নিউ ইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের গ্রেট ডিপ্রেশন এরা নোয়ার থেকে বেরিয়ে আরেক অন্ধকারে পড়লাম। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। আউটডোর কোন কিছু করা সম্ভব নয়। সৌভাগ্যবশত — নেহাতই আমার সৌভাগ্য, পরিবারের বাকিদের দুর্ভাগ্যই বলা যেতে পারে — কাছেই ছিল মর্গান লাইব্রেরি এন্ড মিউজিয়াম। চিন্তা করে রেখেছিলাম বৃষ্টি হলে এখানে এসে ঢুকব।
আমেরিকার ব্যাংকিং আর ফাইন্যান্স ইন্ডাস্ট্রির সাথে পরিচিত যে কেউই জেপি মর্গান চেইজ ব্যাংকের নাম শুনে থাকবেন। সারা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংক এটি। ব্যাংকটির একটি পরিমার্জিত অংশ জেপি মর্গান এন্ড কম্পানি। সে কম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা জন পিয়েরপন্ট মর্গানের নামেই এই লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম।
জেপি মর্গান ঊনিশ শ’ বিশের দশকের প্রগ্রেসিভ এরায় সে সময়ের প্রায় এক মিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজের জন্য এই পার্সোনাল লাইব্রেরিটি তৈরি করেন। তার অসংখ্য বইয়ের সংগ্রহ ছিল, সাথে চিত্র ও শিল্পকর্ম। এগুলি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই মূল দালানটি তৈরি হয়।
ভিডিওতে ভেতরের কারুকার্য দেখেই বুঝতে পারবেন কি পরিমাণ জৌলুস নিয়ে ভবনটি একশ বছরের বেশি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু যে স্থাপত্য তা নয়, তাঁর সংগ্রহে যে অমূল্য বইপুস্তক আর শিল্পকর্ম, তার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ।

সে সময়েই ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল জেপি মর্গানকে নিয়ে প্রতিবেদনে লিখেছিল যে, ব্যাংকার মানুষ যেমন দেদারসে হাজার হাজার স্টক কেনে, মর্গান সাহেব উল্টো দু’হাতে দুষ্প্রাপ্য বই আর পান্ডুলিপি কেনেন। তার ইনকামের অর্ধেকের বেশিই যেত সংগ্রহের পেছনে।
মৃত্যুর পর মর্গান সাহেবের উইল অনুযায়ী লাইব্রেরিটি পাবলিকের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এখনো বছরে প্রায় আড়াই লাখ দর্শনার্থী আসে। মূল লাইব্রেরি রুমটায় দুই তিন তালা সমান শেল্ফে হাজারে হাজারে বই রাখা। তার পাশাপাশি রেনেসাঁ আর্ট।
এই লাইব্রেরিতে বেশ কিছু অমূল্য জিনিস দেখার সৌভাগ্য হল। তবে এখন বলছি কেবল একটির কথা।
যে কোন পান্ডুলিপি লাইব্রেরি কতটা বনেদী, তার একটা জনপ্রিয় মাপকাঠি হচ্ছে তাদের সংগ্রহে গুটেনবের্গ বাইবেল আছে কিনা! হ্যাঁ, এটি ইউরোপে প্রস্তুত প্রথম ছাপাখানায় মুদ্রিত বই। প্রায় দেড়শ কপি ছাপা হয়। তার মধ্যে বোধ হয় পয়তাল্লিশটি এখনো অক্ষত অবস্থায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে। আমেরিকাতেই বোধ করি দশটার মত আছে।
আর এই মর্গান লাইব্রেরিতে আছে তিন তিনটা গুটেনবের্গ বাইবেল! তারই একটি প্রদর্শিত হচ্ছিল, যার ছবি দিয়েছি।

গুটেনবের্গ বাইবেল কিন্তু যে একেবারে প্রথম মুদ্রিত বই তা নয়। ছাপাখানার আবিষ্কার গুটেনবের্গ করেছেন বলা হলেও এর আগে বহু শতাব্দী ধরে প্রায় একই রকম উডব্লক প্রিন্টিংয়ের ব্যবহার চীনে ছিল।
চীনে প্রযুক্তিটির সম্পূর্ণ মালিকানা ছিল সম্রাটের সরকারের হাতে। কোন সাধারণ ব্যক্তি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বা বিদেশে পাচার করলে তার নির্ঘাত গর্দান যেত। যেমনটা ছিল রেশমের ক্ষেত্রেও। এ কারণে চীনে উডব্লক প্রিন্টিং তেমন কোন জ্ঞানবিপ্লবের জন্ম দিতে পারেনি।
ওদিকে ইউরোপে ১৪৫০এর দশকে গুটেনবের্গ বাইবেল মুদ্রণ করেন মাইনৎজ নামে হোলি রোমান এম্পায়ারের একটি জার্মান শহরে। সরকারী কোন পৃষ্ঠপোষকতা তার ছিল না। বাইবেলটি ছাপানো তার ব্যবসায়িক উদ্যোগ ছিল। সেটা বেশ সফলতা পায়। কারন তার এই অসাধারণ বাইবেল কিনতে খোদ ইংল্যান্ড থেকেও বনেদী ক্রেতা আসে।
একটা ব্যাপার উল্লেখযোগ্য। দেখুন, ধর্মীয় বইপুস্তক মুদ্রণ ও পঠনটাকে ইউরোপীয়রা বেশ গুরুত্বসহকারেই নিয়েছিল। ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-দর্শনের অনেক কিছুর মূলেই ধর্মভিত্তিক প্রগতিশীলতা খুঁজে পাওয়া যায়। এটা তাদের মিশনারি অভিপ্রায়ের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে একই ভাবে ধর্মীয় জগতে বিশাল একটা বিপ্লবও এনে দেয় ছাপাখানা প্রযুক্তি। বাইবেল যখন ছাপার আকারে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে গেল, তখন রোমান ক্যাথলিক পোপ ও পাদ্রীদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রথাসর্বস্ব বিশ্বাসের প্রভাবটা মানুষের ওপর কমে আসতে শুরু করে।
সাধারণ মানুষ স্বাক্ষরতা লাভ করে নিজ থেকে বাইবেল পড়ে যতটা বোঝার চেষ্টা করে, তাদের কাছে ততখানি পরিষ্কার হয়ে যায় যে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আখের গুছিয়ে নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জার্মানিতে ঘটে যায় প্রটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশন। মার্টিন লুথার স্বয়ং প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবহার করে তার ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শুরু করেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়ে যায় ক্যাথলিকবিরোধী ধর্মীয় বিপ্লব, নতুন চিন্তাধারার জাগরণ।

তার হাত ধরেই পরবর্তীতে উত্তর ইউরোপে নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব, ডেইজম যার একটি। আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে সজ্ঞানে লালন ও চর্চা ছিল এই নবআদর্শে উজ্জীবিত প্রজন্মের বিপ্লব। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রণেতারা প্রায় সকলেই সেই ইংলিশ, স্কটিশ, ডাচ এনলাইটেনমেন্টের উত্তরসূরী।
অপরদিকে স্পেন-ইতালি প্রভৃতি স্থানে ক্যাথলিক প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে ইনকুইজিশন নামক নিপীড়ন ও দমননীতির সূচনা হয়। যে কারণে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলির সাম্রাজ্যের শক্তি ও প্রভাব স্তিমিত হয়ে আসতে শুরু করে।
মোট কথা, গুটেনবের্গের বাইবেলের বিপ্লব শেষ পর্যন্ত কেবল ধর্মের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরো ইউরোপ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য একটা পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। চীনাদের ছাপাখানা প্রযু্ক্তি প্রথম হলেও মানুষের জীবনে সেই বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে পারেনি।

এখন বলুন তো, ছাপাখানায় মুদ্রিত প্রথম কুরআন কোনটি, বা কোন দেশে প্রকাশিত?
অনেকে সোজাসাপ্টা ধারণা করবেন, তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যে হয়ত। কেননা সেই সাম্রাজ্যই ছিল পনের ষোল শতকে সবচে প্রতাপশালী। আর ইউরোপের নিকটবর্তী হওয়ায় ছাপাখানার প্রযুক্তি তাদের হাতে আসা অসম্ভব নয়।
সেরকমটা হলে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস হয়ত অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু অটোমান তুরস্কে প্রথম কুরআন মুদ্রিত হয়নি। হয়েছে ইতালির ভেনিস শহরে। পাগানিনো পাগানিনি নামে এক প্রকাশকের ছাপাখানায়। শেষ ছবিতে দেখানো, ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।
১৫৩৭ সালে এই কুরআনটি মুদ্রণের উদ্দেশ্য ছিল সম্ভবত তুরস্কে রপ্তানি। কিন্তু সে বাণিজ্য সফল হয়নি। সম্ভবত বহু মুদ্রণ ত্রুটি ছিল, আর ঐতিহ্যবাহী আরবী ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার না থাকায় গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বর্তমানে কেবল একটি কপি সংরক্ষিত আছে, তাও একটি রোমান ক্যাথলিক মনাস্টেরিতে।

হয়ত ভাবছেন, তাহলে নিশ্চয় দ্বিতীয় মুদ্রিত কুরআনটা তুরস্কে হয়েছে? আনফরচুনেটলি নো!
তুরস্কের অটোমান প্রশাসন দেশে মুদ্রণ শিল্প শুরু করার অনুমতি দিলেও কোনও প্রকার ইসলাম ধর্মীয় বইপুস্তক মুদ্রণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ এর বিরুদ্ধে আলেম-ওলামারা ভীষণ শোরগোল তোলেন। হয়ত মানুষের হাতেই লিখতে হবে, কেননা মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির সেরা! নয়ত পাগানিনি কুরআনের মত হাজারো ভুলে ভর্তি থাকবে, আর তা পাঠ করে গুনা কামাই হবে।
ক্যালিগ্রাফি শিল্পের কারিগররাও চায়নি মুদ্রণশিল্পের বিকাশ হোক, তাদের পেটে লাথি মেরে। কুরআনের হাফেজ আর আলেমরাও কুরআনের মৌখিক ঐতিহ্যটাই চলমান রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।
তুরস্কে আরবী লিপিতে প্রথম মুদ্রণ করেন ইব্রাহিম মুতেফের্রিকা বলে এক মনীষী। তাও গুটেনবের্গের প্রায় তিনশ বছর পর। তার মুদ্রিত বইগুলিও ধর্মীয় বিষয়ের নয়। সাধারণ ইতিহাস ও প্রযুক্তি নিয়ে। তবে ১৭২৯ সালে শুরু হওয়া তার প্রকাশনী ১৭৪২ নাগাদ বন্ধ হয়ে যায়। মূল কারণ ছিল হস্তলিপিবিদদের প্রবল বিরোধিতা ও লবিইং। তার তিন বছর পর ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়।
তবে মজার ব্যাপার হল, অটোমান সাম্রাজ্যে গুটেনবের্গ বাইবেল প্রকাশের কয়েক বছরের মাথায় হিব্রু লিপিতে তোরা আর আরবী বা লাতিন হরফে নিউ টেস্টামেন্ট মুদ্রিত হয়। অর্থাৎ ইহুদী ও খ্রীষ্টান সমাজ প্রায় সাথে সাথে প্রযুক্তিটি গ্রহণ করে নেয়।
অটোমান তুরস্কে প্রথম আরবী লিপির কুরআন মুদ্রিত হয় ১৮৭৩ সালে। ১৪৫৩ থেকে ৪২০ বছর পর। এই সময়ের মধ্যেই বহু আরবী লিপির কুরআন মুদ্রিত হয়, কোনটাই মুসলিমশাসিত কোন সাম্রাজ্যে নয়। জার্মানিতে (১৬৯৪), রাশিয়াতে (১৭৮৭) কিংবা ব্রিটিশ ভারতে (১৮০২)।
গুটেনবের্গ বাইবেলের ৫৭০ বছর ভবিষ্যতে আমরা শিক্ষিত সভ্য সমাজে বাস করছি। এত শত বছর ধরে পশ্চিমা সাধারণ মানুষ ঘরে শুধু বাইবেল-তোরা সাজিয়ে রাখেনি, সেগুলি পড়ে ভালমন্দ ফারাক করা শিখেছে।
মুসলিমরা কি তাদের থেকে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ বছর পেছনে নয়? আমাদের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠী কি এখনো সেই ক্যাথলিকদের মত বাগাড়ম্বর আর প্রথাসর্বস্ব নয়? আধুনিককালে স্বাক্ষরজ্ঞান হয়ত হয়েছে, কিন্তু সেই সকল অশিক্ষিত প্রজন্ম কি খুব বেশি অতীতের? আর কত প্রজন্ম গত হলে সেই অজ্ঞানতার স্মৃতি তারা বিস্মৃত হবে?

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫



