ইনোলা গে, লিটলবয় ও অন্যান্য

ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই ভার্জিনিয়ার শ‍্যান্টিলি শহরে উদভার-হাজি সেন্টার নামে ৭৬০,০০০ বর্গফুটের বিশাল এক স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম। সেখানে গেলে দেখতে পাবেন “ইনোলা গে” নামে বি-টুয়েন্টি-নাইন সুপারফর্ট্রেস বোমারু বিমানটি। অনেকের কাছে হয়ত নামটা পরিচিত ঠেকবে। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর প্রথম আণবিক বোমা ফেলে এই বিমানটিই।

মে মাসে ঈস্ট কোস্ট ট্রিপে ভার্জিনিয়া-ডিসি-নিউইয়র্ক ছাড়াও ডিট‍্যুর নিয়েছিলাম আমেরিকায় আমার প্রথম বাসস্থান স্টেট কলেজে। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যখন প্রথম পদার্পণ করি, তখন এক দয়ালু বড় ভাই দু সপ্তাহ স্বগৃহে থাকতে দিয়েছিলেন, ক‍্যাম্পাসটাও ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। তখন রেডিয়েশন সায়েন্স এন্ড ইনজিনিয়ারিং সেন্টারের আঙিনায় ব্রিজীল নিউক্লিয়ার রিএক্টর বিল্ডিং দেখে বেশ ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। এটি এখনো পর্যন্ত আমেরিকায় চালু থাকা সবচেয়ে পুরনো পারমাণবিক চুল্লী। ১৯৫৫ সালে চালু হওয়া এই রিএক্টরটাও এবার বাইরে থেকে দেখে এলাম। তারও ভিডিও দিয়েছি।

আর শেষ ছবিতে আমার সংগ্রহের একটা ডাকটিকেট। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত এই ডাকটিকিটটি “অ‍্যাটমস ফর পীস” শিরোনামে ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘে দেয়া প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের একটি বিখ‍্যাত বক্তৃতার স্মারক। বর্তমান বিশ্ব কিন্তু এখনো সেই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পারমাণবিক ব‍্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




আজকের যুগের ভূরাজনীতির সাথে এই তিনটি আলাদা জিনিস মিলিয়ে কিছু বলি।

১৯৪৫ সালে ইনোলা গে বিমানটি হিরোশিমার ওপর ৬ই আগস্ট ১০,০০০ পাউন্ড ওজনের লিটলবয় নামের পারমাণবিক বোমা ফেলে। এতে প্রায় দেড় লাখ জাপানি মারা যায়, আহত-নিহতের সংখ্যা পরে বেড়ে আড়াই লাখে দাঁড়ানো অসম্ভব নয়। কারণ পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে অনেকের মরণব্যাধি ক‍্যান্সার হয়। মৃতদের প্রায় ২০ হাজার ছিল জাপানি সৈন্য, ২০ হাজার কোরিয়ান দাসশ্রমিকও ছিল।

স্টেট-অফ-দ‍্য-আর্ট বি-২৯ সুপারফর্ট্রেস বিমানটিকে অ্যাটম বোমা ফেলার জন‍্যই নির্বাচিত করেছিলেন পাইলট মেজর পল টিবেটস। প্লেনটির ডাকনাম তাঁরই দেয়া, নিজের মায়ের নামে। উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের তিনিয়ান এয়ার বেইস থেকে আরো দুটি বি-২৯এর সাথে ১২ জন ক্রু নিয়ে ৬ ঘন্টা উড্ডয়নের পর হিরেশিমার আকাশে পৌঁছায় ইনোলা গে। সকাল ৮টা ১৫তে ত্রিশ হাজার ফীট থেকে বোমাটি ফেলা হয়। দুই হাজার ফীটে এসে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের শক্তি ছিল পনের কিলোটন।

বিস্ফোরণের ফলে ৪.৮ বর্গমাইল এলাকাব‍্যাপী প্রচন্ড ধ্বংসযজ্ঞ হয়। হিরোশিমার সত্তর ভাগ দালান পুরোপুরি মাটিতে মিশে যায়। বোমা ফেলা শেষে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর আরো ৬ ঘন্টা উড়ে তিনিয়ান বেইসে ফিরে আসে ইনোলা গে। তিনদিন পর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমা ফ‍্যাটম‍্যান নিক্ষেপের অভিযানেও বক্সকার নামে অ‍ন‍্য আরেকটি বি-২৯এর সঙ্গী ছিল ইনোলা গে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মজার ব্যাপার, ১৯৪৭এর পর বিমানটিকে রিটায়ার করার পর তাকে ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এক অজপাড়াগাঁয়ের এয়ারবেইসে অযত্নে অবহেলায় পঁচছিল ইনোলা গে। আশির দশকে এক দল সামরিক ইতিহাস এনথুসিয়াস্ট ও ভেটেরানদের কর্মসূচিতে ইনোলা গের সংরক্ষণে মনোযোগী হয় স্মিথসোনিয়ান।

কিন্তু নব্বই দশকে প্রথমবার যখন একে ডিসপ্লেতে আনা হয়, তখন জাপানী ভিক্টিমদের কথাগুলি এত ফলাও করে বলা হয় যে ভেটেরানরা ক্ষুব্ধ হন। তারা চেয়েছিলেন, পুরো যুদ্ধের পটভূমিও তুলে ধরা হোক যাতে মানুষ বুঝতে পারে এই বোমা ফেলার প্রয়োজনীয়তা কি ছিল। আমি জাস্ট তিন বাক‍্যে সে কাজ সারি।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ‍্যাটম বোমা ছাড়া‌ই ফায়ারবমিং ও অন‍্যান‍্য কারণে সব মিলিয়ে ২০ লাখের মত জাপানী সামরিক ও বেসামরিক জনগণ মারা যায়। আবার অন‍্যদিকে চীন ও এশিয়ার অন‍্যান‍্য অঞ্চলে জাপানী লাগামহীন বোমাবর্ষণ, আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের শিকার হয়ে মারা যায় ১ থেকে ২ কোটি সামরিক-বেসামরিক মানুষ। এ সংখ‍্যাগুলি ফ‍্যাটম‍্যান ও লিটলবয়ের ক‍্যাজুয়াল্টির সাথে তুলনা না করলে অ‍্যাটম বোমা ফেলার প্রেক্ষাপটটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




লিটলবয় নামের বোমাটি ছিল ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি। ১০,০০০ পাউন্ড ওজনের মোটে ১৪১ পাউন্ড ছিল ইউরেনিয়াম, আর তারও ১ পাউন্ডের কম ওজন পারমাণবিক চেইন রিয়‍্যাকশনের মধ‍্য দিয়ে যায়। লস আলামোস ন‍্যাশনাল ল‍্যাবরেটরিতে তৈরি বোমাটির ইউরেনিয়াম ছিল গড়ে ৮০ শতাংশ “এনরিচড।”

এখানেই বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে আনছি। ইরানের আয়াতোল্লা রেজিম ইউরেনিয়াম এনরিচ করেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এটা অ‍্যাটমিক ওয়াচডগ আইএইএ বলছে। এর অর্থ কি?

প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামে তিন ধরনের আইজোটোপ বিদ‍্যমান। ইউ-২৩৮, ইউ-২৩৫, ইউ-২৩৪। দ্বিতীয়টি আণবিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে এটি এক শতাংশেরও কম। এ কারণে পরিশোধনের মাধ‍্যমে ২৩৫এর পরিমাণ বৃদ্ধি পারমাণবিক বোমা (কিংবা শক্তিচুল্লী) তৈরির জন্য অত্যাবশ‍্যক। সাধারণত ক‍্যাসকেডেড গ‍্যাস সেন্ট্রিফিউজের মাধ‍্যমে এই পরিশোধন প্রক্রিয়া চলে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




এখন ব‍্যাপার হচ্ছে, নিউক্লিয়ার রিঅ‍্যাক্টর যার মাধ‍্যমে আমরা বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করি, যেমন রূপপুর পাওয়ার প্ল‍্যান্ট, আর পারমাণবিক বোমা — উভয়ের জন‍্যই ইউরেনিয়াম এনরিচ বা পরিশোধন করা প্রয়োজন। তবে দুটোর মাত্রা ভিন্ন, প্রক্রিয়া এক।

অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ কাজ যেমন শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি আর অশান্তিপূর্ণ কাজ যেমন বোমা বানানোর প্রযুক্তি মূলে এক। আধুনিক কালের চুল্লীর জন্য ইউরেনিয়াম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পরিশোধন করলেই চলে। আর বোমার জন্য কমপক্ষে ২০ শতাংশের বেশি পরিশোধন করতে হয়। কোন দেশ যদি ৫ শতাংশের ওপর পরিশোধন করে, তাহলে কোন উন্নত শিক্ষিত দেশের মানুষই বিশ্বাস করবে না যে তাদের উদ্দেশ‍্য শান্তিপূর্ণ!

বলে রাখা ভাল, চুল্লীর অনেক প্রকারভেদ আছে, কিছু পরীক্ষামূলক আছে যাতে ইউরেনিয়ামের পরিশোধিত অংশ ২০ শতাংশ বা বেশি। আবার চুল্লী ও বোমা দুটোই ইউরেনিয়াম ছাড়া অন‍্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে তৈরি হতে পারে। তবে ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি করা সবচেয়ে সোজা ও কম ব‍্যয়বহুল।

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার প্রথম সফল ব‍্যবহারের পর পরই চু্ল্লী নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায়। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির এই ব্রীজীল রিয়‍্যাক্টরটি সে শুরুর দিককার চুল্লী। প্রথমে এত ব‍্যবহৃত ইউরেনিয়ামের পরিশোধনের মাত্রা ছিল ২০ শতাংশ — যা কিনা উইপনস গ্রেড!

পঞ্চাশের দশকে অন্যান্য দেশও দ্রুত পারমাণবিক বোমা টেকনোলজিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯৫২তে, ফ্রান্স ১৯৬০এ আর চীন ১৯৬৪ সালে আণবিক বোমার সফল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়।

তদকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের প্রশাসন পারমাণবিক বোমা প্রযুক্তির বিস্তার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালের অনুমানে ২৫ বছরের মধ‍্যে, অর্থাৎ ১৯৮০ নাগাদ, আরো ২৫টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রধারী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। এ কারণে বিস্তার রোধের একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রশাসন উঠেপড়ে লাগে। আবার একই সাথে শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন পারমাণবিক চু্ল্লীর সুফল যাতে বিভিন্ন দেশ আহরণ করতে পারে, সে চিন্তাটাও তাদের ছিল। আইজেনহাওয়ারের অ‍্যাটমস ফর পীস বক্তৃতাটার সারবস্তু তাই-ই।

ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সহযোগিতার মাধ‍্যমে যে আন্তর্জাতিক চুক্তিটি ১৯৭০ সালে দাঁড়া হয়, তার নাম এনপিটি — নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি। এর আগেই ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হ‍য় জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইন্টারন‍্যাশনাল অ‍্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি — আইএইএ।

চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের ১৮০টি দেশ— কেবল ইসরাইল, ভারত, পাকিস্তান বাদে। উত্তর কোরিয়া ১৯৮৫ সালে স্বাক্ষর করলেও ২০০৩ সালে সদস‍্যপদ প্রত‍্যাহার করে নেয়।

চুক্তিটির মূল স্তম্ভ তিনটি – ১. পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তাররোধ, ২. নিরস্ত্রীকরণ, ৩. শান্তিপূর্ণ ব‍্যবহার। প্রথমত, পাঁচটি পরাশক্তি আইনতভাবে পারমাণবিক বোমা প্রযুক্তির বৈধ মালিক, এর বাইরে চুক্তির অধিভুক্ত দেশ পারমাণবিক অস্ত্র গবেষণা ও উৎপাদন করবে না। দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে অ‌ধিভু্ক্ত হবার জন্য পারমাণবিক বোমা পরিত্যাগ করতে হবে। সোভিয়েত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ‍্যে শান্তিচুক্তির আওতায় একাধিকবার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ঘটেছে। ফলে বহু উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম বিপরীত প্রক্রিয়ার মধ‍্যে দিয়ে গিয়ে কম পরিশোধিত লো এনরিচড ইউরেনিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে। এবং সেটা ব‍্যবহৃত হয়েছে পারমানবিক চুল্লিতে। এমনকি মারিকনরা রুশদের থেকে সেই জ্বালানী কিনেও নিয়েছে।

শান্তিপূর্ণ ব‍্যবহারের ক্ষেত্রে দুটো জিনিস উল্লেখযোগ্য‍। এক, সব সদস্য দেশ এক অপরের সাথে পরমাণু প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে পারবে। দুই, কিন্তু ব‍্যাপারটার মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। মধ‍্যস্থতা ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে আইএইএ। এ কারণেই আইএইএ সকল সদস্য দেশের — ইরানসহ — পারমাণবিক স্থাপনাগুলি পর্যবেক্ষণ করে।

এই চুক্তিটি হবার আগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিচুল্লিকে কয়েক দফা আপগ্রেডের মধ‍্য দিয়ে যেতে হয়। যেসব রিয়‍্যাক্টরে উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম ব‍্যবহৃত হত, তাদের সকলকে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে লো এনরিচড ইউরেনিয়াম ব‍্যবহারোপযোগী করে তোলা হয়। এ সময়েই পেন স্টেটের রিঅ‍্যাক্টরটিও আপগ্রেড করে ৩.৫ শতাংশ এনরিচড ইউরেনিয়ামের উপযোগী করা হয়।

ইসরাইল, চীন ও ফ্রান্স এনপিটি চুক্তিটি তৈরি হবার আগেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে। পাকিস্তান ও ভারত চুক্তিতে অংশ না নিয়ে “স্বাধীনভাবে” পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে। বর্তমানে ভারতকে চু্ক্তির বাইরেও নির্ভরযোগ‍্য পার্টনার ধরা হয়। পাকিস্তান তেমনটা নয় কারণ উত্তর কোরিয়া ও ইরানে প্রযুক্তি পাচারের ব‍্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। প্রথম প্রথম এদের দুজনের ওপর স‍্যাংকশন আরোপিত হলেও সময়ের সাথে সাথে স্ক্রুটিনাইজেশন কমে এসেছে, কেননা তারা কথায় কথায় একে অপরকে বা অন্য কাউকে পারমানবিক বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, এমন হুমকি দেয় না। এবং তাদের পারমানবিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার মূল ভিত্তিগুলি মোটামুটি সকলের জানা। আর ইসরাইল খোলাখুলিভাবে তাদের পারমানবিক অস্ত্রের মালিকানা নিয়ে কোন কথা বলে না। কিন্তু ধরা হয় তাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি হুমকি না আসলে তারা সেটা ব‍্যবহার করবে না।

অতীতে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল। ইরাকের সাদ্দাম রেজিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন‍্যতম কারণ তাদের অতীত কার্যক্রম, যেটা তারা গোপনে ধ্বংস করে ফেলে — কিন্তু পাবলিকলি স্বীকার করেনি ইরানের কারণে। সিরিয়া ও লিবিয়ার রেজিমগুলিও স্বেচ্ছায় সে কার্যক্রম পরিত্যাগ করে। দক্ষিণ আফ্রিকাও। এদের প্রত‍্যেকের ওপরই এনপিটির ব‍্যতিক্রম কাজ করায় স‍্যাংকশন ছিল। পাবলিকলি কার্যক্রম পরিত‍্যাগের পর দেশ তিনটির ওপর স‍্যাংকশন প্রত‍্যাহার করা হয়।

যে দেশটি সবচেয়ে সমস‍্যা তৈরি করে সেটি উত্তর কোরিয়া। প্রথমে তারা এনপিটির অংশ হয়ে চীন ও রাশিয়া থেকে “শান্তিপূর্ণ” ব‍্যবহারের জন‍্য আইএইএর আওতায় নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি আমদানি করে। কিন্তু ক্রমে আইএইএ খুঁজে পায় যে উত্তর কোরিয়া উইপনস গ্রেড ইউরেনিয়াম পরিশোধন করছে এবং তাদের অঘোষিত স্থাপনা আছে। জাতিসংঘে যখন তাদের ওপর স‍্যাংকশন আসার শতভাগ সম্ভাবনা, তখন তারা সাথে সাথে এনপিটি থেকে সদস‍্যপদ প্রত‍্যহার করে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা চালায়। মানে তারা আসলেই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি ব‍্যবহার করেছে প্রযুক্তি আহরণের জন্য, বোমা তৈরির উদ্দেশ‍্যে। তারপর থেকে কঠিন স‍্যাংকশন রয়েছে তাদের ওপর।

উত্তর কোরিয়া যেভাবে এনপিটিকে ব‍্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে নেয়, এটা এনপিটির গ‍্যারান্টর শক্তিগুলি সহজে মানতে পারেনি। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক করে চাইলেও সৌদীকে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি দেবে না। ইরানের ক্ষেত্রেও কোরিয়ার মত নানা চুক্তি যে কাজে দেবে না, এ ব‍্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলির অধিকাংশই একমত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক কনফ্রন্টেশনের একটা বড় কারণ ১৭ই মেতে আএইএর প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখিত হয় যে, ইরান আরো বেশি ইউরেনিয়াম পরিশোধিত করেছে। তাদের হাতে ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ এনরিচড ইউরেনিয়াম আছে। এছাড়াও একাধিক অঘোষিত স্থাপনা আছে যেখানে আইএইএকে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়নি।

ইরান ভারত-পাকিস্তান-ইসরাইলের মত মুখ বন্ধ না রেখে প্রকাশ‍্যে তা ব‍্যবহার করে ইসরাইলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার পাবলিক হুমকি প্রায়ই দিয়ে আসে। তাদের আয়াতোল্লা রেজিমের মুখে সর্বদা মর্গ বার আমেরিকা স্লোগান। কখনই মার্কিন জনগণ বিশ্বাস করবে না যে পারমানবিক সক্ষমতা পেলে ইরান থেকে তারা নিরাপদ। এ ব‍্যাপারে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান পার্টির মধ‍্যে কোনও মতপার্থক্য নেই। শুধুমাত্র পার্থক্য কিভাবে সমস‍্যাটা সমাধান করা সমীচীন।

যা হোক, শেষ করি ব্রিজীল রিয়‍্যাক্টর দিয়ে। এই স্থাপনাটি কিন্তু সাধারন মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত। যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বা সাধারণ মানুষ তাদের ড্রাইভার্স লাইসেন্স দাখিল করে রিয়‍্যাক্টরটি ঘুরে দেখতে পারে। শুধু ড্রাইভার্স লাইসেন্স চায় মানে হল বিদেশী নাগরিকও সহজে গিয়ে ঘুরে আসতে পারে। আমি যদিও যাইনি, কিন্তু আমার নাইজেরিয়ান ও আমিরাতী সহপাঠী প্রথম সপ্তাহের ওপেন হাউজে গিয়ে ঘুরে এসেছিল।

শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করলে কোন নিউক্লিয়ার স্থাপনাই লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। যেসকল রেজিম সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে তাদের স্থাপনায় লুকিয়ে গবেষণা করে, মুখের এক সাইড দিয়ে বলে শান্তিপূর্ণ গবেষণা, আরেক সাইড দিয়ে বলে আরেকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, তাদের সাথে শান্তিচুক্তির কোন মূল্য নেই। এসকল রেজিম পদচ‍্যুত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দেশের নাগরিকদের আর বাকি দুনিয়ায় শান্তির কোন সম্ভাবনা নেই।

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0

ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫




আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!