ওপরের চিত্রঃ নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী আর্চডিউক ফার্ডিনান্ড আর স্ত্রী আর্চডাচেস সোফির চিত্র। ১৯১৪ সালের ২৮শে জুনে বসনিয়ার সারায়েভোতে তাদের গুলি করে হত্যা করে এক সার্বিয়ান আততায়ী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক মাসের মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো, পত্রিকার তারিখের দিকে। প্রথম পাতার তারিখ জুনের ২৯। অর্থাৎ একদিনের মধ্যেই আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে ৪,২০০ মাইল দূরের খবর চলে এসেছে ভিয়েনা থেকে নিউ ইয়র্ক!
আগের শতকে এটা মোটেও সম্ভব ছিল না। ইউরোপের খবর আমেরিকায় আসতে একাধিক দিন লাগত, কখনো সপ্তাহ। কারণ সেগুলি আসত স্টীমশিপের মেইলে করে। তারপর রেলের মেল।
এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে টেলিগ্রাফ ও মোর্স কোড আবিষ্কারের পর। মার্কিন এই আবিষ্কার একেকটি মহাদেশের অভ্যন্তরে যোগাযোগ দ্রুততর করে দেয়। রেলের ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্কের সাথে টেলিগ্রাফের তারও ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
তবে মহাসাগরের অপর পারের খবর আসতে সময় লাগত বেশি। সে কারণে বতর্মান যুগের সাবমেরিন অপটিক্যাল কেবলের মত করে টেলিগ্রাফ কেবলও মহাসাগরের নিচে পাতা হয়। ১৯১০ সাল নাগাদ একাধিক ট্রান্সআটলান্টিক কেবল স্থাপিত হয়। দ্বিতীয় ছবি দেখুন।


এই প্রযুক্তিতে আরো গতি আসে মার্কোনির রেডিও সিগনাল নিয়ে গবেষণার কারণে। ১৯০১ সালে আয়ারল্যান্ড থেকে বর্তমান কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে তার ওয়্যারলেস সিগনাল প্রথমবারের মত আটলান্টিক অতিক্রম করে। সৌভাগ্যক্রমে নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেই অন্তরীপ কেপ স্পীয়ারে আমার যাওয়া পড়েছে। তৃতীয় ছবিতে ঠান্ডা সমুদ্রের পাশে লাইটহাউজের সামনে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক প্লেকের ছবি দিলাম।
পরের কয়েকটি ছবিতে আরো কটি হেডলাইন নিউজের ছবি দিয়েছি।







দেখুন, প্রায় প্রতিটার ওপর ওয়্যারলেস এন্ড কেবল ডিসপ্যাচ লেখা। অর্থাৎ মার্কনির ওয়্যারলেস আর ট্রান্সআটলান্টিক কেবল তাদের খবরের উৎস। আরেকটা জিনিস লক্ষ্যণীয় যেটা টেলিগ্রাম থেকে আসেনি। সেটা হল বহু ছবি ও ফটোগ্রাফের ব্যবহার।
বিশ বছর আগেও এমনটা ছিল না। প্রিন্টিং প্রযুক্তিরও অনেক বিবর্তন ঘটে যে কারণে ছবি ও কার্টুন তো বটেই, কম খরচে সংবাদপত্র ছাঁপাও সম্ভব হয়। তার সাথে যোগ করুন পশ্চিমা বিশ্বে গণস্বাক্ষরতার সফলতা। এমনকি রাশিয়ার মত পশ্চাদপসর পশ্চিমা দেশেও সেসময়ে সৈনিক ও শ্রমিক সংবাদপত্র পড়তে পারত। ছবি দেখুন।


ব্রিটিশ আরেকটি পত্রিকা থেকেও কার্টুন দিলাম। এর নাম পাঞ্চ। বিশ্বব্যাপী নানা ভূরাজনৈতিক খবরের স্যাটায়ার কার্টুন তৈরি করতে এরা ছিল অদ্বিতীয়। একটি ছবির নিচে ছোট একটি ক্যাপশন দিয়েই বিশাল এক বাস্তবতা ফুঁটিয়ে তুলত স্বল্পশিক্ষিত কিন্তু স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাছে। এমনকি স্বদেশের সাম্রাজ্যবাদী লোলুপতাকেও কটাক্ষ করতে এদের বাঁধত না।
সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে নতুন ধরনের সংবাদ অতি দ্রুত পৌঁছে যেতে শুরু করে। তার অনেকটা সত্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ, আবার কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট আর সেনসেশনালিস্ট। সাধারণ মানুষকে জাতীয়তাবাদ বা ধর্মের দোহাই দিয়ে উত্তেজিত করা খুব কঠিন ছিল না।


১৮৯০এর দশকে এক নতুন ধরনের সাংবাদিকতারও আত্মপ্রকাশ ঘটে যার নাম দেয়া হয়েছিল নিউ জার্নালিজম। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম বলা যেতে পারে একে। সাংবাদিকরা টেলিগ্রাফ বা কেবলের শুধু এপাশে খবর সংগ্রহে না থেকে ওপাশে চলে যান। মানে সরাসরি ফীল্ডে।
একেবারে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছবিসহকারে রিপোর্টিং তো আগেই শুরু হয়ে যায় মার্কিন গৃহযুদ্ধ ও ক্রাইমিয়ান যুদ্ধে। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে যে পরিমাণে মানুষ মারা যায়, আহত হয়, তার থেকে বিপুল পরিমাণ সহমর্মিতা তৈরি হয়। বর্তমান যুগের রেড ক্রসের শুরুটা হয় সেই যুদ্ধে নার্স ভলান্টিয়ার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের লেখা সরাসরি কলামের কারণে।
সব মিলিয়ে স্বাক্ষরতা, প্রযুক্তি, নতুন সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম, কাগজের মাস প্রডাকশন, প্রিন্টিং প্রেসের অগ্রগতি — ইত্যাদি মাস কমিউনিকেশন ও ব্রডকাস্টিং জগৎকে পুরো বদলে দেয়। বলতে পারেন, খবরের ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস নেচার শুরু হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী সংঘাত সৃষ্টিতে এই দ্রুত ও পার্সোনাল লেভেলের যোগাযোগ অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫




“তথ্যবিপ্লব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ” লেখাটিতে একটি মন্তব্য পড়েছে