হার্বার্ট হুভার ও ক্ষুধার্ত রাশিয়া


১৯২১ সালের জুলাই মাস। রুশ সাহিত্যিক মাক্সিম গোর্কির একটি ছোট্ট লেখা প্রকাশিত হল নিউ ইয়র্ক টাইমসে—

“অন্নদাত্রী স্তেপভূমি খরাগ্রস্ত। কোটি মানুষের রুশ জনপদ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। উপর্যুপরি যুদ্ধ ও বিপ্লবে জনগণ ক্লান্ত, রোগজরার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নেই। … দুনিয়ার সকল সৎ ও সংস্কৃতিবান ইউরোপীয় ও মার্কিন মানুষের নিকট আমার প্রার্থনাঃ তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, মেন্দেলেভ, পাভলভ, মুসর্গস্কি, হ্লিংকার দেশের মানুষকে দ্রুত রুটি আর ওষুধ দিয়ে সাহায্য করুন।…”

ম্যাক্সিম গোর্কি ও ১৯২১এ নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তার আর্জি

এই আকুল আবেদনটি আরো অনেকের মত নজর কাড়ে মার্কিন কমার্স সেক্রেটারি হার্বার্ট হুভারের। তিনি পরবর্তীতে হন যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম প্রেসিডেন্ট। গোর্কির এই আবেদনে সাড়া দেবার মত বিশ্বে আর কেউ সেসময় থেকে থাকলে ছিল আমেরিকা — আর হার্বার্ট হুভার।

গোটা ইউরোপ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। গোর্কির আবেদনে সাড়া দেবার মত অবস্থায় নেই। ওদিকে হার্বার্ট হুভারের নেতৃত্বেই ইউরোপে বিপুল পরিমাণে খাদ্যবন্টন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তিনি বিভিন্ন মার্কিন ত্রাণকর্মের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ চলাকালে বেলজিয়ামে, যুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া-পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে রক্ষা করে তার বদান্যতা।

হার্বার্ট হুভার, পশ্চিম ইউরোপে প্রেরিত ত্রাণসাহায্যের সামনে, ১৯১৯

অবশ্য এসবের পেছনে গূঢ় একটা লক্ষ্য তো ছিলই। যুদ্ধে পরাজিত দেশগুলি এত দুর্বল যে নাগরিকদের দেখভালের যথেষ্ট সামর্থ তাদের নেই। উল্টো ভের্সাই চুক্তিতে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বিশাল ক্ষতিপূরণের বোঝা। এ ব্যাপারে উইলসনের সাথে দ্বিমত ছিল হুভারের। তিনি নিলেন অন্য পথ। এসব দেশের ন্যুব্জ অর্থনীতি থেকে যদি খাদ্যাভাব সাধারণ মানুষকে পীড়িত করে, তাহলে আর দেখতে হবে না! রুশ দেশের মত পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের প্রতিটি দেশ একে একে বলশেভিক ধাঁচের বিপ্লবের সম্মুখীন হবে। যেমনটা প্রায় হয়ে গেছিল হাঙেরিতে।

আমেরিকায় তখন চলছে “রেড স্কেয়ার।” মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগে সেখানেও আছে কম্যুনিস্ট ও লেবার পার্টি। রাশিয়ায় বলশেভিকদের বিজয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে কারখানা শ্রমিকরা এদের সাথে যোগসাজশে ধর্মঘট, রায়ট, ভাঙচুর শুরু করে। মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের সমর্থন এতে খুব বেশি ছিল না। তাদের আশা ছিল সরকার এ অরাজকতা বন্ধ করবে। তাই হয়।

বিশের দশকের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সন্ত্রস্ত ছিল কারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট ও অরাজকতা দেখে, রাশিয়ার বিপ্লবপরবর্তী পরিণতির কথা চিন্তা করে এ ধরনের কার্টুনচিত্রও অংকিত হয়
হাঙেরিতে খাদ্যত্রাণ পাঠানোর জন্যে আমেরিকায় প্রচারিত হার্বার্ট হুভারের সংস্থার পোস্টার, ১৯১৯

সে কারণে গোর্কির এই আবেদন দেখার পর হুভার একটু সাবধানতার সাথে জবাব দেন। রুশদেশে বলশেভিকদের বন্দী মার্কিনদের মুক্তি দেয়া হলে ত্রাণকার্য পরিচালনা করবে তার সংস্থা। তিনি ছিলেন প্রাইভেট নন প্রফিট এ আর এ — আমেরিকান রিলীফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান।

তাছাড়া গোর্কির থেকে আনঅফিশাল এ চিঠিটি আসলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পালের গোদা লেনিনের থেকে তো কোন আনুষ্ঠানিক অনুরোধ আসেনি। তবে নেগোসিয়েশনের পাল্টা প্রস্তাব আসল গোর্কির মধ্যস্থতাতেই — লেভ কামেনেভের কাছ থেকে। আগস্টে বন্দীমুক্তির পর শুরু হল সে আলাপ।<

হুভার প্রথম প্রথম দোনমনায় ছিলেন। তার চিন্তা ছিল কম্যুনিজমের মত আদর্শের দ্রুত পতন জরুরী। এসময় তাকে টিকিয়ে দেয়া ঠিক নয়। আবার উইলসনের সরকার যেমন বলশেভিকদের বিরুদ্ধে ১৩,০০০ মার্কিন সৈন্য পাঠিয়ে রাশিয়ায় গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার পশ্চিমা অভিযানে অংশ নিয়েছিল, সেটার পক্ষেও সম্পূর্ণরূপে ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি ঠিক করেন, সোভিয়েতদের বিনাশ করতে হবে, তবে অস্ত্র দিয়ে নয়, ত্রাণ ও দয়াদাক্ষিণ্য দিয়ে।

রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদে দুর্ভিক্ষপীড়িত অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশু, ১৯২১
রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদে এআরএ পরিচালিত চিলড্রেনজ হাউজে রুশ শিশুর দল, ১৯২১

প্রথম দিকে ত্রাণকার্যের লক্ষ্য ছিল কেবল সোভিয়েত শহরগুলির অনাথাশ্রম। যুদ্ধ ও বিপ্লবের ডামাডোলে যে সকল শিশু এতিম হয়েছে, নয়ত পরিত্যাজ্য হয়েছে, তাদের জন্য শুরু হল ফান্ড কালেকশন। শুরুতে বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়। পত্রিকা, সিনেমা হলে রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে সংগৃহীত হল বিশাল অংকের অনুদান। সামান্য কয়েক সেন্ট থেকে শুরু করে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত দান করেন বহু মার্কিন।

সে দানে কেনা খাদ্য, বস্ত্র ও ওষুধ নিয়ে পেত্রোগ্রাদ — পরবর্তী লেনিনগ্রাদ — শহরে হাজির হল হুভারের প্রতিনিধিরা। সেখানে শিশুদের কংকালসার অবস্থা দেখে তাদের চক্ষু চড়কগাছ! শুধু যে দু্র্ভিক্ষপীড়িত এরা তা নয়, অনেক ভুগছে মরণব্যাধি টাইফাসে। এসকল শিশুদের দিয়েই ক্লান্ত গলার স্বাগতম গীতি গাওয়ালো আশ্রমের সরকারী কর্মচারীরা। ভেজা চোখে অন্যদিকে চাইলেন এআরএ কর্মকর্তা বিল শ্যাফ্রথ ও তার সহকর্মীরা।

শিশুটির দাঁড়ানোর শক্তি নেই, হামাগুঁড়ি দিতে দিতে মাটি থেকে পোকামাকড়, ময়লা কুঁড়িয়ে কুঁড়িয়ে খাচ্ছে, রুশ মহাদুর্ভিক্ষ, ১৯২১
টাইফয়েডে আক্রান্ত রুশ শিশু, রুশ মহাদু্র্ভিক্ষ, ১৯২১

শহরের এ করুণ অবস্থা দেখে গ্রামাঞ্চলের ব্যাপারে কৌতূহল হল শ্যাফ্রথের। যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভল্গা নদীর উপত্যকায় সামারা, কাজান, উরাল, উফা প্রভৃতি বিস্তীর্ণ দুর্গম অঞ্চলে স্কাউটিংয়ের জন্য পাড়ি জমালো তার দলের লোকজন। যেমনটা সন্দেহ ছিল তার থেকে খারাপ অবস্থা গ্রাম্য মানুষের। তাদের নিজেদের ফলানো যা শস্য ছিল তা রিকুইজিশন করে নিয়ে গেছে লালবাহিনী, নিয়ে গেছে পরের মৌসুমে ব্যবহারের জন্য বেছে রাখা গমের দানা।

এ অঞ্চলের অধিবাসী শুধু রুশ নয়, কাজাখ-বাশকির প্রভৃতি মুসলিমপ্রধান জনপদও। সকলে কমবেশি দুর্ভিক্ষগ্রস্ত। গাছের ছাল, গুঁড়োকরা হাঁড়, খড় প্রভৃতি কাঁদার সাথে মিশিয়ে স্যুপ বানিয়ে খাচ্ছে এরা। নোংরা বাসস্থানের উঁকুন আর অপুষ্টি থেকে টাইফাস রোগের প্রাদুর্ভাব। যত দিন যাচ্ছে, তত রিপোর্ট আসছে ক্যানিবালিজমের — কোন ক্ষেত্রে কবর খুঁড়ে টাইফয়েডে মারা যাওয়া মৃতদেহের অবশেষ খাচ্ছে দুর্ভিক্ষপীড়িতরা। যাদের বাড়িতে বাচ্চা আছে তারা সন্ধ্যার পর তালা মেরে দরজা লক করে রক্ষা করছে বাচ্চাদের। কারণ ক্যানিবালিজমের প্রথম শিকার এরা। দুয়েকটা এমন কেসও বেরিয়েছে যেখানে মা তার অন্য শিশুর খাদ্যসংস্থানের জন্য হত্যা করেছে বড় সন্তানকে। এসকল হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল আসলেই। প্রপাগান্ডা নয়। রুশ রিপোর্ট আবিষ্কৃত হয়েছে পরে।

কংকালসার রুশ শিশু, রুশ মহাদুর্ভিক্ষ, ১৯২১
দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারানো শিশুদের কংকালসার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঠেলাগাড়ি করে, রুশ মহাদুর্ভিক্ষ, ১৯২১
দুর্ভিক্ষপীড়িত ভল্গার মুসলিম জনপদ, রুশ মহাদুর্ভিক্ষ, ১৯২১

এ রিপোর্ট যখন হুভারের কাছে গেল তখন তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে শুধু শহরের শিশুদের সাহায্য করে খাদ্যের চাহিদা মিটবে না। খাওয়াতে হবে কয়েক কোটি জনগণকে, রোপন করতে হবে পরবর্তী মৌসুমের বীজ। কংগ্রেসে দ্রুত রাশান ফ্যামিন রিলীফ অ্যাক্ট পাশ হল ডিসেম্বর ১৯২১এ। প্রথম ধাঁপে অনুমোদন হল ২০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য। পরের বছরে সেটি বেড়ে হল ৬০ মিলিয়ন ডলার। এখনকার হিসাবে সব মিলিয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

প্রায় ৩০০ জন মার্কিন কর্মকর্তা আর ১,২০,০০০ ইংরেজীতে পারদর্শী স্থানীয় রুশ সহকারীদের নিয়ে মধ্য রাশিয়ার বিশাল এলাকাকে কয়েকটি ডিস্ট্রিক্টে ভাগ করে কাজ শুরু করল এআরএ। বাল্টিক সাগরে মার্কিন জাহাজে করে এল টনকে টন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত গম ও ভুট্টা। কৃষ্ণসাগরের বন্দরেও নোঙর করল খাদ্যবাহী জাহাজ। ট্রেনে করে ভল্গার উজানে যেতে শুরু করল ত্রাণ। প্রতিদিন প্রায় ১.১ কোটি মানুষের খাদ্যসংস্থান হল আট-নয় মাসব্যাপী। লঙ্গরখানা খোলা হল ১৯ হাজার।

নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ১৯২১ সালের রিপোর্টে বলা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্ররা এক বেলা না খেয়ে থেকে সে টাকা দান করেছে হুভারের রুশ ত্রাণ তহবিলে
হুভারের এআরএ পোস্টার প্রচারণায় বলা হচ্ছে ১০ ডলারের একটি অনুদান পেলে তারা কি ধরনের খাবার রাশিয়ায় পাঠাবে, ১৯২১
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ভোটে তদকালীন মুদ্রামানের ২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ হয় রুশ মানুষের ত্রাণে, ১৯২১
তদকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান বেলারুশের মিনস্কে অবস্থিত এআরএ অফিসের সামনে তার মার্কিন কর্মকর্তারা, ১৯২১
কৃষ্ণসাগরের নভোরসিস্ক বন্দরে এআরএ’র খাদ্যত্রাণ খালাস হচ্ছে, ১৯২১-২২
এআরএ’র ত্রাণবাহী ট্রাকের সামনে তার কর্মচারীরা, ১৯২১-২২
ভল্গার পূর্ব তীরের দুর্গম স্তেপে রেল ছিল না, ছিল না গাড়ি চলার রাস্তা। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছাতে এআরএ’কে ব্যবহার করতে হয় ঊটের কাফেলা। ১৯২১-২২।
এআরএ’র উফা-উরাল ডিস্ট্রিক্টের পরিসংখ্যান বোর্ডে দেখানো হয়েছে হিসাব, নিয়মিত ত্রাণ যাচ্ছে দেড় মিলিয়নের বেশি মানুষের কাছে। ১৯২১-২২।
এআরএ’র উফা-উরাল ডিস্ট্রিক্টের পরিসংখ্যান বোর্ডে দেখানো হয়েছে হিসাব, নিয়মিত ত্রাণ যাচ্ছে দেড় মিলিয়নের বেশি মানুষের কাছে। ১৯২১-২২।

হুভারের এই ত্রাণকার্য যে কোন প্রকার বাঁধা ব্যতিরেকে হয়েছে তা কিন্তু নয়। স্মরণ করুন যে গোর্কি স্বয়ং হাটে হাঁড়ি না ভেঙে দিলে এ খবর পশ্চিমে বেরুতও না। দুর্ভিক্ষের আভাষ পাওয়া সত্ত্বেও অহেতুক বিলম্ব করে সোভিয়েত কেন্দ্রীয় প্রশাসন। ততদিনে মানুষ মারা যেতে শুরু করেছে। তারপর ট্রেনে করে কৃষ্ণসাগর থেকে এআরএ’র খাদ্য আনতে গিয়ে দেখা গেল অনেকগুলি কার লাপাত্তা। রাস্তাতেই গায়েব করে দিয়েছে রেলশ্রমিকেরা। সে ব্যাপারে অভিযোগ তুলতে রেল ইউনিয়ন পুরো রেলব্যবস্থায় এমন একটা জ্যাম তৈরি করে রাখল যে কয়েক সপ্তাহ ত্রাণ যেতে পারল না ভল্গায়। ট্রেনে উল্টো রাস্তায় ইউক্রেনে আসতে শুরু করল ক্ষুধার্ত মানুষ। ভল্গায় খাবার না পেয়ে মারা গেল কয়েক লাখ।

এ অবস্থায় শ্যাফ্রথ হুভারকে একটি আনএনক্রিপটেড চিঠি পাঠান। এর বক্তব্য সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ ঠিকমত সাহায্য করছে না, যতদিন সে সাহায্য না আসে ত্রাণ পাঠানোতে যেন বিরতি দেয়া হয়। এটি পাঠানোর পরপরই লেনিন তদকালীন রেল কমিসারকে পদচ্যুত করে তার জায়গায় আসীন করেন ফেলিক্স জেরঝিনস্কিকে। রেল ব্যবস্থা আয়রন ফেলিক্সের ভয়ে আবার ঠিকমত চালু হয়। পুরো দুর্ভিক্ষে এভাবে প্রায় ৬ থেকে ১০ মিলিয়ন প্রাণ হারায়, যদিও এআরএ তার থেকে বেশি প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়।

শুধু যে এ ধরনের লজিস্টিকাল সমস্যার সম্মুখীন হয় এআরএ, তা নয়। গোর্কির সুপারিশে তাদের রাশিয়ায় ঢুকতে দিলেও লেনিন এদের ব্যাপারে ভীষণ সন্দেহগ্রস্ত ছিলেন। ত্রাণ বিলানোর অন্তরালে এরা গুপ্তচরবৃত্তি করছে কিনা, সাধারণ মানুষকে “প্রতিবিপ্লবী” বানানোর ষড়যন্ত্র করছে কিনা — এসব চোখে চোখে রাখার জন্য গুপ্ত পুলিশ চেকা থেকে লোক এসে তদারকি শুরু করে।

এআরএ অফিসে কার্যরত রুশ শিক্ষিত অভিজাত নারী। বিপ্লবে এরা সর্বস্ব খোয়ায়, কিন্তু ৎসারের আমলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কাজে লেগে যায় মার্কিনদের সাহায্য করতে। বলশেভিকদের সন্দেহ পড়েছিল এ সকল “প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিবিপ্লবীদের” ওপর। ১৯২১-২২।
খাদ্য বিতরণরত এআরএ কর্মকর্তা, ত্রাণ নিচ্ছে দাঁড়ি-টুপিওয়ালা এক কসাক গোছের রুশ। ১৯২১-২২।
এআরএ পরিচালিত চিলড্রেনজ হাউজ ও কিচেনে রুশ শিশুর দল, ১৯২১-২২।

অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রুশদের সাথেই চেকার টক্কর লেগে যায়। যেহেতু এআরএ’এর দরকার ছিল ইংরেজীভাষী ফীল্ড এজেন্ট এবং একমাত্র ৎসারের আমলের শিক্ষিত অভিজাত মানুষদের মধ্যেই এদের সংখ্যা বেশি, সেহেতু চেকার সাথে একটা সংঘাত লেগে থাকত এআরএ’র। এ ধরনের রাজনীতির ফাঁকে গোপনে এআরএ’র একটি জেলার ত্রাণকার্যের নিয়ন্ত্রণ চেকা নিয়ে নেয়। এবং এআরএ’র পুরো ত্রাণপ্রচেষ্টাকে বলশেভিক সরকারের বদান্যতা হিসাবে প্রচার করে। এই অপপ্রচার হটাতে এআরএ’কে তৈরি করতে হয় প্রচারণা পোস্টার। যাতে সাধারণ মানুষ বোঝে এই ত্রাণ বলশেভিকদের কিংবা তথাকথিত “মার্কিন প্রলেতারিয়াতের” কাছ থেকে আসেনি।<

লেনিন শেষ পর্যন্ত এতটা ক্ষিপ্ত হন যে মলোতভকে চিঠি লিখে বলেন যে কোন মূল্যে হুভারকে শাস্তি দিতে হবে। গুপ্তচর বলে কোন কিছু এআরএ’র মধ্যে তো ছিলই না, বরং স্থানীয় রুশদের সাথে তাদের এত সখ্যতা ছিল যে খুব সহজে গুপ্তচরবৃত্তির বানোয়াট দোষ চাপিয়ে তাদের উৎপাটন সম্ভব নয়। তখন নতুন দোষারোপ করা হল এআরএ’র ওপর। তারা নাকি অর্থডক্স চার্চের সোনায় বাঁধানো আইকন ও অন্যান্য মূল্যবান বস্তু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে, বিনিময়ে আনছে খাদ্য। চার্চগুলোর ওপর এই আক্রমণও আসলে বলশেভিকদের কাজ। কিন্তু ধার্মিক সাধারণ মানুষকে এআরএ বিমুখ করাটাই উদ্দেশ্য।

এআরএ’র প্রচারণা পোস্টার। রুশে লেখা দুর্ভিক্ষপীড়িত রাশিয়ার নিকট আমেরিকা। বলশেভিকদের অপপ্রচারণা খন্ডন করতে এগুলি ছাপাতে হয়। ১৯২১-২২।
এআরএ’র প্রচারণা পোস্টার। রুশে লেখা আমেরিকার জনগণের উপহার। বলশেভিকদের অপপ্রচারণা খন্ডন করতে এগুলি ছাপাতে হয়। ১৯২১-২২।
রুশ শিশুদের টাইফয়েডের টীকা দিচ্ছে এআরএ’র ডাক্তার, ১৯২১-২২।

লেনিনের আশা ছিল যে এআরএ’এর সাথে এই “সহযোগিতার” বিনিময়ে মার্কিনদের থেকে তার সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হবে। ১৯২২এ এসে যখন পরিষ্কার হল সেটা হবে না, তখন এআরএ বিরোধিতা আরো তুঙ্গে উঠল। ততদিনে এআরএ ৩.৪ কোটি টন খাদ্যত্রাণ সরবরাহ করেছে। টাইফাস, প্যারাটাইফয়েডের বিরুদ্ধে টীকা দিয়েছে কয়েক মিলিয়ন শিশুকে। পরবর্তী মৌসুমের গমের বীজ বপন শেষ।

এর ওপর বেরুল যে সোভিয়েত সরকার ইউক্রেন থেকে গোপনে শস্য বিদেশে রপ্তানি শুরু করেছে। অর্থাৎ একদিকে করছে রপ্তানি, আরেকদিকে চলছে দুর্ভিক্ষ। এ পর্যায়ে এসে এআরএ মিশনের আর কোন অর্থ হয় না। ফেব্রুয়ারি ১৯২৩ সালে তারা অফিস গুঁটিয়ে ফিরে যায় মার্কিন দেশে। রেখে যায় দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচানো এক পুরো জেনারেশন, তাদের সাহায্য করতে এসে টাইফয়েডে মৃত্যুবরণ করা স্বেচ্ছাসেবকদের কবর, আর কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় রুশ ভার্যা। সোভিয়েত সরকার তাদের পুরো কার্যক্রমকে ডিসক্রেডিট করে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তি অপারেশন হিসাবে।

তবে এআরএ’এর স্মৃতি রয়ে গেছিল রুশদের মাঝে। কর্নেল বেল নামে এক এআরএ কর্মকর্তা উরালের নিকটবর্তী রুশ, বাশকির ও কাজাখদের এতটাই স্নেহভাজন হন যে স্থানীয় মুসলিম ইমামরা তাকে অনুমতি দেন তাদের মসজিদে থাকা বহু শতকের পুরনো একটি কুরআনে চোখ বুলানোর। বহির্বিশ্বের আর কেউ, এমনকি কোন রুশও এ সম্মানের অংশীদার কখনো হয়নি। বহুদিন ভল্গা উপত্যকার মানুষ খাদ্যত্রাণের নাম মনে রেখেছে “আমেরিকা” নামে। কারণ ঐ লেবেলেই ত্রাণ আসত। খাদ্য মানে আমেরিকা, আমেরিকা মানে খাদ্য।

দুর্ভিক্ষপীড়িত বাশকির পরিবার, উফা অঞ্চল, ১৯২১-২২।
বাশকির-তাতার মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সাথে করমর্দন করছেন এআরএ’র কর্নেল বেল, ১৯২১-২২।

এভাবে মধ্যযুগের ব্ল্যাক প্লেগের পর ইউরোপের সবচেয়ে মরণঘাতী দুর্যোগ থেকে উত্তরণ ঘটে রাশিয়ার। হুভার ভেবেছিলেন, উই উইল কিল দ্য বলশিজ উইথ কাইন্ডনেস। তা কিন্তু হ্য়নি! পরবর্তীতে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন যে, সোভিয়েতদের বরং দাঁড়া করে দিয়ে গেছে তার মানবিক ত্রাণকর্ম।

আরেকটা ব্যাপার মনে করুন। আজকের যুগে অনেকে ভাবেন যুক্তরাষ্ট্রের টাকার কি অভাব! যতখুশি সাহায্য করতে পারে! ডলার ফরেন রিজার্ভ কারেন্সি হবার কারণে যত খুশি তারা তো “টাকা ছাপাতেই” পারে! সত্য এত সোজাসাপ্টা নয়। বর্তমানে তো নয়ই, অতীতেও ছিল না। সে যুগে ইউএস ডলার ফরেন রিজার্ভ ছিল না, আর আমেরিকার জনগণ প্রবেশ করতে যাচ্ছে গ্রেট ডিপ্রেশনের অনিশ্চয়তার যুগে। তার মধ্যেও আজকের মানের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সাহায্য এবং স্বদেশী এক্সপার্টদের মার্কিনরা পাঠায় সোভিয়েত ইউনিয়নে। এভাবে সে যাত্রা মার্কিন বদান্যতায় বেঁচে যায় লেনিনের ইউটোপিয়ার স্বপ্ন আর পাকাপোক্ত হয় স্তালিনের স্বৈরাচারের ভবিষ্যৎ।

ব্যালান্স অফ গ্রেট পাওয়ারস

১৯১৪ সালে সার্বিয়া নামের ছোট্ট, কিন্তু দাম্ভিক, স্লাভিক জাতীয়তাবাদী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির যৌথ সাম্রাজ্য আক্রমণ করে বসে। আর তার ফলে শুরুতে ইউরোপ, পরে বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় কলোনিগুলি, আর শেষে নব্যপরাশক্তি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র, জড়িয়ে পড়ে সাড়ে তিন বছর দীর্ঘ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮)।

ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপে এথনিক-লিংগুইস্টিক জাতীয়তাবাদ ছিল বেশ জনপ্রিয়। এর ফলশ্রুতিতে ছোট-মাঝারি কয়েকটি রাজ্য নিয়ে উত্তরে ও দক্ষিণে দু’টি নতুন সাম্রাজ্যের সূচনা হয় — বিসমার্কের জার্মানি (১৮৭১) ও গারিবাল্দির ইতালি (১৮৬১)।

ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি বামপন্থী অ্যানার্কিজ়ম, বিপ্লবী কম্যুনিজ়মও যে জনপ্রিয় হচ্ছিল বলা বাহুল্য। পুরনো সাম্রাজ্যগুলির দুর্বলতার সুযোগে তাদেরও সফল ও বিফল উত্থান ঘটে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে (বলশেভিক বিপ্লব, ১৯১৭; সোভিয়েত হাঙ্গেরি, ১৯১৯; জার্মানির স্পার্টাসিস্ট বিদ্রোহ, ১৯১৯)। আর জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মুলত অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও রাশিয়া ভেঙ্গে নতুন কয়েকটি দেশ ইউরোপের মানচিত্রে স্থান পায় (চেকোস্লোভাকিয়া, ইউগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া)।

ঊনবিংশ শতকে ইউরোপের রাজপরিবারগুলি নাপোলেওনের সময়কার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ (১৮০৩-১৮১৫) এড়ানোর জন্যে একে অন্যের সাথে সামরিক সমঝোতা চুক্তি করা শুরু করে। নানা চুক্তির জালের বুনটে সংরক্ষিত হয় ছোট রাজ্যগুলির নিরাপত্তা, স্ফেয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্স, ইত্যাদি। তার ওপর রাজপরিবারগুলি একে অন্যের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে আরেক লেভেলের ‘নিরাপত্তা’ তৈরি করে। যেমন, রুশ ৎসার নিকোলাস ছিলেন ব্রিটিশরাজ পঞ্চম জর্জের আপন খালাত ভাই, তাঁদের ছবি দেখলে তাঁদের আলাদা করে চেনার উপায় নেই। এধরনের ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচিত ছিল ‘ব্যালান্স অফ গ্রেট পাওয়ারস’ বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থামানো তো দূরের কথা, এ ব্যবস্থা একদিক থেকে দায়ী ছিল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির জন্যে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণ অনেক গভীর, একটি কারণ জার্মানির উচ্চাকাংক্ষা। উডরো উইলসনের ভাষায় “ব্রিটেন হ্যাজ় দ্য আর্থ, এন্ড জার্মানি ওয়ান্টস ইট।” এটুকু কথার পিছনে অনেক লম্বা ইতিহাস রয়েছে। শিল্পায়ন যুগের শেষভাগে কাঁচামাল আর বাজারের জন্যে প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক ও সামরিক সাম্রাজ্য গড়ার প্রচেষ্টা, ইত্যাদি। সে চিত্রে জার্মানি ছিল লেইটকামার। শেষে এসেও যুদ্ধবিগ্রহের সুযোগ নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়া ছিল জার্মান শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য। এধরনের “রেয়ালপলিটিক” (“বাস্তবতাভিত্তিক কূটনীতি”) জার্মানির রূপকার বিসমার্কেরই সিগনেচার কৌশল। এর সফলতার কারণেই প্রুশিয়া নামক সামরিক রাষ্ট্র থেকে জার্মান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ হয় (১৮৭১-১৯১৯)।

অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই তার যথেষ্ট বারুদ তৈরি ছিল।

আর সে বারুদে যে স্ফূলিঙ্গটি বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে, তা হলো বসনিয়ায় সার্ব আততায়ীর হাতে ডাকটিকেটে দেখানো অস্ট্রীয় যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড ও তাঁর স্ত্রী সোফিয়ার মৃত্যু (জুন ২৪, ১৯১৪)।

১৯১৭ সালে বসনিয়ায় অস্ট্রীয় সামরিকবাহিনীর ব্যবহারের জন্য প্রকাশিত এই ডাকটিকেটে স্মরণ করা হয়েছে ১৯১৪ সালে সার্ব আততায়ীর হাতে নিহত আর্চডিউক ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড ও তাঁর স্ত্রী সোফিয়াকে — ব্যক্তিগত সংগ্রহ

ফ্রানৎস ফেরডিনন্ডের যুবরাজ হবার কথা ছিল না। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির রক্ষণশীল সম্রাট ফ্রানৎস ইয়োসেফের একমাত্র পুত্র রুডল্ফ ত্রিশ বছর বয়সে পরকীয়া প্রেমের সূত্র ধরে প্রেমিকার সাথে আত্মহত্যা করেন ১৮৮৯ সালে। সেসময় নাকি তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। ফলশ্রুতিতে, ফ্রানৎস ইয়োসেফের ছোট ভাই কার্ল লুডভ়িগ হন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। ১৮৯৬ সালে তাঁরও মৃত্যু হয় — প্যালেস্টাইনের ‘পবিত্র’ জর্দান নদীর নোংরা পানি খেয়ে টাইফয়েডে ভুগে। তখন তাঁরই ছেলে ফ্রানৎস ফেরডিনন্ডের ওপর যুবরাজ হবার গুরুদায়িত্ব বর্তায়।

ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড সেকারণে অনেক দেরিতে রাজশাসনের উপযোগী শিক্ষালাভ শুরু করেন। বৃদ্ধ সম্রাট ফ্রানৎস ইয়োসেফের সাথেও ঝগড়াঝাঁটি লেগে থাকত। ‘বুড়ো ভামকে’ অতিরিক্ত রক্ষণশীল ভাবতেন তিনি। বিয়েও করেন রাজপরিবারের ঐতিহ্যের বাইরে। তাতে সম্রাট সায় দেন শুধুমাত্র একটি শর্তে, যে বিয়েটি হবে ‘মর্গানিটিক’। অর্থাৎ রাজকার্য, উপাধি, ইত্যাদিতে সোফিয়া আর তাঁর ছেলেমেয়েদের কোন দাবি থাকবে না। ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড মারা গেলে তাঁর বংশধরের পরিবর্তে সম্রাট হবেন ফ্রানৎস ইয়োসেফের আরেক ভাতিজা কার্ল।

শিকারপাগল ফ্রানৎস ফেরডিনন্ডের ১৮৯২-৯৩এর ভারতভ্রমণের সময়কার ছবি। — ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

জার্মানির সমস্যা ছিল তার শাসকগোষ্ঠীর জার্মান-জাতীয়তাবাদী ঔদ্ধত্য, আর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সমস্যা ছিল তার উল্টো। জাতিগতভাবে জার্মান, আর ধর্মে ক্যাথলিক, হাবসবুর্গ গোষ্ঠীর সম্রাটরা কয়েক শতাব্দী ধরে সার্ব, ক্রোয়েশিয়ান, স্লোভেনিয়ান, চেক, স্লোভাক, ইউক্রেনিয়ান, রোমানিয়ান, পোলিশ, ইতালিয়ান, ইত্যাদি নানা ভাষা ও জাতের প্রজাদেরকে শক্ত হাতে শাসন করে চলছিল। ১৮৪৮ সালে সে ব্যবস্থার ওপর আঘাত আসে হাঙ্গেরির মাগিয়ার জাতিগোষ্ঠীর বিপ্লবের মাধ্যমে। অস্ট্রিয়ার শাসকরা রাজি হন সাম্রাজ্যকে দু’টি সমকক্ষ রাজত্বে ভাগ করে একভাগের শাসনভার মাগিয়ারদের দিতে, অবশ্য রাজা-সম্রাট থাকবেন একই হাবসবুর্গ উত্তরসূরী।

এতে সমস্যার তেমন কোন সমাধান হয়নি। কারণ মাগিয়াররা আরো ক্ষমতাবান হয়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা শুরু করে। অপরদিকে অস্ট্রীয় জার্মানরাও সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রাক্তন তুর্কী প্রদেশ বসনিয়া-হারজেগোভিনাকে হস্তগত করে তাকে ‘প্রতিরক্ষার’ নামে (বসনিয়া-হারজেগোভিনা প্রটেক্টোরেট, ১৮৭৮)।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে প্রদেশে ভাগ করে কিভাবে ফেডারেল পদ্ধতিতে শাসন করা সম্ভব, ১৯০৬এ তার একটা প্রস্তাবনা করেছিলেন এক রোমানিয়ান বুদ্ধিজীবী আউরেল পপভিৎস। ফরাসী ভাষার মানচিত্রে এই বৃহত্তর অস্ট্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রাদেশিক বিভাগ দেখানো হয়েছে। — ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

এসব কারণে জার্মান-মাগিয়ার বাদে বাকি সকল এথনিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে স্লাভরা, যারপরনাই অসন্তুষ্ট ছিল। আর দু-দু’টো বল্কান যুদ্ধে ‘ইউরোপের সিক ম্যান’ তুরস্ককে পরাজিত করে সার্বিয়া-বুলগেরিয়ার মত দেশগুলি সে এলাকার সামরিক পরাশক্তিগুলির মাঝে যথোপযুক্ত স্থান করে নেয়। সার্বিয়ার পরবর্তী লক্ষ্য হলো আরেক ‘সিকম্যান’ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর ‘নিষ্পেষিত’ স্লাভিক জনগোষ্ঠীদের ‘মুক্ত’ করে উত্তরের তুতো ভাই রুশদের মত দক্ষিণেও সর্ব-স্লাভিক দেশ ‘ইউগোস্লাভিয়া’ কায়েম করা। সে লক্ষ্যে বসনিয়ার সার্ব স্বাধীনতাসংগ্রামীদের (বা সন্ত্রাসবাদীদের) গোপনে রসদ সরবরাহ করে সার্বিয়া। সংগঠিত হয় ইয়ং বসনিয়া আর ব্ল্যাক হ্যান্ডের মত গুপ্তদল।

১৯১৪ সালের ২৪শে জুন ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড সস্ত্রীক বসনিয়ার সারায়েভো পরিদর্শনে আসেন। সকালেই তাঁর মোটর শোভাযাত্রার ওপর পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা করে ইয়ং বসনিয়ার এক সদস্য। সে যাত্রা বেঁচে যান অস্ট্রিয়ার যুবরাজ, শুধু পিছনের গাড়ির কয়েকজন আহত হয়। ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড গভর্নরের প্রাসাদে পৌঁছে বেশ হম্বিতম্বি করেন, তারপর দুঃসাহস দেখিয়ে দিনের বাকি কর্মসূচীপালনের জন্যে আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কিছু বিভ্রান্তির কারণে গাড়িবহর পথে বিলম্বিত হয়। ভাগ্যের ফেরে সেপথের পাশেই এক কাফেতে বসে কফি খাচ্ছিল গাভ্রিলো প্রিন্সিপ বলে ইয়ং বসনিয়ার আরেক সদস্য। সকালের বিফল সাথীর কার্যসিদ্ধি করবে কি করবে না সে নিয়ে দোনমনা করতে করতেই গাভ্রিলো কাফে থেকে বের হয়ে সাথে থাকা রিভলভার দিয়ে ক্লোজ রেঞ্জে ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড আর সোফিয়াকে গুলি করে বসে। যথোপযুক্ত পরিচর্যা সাথে সাথে না পাওয়ায় দু’জনেই কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।

এরপরে সূচনা হয় ১৯১৪এর জুলাই সংকট — অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কঠিন শর্তের আল্টিমেটাম দেয় সার্বিয়াকে। আক্রান্ত হলে সার্বিয়াকে তাদের তুতোভাই রুশরা সাহায্য করবে, এ ভরসায় সার্বরা আল্টিমেটামকে পাশ কাটিয়ে যায়। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। রুশরা ঠিকই আসে সার্বদের সাহায্যে। জার্মানিও আরো সাম্রাজ্যের লোভে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। আর রুশদের মিত্র, ত্রিপল-অঁতঁতের অপর দুই দেশ ব্রিটেন-ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। তুরস্কও অক্ষশক্তির সাথে যোগ দেয় এই ভেবে যে রুশ আর স্লাভদের কাছে খোঁয়া যাওয়া আগের সাম্রাজ্য পুনরোদ্ধার হবে।

ফ্রানৎস ফেরডিনন্ডের মৃত্যুতে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো, এ ভাগ্যের পরিহাস! কারণ, ফ্রানৎস ফেরডিনন্ড অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সাম্রাজ্যে জার্মান-মাগিয়ারদের একাধিপত্য খর্ব করে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে সমাধিকার দেয়ার ব্যাপারে উদারপন্থী ছিলেন। তাতে নিজের সর্বময় ক্ষমতা অবশ্য অটুট রাখতে পিছপা ছিলেন না। বেঁচে থাকলে আর রাজসিংহাসনে বসলে হয়ত কোন না কোন উপায়ে নিজ রাজ্যের সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করতেন।

এখানে আরেকটা তুলনা উল্লেখযোগ্য। ওসমানি তুরস্ক আর হাবসবুর্গ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি — এ দুটি দেশের সমস্যাগুলি একই রকম ছিল। দুটোতেই সম্রাট সর্বেসর্বা — সংসদ নামেমাত্র। তাছাড়াও অস্ট্রিয়ার কাইজ়ার একই সাথে হোলি রোমান এম্পেরর — অর্থাৎ ক্যাথলিককূলের ধ্বজাধারী রক্ষক। তুরস্কের সুলতানও সেরকম নমিনাল ‘আমিরুল মুমিনীন’ — তাবৎ মুসলিমদের ঈমানের রক্ষক। দুটো দেশেই ইহুদী-খ্রীষ্টান-মুসলিম আরব-তুর্কী-আর্মানী-ফার্সী চেক-স্লোভাক-ক্রোয়েশীয়-পোলিশ ইত্যাদি নানা জাতি ও ভাষার জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। দুটোই ছিল একরকম ‘সিক ম্যান’ — অর্থাৎ সামরিক প্রযুক্তি আর অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রগতিশীলতার বিচারে পশ্চাদপর। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে দুটো দেশই টুকরো টুকরো হয় যায়।

তফাত হলো, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির টুকরোগুলি দেশে পরিণত হয় তাদের জাতিস্বত্ত্বার ইচ্ছানুযায়ী। সেসব আত্মসমর্পণের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও উডরো উইলসন জড়িত ছিলেন, যাঁর মূল লক্ষ্য ছিল যেন সেসব নতুন দেশে কোন না কোন ধাঁচের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। কিছুটা সফলও হয়েছিল সে উদ্দেশ্য, চেকোস্লোভাকিয়া ভাল উদাহরণ। আবার উল্টোদিকে ইউগোস্লাভিয়ায় গণতন্ত্রের বদলে সার্বীয় রাজার ৎসারতন্ত্র কায়েম হয়।

তুরস্কের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণের চুক্তিতে মার্কিনদের আসন ছিল না। তুরস্কের জাতিস্বত্ত্বাগুলির নিজস্ব সিদ্ধান্তের বদলে বিজয়ী ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের ইচ্ছেমত ম্যাপ কাটাকুটি করে ভাগ করে নেয়। যার ফলে সিরিয়া ও ইরাকের মত দুটি ‘আর্টিফিশিয়াল’ দেশের উদ্ভব ঘটে, যার প্রজাদের জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য ছিল না। এখানেই কিন্তু তাদের পরবর্তী দুর্ভোগের বীজের বপন। সাথে কুর্দিস্তান-সৌদি-প্যালেস্টাইন-লিবিয়া ইত্যাদিরও ভাগ্যলিখন চূড়ান্ত হয়ে যায়। (সাইকস-পিকো অ্যাগ্রিমেন্ট, ১৯১৬)।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে এত কিছু লেখার জন্যে শুরুতে বসিনি। চেয়েছিলাম আমার সংগ্রহের ঐ ডাকটিকেটটা জাহির করে ফ্রানৎস ফেরডিনন্ডের গল্প বলতে। কান টানতে মাথা চলে এল!


পুনশ্চ: চিন্তা করে দেখলাম সাইকস-পিকোকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দোষ বলা যায় কিনা। মনে হয় যায়। কারণ, সিরিয়া-ইরাকের যেসকল সমস্যা, সেসকল সমস্যা ইউগোস্লাভ জনপদগুলিরও ছিল, আর তাদেরও কপালে একই লিখন ছিল (নব্বই দশকের একাধিক যুদ্ধ ও প্রচুর পৈশাচিকতা ও লোকক্ষয়)। ইউগোস্লাভিয়া সেসকল তুর্কী সমস্যা ইনহেরিট করেছিল, গ্রীক-আলবেনীয়দের প্রচুর পকেট ছিল তাদের রাজ্যে যাদের তেমন কোন অধিকার স্লাভরা দেয়নি। অর্থাৎ সমস্যা একই — সাইকস-পিকো ছাড়াই।

আর ইউরোপের জাতিগোষ্ঠীগুলির জাতীয়তাবাদের কারণে তাদের ইতিমধ্যে স্বদেশের মানচিত্রের ধারণা ছিল। ইরাক-সিরিয়ার আলাউয়ী, শিয়া, সুন্নি, দ্রুজ, ইয়াজিদি, তুর্কমেন, এদের জাতীয়তাবাদের তেমন কোন ধারণাই ছিল না — আরব, আর্মনী আর কুর্দ বাদ দিলে। তাদের জনপদগুলিও ছিল ছড়ানো-ছিটানো, আলাদা করে অর্থবহ ভৌগোলিক ম্যাপ আঁকা মনে হয় না সম্ভব ছিল। পরবর্তীতে যখন জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে একেক জনপদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়, তখন থেকেই অধুনাযুগের টেনশনগুলির শুরু।

অর্থাৎ সেসময়ের নিরিখে হয়ত সাইকস-পিকো ছিল আরব স্বদেশভূমির একটি গ্রহণযোগ্য, কিন্তু ঔপনিবেশিক, সমাধান। আর তা না হলেও সাইকস-পিকোর সাধ্যি ছিল না এত কিছু বুঝে (বা না বুঝে) ভবিষ্যদ্দর্শনের।

(আর সাইকস-পিকোর আরেক পার্টনর ছিল রুশরা, পরবর্তী বলশেভিক সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাইকস-পিকোর হাড়ি হাঁটে ভেঙে দেয়।)

[Sykes–Picot Agreement]


close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!