলিউডের পরপরই সেটা হবে এমটিভি। হালের এমটিভি অত‍্যন্ত বিচ্ছিরি। আমরা যখন দেখতাম তখন সিম্পল ফর্ম‍্যাটে মিউজিক ভিডিওই চলত খালি। মাইকেল জ‍্যাকসনের জনপ্রিয়তা তখন তু্ঙ্গে। তার প্রভাবে ইউরোপেও চালু হয়েছে নানা মিউজিক কম্পিটিশন — এখনকার ইউরোভিশন। এমটিভির আগে কেবল ভ‍্যারাইটি শো বা লেট নাইট শোতে মিলত লাইভ পারফর্মেন্স। এমটিভি শিল্পীদের আরেকটা বিশাল স্বাধীনতা এনে দিল।

পশ্চিম জার্মানির আর্টিস্টদের গান-ভিডিও চোরাচালানী করে নিয়ে যেত পূর্ব বার্লিনের অধিবাসীরা। এভাবে আয়রন কার্টেনের অপর পারে প্রদর্শিত হয় পশ্চিমা সফট পাওয়ারের শক্তিমত্তা। নিজ দেশে যে টিভি মাধ্যম সরকারকে করেছে বিরাগভাজন, সেটা উল্টো বিদেশে তাদের করে তোলে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখনো উত্তর কোরিয়ায় যদি কারো মালিকানায় দক্ষিণের টিভির শো বা কেপপের কন্টেন্ট ভরা ইউএসবি ড্রাইভ পাওয়া যায়, তাহলে অন্তত পক্ষে ফোর্সড লেবার ক‍্যাম্পে কয়েক মাস গ‍্যারান্টিড। রোমানিয়ার যে টিভিতে ডিক্টেটর চসেস্কু আর তার বৌয়ের চেহারা ছিল চিরায়ত, তাদের সম্মানে সারা দেশের ছেলেমেয়েরা স্টেডিয়মে জড়ো হয়ে টিভি স্ক্রীনে সরাসরি প্রচারিত প্রপাগান্ডা র‍্যালিতে অংশ নিত, সে একই টিভিতে অত‍্যধিক জনপ্রিয় ছিল মার্কিন সিরিজ ডালাস।

১৯৭৮ সালে রোমানিয়ার কম‍্যুনিস্ট স্বৈরশাসক চসেস্কুর সম্মানে স্টেডিয়ামে জড়ো হয়ে র‍্যালী, শারীরিক কসরত আর নৃত‍্যগীতি পরিবেশন করছে ছাত্রছাত্রীরা, সম্মুখে নেতার বিশাল ছবি।
১৯৮৬ সালে সোভিয়েত টিভিতে চেরনোবিল দুর্ঘটনার খবর ছিল এই কয়েক সেকেন্ডের মাত্র, তাও হয়ত প্রচারিত হত না, যদি না পশ্চিমা কয়েকটি দেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ায় গুমোর ফাঁস হয়ে যেত।
চাইকভস্কির সওয়ান লেক মিউজিকের সাথে এই ব‍্যালে পারফরমেন্স সোভিয়েত টিভিতে প্রচারিত হত — দরকার হলে ঘন্টার পর ঘন্টা — যতক্ষণ না নতুন নেতৃত্ব কে পাবে, সেটার বোঝাপড়া শেষ হচ্ছে।

অবশ‍্য দুয়েকটা ব‍্যাপার না বললেই নয়! সোভিয়েত টিভি রাষ্ট্রায়ত্ত হলেও তাদের কমের মধ‍্যে ক্রিয়েটিভ হতে হত। তারা এটীমের মত বিশাল বিশাল বিস্ফোরণের ভিজুয়াল এফেক্ট তৈরি করার সামর্থ্য না রাখলেও চমকপ্রদ সিম্পল সব আইডিয়া বের করত, আর তা দিয়ে স্টোরি লাইন দাঁড়া করাত। আর সেগুলি যখন মার্কিনদের নজরে আসত, তখন বেমালুম সেটা চুরি করত মার্কিন পরিচালকরা। যেমন, স্মল ওয়ান্ডার নামে একটা শো আমরা ছোট বেলায় দেখেছি। সেখানে মানুষরূপী একটি মেয়ে এন্ড্রয়েড রোবট ও তার পরিবারের মজার মজার সব কাহিনী। এটি আসলে একটি সোভিয়েত শোএর কপি! সোভিয়েতদের দুর্বল পয়েন্ট ছিল তারা প্রপাগান্ডারই কেবল গ্লোবাল মার্কেটিংয়ে এক্সপার্ট ছিল, সিম্পল বিনোদনের নয়। সেক্ষেত্রে আমেরিকানস আর দ‍্য কিং!

স্নায়ুযুদ্ধের মূল মাধ‍্যম টিভি প্রপাগান্ডাকে ভিন্ন রূপ দিলেও তার পজিটিভ দিক হল, শেষ পর্যন্ত পিওর বিনুদনের জয়! খবর দেখে মানুষের ব্লাড প্রেসার উঠে গেলেও এমটিভি ছেড়ে একটু নাচানাচি করলেই আবার সব ঠিক! বোধ করি এটা একটা বড় কারণ যে টিভির যুগে বড়সড় যুদ্ধ হয় নি! ওহ না, ভুল বললাম! যুদ্ধটা হয়েছে, জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে! সে সবই টিভির পর্দায়! ৬২ সালে ভোস্তক ৩/৪এর সম্প্রচার দিয়ে সোভিয়েতরা সেই যুদ্ধটা শুরু করে, ১৯৪৯এর পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার করে নয়। ১৯৬৯ সালে অ‍্যাপোলোর ম‍্যারাথন সম্প্রচার সেটাকে পাশ কাটিয়ে সামনে চলে আসে। আশি নব্বইয়ের দশক টিভির পর্দা ছিল বলতে গেলে মার্কিনদেরই একচেটিয়া দখলে। অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় লেট নাইনটিজে। সেই নতুন ইন্টারনেট যুগও মার্কিন প্রযুক্তি। টিভি যতটা শক্তি ধরে বা ধরত, বোধ করি ইন্টারনেট প্রপাগান্ডার রীচ আর ভ‍্যারায়টি দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন কোন যুদ্ধের জন্ম কি এই মাধ‍্যম থেকেই আসবে? সে নিয়ে বলছি আগামী লেখায়।



This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0

ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫





আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!