“দ্য কিংস স্পীচ” ছবিটা দেখেছেন কে কে? কলিন ফার্থ সে ফিল্মে অভিনয় করেছেন রাজা ষষ্ঠ জর্জের ভূমিকায়। সেই রাজার তোতলামির রোগ ছিল। স্পীচ থেরাপিস্টের সাহায্য নিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও কমনওয়েল্থের যুদ্ধ ঘোষণার বক্তৃতা দেন। ১৯৩৯ সালে। কোটি কোটি ব্রিটিশ নাগরিক তার কণ্ঠ তখন প্রথমবারের মত শোনে।
একই অবস্থা জাপানে। সম্রাট হিরোহিতো দেবতুল্য মানুষ। তাঁকে সাধারণ জনগণ পাবলিকলি তো দেখেইনি, কণ্ঠ শোনা দূরের কথা। কিন্তু জাপান ১৯৪৫এ জেনারেল ম্যাকআর্থারের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর সম্রাট হিরোহিতো স্বয়ং রেডিওতে ভাষণ দেন। সেই প্রথমবারের মত দেবতা-সম্রাটের কণ্ঠ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ে যুদ্ধে বিধ্বস্ত, পর্যুদস্ত জনপদ।
আজ আমরা লাইভ টিভি দেখে অভ্যস্ত। বিশ ও ত্রিশের দশক ছিল লাইভ রেডিওর স্বর্ণযুগ। ১৯২২ সালে আমেরিকায় সর্বপ্রথম রেডিও স্টেশন চালু হয়। জ্যাজ-ব্লুজ-ক্লাসিকালের মত মিউজিক বাজত তাতে। এমনকি লাইভ ব্রেকিং নিউজ হত। ব্রিটেনে ১৯২৩ সালে বিবিসি প্রথম রেডিও সম্প্রচার শুরু করে। একই বছর জার্মানিতেও রেডিও শুরু হয়।
আগের পোস্টে বলা মার্কোনির রেডিও ছিল কেবলমাত্র টেলিগ্রাফির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশ বছরের মাথায় ভ্যাকুয়াম টিউব ও সুপারহেটারোডাইন রিসিভার আবিষ্কার হবার কারণে রেডিওর ক্ষেত্রে বিশাল অগ্রগতি আসে। শুধু ডট-ড্যাশ ট্রান্সমিট করার পরিবর্তে বিশাল বিশাল অ্যান্টেনার সাহায্যে এএম এয়ারওয়েভে শত শত মাইল কাভার করতে শুরু করে রেডিও নেটওয়ার্কের ভয়েস ও মিউজিক সার্ভিস। রিপীটার স্টেশনের সাহায্যে পুরো আমেরিকায় নেশনওয়াইড ব্রডকাস্টিং শুরু হয়।
ফলে আগে যে সংবাদ নিউজপেপারে করে একেক সময়ে দেশের একেক অংশে যেত, সেটা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। অনেকগুলি রেডিও ব্রডকাস্ট স্মরণীয় হয়ে রয়েছে এখনো। এয়ার ন্যাভিগেশন পাইওনিয়ার চার্লস লিন্ডবার্গের শিশুপুত্র অপহরণ ও খুনের চাঞ্চল্যকর খবর (১৯৩২-৬)। মহিলা পাইওনিয়ার এমেলিয়া ইয়ারহার্ট আটলান্টিক পাড়ি দেবার সময় রহস্যময় অন্তর্ধান (১৯৩৭)। নিউইয়র্কে জার্মান এয়ারশিপ হিন্ডেনবার্গে অগ্নিকান্ড তারপর ক্র্যাশ, সমস্ত যাত্রীর মৃত্যু — সে ঘটনার পুরো সরাসরি সম্প্রচার, তাও আবার খুবই ইমোশনাল প্রত্যক্ষদর্শী এক সিবিএস নিউজ রিপোর্টারের মর্মস্পর্শী ভাষ্যে (১৯৩৬)।
এসব খবর শোনার জন্য প্রায় কাউকেই সংবাদপত্র কষ্ট করে কিনে আরামকেদারায় বসে পড়তে হয়নি। ১৯৩৮ নাগাদ ৮০% মার্কিন গৃহে রেডিও ছিল। গাড়িতেও রেডিও চলে এসেছে বিশের দশকে। স্বাক্ষরবিহীনতাও আর কোন সমস্যা নয়।
খবরের পাশাপাশি বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে রেডিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাংবাদিক আর নাট্যকাররা সে মাধ্যমের চরম সদ্ব্যবহার করেন। ফ্ল্যাশ গর্ডন নামে একটা কার্টুন আমরা ছোটবেলায় দেখতাম। বিশ-ত্রিশের দশকের কমিক বইয়ের পাতা থেকে রেডিও সিরিজে রূপান্তরিত হয় এই কাল্পনিক চরিত্রের আন্তর্গ্রহ অভিযানের কাহিনী (১৯৩৭)। ১৯৩৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্দেশক অরসন ওয়েলস এইচ জি ওয়েলসের ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডসের এমন এক চমৎকার রেডিও এডাপ্টেশন সম্প্রচার করেন যে, রাস্তার মধ্যে রেডিও শুনতে থাকা শ্রোতা গাড়ি বন্ধ করে বের হয়ে আসে এই ভেবে যে মঙ্গলগ্রহের প্রাণীরা বুঝি সত্যি সত্যি পৃথিবীতে আক্রমণ শুরু করেছে!
রেডিও জনপ্রিয়তার কারণে স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতিবিদরাও এর সদ্ব্যবহার করেন। ফ্রাংকলিন রোজাভেল্ট রাষ্ট্রপতি হবার পর নিয়মিত রেডিওতে জাতির উদ্দেশ্যে দেশের অবস্থা গতি-প্রকৃতি তুলে ধরতেন। ফায়ারসাইড চ্যাট নামে এই সিরিজে গ্রেট ডিপ্রেশন পরবর্তী কি কি সংস্কার করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কি করণীয়, তা নিয়ে মতামত থাকত। রোজাভেল্ট যে পোলিও আক্রান্ত ও হুইল চেয়ারের ওপর নির্ভরশীল এটা তার কণ্ঠ শুনে মার্কিনীরা ঘুণাক্ষরেও ঠাহর করতে পারত না।
ব্রিটেনেও রাজা পঞ্চম জর্জের সময় থেকে ক্রিসমাস রেডিও মেসেজ শুরু হয় (১৯৩২)। অষ্টম এডওয়ার্ড তার সিংহাসন পরিত্যাগের ঘোষণাও লাইভ রেডিওতে দেন (১৯৩৮)। আর ষষ্ঠ জর্জের যুদ্ধঘোষণার কথা তো বললামই। ১৯৪০ সালে চার্চিল হন লাইভ রেডিওতে বক্তব্য দেয়া প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধকালীন তার কয়েকটি রেডিও স্পীচ অত্যন্ত ঐতিহাসিক। Be ye men of valour (১৯৪০), We shall fight on the beaches (১৯৪০), This was their finest hour (১৯৪০), Blood, toil and sweat (১৯৪০)। এগুলির প্রতিটিই ব্রিটিশ ও কমনওয়েল্থ নাগরিকদেরকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে ব্রিটেনের আত্মরক্ষা ও অস্তিত্বের যুদ্ধে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করে।
আর ইংলিশ চ্যানেলের অপর পারে হিটলারের সাথে রেডিওর প্রেমের কথা কি না বলে পারা যায়! হিটলার ও নাৎসি পার্টি আধুনিক প্রযুক্তির যে পরিমাণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সদ্ব্যবহার করে, তেমনটা বোধ করি জার্মানির ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি। ১৯৩৩ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পরপর জার্মান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন হিটলার। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, সকলে জার্মানিকে অপদস্ত করেছে এতদিন, এখন সময় “মেক জার্মানি গ্রেট এগেন!”
জার্মানির সাধারণ মানুষ হিটলারের শক্ত শাসনের সুফল দেখতে শুরু করে। রেডিওতে সেগুলি আরো ঢালাও করে সম্প্রচার হত। হিটলার ও গোবেলসের অত্যন্ত বিদগ্ধ জ্বালাময়ী ভাষণের সাথে সাথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু এই রেডিও প্রপাগান্ডা ব্যতীত সম্ভব ছিল না।
অবশ্য শুধু রেডিওর কথা বললে অন্যায় করা হবে। ত্রিশের দশকে টকিং মুভিজও শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত ফিল্ম ছিল সাইলেন্ট। কিন্তু মানুষজন যখন থিয়েটারে চলচ্চিত্র দেখতে যেত, তখন ফিল্ম শুরুর আগে খবরের পাঁচ মিনিটের রীল দেখানো হত। একে বলে নিউজরীল — শব্দটা বর্তমান যুগের আবিষ্কার নয়!
সে সকল রীলে ইউরোপে কি ঘটনাবলী চলছে, তার সচিত্র সংবাদ পেত মার্কিনীরা। যেমন গান্ধী যখন ১৯৩১ সালে ব্রিটেন সফরে যান, তখন সে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। সে নিউজরীল প্রকাশ করে পাথে নামে এক কম্পানি। ১৯৩৬ সালে মিউনিখ অলিম্পিক ছিল হিটলারের শোডাউনের মোক্ষম সুযোগ। বোধ করি সে সময়েই অলিম্পিক ওপেনিং সেরেমনি এত বিশাল এক স্পেকটেকলে পরিণত হয়। হিটলার সুযোগ পায় সারা বিশ্বকে দেখানোর যে জার্মানি কিভাবে ফিনিক্স পাখির মত আগুনে ভস্মীভূত হবার পরও পুনরায় জন্ম নিয়েছে।
হিটলারের ঈগলস নেস্টে ব্যক্তিগত সময়েরও চলচ্চিত্র প্রকাশিত হয়। তাকে দেখানো হয় একজন শক্তিমান কিন্তু পরিশীলিত ফ্যামিলি ম্যান হিসাবে। এগুলি অবশ্যই ছিল প্রপাগান্ডা। জার্মান এক মহিলা ডিরেক্টর লেনি রিফেনশ্টাল নাৎসি পার্টির জন্য একটা সুদীর্ঘ অসাধারন প্রপাগান্ডা ফিল্ম তৈরি করেন, যার নাম ছিল দ্য ভিক্টরি অফ ফেইথ। সুসজ্জিত শৃংখলাবদ্ধ সারি সারি হাজার হাজার জার্মান নানা নাৎসি শ্লোগান ও চিহ্ন নিয়ে মগ্ন হয়ে হিটলারের বক্তৃতা শুনছে। বাকি বিশ্বকে হিটলারের প্রতি বিমোহিত করতে এই সীনই ছিল যথেষ্ট।
জার্মানি আর সোভিয়েত বাদ দিলে বাকি পশ্চিমা বিশ্বে প্রপাগান্ডা তখনো সেভাবে শেকড় গেঁড়ে বসেনি। মূলত নিউজ হিসাবে চলত। যেমন নেভিল চেম্বারলেইন ১৯৩৮ সালে মিউনিখ কনফারেন্স থেকে ফিরে ঘোষণা করলেন “পীস ইন আওয়ার টাইম।” কিংবা ইথিওপিয়ায় ইতালিয়ানদের আক্রমণের খবর, নানকিংয়ে জাপানী বোমাবর্ষণ, আর স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের খবর।
কিন্তু এই নিউজরীল আসত প্লেনের মেইলে, সময় লাগত। টিভি সম্প্রচার আসেনি তখনো। নিউজরীল ফিল্ম যেটা পারত না, কিন্তু রেডিও পারত, সেটা হল লাইভ সম্প্রচার। এ কারণে হিটলার, এফডিআর, চার্চিল সকলের সরাসরি যোগাযোগের গণমাধ্যম ছিল বেতার। (মনে করুন আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতারের কথাও!)
দেশনেতারা এভাবে সাধারণ প্রজাদের বৈঠকখানায় যেন সরাসরি চলে আসেন। আপ ক্লোজ এন্ড পার্সোনাল। মানুষের অভিমত প্রভাবিত করার মত এমন প্রযুক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েও ছিল না।
সন্দেহ নেই, পরবর্তী বিশ্বব্যাপী সংঘাতে অগ্রগণ্য ভূমিকা দিতে হবে রেডিওকেই।
(পোস্টে যোগ করা নিউজরীল বাদে ভিডিওগুলির অধিকাংশ সেসময়ের বেশিরভাগ মানুষ শুনেছে রেডিওতে, ইউটিউবে এখন যেমন সচিত্র রয়েছে, সেরকমভাবে নয়।)

This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0
ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫



