কোটোর ও জারা

তিনটা ইন্টারেস্টিং ডাকটিকেট। তিনটাই অর্জিনালি ইতালির। পোস্তে ইতালিয়ানে লেখার একপাশে ফ‍্যাশেস নামে কাঠের লাঠির একটা বান্ডিল, যার একপাশ দিয়ে কুঠারের মাথা বেরিয়ে আছে। মুসোলিনির ফ‍্যাশিস্ট পার্টির প্রতীক।

ডয়চে বেজেৎসুঙ ৎসারা
ডয়চে মিলিটের ফেরভাল্টুঙ কোটোর

কিন্তু তার ওপর ছাপ্পড় দেয়া জার্মান ভাষায়। একটায় লেখা ডয়চে বেজেৎসুঙ ৎসারা — ৎসারার জার্মান দখলদার সরকার। আরেকটায় ডয়চে মিলিটের ফেরভাল্টুঙ কোটোর — কোটোরের জার্মান সামরিক প্রশাসক।

মজার ব‍্যাপার হল, এই দুই স্থানের একটিও এখন আর জার্মানি বা ইতালির হাতে নেই। ৎসারা এখন ক্রোয়েশিয়ার জাদার শহর — পর্যটকদের কাছে বহুল জনপ্রিয়। আর কোটোর মন্টেনেগ্রোর অন‍্যতম বন্দর। দুটো শহরই আড্রিয়াটিক সাগরের তীরবর্তী মনোরম পর্যটক আকর্ষণ।

জাদার
কোটোর

কিন্তু এমন শান্তিপূর্ণ অবস্থা এ অঞ্চলে সবসময় ছিল না। ১৯১৮ সালের আগে আড্রিয়াটিকের পূর্ব উপকূলের উত্তরাংশ — ডালমেশিয়া — ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ‍্যের অংশ। মন্টেনিগ্রোর অস্তিত্ব ছিল অটোমান সাম্রাজ্য থেকে সম্প্রতি স্বাধীন রাজ্য হিসাবে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি মিত্রবাহিনীর সাথে যোগ দেয় জার্মানি-অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার জন‍্য। তাদের উদ্দেশ‍্য ছিল, অস্ট্রিয়া-হাঙেরির ডালমেশিয়ান উপকূল ইতালিতে অংশীভূত করা। কিন্তু ভের্সাই চুক্তির পর তাদের আশাভঙ্গ ঘটে। মিত্রশক্তির আরেক অংশীদার সার্বিয়ার স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।

সার্বিয়ার কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আরম্ভ। আর যুদ্ধশেষে তাদের বৃহত্তর স্লাভিক রাজ‍্য রূপ পেতে শুরু করে অস্ট্রিয়া-হাঙেরির অন্তর্গত স্লাভপ্রধান ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া-বসনিয়া প্রদেশকে একীভূত করার মাধ‍্যমে। এই কাজ করতে গিয়েই টক্কর লাগে আরেক অংশীদার ইতালির সাথে, কেননা আড্রিয়াটিক সাগরের সম্পূর্ণ উপকূলের নিয়ন্ত্রণ লাভের জন‍্য ইতালি বদ্ধপরিকর ছিল।

পরাশক্তিগুলির সমঝোতার মাধ‍্যমে জারা নামের ছোট্ট শহরটি কেবল ইতালির কাছে সঁপে দেয়া হয়। ইতালির মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিঁটমহলে পরিণত হয় শহরটি। শহরের একটা বড় অংশের জনসংখ্যা ছিল ইতালিয়ান। আর কোটোর মন্টেনেগ্রোর অংশই রয়ে যায়।

ইতালির জারা ছিঁটমহল, ১৯২০-৪৭

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি আগের সেই অপমানের বদলা নেবার সুযোগ পায়। ১৯৪১ সালে জার্মানি ও হাঙেরির সাথে যৌথ আক্রমণের বদৌলতে জারার আশপাশের বিশাল এলাকা, বর্তমান স্প্লিত উপকূল আর মন্টেনেগ্রোর কৌশলগত গুরুত্বের কোটোর উপসাগর দখলে আসে তাদের, সাথে স্লোভেনিয়ার দক্ষিণাংশ।

কিন্তু এই নতুন সাম্রাজ্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। মিত্র বাহিনীর সিসিলি আক্রমণের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৩ সালে মুসোলিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ইতালিয়ান প্রশাসন ও সেনাবাহিনী আড্রিয়াটিকের পূর্ব উপকূল ছেড়ে কেটে পড়তে শুরু করে।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ইউগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন এলাকা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দখল করে প্রতিবেশী দেশগুলি, ১৯৪১-৪৫
ইতালির জারা প্রদেশ, ১৯৪১-৪৩
ইতালির মন্টেনেগ্রো গভারনরেট, ১৯৪১

তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে হিটলার পাঠান জার্মান সেনাবাহিনী। কারণ ভয় ছিল যে, কোটোরের মত কৌশলগত বন্দর অরক্ষিত রাখলে যৌথবাহিনী সেই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে জার্মানির বিরুদ্ধে আরেকটি ফ্রন্ট তৈরি করতে পারে।

বর্তমান ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়া তখন ছিল জার্মান পাপেট ক্রোয়েশিয়ার “নাৎসি” শাসক আন্তে পাভেলিচের উশতাসে পার্টির হাতে। কিন্তু জারা এবং কোটোরের শাসনভার তাদের হাতে জার্মানরা ছাড়তে রাজি হয়নি সংগত কারণে। সার্বিয়ার সরকার ছিল নাৎসি রাজাকার সার্বিয় জাতীয়তাবাদী চেতনিকদের হাতে। এরা পুরো যুদ্ধের সময় নিজেদের মধ‍্যে এবং মার্শাল টিটোর বামপন্থী পার্টিজানদের সাথে লড়েছে। বহু গণহত‍্যার সাথে এরা সংশ্লিষ্ট ছিল।

মুসোলিনির অপসারণের পর ইতালির জার্মান দখলীকৃত অঞ্চল, ১৯৪৩

ডাকটিকেটগুলি সেই সময়ের জার্মান প্রশাসিত কোটোর ও জারা শহরের। এগুলিও বেশিদিন চলেনি। এক বছর পরেই ১৯৪৪ সালে তল্পিতল্পা গুঁটিয়ে জার্মান পিতৃভূমি রক্ষার জন্য নাৎসিবাহিনীকে বল্কান পরিত‍্যাগ করতে হয়। সে জায়গায় চেতনিক-উশতাসেদের সাথে প্রতিযোগিতা শেষে বিজয় পায় পার্টিজানরা।

যুদ্ধশেষে কয়েক বছর ধরে আবারো ইতালির সাথে সেই পুরনো দর কষাকষির পর জারা আর কোটোর নতুন ইউগোস্লাভিয়া ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকের অংশ হয়।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




ডাকটিকিটগুলো অত‍্যন্ত দুর্লভ নয়, কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসের খুব ক্ষণস্থায়ী অস্থির সময়ের সাক্ষী।



আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




This work is licensed under CC BY-NC-SA 4.0

ব্যবহারের সময় এই ক্রেডিটটি সংযুক্ত করুনঃ Copyright © satsagorermajhi.com, ২০২৫




আরও পড়ুন বিজ্ঞাপনের পর...




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

close

ব্লগটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন!